তেরো ঠিক কবে থেকে 'আনলাকি' সংখ্যা ধরে নিল সবাই, তার ঠিকঠাক হিসেব নেই কারো কাছেই। তেরো একটা প্রাইম নাম্বার। আর ফিবোনাক্কি রাশিমালাতেও তেরো আছে। এজটেক মিথলজিতে তেরোটা বেহেশতের কথা আছে।
সংকলনের নামটা খানিক ধার করা। ' বারো ঘর এক উঠোন ' নামে স্বদেশী আন্দোলন করা ভীষণ রকম বাস্তববাদী লেখক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর একটা উপন্যাস আছে। উপন্যাসের কাভার আবার ভীষণ প্রিয় পূর্ণেন্দু পত্রীর করা। এই তেরটা গল্পের একটায় পূর্ণেন্দুবাবুর শুভঙ্কর নন্দিনী চলে এসেছে। জ্যোতিবাবু ভীষণ বাস্তব লেখক। লেখায় চূড়ান্ত বাস্তবতা আনতে সমাজের দলিতদের সাথে থেকেছেন, লিখেছেন খুব কাছ থেকে দেখা তাদের জীবনের অংশ। আমি বাস্তবতাকে খুব কাছ দেখতে ভয় পাই হয়ত, অনেকটা বদ্ধ হাড়িতে গোখরো থাকতে পারে ধরে নিয়ে আশপাশে ঘুরে বেড়াতে নিশ্চিন্তবোধ করি। আর তাই পরাবাস্তব কিংবা জাদুবাস্তবতা তুলে আনি লেখায়।
জুডাস স্ক্যারিয়ট তের নম্বর আসনে যীশুর সাথে বসেছিলেন লাস্ট সাপারের সময়। এখানে একটা মজার প্রশ্ন আসে। তের নম্বর আসনে বসেছিলেন বলেই কি বিশ্বাসঘাতক হয়েছিলেন তিনি নাকি বিশ্বাসঘাতক হবেন বলেই তের নম্বর আসনে বসেছিলেন? একটা প্যারাডক্স চলে আসে। আমারও ইচ্ছে হল পাঠকদের জন্যে একটা প্যারাডক্স ছুঁড়ে দেই। তেরটা গল্প নিয়ে সংকলন করেছি বলেই সেটা পাঠকের ভাল লাগবে নাকি পাঠকের ভাল লাগবে বলেই তেরটা গল্প দিয়েছি? প্রশ্নে ঋণাত্মক অংশ যোগ করে প্যারাডক্সটা জটিল করা যায়। তেরটা গল্প বলেই সংকলনটা ভাল লাগেনি পাঠকের -তাও হতে পারে। প্যারাডক্সের সমাধান পাঠকের কাছ থেকেই পাবার আশা রাখি।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর 'বারো ঘর এক উঠোন' বইটা আমার পড়া হয়নি। বিখ্যাত একটা বই। তবে মুনীরা কায়ছানের 'তেরো ঘর এক উঠোন' বইটা পড়ার সুযোগ হয়েছে। বই দুইটির তুলনা করছি না। অবশ্য বই দুটোতে নামের মিল ছাড়া আর কোনো মিল নেই। বইটি মুনীরা কায়ছানের প্রথম গল্পগ্রন্থ; যেখানে মোট ১৩ টি গল্প সংকলিত আছে।
চন্দ্রাহত
গ্রামের নাম আমজাদের বাজার। অদ্ভুত নাম। নামটার সৃষ্টি কীভাবে বা আমজাদ লোকটাই বা কে এই নিয়ে নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু বলতে পারেনা। তবে নামটার সাথে এক সুদর্শন ফেরিওয়ালার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। যে কিনা হুট করে এসে হুট করেই গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সেই গ্রামেরই হাজী আলতাফ মাদরাসার প্রিন্সিপাল হাজী মুহসিনের তিন কন্যা আর চার ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মায়মুনা। সুন্দরী হওয়ায় স্বভাবতই পাণিপ্রার্থীর অভাব হয়নি। কিন্তু যেইই মায়মুনার দিকে নজর দিয়েছে, কোনো না কোনো দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে। সবাই বলে জিন-ভূতের আছর আছে মায়মুনার উপর। আসল ঘটনা কী?
শম্বুক
গল্পকথক পেডিয়াট্রিক সাইকোলজির একজন ডাক্তার। কফিশপে স্বামীর সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির জন্য যেতে পারছেন না। তখন একটি তিন-চার বছর বয়সী মেয়ে তার বাবার সাথে চেম্বারে আসে। শিশু রোগি কম দেখেন নি গল্প কথক, তবে এই শিশুটির নাম জিজ্ঞাসা করার পর উত্তর শুনেই তিনি বেশ অবাক হন। মেয়েটির বাবা জানান, আরিয়া অর্থাৎ শিশুটির শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়। গত দশ বছর ধরেই আরিয়ার এই অবস্থা। তিনি তার ডাক্তারি জীবনে এমন ঘটনা দেখেন নি। আসলেই কি ঘটনা সত্য নাকি প্রচারণা করে কিছু টাকা উপার্জনের চিন্তা করছে আরিয়ার বাবা?
নার্সিসাস
নার্সিসাস শব্দের অর্থ নিজের সৌন্দর্য আর সক্ষমতার অতিশায়িত অনুভূতি, যা নিজের প্রতি নিমগ্নতা তৈরি করে। চাকরির সুবাদে সার্কিট হাউজের ডাকবাংলোতে কিছুদিনের জন্য থাকতে হলো সায়রা-হাসিব দম্পতির। চার বছরের সংসার তাদের। এখানে আসার পর সায়রা সারাদিন একটি আয়নার সামনেই বসে থাকে। নিজেকে দেখতেই ভালো লাগে তার। আয়নায় নিজেকে অনেক সুন্দরী লাগে তাকে। তবে ডাকবাংলোর কাজের লোক হাসি বানু বারণ করেছিল ঐ আয়নায় এত চেহারা দেখতে। সায়রা বারণ শুনেনি। উলটো বাড়ি ফেরার সময় আয়না সাথে নেয়ার বায়না করে স্বামীর কাছে। এদিকে এই ক'দিনের যেন সায়রা তরুণী থেকে বুড়িয়ে গিয়েছে। তাহলে কি ঐ আয়নার মধ্যেই এমন কিছু রয়েছে যা সায়রার চেহারায় প্রভাব ফেলেছে?
আয়ু
বুড়িভিটা গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো সোনালু গাছের পাশেই ছিল তমিজ ভূঁইয়ার স্ত্রী মরিয়ম জাহানের ভিটা। সেই মরিয়ম জাহানকে কেন্দ্র করেই একসময় গ্রামটির নাম বুড়িভিটা হয়ে গেছে। মরিয়মের জন্ম কবে সেটা তার নিজেরও মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, দশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল এক কেরানির সাথে। সেই বছরই ভারতে প্রথম রেল চালু হয়েছিল। সেই হিসেব করলে বয়স শত পেরিয়েছে অনেক আগেই। স্রোতের বিপরীতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকায় নাতি-নাতনিরা তাদের সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা করে নিতে পারছে না। তাই নিয়ে প্রতিদিনই ঝগড়া লেগে আছে। মরিয়ম জাহানের দীর্ঘজীবনের রহস্য কী?
ব্যাঙ রাজকন্যা
গল্পকথক একজন লেখক। তার কাছে একদিন হাফেজ নুরেন ওরফে অর্ণব হাসান নামে এক লোক আসে। লোকটি লেখককে একটি গল্প শোনাতে চান। যে গল্পটি ঐ ব্যক্তি বললে হয়তো বিশ্বাস করবেনা কেউ, তাই তিনি চান লেখক যেন গল্পটি শুনে তারপর পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেন। লোকটি তার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি গল্প বলেন। যা লেখককে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে বাধ্য করে। তবুও লোকটি তার নিজ বিশ্বাসে অটল। লোকটির গল্পের সাথে ব্যাঙ রাজকন্যার সম্পর্ক কী?
শুভঙ্করের নন্দিনী
পূর্নেন্দু পত্রীর কথোপকথন পড়েছেন? অসাধারণ একটা কবিতা-কথামালার বই। তবে এই গল্পের নায়ক নায়িকা সেই শুভঙ্কর-নন্দিনী না হলেও তাদের প্রেমের আবহে তারা নিজেদের সেটাই ভাবতে পছন্দ করে। সোহান ও রূপার প্রেমের বিয়ে। ঝড়ঝাপটা ত কম যায়নি। এখনো একে অপরকে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ছায়া থেকে আড়াল থেকেই রক্ষা করে চলছে তারা।
সিন্ডারেলা
ছোটবেলায় সিন্ডারেলার কার্টুন দেখেছেন আর তার মতো করে জাদুর উপহার পেতে চায়নি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। লঞ্চ দূর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারানো কাজলও নিজেকে সিন্ডারেলা ভাবতে ভালো লাগে। জন্মগতভাবে রূপ পেলেও অযত্নের অভাবে তার জৌলুশ হারিয়েছে। চাচার সংসারে দুই ভাই-বোন পরগাছার মতো বেঁচে রয়েছে। টাকার অভাবে নিজে ডিগ্রি পর্যন্ত পড়েছিল। তবে ভাই পলাশকে শিক্ষিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। রান্না-বান্নার প্রতি ঝোঁক থেকেই একটি রেস্টুরেন্টে রাঁধুনীর কাজ নিয়েছে সে। সেই রেস্টুরেন্টের পাশেই একটি দোকানের নাম, 'শখের তোলা আশি টাকা।' এমন অদ্ভুত নামের কারণ জানতে গিয়েই দোকানটির মালিকের সাথে পরিচয় হয় কাজলের। এই দোকান মালিকের বদৌলতেই কাজল দেখা পায় সিন্ডারেলার। তবে রূপকথার সিন্ডারেলা ও বাস্তবের সিন্ডারেলার মধ্যে কতটা পার্থক্য দেখা যায়?
মুনীরা কায়ছানের চন্দ্রভুক বইটি পড়েছিলাম। লেখার হাত দারুণ। এই বইটাও আমাকে আশাহত করেনি। সবগুলো গল্প যে ভালো লাগবে এমন ভাবতেও চাইনা। তবে অধিকাংশ গল্পগুলোই সুন্দর ছিল। চন্দ্রাহত গল্পটা বেশ লেগেছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত আধুনিক কাব্যসাহিত্যের মাধ্যমে রামায়ণকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। মুনীরা কায়ছানের আয়ু গল্পটাতে এমনই একটি ঘটনাকে উপজীব্য করে গল্প লিখেছেন, যা আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে উৎসাহ দেয়। বইটির প্রতিটি গল্পতেই সুন্দর সব ইলাস্ট্রেশন আছে। নতুন লেখকদের বই নিয়ে অনেকেরই ভয় থাকে! তবে এই বইটি পড়তে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে। হ্যাপি রিডিং।