হুমায়ূন আহমেদ বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক গণ্য করা হয়।সাবলীল ঘটনার বর্ননা আর সহজ ভাষায় লেখার কারণে হুমায়ুন আহমেদের বই এর তুলনা নেই। হুমায়ূন আহমেদ একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও হুমায়ূন আহমেদ সমাদৃত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। হুমায়ুন আহমেদের বইসমূহ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই কালপর্বে তাঁর গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। হুমায়ূন আহমেদ এর সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলি চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে।তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। তবে তাঁর টেলিভিশন নাটকগুলি ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়। সংখ্যায় বেশী না হলেও তাঁর রচিত গানগুলোও সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর অন্যতম উপন্যাস হলো নন্দিত নরকে, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া ইত্যাদি। তাঁর নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো দুই দুয়ারী, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেঁটুপুত্র কমলা ইত্যাদি। নবীজি (২০১২) হুমায়ুন আহমেদের অপ্রকাশিত ও অসমাপ্ত বই।
Humayun Ahmed (Bengali: হুমায়ূন আহমেদ; 13 November 1948 – 19 July 2012) was a Bangladeshi author, dramatist, screenwriter, playwright and filmmaker. He was the most famous and popular author, dramatist and filmmaker ever to grace the cultural world of Bangladesh since its independence in 1971. Dawn referred to him as the cultural legend of Bangladesh. Humayun started his journey to reach fame with the publication of his novel Nondito Noroke (In Blissful Hell) in 1972, which remains one of his most famous works. He wrote over 250 fiction and non-fiction books, all of which were bestsellers in Bangladesh, most of them were number one bestsellers of their respective years by a wide margin. In recognition to the works of Humayun, Times of India wrote, "Humayun was a custodian of the Bangladeshi literary culture whose contribution single-handedly shifted the capital of Bengali literature from Kolkata to Dhaka without any war or revolution." Ahmed's writing style was characterized as "Magic Realism." Sunil Gangopadhyay described him as the most popular writer in the Bengali language for a century and according to him, Ahmed was even more popular than Sarat Chandra Chattopadhyay. Ahmed's books have been the top sellers at the Ekushey Book Fair during every years of the 1990s and 2000s.
Early life: Humayun Ahmed was born in Mohongonj, Netrokona, but his village home is Kutubpur, Mymensingh, Bangladesh (then East Pakistan). His father, Faizur Rahman Ahmed, a police officer and writer, was killed by Pakistani military during the liberation war of Bangladesh in 1971, and his mother is Ayesha Foyez. Humayun's younger brother, Muhammed Zafar Iqbal, a university professor, is also a very popular author of mostly science fiction genre and Children's Literature. Another brother, Ahsan Habib, the editor of Unmad, a cartoon magazine, and one of the most famous Cartoonist in the country.
Education and Early Career: Ahmed went to schools in Sylhet, Comilla, Chittagong, Dinajpur and Bogra as his father lived in different places upon official assignment. Ahmed passed SSC exam from Bogra Zilla School in 1965. He stood second in the merit list in Rajshahi Education Board. He passed HSC exam from Dhaka College in 1967. He studied Chemistry in Dhaka University and earned BSc (Honors) and MSc with First Class distinction.
Upon graduation Ahmed joined Bangladesh Agricultural University as a lecturer. After six months he joined Dhaka University as a faculty of the Department of Chemistry. Later he attended North Dakota State University for his PhD studies. He grew his interest in Polymer Chemistry and earned his PhD in that subject. He returned to Bangladesh and resumed his teaching career in Dhaka University. In mid 1990s he left the faculty job to devote all his time to writing, playwright and film production.
Marriages and Personal Life: In 1973, Humayun Ahmed married Gultekin. They had three daughters — Nova, Sheela, Bipasha and one son — Nuhash. In 2003 Humayun divorced Gultekin and married Meher Afroj Shaon in 2005. From the second marriage he had two sons — Nishad and Ninit.
Death: In 2011 Ahmed had been diagnosed with colorectal cancer. He died on 19 July 2012 at 11.20 PM BST at Bellevue Hospital in New York City. He was buried in Nuhash Palli, his farm house.
গত বছর যখন হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ছিলাম (পরিচিত নামের বই) তখন একটা নাম না শোনা বইও পড়ে ফেলি-অচিনপুর, অবাক হয়েছিলাম খুব। হুমায়ূন আহমেদের লেখাকে তিনটি ভাগে ফেলা যায়- স্বর্ণযুগ, রৌপ্যযুগ এবং সর্বশেষ জং ধরা লৌহযুগ। সে হিসেবে এই বইখানা নিঃসন্দেহে স্বর্ণযুগের অন্তর্গত। অচিনপুরের সাথে ফেরা'র কিঞ্চিৎ মিল আছে- একটা চক্র সম্পন্ন হওয়ার মিল।
সোহাগী গ্রামের কাহিনী নিয়ে এই বই, ভাঁটি এলাকা হওয়ায় এদিকটায় তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। কোনো স্কুল কলেজ নেই, হাসপাতাল তো ম্যালা দূরের ব্যাপার; তারপরও ডাক্তার আমিন আছেন। আমিন ডাক্তার ফেরার পুরোটা জুড়েই আছেন। আরও আছে চৌধুরী পরিবার, মতি মিয়ার পরিবার- স্ত্রী শরিফা, দুই ছেলে আজরফ ও নুরুদ্দীন, আশ্রয়হীন রহিমা ও তার ছোট মেয়ে অনুফা। এরই সাথে আছে গ্রামের গল্প, জ্যোৎস্না রাতে কানা নিবারণের গানের গল্প, দুঃখের গল্প, বন্যা আর কলেরার গল্প।
তারপর কিছুটা সময় বিরতি আর পরিবর্তন, এক চক্র সম্পন্ন হয়ে আরেক চক্রের ঘূর্ণন শুরু। শিশু-কিশোর হয়েছে যুবক, যুবক হয়েছে শক্ত-সমর্থ পুরুষ আর আগের শক্ত-সমর্থ পুরুষের বেলা শেষ!
এই উপন্যাস 'পুতুলনাচের ইতিকথা' কিংবা 'পদ্মা নদীর মাঝি' এর মত ক্লাসিক রচনার সমকক্ষ। বাংলার আগের স্বর্ণযুগ গত হয়েছে সেই কবে। আমরা সেই যুগে বাস করতে পারিনি; এসব উপন্যাস পড়ে কিছুটা সময়ের জন্য কল্পনায় বাস করতে পারি। এটাই লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
হুমায়ূন আহমেদের এই ধরনের বইগুলো নিয়ে আলোচনা প্রায় হয় না। এই ধরনের বই পড়ার রুচি নতুন প্রজন্মের নেই মনে হয়। একটা দীর্ঘ সময়ের পর জনপ্রিয় লেখকের অল্পকিছু বই-ই তো ঠিকে থাকে। তেমনি হুমায়ূন আহমেদের এই বইটাও ঠিকে থাকবে জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' কিংবা তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হাসুলী বাঁকের উপকথা' এর সাথে।
আগের প্রকৃতি, সহজ-সরল মানুষ, গ্রামাঞ্চল, শিশুদের শৈশব আর নেই। এখন ভার্চুয়াল দুনিয়া আসল দুনিয়াকে দখল করে নিয়েছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার বিষবাষ্পে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 'সোহাগী' গ্রাম আর আগের মত নেই। আফসোস।
আরাফাত করিমের করা দৃষ্টিনন্দন নতুন প্রচ্ছদের সুবাদেই আবার পড়ে ফেলা হলো বইটা। হুমায়ূন আহমদের এই বইটা আন্ডাররেটেডই থেকে গেল। আমার মতে ওঁনার সেরা সাহিত্যকর্মগুলোর কাতারে পড়বে 'ফেরা'। পড়তে পড়তে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল 'হাজার বছর ধরে', 'পদ্মা নদীর মাঝি'-র মতন ক্লাসিক উপন্যাসগুলো। হয়তো আজ থেকে চল্লিশ বছর পরে ফেরা-ও ক্লাসিক বলেই গণ্য হবে।
‘ফেরা’র সন্ধান পাই লেখক শাহাদুজ্জামানের কোনো এক সাক্ষাৎকার থেকে। শাহাদুজ্জামানের মতো লেখক কেন এই উপন্যাসটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন তার প্রমাণ পেয়েছি নিজে পড়ে। বেশি কিছু বলার দরকার নেই। শুধু বলি, দুই ক্লাসিক ‘পদ্মানদীর মাঝি’ এবং ‘হাজার বছর ধরে’ থেকে খুব একটা পিছিয়ে রাখব না আমি ‘ফেরা’কে।
‘ফেরা’ একটু ব্যতিক্রম হুমায়ূন আহমেদের অন্য বইগুলোর থেকে। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর উপস্থিতি অকৃত্রিম তবে একটানা খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারেনি গতিশীল ন্যারেশনের জন্য। তবুও বারবার ওদের ছোট ছোট সংলাপে সোহাগীর দিনগুলো জলজ্যান্ত, নির্ভেজাল, ছুঁয়ে ফেলা যায় এমন বাস্তবতায় মোড়া ছিল আগাগোড়া। অনেকটা দূরের গতিশীল নৌকা থেকে পাড়ের মানুষগুলোকে প্রতিদিন অল্প কিছুক্ষণের জন্য করে সরল দৃষ্টিতে নির্লিপ্তভাবে দেখে যাওয়া। একটা দীর্ঘসময় হুমায়ূন আহমেদের বই সপ্তাহে দুটো তিনটে করেও পড়া হয়েছে। এবছরের শুরুতে হিসাব করে দেখি আমার হুমায়ূন আহমেদের যতগুলো বই পড়া হমেছে তা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যে লেখকের পড়েছি তার তিনগুণের বেশি। তারপর বইগুলোর দিকে নজর করে বুঝলাম ফিকশন যেগুলো পড়েছি তার মধ্যে খুব অল্প কিছু দৃশ্য মনে আছে, বেশিরভাগটাই মেমোরি থেকে মুছে গেছে। কয়েকটার মেইন প্লটই ভুলে বসেছি! এরপর সবদিক বিবেচনা করে কিছুদিন বিরতি নিই। ‘ফেরা’র মাধ্যমে আবার ফিরলাম বছরান্তে। আগে যেটা ভেবেছিলাম যে লেখা গতিশীল হলেও আস্তে ধীরে পড়ব। কারণটা আগেই বললাম। প্রথমে তো লেখকের চিরচেনা লেখার পরিবেশের বাইরের জগতে খুব আগ্রহে ঢুকলাম। ভাটির দেশে হাওড়ে নৌকার ধীর গতিতে এগোচ্ছি, গল্পের ভাষা আর আবহে মুগ্ধ হয়ে ভেসে চলেছি কি এরপড় হঠাৎ ঝড়ের বেগে একটা দৃশ্যে একটু থিতু হতে না দিয়েই অন্য কোথাও উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ প্রথমদিকের ঘটনা ছাড়া পড়ার পরপরই যেন সব অস্পষ্ট হয়ে গেল। তবুও সোহাগী গ্রামের মতি, শরিফা, রহিমা, আজরফ, নূরুদ্দীন, আমিন ডাক্তার চরিত্রগুলো মস্তিষ্কের স্থায়ী স্মৃতির অংশ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে যেমনটা ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’ নাটকটির চরিত্রগুলোর সাথে হয়েছে।
ভাটি অঞ্চল "সোহাগী"-এর মানুষ মতি মিয়া, তার বউ শরিফা, তাদের ছেলে আজরাফ এবং নুরুদ্দীন, আমিন ডাক্তার, গ্রামের সরকার পরিবার। এসব মানুষের গল্পের সমন্বয়ের সাথে মিশেছে ভাটি অঞ্চলের মানুষের মানসিকতা, কুসংস্কার, বন্যা-দুর্যোগকে সাথে নিয়ে কষ্টে বেঁচে থাকা।
এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে তাদের ফসল তোলার সময়ের এবং পরের আনন্দের বর্ণনা!! ফসল তোলার পরে উৎসবমুখর পরিবেশের আবির্ভাব ঘটে! ধান কাটা শেষ হবার পরই প্রথম পূণিমাতে বাঘাই সিন্নির দল বেরোয়। এই দলকে সবাই চাল দিবে সিন্নি বানাতে। বিশেষ করে ছোটরা এই দলের আকর্ষণ হলেও বুড়া-বুড়িরাও এই দলে যোগ দেয়। নৌকা সাজিয়ে বেদেনীরা আসতে শুরু করে। টাকা নয়, বরং ধানের বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে চুড়ি, আয়না, পিঠা বানানোর ছাঁচ কিনে নেওয়া যায়......
লেখক ছোট বেলাতে এসব মানুষের জীবনযাপনকে নিজ চোখে দেখেছেন, তাই হয়তো বইয়ের সবকিছুর বর্ণনা এতটা জীবন্ত রূপ পেয়েছে...... তাদের কষ্টের জীবনের বর্ণনা পড়ে যেমন কষ্ট পেয়েছি, তেমনি তাদের উৎসবের বর্ণনা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছি। তাছাড়া অনেক আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার আমরা দেখব, যেগুলোর অর্থ বইয়ের শেষে দেওয়া হয়েছে। এই বইটি পড়তে পড়তে 'হাজার বছর ধরে' এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো 😅 সুতরাং বুঝতেই পারছেন এই বইটাতে একদম অন্যরকম এক হুমায়ূনকে দেখব আমরা। সচরাচর যে গৎবাঁধা হুমায়ূনকে দেখি তার চেয়ে একদম ভিন্ন এখানে। বর্ণনাভঙ্গি, ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা, সবমিলিয়ে আমার বেশ ভালো লেগেছে 🌻
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য কর্মের মধ্যে 'বেস্ট ওয���ান' বলা যায়, এটিকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসটির, আরেকটি পর্ব যেন হুমায়ূন আহমেদ রচনা করে গেছেন!
ক্যানো এই উপন্যাসের চরিত্রেরা বইটির কালো অক্ষর-খোদিত পৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে এসে আমার চারপাশে তাদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে গ্যালো; শহুরে মানুষ আমি ক্যানো স্পষ্ট চাক্ষুষ করি আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত অদেখা ভাটি অঞ্চলের জল থৈ থৈ পরিপার্শ্ব আর ভেজা শোঁ-শোঁ বাতাসমাখা দিনগুলি আর রাতগুলি; ক্যানো এই বইটির নাম গ্রামকেন্দ্রিক/ নদীকেন্দ্রিক বাংলা ক্লাসিক উপন্যাসের তালিকায় খুঁজে পাইনি একবারও; এইসব হরেক ক্যানোর উত্তর ধীরেসুস্থে খোঁজার চেষ্টা করবো পরে কখনও। কোন্ লেখা যে পাঠকসাধারণের নেকনজর লাভ করে (মাঝে মাঝে অহেতুকভাবে), আর কোন্ লেখা আত্মগোপন করে থাকে কোনো এক মধ্যরাতে অকস্মাৎ আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায়, পাঠকজীবনের এই এক আনন্দময় রহস্য।
ভাটি অঞ্চল ও এর সাধারণ কাতারের মানুষগুলারে নিয়ে কি অসাধারণ চিত্র আঁকায় ফেলসে হুমায়ূন আহমেদ। এইযে নিস্বার্থ আমিন ডাক্তারের হুট কইরা প্রতিবাদি স্বত্ত্বাটা জাইগা উঠলো, এইযে পাগল ছোট চৌধুরী শেষ পর্যন্ত সুস্থ হইয়া উঠসিলো, এইযে রহিমা যারে শরীফা এতো ঘেন্না করসিলো তার জন্য মাঝেমাঝে মন কাঁদে ওঠা, এইযে আমাগো কেয়ারলেস মতি মিয়া যার যাযাবরী স্বার্থপর জীবন দেইখা আমারই রাগ উইঠা গেল। এইসব একাধিক ইমোশন অল্প কথায় হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া কেউ কি আর অনুভব করাইতে পারবে! আর বইটা কেনার পরে থেকে প্রচ্ছদটায় আমি কবার যে হাত বুলাইসি, এত সুন্দর! এই বইটা আসলেই আন্ডাররেটেড।
হুমায়ূন আহমেদের বই রিভিউ করা অর্থহীন মনে করি। লেখক জীবনের ২৫-৩০(?) বছরে হাতের দশ আঙুলে গোনা খান পনের (যার ১০টাই ছোটদের) বই বাদে বাকি শ'দুয়েক বই শুধু একই কিছু চরিত্রের (একজন বড়লোক, এএকজন দুনিয়ার কোন কিছুই গায়ে না লাগানো যুবক, একজন উদাসীন তরুণী, একজন ওভারকনসার্ন্ড মা, একজন গ্রামের ইমাম, একজন গ্রামের মোড়ল, ইত্যাদি) পারমিউটেশন কম্বিনেশন করা শ'খানে পাতার কাহিনি। একই জিনিস শ'খানেকবার রিভিউ করার মানে নাই।
যে কয়টা বই ভিন্ন চরিত্র, ভিন্ন কাহিনির, তার একটা হলো 'ফেরা'। তাও এখানে হুমায়ূন আহমেদের পুরাতন বিষয়বস্তু উপস্থিত। কিন্তু যতদূর মনে পড়ছে তার কোন সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন ফেরা-র কাছাকাছি একটি কাহিনি বাস্তবজীবনে প্রত্যক্ষ করায় তার লেখনিতে আইনের তরফ থেকে ন্যায় বিচার না পাওয়া/বেকসুর কেউ শাস্তি পাওয়ার বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে (উদা - 'কোথাও কেউ নেই')।
এই বইটা ভালো লেগেছিলো কাহিনির প্রেক্ষাপট আর উপস্থাপনের ভিন্নতার জন্যে।
মোহনগঞ্জের আশেপাশে সোহাগী বলে একটি গ্রাম৷ সেই গ্রামে আছেন আমিন ডাক্তার, আছে মতি মিয়া, তার স্ত্রী শরিফা, তাদের ছেলে নূরুদ্দিন, আজরফ। একটি চৌধুরীবাড়ি রয়েছে, রয়েছে রহিমার মতো স্বামীহারা সর্বংসহা একটি চরিত্র, তার মেয়ে অনুফা। শুরুতেই দেখা যায় শরীফা অসুস্থ, যাকে নিয়ে আমিন ডাক্তার নৌপথে হাসপাতালে পাড়ি দেন৷ মতি মিয়ার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা-সম্মান কোনটাই তেমন দেখা যায় না, আমিন ডাক্তার তার বন্ধু হয়। কিন্তু বন্ধুত্বের সম্পর্কটা স্ত্রী শরিফার সাথে বরং বেশি। প্রায় ৬ মাস চিকিৎসাধীন থাকতে হয় শরিফাকে। এর মাঝে রহিমা জায়গা করে নেয় মতি মিয়ার পরিবারে৷ যত্ন-কাজ দুটো দিয়ে, সকলেরই মন জয় করে সে। শরিফা যখন একটি পা হারিয়ে ফিরে আসে তখন দেখা যায় সংসারের কেউই তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। মতি মিয়া গায়ক, গান বাঁধে। কাহিনী ধীর লয়ে এগোতে থাকে। চৌধুরীবাড়ির এক ছেলে পাগল, অন্য ছেলে একের পর এক বিয়ে করে, প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে। আমিন ডাক্তার এর ব্যাপ্তিই পুরো উপন্যাস জুড়ে সবচাইতে বেশি। নূরুদ্দিন এর খেয়ালি আচরণ এর সাথে গ্রামীণ ভীতি-কুসংস্কার চমৎকার খাপ খেয়ে যায়। সোহাগী গ্রামের পটবদলের মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে হুট করেই যেন গল্পটি শেষ হয়ে যায়৷ গ্রামীণ জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে কলেরা মহামারীর কথাও এসেছে। দিনবদলের কথাও শেষ দিকে এসেছে, এসেছে দীর্ঘদিন পর আমিন ডাক্তারের গ্রামে ফেরা এবং নতুন চোখে দেখা অভিজ্ঞতার সামান্য বর্ণনা। এই উপন্যাসটি হুমায়ূন আহমেদের লেখা। পড়তে গিয়ে একটুও মনে হয়নি তা। হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব স্টাইলের বাইরের কয়েকটি উপন্যাস আছে, তার মধ্যে পড়ে যায় এটি। কেউ যদি নাম না দেখে বইটা পড়ে, তবে বোধহয় বুঝবেই না যে এটি হুমায়ূন লিখেছেন। জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি যেন একটু খানি উঁকি দিয়ে যায়। এই উপন্যাসটির কথা বেশ কমই শুনেছি আমি, তাই এতদিন পর পড়া। অন্য রকম এক হুমায়ূনকে আবার আবিষ্কার করতে পেরে মন্দ লাগছে না।
মধ্যবিত্ত শহুরে জনগোষ্ঠীকে নিয়েই বেশিরভাগ লেখা লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ এবং সকলেই একবাক্যে তা-ই কেবল বলে থাকে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর একটি ছিল গৌরীপুর জংশন। সমাজের তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর মানুষকে উপজীব্য করে লিখেছিলেন গৌরীপুর জংশন। "ফেরা"র কথা বলতে গেলে একে মাস্টারপিস বলা হবে কি হবে না তা নিয়ে এক পশলা দ্বন্দ্ব হতেই পারে চায়ের কাপে, কিন্তু আপনি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন তারাশঙ্করের হাঁসুলি বাঁকের উপকথা ঠিক যেসব এলিমেন্ট দিয়ে ঠাসা, প্রায় সেরকম কিংবা তার কাছাকাছি এলিমেন্টে "ফেরা"- ও রচিত।কলেবরে " ফেরা"র আকার হয়ে গেছে ছোট নয়তো ফেরা বাংলা সাহিত্যে মাইলফলক হয়ে থাকতো। মাত্র ১১০ পৃষ্ঠার বইয়ে হুমায়ূন আহমেদ ভাটি অঞ্চলের মানুষের সুখ দুঃখ আঁকতে চেয়েছেন, তবে পরিপূর্ণ চিত্রটা ঠিক ভাসেনি। যেমনটা আমরা জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসে লক্ষ্য করি- আকারে ছোট হলেও তা দারুণ তাৎপর্য বহন করে, এই জায়গায় "ফেরা" হয়তো একটু ক্লিশে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের এভারেজ অন্যান্য বই যতটুকু আদর আপ্যায়ন কিংবা হাইপ পায় মেইনস্ট্রিমে, "ফেরা" তার চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে থাকার যোগ্যতা রাখে বলে আমার ধারণা। সব মিলিয়ে "ফেরা"-র যাত্রা দারুণ ছিল। পড়ে দেখবেন নাকি একবার? হ্যাপি রিডিং💙
চিরাচরিত গ্রামবাংলার মানুষের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস। গ্রামে যেমন আছে মতি মিয়ার মত ভবঘুরে, তেমনি আছে আজরফের মত উচ্চাভিলাষী। বইয়ের সব থেকে ভালো লাগা চরিত্র আমিন ডাক্তার। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে বইটা।
ক'দিন থেকে এমন বই খুঁজছি, যে বই পড়ে খুবই মন খারাপ হয়ে যাবে। এই বইটা পড়ে অসম্ভব রকম মন খারাপ হয়ে যাবে, অথচ এই বইটা আমি কিছুটা পড়ে রেখে দিয়েছি। হুমায়ূন আহমেদের যে জিনিসটা আমার খারাপ লাগে, তা হলো টুপ করে একজনকে উপরে পাঠিয়ে দেন। কোনো কথা নেই বার্তা নেই! মন খারাপ হয়ে যায় খুব।
এই নামে যে হুমায়ুনের কোনো বই আছে তা-ই জানা ছিলো না, অথচ ভাবতাম হুমায়ুন আহমেদের সব বই আমি পড়েছি। সেই হিসেবে একে বেশ একটা আন্ডাররেটেড বই বলা যেতে পারে। গ্রামবাংলার এক চিত্র ফুটে উঠেছে এই বইটাতে। কেমন একটা মন খারাপ করা আবহ। সৎ লোকের অভাব, অনটন, এদিকে দুষ্ট ধনীলোক। মেয়েদের, স্ত্রীদের প্রতি স্বামীদের অনীহা... এই গ্রামবাংলার মানুষের চরিত্রের এই দিকটি আমি হজম করতে পারিনা বলেই এই ধরণের বই পড়তে আমার একধরণের ইরিটেশন হয়। :)
হুমায়ূন আহমেদ এর বেশির ভাগই বইয়েই দেখা যায় লেখক কয়েকটি চরিত্র নিয়ে জাগলিং খেলছেন। এই চরিত্রগুলো বারবার খুজে পাওয়া যায় বিভিন্ন বইয়ে। যদিও প্রায় প্রতিবারই এই জাগলিং খেলাটা শেষ পর্যন্ত বেশ ভালই লাগে, তবে আলাদা করে কিছু বলার থাকে না ওই বই গুলোর ব্যাপারে। মনে একই দাগ বারবার করে কাটতে থাকে বই গুলো।
ফেরা সেদিক থেকে কিছুটা ভিন্ন মনে হয়েছে আমার কাছে। আমিন ডাক্তারের মত চরিত্র খুব বেশি আনকমন না হলেও খুব বেশি বইতে বোধহয় আসেনি। জীবনের প্রতি হাওড় আঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিটা উঠে এসেছে বেশ রহস্যময় ভাবে। মনে নতুন একটা দাগ কেটেছে আমিন ডাক্তার আর তার ফেরা।
ভাটি অঞ্চলের একটি গ্রাম ' সোহাগী '। গ্রামের মানুষের মনে আবেগ, দুঃখ, আনন্দ মিশে আছে। ভাটি অঞ্চল এর মতি,শরীফা, রহিমা, ডাক্তার আমিন প্রতিটা চরিত্রের প্রতি এক ধরনের আবেগ কাজ করে পাঠকের। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ডাক্তার আমিন কে। বইটার শক্তিশালী দিক স্থানীয় ভাষা ব্যবহার। একসময় মনে হচ্ছিলো সোহাগী গ্রামে আমিও চলে গিয়েছি । হুমায়ূন আহমেদ প্রাচীন কালের গ্রামের মানুষের জীবনযাপন এ চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। অনেক ভালো লেগেছে পড়ে।
কিছু বই আছে যা পড়ার শেষে কেমন জানি একটা শুন্যতা অনুভব হয়, 'ফেরা' এমনই একটা বই। গ্রাম-বাংলার পরিবেশ, লোকজন, তাদের রীতি, তাদের সংগ্রাম, তাদের সরলতায় হারিয়ে যেতে চাইলে, বেশ ভালো একটা উপন্যাস। বইটা পড়ার সময় কেন জানি খনেখনে জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসটার কথা মনে হচ্ছিল; বিশেষ করে শেষ অধ্যায়টা পড়ার সময়। হাওর অঞ্চল কিংবা গ্রামীণ জীবন নিয়ে লিখা অসংখ্য বিখ্যাত উপন্যাস আছে বাংলা সাহিত্যে, হুমায়ুন আহমেদের লিখা প্রচন্ডরকম আন্ডাররেটেড এই উপন্যাস খুব সহজেই সেই তালিকায় একটা জায়গা করে নিতে পারে।
হুমায়ূন আহমেদ মানে অন্যরকম এক লেখনী। সেই লেখনীর জোরে গরগরিয়ে বইটা শেষ হয়ে গেল। ছোট বই, তবুও কত আবেগ, কত গল্প একটি উপন্যাসে৷ হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে আরেকটি মাস্টারপিস।
চিরাচরিত হুমায়ূন ঘরানার বাইরের এই লেখাগুলো আজকালকার ভাষায় বেশ আন্ডাররেটেড।এই বইটার গাঢ় আবেগে মন কেমন করে দেয়ার ক্ষমতা আছে।সে আবেগ সুখের নাকি দুঃখের সেটা পার্থক্য করার মতোও বোধবুদ্ধি থাকেনা তখন মস্তিষ্কে, কারণ মগজের সমগ্র অংশ ই তখন 'ফেরা'র ঘোরে মসগুল।
প্রচন্ড যত্ন দিয়ে লেখা প্রত্যেকটা চরিত্র গল্পের তালে তালে তাদের সমস্ত স্বত্ত্বা নিয়ে বাস্তবে প্রকট হতে থাকে ক্রমশ।মতি মিয়া,শরীফা,রহিমারা গল্পের এক একটি ইট।নুরা,আজরফ,অনুফারা তাতে চুন-সুরকির মতো কাজ করে।আমিন ডাক্তারের চরিত্র বিশাল 'ইমারত' হয়ে ধরা দেয় শেষ অবধি।
নাইন টেনে 'হাজার বছর ধরে' পড়ে যেমন একটা অবর্ননীয় অনুভূতি হয়েছিলো,ঠিক তেমনি সূক্ষ্ম অনুভূতি হয়,নস্টালজিয়া আর গাঢ় আবেগ মিলেমিশে বোবা একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়,সেই অনুভূতির জন্ম এই টানাপোড়েনের পৃথিবীতে নয়,সেই নিরেট অনুভূতির জন্ম নিশ্চয়ই অন্য কোথাও।
পাতার পরে পাতা উলটে শেষ হয়ে যায় ফেরা কিন্তু আমিন ডাক্তাররা কখনো শেষ হয়না,শব্দে শব্দে বাঁধা ভোঁতা অনুভূতিরা মাথা থেকে বেরোতে চায়না,ঘুরপাক খেতে থাকে মুহুর্তের পর মুহুর্ত।
হুমায়ূন আহমেদের বেশির ভাগ বই একটা নির্দিষ্ট নকশায় ফেলে ভিন্ন রঙ-ঢঙ দিয়ে আঁকা। কিন্তু এর বাইরে বেশ কিছু বই আছে যা একেবারেই মেলানো যায় না। যেমনঃ নন্দিত নরকে, অচিনপুর ইত্যাদি। 'ফেরা' তেমনই এক ভাটি অঞ্চলের গল্প। লেখনী ভঙ্গিমার কারণে চরিত্র গুলো যেন খুব আপন হয়ে উঠে। শরিফা, আমিন ডাক্তার, আজরফ, মতি মিয়া শুধু বইয়ের চরিত্র নয়; সকলেই যেন রক্ত-মাংসের মানুষের হয়ে উঠে। ব্যক্তিগতভাবে, আমি কখনো ভাটি অঞ্চলে যাইনি। শহরের চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থেকে তাদের সুখ-দুঃখ স্পর্শ করার কারণও নেই। কিন্তু কোন লেখক যদি এই অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারেন তাহলে নিঃসন্দেহে তা অসাধারণ!
এই মাসে বুক ক্লাবের জন্য যখন বইটি বেছে নেওয়া হল, আমি ভাবছিলাম, আগে পড়েছি কিনা! কারন, হুমায়ূন পড়ে বুড়ি হওয়া আমি প্রায়শই ভুলে যাই, তাঁর কি পড়েছি এবং কি পড়ি নি। কিছুদূর পড়ে মন ভালো হয়ে গিয়েছিল এই ভেবে যে তাঁর লেখা যতগুলো বই এখনো অযথা পড়া হয় নি, সেগুলোর মধ্যে একটি এই 'ফেরা'।
একই নামের মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি বই আছে। বুক ক্লাবে এই আলাপ একজন তুলেছিল যে তার দুটো একসাথে কিনার ইচ্ছা বলে কিনা হচ্ছে না। তাকে তখন বলেছিলাম যে দুটোর মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই। হুমায়ূনের 'ফেরা' পড়ে আমার মনে হয়েছে যে সম্পর্ক আছে। কারন, জাফর ইকবাল স্যারের নায়কও অন্যায়ের সাথে আপোষ করে নি, চোখ বুজে থাকে নি। লড়ে গেছে তাঁর জায়গা থেকে।
হুমায়ুনের 'ফেরা'-তেও এক ব্যক্তি ঠিক করে বসে যে সে একটি অন্যায় মেনে নিবে না আর তখন পরিষ্কারও হয় 'ফেরা' কেন এই বইয়ের নাম।
মজাটা হল যার ফেরার কথা লেখক আমাদেরকে শেষমেশ বলেন, তিনি কি আসলে মূল চরিত্র? তাহলে কি পার্শ্বচরিত্র? শেষ অবধি পড়লে সেটা কিন্তু মনে হয় না। আর তিনি যদি তেমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র না হন, তাহলে এই উপন্যাসিকার মূল চরিত্র কে? আর ফিরেন কি শুধু তিনি? যারা গেছেন কিন্তু ফিরেন নি নানা সময়ে, তাদের গল্পও কি এই নামের সাথে সম্পৃক্ত?
সোহাগী গ্রামের মানুষদের কথা যখন লেখক আমাদের বলতে শুরু করেন, তখন মনে হয় যে এই গল্প তাঁর কাছ থেকে বহুবার শুনেছি। তাঁর নাটক ও সিনেমাতেও দেখেছি। 'শ্রাবণমেঘের দিনে' এর মতোই এখানে একজন গাতক মতি আছে। এই গাতক বিবাহিত এবং সেই গাতকের মতো অতোটা সৎ নন। তাঁর স্ত্রী শরীফা, দুই পুত্র বাদেও তাঁর ভিটায় এক সময়ে চৌধুরী বাড়ির আশ্রিতা রহিমা ও তার কন্যা অনুফা এসেও থাকা শুরু করে। আর কারনে অকারনে আমিন ডাক্তারও মতির পরিবারের খোঁজখবর নিতে আসেন। গ্রামে সরকার বাড়িও আছে। কৈর্বতরা আছে। ছোট এক চৌধুরী আছেন যিনি মানসিকভাবে অতোটা সুস্থ নন, কিন্তু, তার অসাধারণ একজন বউ আছেন।
গ্রামের আরো সব চরিত্র ও নানা ঘটনা প্রবাহের কারনে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সোহাগী বেশ জমজমাট। বিশেষ করে নবান্ন উপলক্ষ্যে হওয়া বাঘাই সিন্নি এবং যাত্রার দলের আনাগোনা সোহাগীকে এখনের ইট কাঠ পাথরের আঁটো শহরের তুলনায় অনেক বেশি 'ধনী' মনে হয়। জঙ্গলা ভিটার সাথে নুরুদ্দীনের বাল্যকাল থেকে যেই যোগাযোগ দেখানো হয়, সেটার পরিণতিও আমাদের চমৎকৃত হয়। এই রহস্যময়তা একটুও বেখাপ্পা মনে হয় না। উল্টো মনে হয়, সোহাগীর মতো গ্রামেই এমন এক জায়গা থাকার কথা এবং এরকম বুকে হীম ধরানো ঘটনা সেই জায়গাতেই ঘটার কথা।
পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল না যে গ্রামীন মানুষদের চিরন্তন সুখ-দুঃখের গল্প বাদে গল্প অন্য কোন দিকে মোড় নিবে। কিন্তু, নিয়েছে যখন, তখন অসম্ভব সাহসী এক হুমায়ূনের দেখা পাই আমরা। আমরা সেই হুমায়ূনের ঝলক পাই যিনি অচিরেই সরকারী চ্যানেলে টিয়া পাখির মুখ দিয়ে 'তুই রাজাকার' বলাবেন।
'ফেরা' আমার মন খারাপের দিনে করনীয় স্মরণ করিয়ে দিল। মনে করিয়ে দিল যে বেঁচে থাকার তরিকা নিয়ে শতেক মানুষের শতেক সিলেবাস শুনলেও তা মনে প্রাণে ধারণ করা যাবে না। নিজের অবস্থান থেকে ভালোটা করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেলেও আমাদের তো থামার কথা না। কারন, থেমে যাওয়াটাই হয়তো আর ফিরে আসার উপায় রাখে না।
প্রিয় হুমায়ূনকে তাঁর এরকম লেখা পড়লে ভীষণ মিস করি। তাঁর নতুন বইয়ের জন্য আগের মতো অপেক্ষা করার সুযোগ না থাকলেও প্রচুর লিখেছেন বলে এরকম সব বইতে এখনো ফিরে যেতে পারি। শেষ করে এভাবে কৃতজ্ঞতাও জানাতে পারি।
হুমায়ূন আহমেদের সেই প্রথমদিককার লেখা গুলার মাঝে অন্যতম ক্লাসিক একটা উপন্যাস হচ্ছে, "ফেরা"। হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম প্রধান গুণাবলির একটি হচ্ছে তার লেখার মাধ্যমে পাঠক হৃদয়ে এক অসাধারণ কল্পনার জন্ম দেওয়ার সক্ষমতা। আমি কখনো ভাটি অঞ্চলে থাকি নাই কিংবা ভাটি অঞ্চল সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা ও ছিল না। কিন্তু এই উপন্যাসটা শেষ করার পর, আমার মনে হচ্ছে আমি হয়ত দীর্ঘদিন সোহাগী গ্রামে ছিলাম। হয়ত আমার জন্মই সোহাগী গ্রামে। উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র আমার নজরে জীবিত। হুমায়ূনের লেখনী শক্তি আমায় শহুরের কোলাহল থেকে টেনে নিয়ে গেছিল প্রত্যন্ত সেই ভাটি অঞ্চলের মানুষের মাঝে। হুমায়ূন আহমেদের নানা বাড়ি ছিল ভাটি অঞ্চলে। সে তার শৈশবের অনেক সময় কাটিয়েছেন এই ভাটি অঞ্চলের মানুষের সুখ, দুঃখ, জীবনের উত্থান পতন দেখতে দেখতে। এবং তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন উপন্যাসের মাঝে। মতি মিয়া, আমিন ডাক্তার, শরীফা, রহিমা, আজরফ, নুরা এছাড়াও গ্রামের প্রভাবশালী চৌধুরীরা, সরকার বাড়ির লোকজন ছাড়াও একাধিক চরিত্র রয়েছে উপন্যাস জুড়ে এবং প্রতিটা চরিত্রই তার নিজ স্থান থেকে অভিন্ন এবং সমগ্র উপন্যাস জুড়ে প্রত্যেকের উপস্থিতি সমান ভূমিকা রেখেছিল। মতি মিয়ার গানের প্রতি আগ্রহ এবং সংসার ছেলেপেলের প্রতি অনিহা, আমিন ডাক্তারের দায়িত্বশীলতা, আজরফের তার বাবার অবর্তমানে সংসারের হাল ধরা এবং নুরার শৈশব চিত্র গুলা এখনো যেন চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে। ভাটি অঞ্চলের মানুষের বন্যা, কলেরায় দুর্দশা এছাড়াও বাঘাই সিন্নি, গানের আসর, ধান মাড়াইয়ের সময় রাতভর বারান্দায় বসে গল্পকথক আলাউদ্দীনের মুখে গল্প শোনার আনন্দ, ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের এসব অংশ গুলা সম্পর্কে আগে তেমন একটা জানতাম না কিন্তু এই বইটা শেষ করে আমার এত এত ভাল লাগছিল, বারবার মন চাচ্ছিল, ইস আমি যদি একবার ভাটি অঞ্চলের এসব অনুষ্ঠানের অংশ হতে পারতাম! বইটায় লেখক বেশ কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেন গল্পের প্রয়োজনীয়তায়, যার অর্থ বইয়ের শেষে উল্লেখ করে দিয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদের শহুরে জীবনের লেখা গুলার চাইতে, গ্রামীণ জীবনের লেখা গুলা আমার ব্যক্তিগতভাবে সব থেকে বেশি ভালো লাগে। এই বইটাও তার ব্যতিক্রম না।
যখন পড়া শুরু করছি, মনে হইছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির একটা ভাইব পাচ্ছি। নিজের অনুমান আরো জোড়ালো করার জন্য হয়তো কিছুদিন আগেই জানা তথ্যের সম্পর্ক আছে। সেটা হলো হুমায়ূন আহমেদের গুরু ভক্তি ছিলো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি। তিনি তার কাঠপেন্সিল বইয়ে সেটা লিখে গেছেন। বই শেষ করে কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যে আছি।