"আমি আর টোটো মার্কিন নোঙর জেটি তৈরির কাজ অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে দেখে বোবা হয়ে গেলাম। নদীর বুকটাকে ওরা খেলার মাঠ বানিয়ে কাঠের পাটাতন ভাসাচ্ছে। নদীর তলপেটে পাতাল খুঁড়ে সিমেন্টের বিম ঢালাই চলছে। জিপ গাড়ি নামে যেন খুদেমতো একটা ছুটন্ত চালাঘর এদিক-সেদিক তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে ডাঙায় - ফিরে আসছে। এই তুলনায় আমরা মা-বাবার সঙ্গে থাকি তো একটা দেশলাই বাক্সে। ছাদ ফুটো। বর্ষায় জল পড়ে। বারান্দার টালি উড়ে গেলে তা আর বদলানো হয় না। উঠোন ভর্তি ছাগল, ঢেঁড়শ গাছ, লাউমাচা। বছর বছর ভাই হয় আমাদের। রোদ উঠলে মুতের কাঁথা শুকোতে দেয় মা। জানালার কবাটে উঁই ধরে আছে। হেরিকেন ধরালে শীতের সন্ধ্যায় অন্ধকার আরো ঘোলাটে হয়ে যায়।"
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতের খুলনাতে (অধুনা বাংলাদেশ)। খুলনা জিলা স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, ১৯৬১ সালে আনন্দবাজারে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ছোটগল্প ‘হাজরা নস্করের যাত্রাসঙ্গী’, ‘ধানকেউটে’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বৃহন্নলা’, কিন্তু দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই শ্যামলের লেখনী বাংলা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়। ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান, সুরসিক ও আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর অন্যতম কর্তা সন্তোষকুমার ঘোষের সাথে তাঁর মনোমালিন্য হওয়ায় যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের সাহিত্য পত্রিকা অমৃত সম্পাদনা করতেন। ১৯৯০ সালে অবসরের পরে আজকাল পত্রিকা ও সাপ্তাহিক বর্তমানে নিয়মিত লিখেছেন। গ্রামীণ জীবন, চাষবাস, সম্পর্কের জটিলতা ইত্যাদি শ্যামলের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১৯৯৩ সালে শ্যামল সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন ‘শাহজাদা দারাশুকো’ উপন্যাসটির জন্যে। এছাড়া তাঁর লেখা দেশ বিদেশের নানা ভাষাতে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
শ্যামলের জীবন বর্ণাঢ্য; অনেক উত্থান পতন ও নাটকীয়তায় টইটম্বুর। কৈশোরে দুর্ঘটনাক্রমে পতিতাগমন করলে লঘু পাপে গুরু দণ্ড পান তিনি, রাতারাতি তাকে বড়দের জগতের নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে হয়। খুলনার রঙিন শৈশব, বাবার দুর্নীতি, দেশভাগের পরের সংগ্রাম, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ছদ্মবেশে গৃহভৃত্যের কাজ নেওয়া, নিজেকে সিনেমার নায়ক পরিচয় দিয়ে বিড়ম্বনায় পড়া, কথাসাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ, জীবনবোধ - সব মিলিয়ে এ বই পড়ে বিরক্ত হওয়ার সুযোগ নেই ;যদি না "জীবন রহস্য" পড়া থাকে। পরপর দুটো বই পড়লে দেজাভু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পূর্বোক্ত বইয়ের অনেক ঘটনা, চিন্তাভাবনার বীজ সরাসরি এখানেও আছে। দুই বইয়ে আরেকটা মিল আছে - প্রায় পুরো সময় জুড়ে আত্মজীবনী লিখতে লিখতে শেষদিকে এসে শ্যামল লিখে ফেলেছেন মুক্তগদ্য (হাল আমলের ভাষায়।) সমাপ্তিও হয়েছে বাংলাসাহিত্য ও নিজের লেখালিখি সম্পর্কিত ভাবনা দিয়ে; আত্মজৈবনিক কোনো উপাদান সেখানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এতে পাঠকের মনে একটা বড় রকমের অতৃপ্তি থেকে যায়।
শ্যামল গাঙ্গুলীর এই আত্মকথাটা পড়তে যথারীতি ভালো। লেখকের ভেতর থেকে উঠে আসা কাটা-কাটা সব বাক্য। কিন্তু, ‘জীবন রহস্য’ যদি কেউ পড়ে থাকেন আগে, তার কাছে এই বইটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পুরোনো, নতুন কিছু নেই। তবে নিঃসন্দেহে, শ্যামলের জীবনে প্রথমবার উঁকি মারতে চাওয়া পাঠকের কাছে এই স্মৃতিচারণই দুর্দান্ত লাগবে।
শেষ দিকে শ্যামল একবারে লাফ মেরে বৃদ্ধ বয়েসে চলে গেছেন, তখন চেয়েছেন নিজের এবং সমসাময়িকদের সাহিত্যিক যাত্রা নিয়ে একটা সামগ্রিক বক্তব্য দিতেও। পাঠকের কাছে ওই জায়গাটা নতুন প্রাপ্তি, যদিও সেই অংশটা পড়তে বেশ খাপছাড়া, অমসৃণ।
কাগজ প্রকাশন এ বছর বইটা পুনঃমুদ্রণ করেছে। বানান, সম্পাদনার দিকে মনোযোগের অভাব পাঠককে খানিক বিরক্ত করলো।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের একজন গ্র্যান্ডমাস্টার বলা যায় লেখককে। আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ে নিজ জীবনের করা ভুলগুলি নিয়ে নিঃশঙ্কোচে কথা বলেছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সব ভুলগুলিই কি মধুর ছিল?
'যারা পকেটে শৈশব নেই, প্রতিভার সাগরে সাঁতড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব।' উক্ত কথাটি গ্রন্থে বারবার বলেছেন কিংবদন্তি লেখক। অদ্ভুত সৌন্দর্যে এবং নিষ্ঠুরতায় পূর্ণ এক বৈচিত্রময় শৈশব পেয়েছিলেন শ্যামল। লেখকের বাবা একটি মহাযুদ্ধের সাক্ষী। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় দ্বিতীয়টির।
যুদ্ধকালীন সময়ে মানুষজনের পেশায় পরিবর্তন থেকে শুরু করে দেশবিভাগের মত নির্মম বাস্তবতা, সবকিছুর মধ্য দিয়ে এক বর্ণীল ভ্রমণ করে বেরিয়েছেন গল্পকার। নিজের ঠাকুর্দা এবং দাদামশাই সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ সচেতন পাঠকের কাছে গুরুত্ববহ হতে পারে। কারণ শ্যামল মনে করতেন প্রতিটি ব্যক্তি প্রায় ১০০ বছরের অভিজ্ঞতার এক ক্যাপশুল যেন। নিজের ৬০-৭০ বছরের সাথে আগের এবং পরের কিছু বছরের কল্পনার যোগফল থেকেই তার এই ধারণা।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় জীবনে ব্যাপক অর্থকষ্টে ভুগেছেন। প্রায় সবধরণের পরীক্ষায় ফেল মেরেছেন। জায়গা-অজায়গায় প্রচুর মার খেয়েছেন। হয়েছেন অপমানিত। বিভিন্ন রকমের পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। প্রেম এসে বারবার ছেড়ে ছেড়ে গিয়েছে। নিজ জীবনের সবচেয়ে বিব্রতকর অধ্যায়গুলো অকপটে লিখে গেছেন ঐতিহাসিক এক সময়ের এই নক্ষত্র।
লেখালেখির ক্ষেত্রে শ্যামল জটিল ভাষা প্রয়োগ করা থেকে সঙ্গত কারণে নিজেকে বিরত রাখতে পেরেছিলেন। তার লেখালেখির ক্রাফ্ট এবং তৎসংশ্লিষ্ট নানা রঙের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুনেছেন আত্মজীবনীমূলক এই বইটি। শ্যামলের রাইটিং এ চলে এসেছে কলকাতার শহর বা একটি দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার সন্ধিক্ষণের কাহিনি। বিভিন্ন লিজেন্ডারি লেখকদের সান্নিধ্য এবং তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে অনেক প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা। বাংলা সাহিত্যে 'দেশ' পত্রিকা ছাড়াও আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সাময়িকীর গোড়ার গল্প বলেছেন গল্পকার শ্যামল।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের চোখের সামনে ঘটেছে ঐতিহাসিক অনেক নারকীয় ঘটনা। মহাযুদ্ধ, দেশবিভাগ এবং এসবের আঁচে নিজেরও জ্বলে-পুড়ে যাওয়াটা কত স্নিগ্ধতার সাথেই না লিখেছেন গ্রন্থকার। কিছু কিছু ঘটনায় পাঠক ব্যাপক উইট এবং হিউমারের দেখা পাবেন। আবার বেশিরভাগ ঘটনা যেন ডার্ক কমেডি ছাড়া কিছু নয়।
জীবনভর লেখকের যে ফিলসফিক্যাল জার্নি তা হৃদয়ের গহীন ছুয়ে যায়। বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত লেখকের সাথে তার বন্ধুত্ব পাঠকের মনে চমক সৃষ্টি করতে পারে। ইচ্ছে করে নামটি লিখলাম না। নিজ সময়, কাল বা জীবনকে এলোমেলো ড্রাইভারের মত চালিয়েছেন বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিশালি এই গদ্যকার। বিভিন্ন যন্ত্রণায় অগ্নিস্নান করে যেন অদম্য এক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়।
বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী পাঠকদের জন্য আমার মতে এই বইটি একটি ইমোশনাল গাইডলাইন। গুরুত্বপূর্ণ লেখক, বই, ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, পত্রিকা, সম্পাদক এবং অদ্ভুত এক সময়ের অপূর্ব সাক্ষ্য দিয়েছেন লেখক। পুরো বইজুড়ে তার ক্ষুরধার বিশ্লেষনী ক্ষমতা, গভীর জীবনবোধ এবং উৎকৃষ্ট ভাষার প্রয়োগ দেখে উপলব্ধি হয় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের অগুনতি ভুলগুলি প্রকৃতপক্ষে মধুর ছিল।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি লেখক : শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম প্রকাশ : একুশে বইমেলা ২০০৩ দ্বিতীয় মুদ্রণ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রকাশনা : কাগজ প্রকাশন প্রচ্ছদ : সুকান্ত ভৌমিক জঁরা : আত্মজীবনীমূলক রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
'যার পকেটে শৈশব নেই - প্রতিভার নদীতে সাঁতার দিতে নামা তাঁর উচিত হবে না। ' - শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
বাঙালি আত্মজীবনী লিখতে পারে না। তাতে সত্যের অনুপাতে মিথ্যার মিশ্রণের হার থাকে যোজন যোজন বেশি। ফলে সৎ আত্মকথার বদলে পাই খানিক সত্যের সাথে ডুমো ডুমো মিথ্যার মিশেলে অদ্ভুত এক লেখা। ঠিক এখানেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব। জীবনের সব ভুলকে তিনি ফুল মনে করেননি। কিছু কিছু ভুল কাঁটার মতো তাঁকে বিদ্ধ করেছে। দেহকে আহত করেনি ; হৃদয়ে রেখে গেছে চিরস্থায়ী ক্ষতের দাগ। সেই ক্ষতের কথা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লিখেছেন। বড়ো দরদ দিয়েই লিখেছেন। যা পড়তে বেশ লাগে।
খুলনার জন্মেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। দেশভাগের আগপর্যন্ত সেখানেই বসবাস। চমৎকার বর্ণনা আছে আজ থেকে প্রায় আট দশক আগের খুলনার। পড়তে গিয়ে মনে হবে চোখের সামনে সব বায়োস্কোপের মতো ভেসে উঠছে।
দেশভাগের বেদনা নিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। এরপর রাজনীতি, প্রেম, ব্যর্থতা ও বেকারত্ব - সবকিছুর বড্ড জীবনঘনিষ্ঠ বর্ণনা। যেখানে লেখকের বন্ধু মনোজের মাধ্যমে ভিন্ন এক জগতের সন্ধান পাবেন পাঠক। আবার, সুনীল, শক্তি, বরেন, শীর্ষেন্দু- এঁদের মতে নামজাদা লেখকদের সান্নিধ্যের স্মৃতিচারণ পাওয়া যাবে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে।
'জীবন রহস্য' পড়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে আবিষ্কার করেছিলাম। সেই মুগ্ধতার কারণেই 'এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি' নিয়ে আগ্রহ অনেকটাই বেশি ছিল। ২শ ৩২ পাতার বইটির প্রথম অর্ধেক অনবদ্য। একেবারে ফার্স্টক্লাস। কিন্তু বাকিটুকু কেমন যেন গতিহীন ; যেখানে ঘটনা পরম্পরার অনেক অভাব।
"আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙ্গিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার।"
মাহমুদুল হকের মতো শ্যামলও এমনটাই মনে করতেন। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে খুলনার ভৈরব নদীর তীরবর্তী এলাকায়। এসব গল্প তিনি ভীষণ মায়া মিশিয়ে লিখেছেন। বেশকজন ভাইবোনের মাঝে বড়সড় পরিবার বেড়ে উঠেছেন তিনি। বাবা একসময় সরকারি চাকুরি করতেন, পরে শুরু করেন ওকালতি। তার কৈশোরকালেই তার বড় ভায়েরাও চাকুরিতে ঢুকে গিয়েছেন। তবে পরিবারের সদস্যদের কথা অল্পই আছে। তার চেয়ে আশপাশের কথাই বেশি। একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ভৈরব নদীতে একবার গোছল করার সময় ডুব দিয়ে দেখেন মাথা তুলতে পারছেন না। উঠতে গেলেই মাথা শক্ত কিছুর সাথে আটকে যাচ্ছে। বুঝতে পারলেন যে পাশে অনেকগুলো নৌকা বাধা থাকে সেদিকটায় চলে এসেছেন। ভীষণ ভয় জেকে ধরল। মনে হলো মরে যাবেন। কিন্তু প্রাণান্ত চেষ্টায় নৌকার মাঝে ভেসে উঠতে পেরেছিলেন। ঠিক এরপর তার ব্যাক্তিগত অনুধাবনের কিছু কথা আছে। লাইনগুলো আলাদা করে নজর কাড়ল বলে হুবহু তুলে দিচ্ছি।
"ভাগ্যিস মরে যাইনি। মরে গেলে মা ঠিক মারত। ওটাও তো তখন একটা অন্যায়। মায়ের কথা না শুনে মরে যাচ্ছি। অ্যানুয়াল পরীক্ষা বাকি। ক্লাস ফোরে ওঠা হয়নি। এই সময় কি মরা যায়! তেজোদের বাগানে গাছে গাব পাকবে এবার। সন্ধ্যে সন্ধ্যে বাদুর আসছে। ওগুলো খাবে কে! এখন মরা যায় না কিছুতেই।"
আমার চোখে বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশ জীবনকে এভাবে দেখার বর্ণনাগুলো। আরেকবার তিনি আর তার বন্ধু একবার ঘটনাচক্রে পতিতাসঙ্গ লাভ করেন। কিন্তু ঘটনাটা জানাজানি হওয়ার পর থেকে বাড়ি এবং আশেপাশে খারাপ ছেলের তকমা পেয়ে যান। নিরপরাধ মানুষকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে থাকলে তার মধ্যে একটা অপরাধ প্রবণতা জেগে উঠতে দেখা যায়। শ্যামলের ক্ষেত্রেও তাই হলো। একটা সময়ে ইচ্ছাকৃতই এসব করতে থাকেন। একবার বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে নিজে এবং আশেপাশের কিছু ছেলেপেলে মিলে উদরপূর্তি করেন। বাড়িতে ফিরলে যথারীতি উত্তম-মধ্যম পড়ে তার উপর। এরপর দেখা যায় বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ধারে গিয়ে ফিক করে হাসছেন। অতোগুলো টাকার বদলে অল্পকটা মার, তাদেরকে বেশ ঠকিয়েছেন ভেবেই আনন্দ পান।
তার কৈশোরের সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। তার বয়স কম হওয়ার সমস্ত সমীকরণ বুঝতেন না কিন্তু যুদ্ধের একটা প্রভাব থাকেই। এ সম্পর্কিত কিছু টুকরো পাওয়া গেলো লেখায়। যুদ্ধের কিছুদিন পরই দেশভাগ। পুরো পরিবারসহ তারা চলে যান কলকাতায়।
তবে সত্যি বলতে তার শৈশব-কৈশোরের গল্প যতোটা টানতে পেরেছিলো পরবর্তী অংশগুলোতে তেমনটা অব্যাহত থাকেনি। তার লেখালেখি, পরিচিত মানুষজন, জমি জিরেত করার কথা এসেছে প্রায়ই। কিন্তু গল্পগুলোর ধারাবাহিকতা এবং বিস্তারিত বর্ণনার অভাব বারবার চোখে পড়ছিলো।
শ্যামলের লেখা পড়ার মাঝেই একটা আনন্দ আছে। তার অকপট বর্ণনাভঙ্গিও ভালো লাগার মতো। তবে প্রথমার্ধের মতো পুরো বইটা না হওয়ার একটা আক্ষেপ থেকেই যায়।