এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অসাড় হয়ে গেছে বিদীপ্তার দুটো পা। অসহায় বিদীপ্তা একদিন উপলব্ধি করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতনই বিবশ হয়ে যায় মানুষের নিকটতম সম্পর্কও। তার সঙ্গে পরিচয় হয় চন্দনের। চন্দন তাকে এই বোধে পৌঁছে দেয় যে, প্রতিবন্ধকতা যেমন শরীরকে জড়ত্ব দেয়, তেমনই নানা রিপু খঞ্জ করে আমাদের মনকে। সেই রিপুর কবল। থেকে মনকে মুক্ত করাই জঙ্গমতার সাধনা। কাহিনিতে প্রবলভাবে আছেন বিদীপ্তার বাবা সাধন, যিনি পেশায় ঘটক, কিন্তু তাঁর নিজের মেয়েই অরক্ষণীয়া।আছে পল্লবী- স্বেচ্ছাচারী ভোগলিঙ্গু নতুন প্রজন্মের অস্থির মেয়ে।নানা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে নবীন লেখকের ‘তিন চাকা’ উপন্যাসে।
উল্লাস মল্লিকের জন্ম ১৯৭১ হাওড়া জেলায়, গাছগাছালি দিঘি ঘেরা এক শান্ত গ্রামে।বাবা সমরসিংহ মল্লিক, মা গীতা মল্লিক। একটু বড় হয়ে সপরিবারে চলে আসেন হাওড়া জেলারই আর এক চমত্কার গ্রাম কেশবপুরে।বাবা ছিলেন সেখানকার বিশিষ্ট শিক্ষক। স্নাতক হবার পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু।চাকরি ছেড়েছেন; পেশা বদলেছেন।দুষ্টুমির বাল্যকৈশোর, অনিশ্চিত কর্মজীবন, চেনা-অচেনা, ভাল-মন্দ বাছবিচার না করেই মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, অদ্ভুত সব ঘটনা আর স্নিগ্ধ প্রকৃতি তাঁর লেখা জুড়ে।মনে আনন্দ আর রসবোধ নিয়েই বেঁচে থাকতে চান। ২০০০ সালে লেখালিখির শুরু।বিভিন্ন বছরে ‘দেশ’ হাসির গল্প প্রতিযোগিতায় বিজয়ী।একডজন উপন্যাস, দেড়শোর বেশি গল্প আর রম্যরচনা লিখেছেন।
একদমই অচেনা এ লেখকের বইটা সাজেস্ট করেছেন সুলতান ভাই। শুধু বলেছিল, ওনার লেখা ভাল। সুলতান ভাইয়ের সাজেশানের ওপর ভরসা থাকা আমিও ধরে নিয়েছিলাম লেখাটা ভালই হবে। কিন্তু পড়া শেষে দেখলাম, বইটা শুধু ভাল না, বেশ ভাল।
লেখক চমৎকার ভাষায় একটা সামাজিক গল্প বলে গেছেন। গল্পটা ছিমছাম, সাধারণ। কিন্তু সাধারণ গল্প সাধারণভাবে বলতে পারাটা আমার কাছে অসাধারণ একটা ব্যাপার মনে হয়। আর এ কারণেই বইটা আমার অসাধারণ লেগেছে।
আমরা যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠি, আমাদের অনেক সুক্ষ্ম বদ অভ্যাস গড়ে ওঠে এভাবে থাকতে থাকতে। অবশ্য বাকিদের কাছে এগুলো বদ অভ্যাস বলে মনে হলেও আমাদের কাছে এগুলোর একটা পোশাকী নাম রয়েছে, মায়া। আমার বাবার একখানা বন্ধ ঘড়ি ছিল, ঠাকুমা দিয়েছিলেন। তখনকার দিনে কোনো এক জাপানি কোম্পানির ঘড়ি। কিন্তু ঐ ঘড়িটা আজ প্রায় ৩৩বছরের উপর হয়ে গেলো বন্ধ হয়ে গেছে। বাবাও চলে গেছে আজ অনেকদিন হয়ে গেলো, কিন্তু ঐ ঘড়িটা আজও রয়ে গেছে। আমরা এমন এক প্রজাতি বলা চলে, যারা বিস্কুটের ব্যবহার হয়ে যাওয়া কৌটোটাও আজন্মকাল ধরে রেখে দিই, বারবার মেজে মেজে.. কি হবে? ফেলে দিলেই দেওয়া যায়, কিন্তু পরে মনে হবে, ইশশ! কৌটোটা থাকলে এই পরের মাসের বাড়তি বিস্কুট গুলো এতে রেখে দেওয়া যেতো... মাসের পনেরো দিন পেরোলে এমার্জেন্সি তে এই কৌটোটা থেকে বিস্কুট খাওয়া যাবে। গরীব মানুষ খুব সহজেই হাত পাততে পারে, লঙ্গরখানাতে লাইন দিতে পারে ঐ কটা প্লেট ভাত এক্সট্রা পাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা পেটে খিল মেরে থাকলেও ওটা করতে পারিনা.. কারণ আমরা নিজেদের ছেড়ে অন্যদের কথা বেশি ভাবি সবসময়, "লোকে দেখলে কি বলবে? " এটা আমাদের প্রিয় লাইন।
🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂
সাধন আর মণিমালার সংসারটাও খানিকটা এরকম। সাধন ঠিক করেছে যতদিন না সাইকেলের চাকার লিকটা বড়ো হচ্ছে ততদিন ওটা না সারালেও চলবে.. ঘড়িটা সামান্য লেটে চললেও এদিক ওদিক টাইম জেনে নিয়ে বেশ তো চলে যাচ্ছে, আবার একটা নতুন নিলে বেকার মাসের মাঝখানে কটা টাকা খসবে। সাধনের দুই মেয়ে, বীদীপ্তা আর বীণা। বীদীপ্তা এক পথ দুর্ঘটনায় নিজের পা হারিয়ে বলা যায় এখন ঘরবন্দী, অসহায় বিদীপ্তা একদিন উপলব্ধি করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতনই বিবশ হয়ে যায় মানুষের নিকটতম সম্পর্কও। তার সঙ্গে পরিচয় হয় চন্দনের। চন্দন তাকে এই বোধে পৌঁছে দেয় যে, প্রতিবন্ধকতা যেমন শরীরকে জড়ত্ব দেয়, তেমনই নানা রিপু খঞ্জ করে আমাদের মনকে। সেই রিপুর কবল থেকে মনকে মুক্ত করাই জঙ্গমতার সাধনা। কাহিনিতে প্রবলভাবে আছেন বিদীপ্তার বাবা সাধন, যিনি পেশায় ঘটক, কিন্তু তাঁর নিজের মেয়েই অরক্ষণীয়া।আছে পল্লবী- স্বেচ্ছাচারী ভোগলিঙ্গু নতুন প্রজন্মের অস্থির মেয়ে।নানা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে নবীন লেখকের ‘তিন চাকা’ উপন্যাসে। 🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂 এমন অনেক মানুষের সঙ্গে পথ চলতে চলতে আমাদের পরিচয় হয় যাদের দেখলে মনে হয়, মানুষ এভাবেও ভাবতে পারে?? ওদের দেখলেই মনের মধ্যে এই ধারণা বড্ড প্রগাঢ় হয় যে ঠিক কতটা সুক্ষ্ম অনুভূতি থাকলে মানুষ গাছের প্রাণ অনুভব করতে পারে। আবার ওদের সঙ্গেই হাত ধরে পথ চলতে চায় এমন কিছু মানুষ যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মানুষকে নীচু করে বড়ো হওয়া। ধুরন্ধর দুনিয়াটা এই দুই ধরণের মানুষের একটা হট্টোগোলের মেলা বলা চলে। এই মেলাতে এতকিছু না ভেবেই যারা শুধু দুচোখ ভরে মেলা দেখার জন্য ঘুরে বেড়ায়, লেখক যেন কেমন করে তাদের মনের মধ্যে ঢুকে পড়ে এই গল্প সৃষ্টি করে ফেলেছেন বলা যায়। 🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂 উল্লাস মল্লিক আমার বরাবরের প্রিয় লেখক, হয়তো প্রিয় এই কারণেই কারণ, উনি চরম দুঃখের মুহুর্তকেও কীভাবে যেনো হাসির শব্দ দিয়ে বর্ণনা করতে শিখিয়ে দেন.. ঐ যে আমরা চরম দুর্দশাতেও হঠাৎ বলে উঠি না, "হাসছি কি আর সাধে ভায়া।"
"নাগরদোলার মতো দর্শন-শিক্ষক তুমি দুটো পাবে না । নিজে অনবরত পাক খেতে খেতে জীবনের উত্থান-পতনের সারাংশ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।" সংসারের 'চাকা' হলো মহিলারা , উপন্যাসটির বেশিরভাগ আবর্তিত হয়েছে মহিলাদের নিয়ে । জীবনের ভালবাসা, চাওয়া-পাওয়া খুব অনিশ্চিত । এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অসাড় হয়ে গেছে বিদীপ্তার দুটো পা । অসহায় বিদীপ্তা বুঝতে পারে এই দুর্ঘটনায় তার কাছের মানুষের ভূমিকা শতভাগ , তাই বিদীপ্তা একদিন উপলব্ধি করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতনই বিবশ হয়ে গেছে নিকটতম সম্পর্কও। বিদীপ্তার বাবা সাধন বর্তমানে পেশায় ঘটক আর টিউশন পড়ান ,কিন্তু তাঁর নিজের মেয়েই অরক্ষণীয়া। যিনি প্রবলভাবে কাহিনীতে নিজের উপস্থিতি, বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেন । একাধারে পল্লবী এক প্রাণোচ্ছল , স্বেচ্ছাচারী , ভোগলিঙ্গু নতুন প্রজন্মের অস্থির মেয়ে। যে অর্নগল কথা বলতে আর প্রেম করতে ভালোবাসে , পল্লবীর সাথে চন্দনের আলাপ হয় । বিদীপ্তার সঙ্গে পরিচয় হয় চন্দনের। চন্দন তাকে এই বোধে পৌঁছে দেয় যে, প্রতিবন্ধকতা যেমন শরীরকে জড়ত্ব দেয়, তেমনই নানা রিপু খঞ্জ করে আমাদের মনকে। সেই রিপুর কবল থেকে মনকে মুক্ত করাই জঙ্গমতার সাধনা । কাহিনীতে নানা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে । কোথাও গিয়ে আমরা খুঁজে পেয়েছি আমাদের আশেপাশে নানা মানুষের চরিত্র , নবীন লেখক হয়তো বর্তমান নতুন প্রজন্মকে তার লেখনীতে তুলে ধরেছেন। "চারদিকের পৃথিবী বড় সুন্দর , গোধূলি মায়াময় ......."
তিন চাকা উল্লাস মল্লিক-এর লেখা একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস। সমাজের প্রান্তিক মানুষের যাপিত বাস্তবতা, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। সহজ ভাষা ও তীব্র অনুভব এই বইটিকে পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলতে সাহায্য করে।
তিন চাকা লেখক - উল্লাস মল্লিক প্রকাশক - আনন্দ মূল্য : ১০০ টাকা।
এই বছরের ২১ নম্বর বই উল্লাস মল্লিক এর লেখা একটি নভেলা " তিন চাকা "। ২০২২ সালে আনন্দলোক এ প্রকাশিত " যাত্রাপালা " উপন্যাসটি আমার পড়া উল্লাস মল্লিকের প্রথম বই। ১৪০ পাতার একটি নভেলা, শুরু থেকে শেষ লেখক নিজের মুন্সিয়ানায় তৈরি করেছেন কিছু সুন্দর সম্পর্ক ও তাদের মুহূর্ত। বইটি এক বসায় শেষ করে ফেলা যায়, কিন্তু আমার সমস্যা হয়েছে বইটির মাঝামাঝি নুতুন চরিত্রের আগমন, পূর্বে কোনো সম্পর্ক ছাড়া।
পটভূমি -
একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিদীপ্তার পা দুটি অসাড় হয়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে তার উজ্জ্বল ভবি���্যতে। কাছের সম্পর্ক গুলো আস্তে আস্তে ধূসর হতে থাকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাবা বসায় তার মনেও। এহেন জীবনে এক টুকরো হিমেল পরশ বয়ে নিয়ে আসে চন্দন। বিদীপ্তার বন্ধু পল্লবীর মাধ্যমেই তাদের পরিচয়। বিদীপ্তার জীবনে আনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে চন্দন। অপরদিকে পল্লবী মন দিয়ে বসে চন্দনকে। আর আছেন বিদীপ্তার বাবা। পেশায় ঘটক মানুষটি মেয়ের পা দুটি ঠিক করার জন্য সবরকম কসরত করে যাচ্ছেন। কাহিনীতে তাকেও এসে দাঁড়াতে হয় নৈতিক দ্বিধার সামনে। নিজের মেয়ে নাকি নৈতিক দায়িত্ব - কোনটি বেছে নেবে সে শেষ পর্যন্ত ? কাহিনীর মূল বিষয় হল বিদীপ্তার হঠাৎ পাল্টে যাওয়া জীবন, তার রোজনামচা, চন্দনের সান্নিধ্যে থেকে জীবনের উপলব্ধি।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
আনুষঙ্গিক প্লটগুলির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেগুলি খুব ভালো ভাবে বিকশিত হয়নি বলেই আমার মনে হয়েছে। গল্পে নানা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব যেমন প্রকাশ পেয়েছে তেমনি নুতুন প্রজন্মের কথাও লেখক তুলে ধরেছেন বইটির মধ্য দিয়ে। উল্লাস মল্লিকের লেখার একটি সুন্দর বৈশিষ্ট হলো চরম দুঃখের মুহূর্ত কেও লেখক হাসির শব্দ দিয়ে বর্ণনা করতে পারেন। বইটি একবার পড়ার জন্য ভালো, আমার সামগ্রিক ভাবে ভালো লাগেনি।