প্রসঙ্গ- জেমস রলিন্স ও সিগমা ফোর্সঃ
জেমস রলিন্সের ব্যপারে কোনও একটা অনলাইন ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম, "James Rollins is everything that Dan Brown wants to be." সেসময় রলিন্সের লেখার সাথে পরিচিত ছিলাম না বলে তেমন গুরুত্ব দেইনি কথাটায়। তবে কয়েকটি স্ট্যান্ড আলোন এবং সিগমা ফোর্স সিরিজের বইগুলো পড়ার পর, কিছুটা হলেও একমত হতে বাধ্য হয়েছি। পেশায় পশু চিকিৎসক এই ভদ্রলোক লেখালেখি করতে গিয়ে প্রচুর রিসার্চ করেন, পড়াশুনা করেন। তার ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় একের পর এক মাস্টারপিস; ইতিহাস,বিজ্ঞান,মনস্তত্ব,পুরাণ,ভ্রমণ,সংস্কৃতি,ধুমধাড়াক্কা একশন-এডভেঞ্চারের অসাধারন মেলবন্ধন ঘটে তার লেখনীতে। "শ্বাসরুদ্ধকর', ' আল্টিমেট পেইজ টার্নার' - এই বিশেষনগুলো তাই অনায়াসেই ব্যবহার করা যায়।
লাস্ট ওরাকল সম্পর্কে আলোচনা করার আগে, ছোট্ট করে সিগমা ফোর্স সম্পর্কে বলে নিচ্ছি। সিগমা ফোর্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে DARPA প্রোগ্রামের একটি কাল্পনিক বিভক্তি। সিগমার প্রধান কর্মকর্তাদের বিশেষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পাশাপাশি রয়েছে প্রশিক্ষিত সামরিক দক্ষতা। এ সংঘের উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন সব সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষন করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হতে পারে। কাজগুলো হচ্ছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান , গবেষণা, এবং গোপন অপারেশন।
প্রসঙ্গ - কাহিনী সংক্ষেপঃ
দ্য লাস্ট ওরাকল - সিগমা ফোর্স সিরিজের পঞ্চম বই এটি। কাহিনীর শুরুতে সিগমা সদস্য কমান্ডার গ্রে পিয়ার্সের কোলে মাথা রেখে মারা যায় এক ভবঘুরে গোছের লোক। আততায়ীর গুলির আঘাতে মৃত লোকটার হাতে ধরে থাকা প্রাচীন এক কয়েনকে ঘিরে জন্ম নেয় রহস্য। এই কয়েন এমন এক কয়েন, যার সাথে সম্পর্ক আছে হাজার বছরের পুরনো কিংবদন্তীর এক চরিত্র—ডেলফির ওরাকলের।
একদল অতিমানবিক প্রতিভাধর অটিস্টিক শিশু, সেই ১৯৫০ সাল থেকে গোপনীয়তার সাথে চালিয়ে আসা জেনেটিক অল্টারেশন প্রজেক্টের ফসল ওরা। বিশেষ প্রতিভাধর শিশুদের ক্ষমতাকে পুঁজি করে দুনিয়ায় প্রলয় ডেকে আনতে চলেছে দুই ম্যানিয়াক;জেনারেল-মেজর সাভিনা মারতোভ আর তার ছেলে রাশিয়ান সিনেটর নিকোলাস। সাথে জুটেছে পাগলাটে কিছু বিজ্ঞানী। তেজস্ক্রিয়তার প্রয়োগে সমগ্র বিশ্বের নেতৃস্থানীয় গোষ্ঠীকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে, পৃথিবীর একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে চায় তারা। রাশিয়ান ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সাথে কী সম্পর্ক এই ব্যাপারটার?
এদিকে ভু-গর্ভস্থ রাশিয়ান ফ্যাসিলিটিতে জ্ঞান ফিরে পায় স্মৃতিভ্রষ্ট, বিকলাঙ্গ এক মানুষ, পৃথিবীর সবাই যাকে মৃত বলেই জানে। তিনজন প্রতিভাধর প্রতিবন্ধী শিশুকে সাথে নিয়ে স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল সে। কনস্টানটাইন - ম্যাথমেটিক্যাল জিনিয়াস; কিস্কা- অনুকরণে অদ্বিতীয়, যে কোনও শব্দ নকল করতে যার জুড়ি নেই; পিওতর- মাইন্ড রিডার, সহজেই অন্যের চিন্তাভাবনা বুঝতে পারে। সাথে আছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার আরেক ফসল - শিম্পাঞ্জি মার্তা। ওদিকে পিওতরের ছোট্ট বোন সাশা (যোজন যোজন দূরে থেকেও যে পৃথিবীজুড়ে ঘটতে থাকা সমস্ত ঘটনার পূর্বাভাস দিতে পারে) কে আটকে রাখা হয়েছে ওয়াশিংটনে।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির চেয়ে বড় দায়িত্ব চেপে বসেছে ঘাড়ে, আসন্ন বিপদ থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। রক্ষা করতে হবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন।
প্রাচীন গ্রীক মন্দির থেকে আধুনিক পারমাণবিক কেন্দ্র পর্যন্ত, ভারতের বস্তি থেকে রাশিয়ার ধ্বংসস্তুপ পর্যন্ত, দুজন মানুষকে ছুটতে হচ্ছে এমন এক রহস্য সমাধানের জন্য, যার উৎপত্তি হয়েছে ইতিহাসের প্রথম ভবিষ্যতদ্রষ্টা, ওরাকল অফ ডেলফির আমলে।
প্রশ্ন একটাই, অতীত কি পারবে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে?
প্রসঙ্গ - পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
একটামাত্র শব্দ দিয়ে যদি মনোভাব প্রকাশ করতে যাই, তবে বলতে হবে "unputdownable"। সিরিজের চতুর্থ বই 'দ্য জুডাস স্ট্রেইন' যেখানে শেষ হয়েছে 'দ্য লাস্ট ওরাকল' এর কাহিনী শুরু হয়েছে ঠিক সেখান থেকেই। ধুমধাড়াক্কা অ্যাকশনের সাথে ইতিহাস আর বিজ্ঞানের পুর্ণ মেলবন্ধন ঘটানো শুধু রলিন্সের পক্ষেই সম্ভব। জিপসি অথবা রোমা গোষ্ঠীর সাথে জড়িত প্রাচীন এক গোপনীয়তার বিস্তারিত ইতিহাস জানা যাবে বইটিতে। মানব মস্তিষ্কের রহস্যময়তাকে অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল্ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রলিন্সের অন্যান্য বইগুলোর মতো দ্য লাস্ট ওরাকল-ও পাঠককে যোগায় চিন্তার খোরাক; বিজ্ঞানকে ছাপিয়ে অতিপ্রাকৃত অব্যাখ্যায়িত বিষয়গুলোর সমাধান কি আদৌ মিলবে?
ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্বলিত স্থানগুলো বইয়ের সাদাকালো অক্ষরকে দুরে সরিয়ে জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ধরা দেয় লেখকের ভৌগোলিক বিবরণের দক্ষতার কারণে। ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের কোনও বালাই নেই। এতদিনে চরিত্রগুলোকে অত্যন্ত আপন হিসেবে ধরে নিতে পেরেছি। সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি প্রিয় এক চরিত্রের পুনরাগমনে... না থাক! এটা বললে আবার স্পয়লার হয়ে যায়!
এপিলগের টুইস্টটাও .... নাহ! এটাও স্পয়লার! :/
প্রসঙ্গ- রুপান্তর অথবা অনুবাদঃ
আদনান আহমেদ রিজনের প্রথম অনুবাদ। 'বাসর রাতে বিড়াল মারা' বলতে একটা প্রবাদবাক্য প্রচলিত আছে। সেই প্রবাদের সূত্র ধরে বলা যায়, রিজন যথেষ্ট দক্ষতার সাথে বিড়াল মেরে দিয়েছে ; থুক্কু রুপান্তরের দক্ষতা দেখিয়েছে। অনুবাদ পড়তে গিয়ে যদি মূল বইয়ের স্বাদ পাওয়া যায়, তবেই তো অনুবাদকের সার্থকতা। বিশেষ করে হিউমার আর সাস্পেন্স সমৃদ্ধ জায়গাগুলোোতে অনুবাদের দক্ষতা খুব স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। পুরো বই পড়ার সময় একবারও ঠেকতে হয়নি, কপাল কুঁচকাতে হয়নি, গুগল করতে হয়নি। রিজনকে অভিনন্দন, এধরনের ঝরঝরে সুস্বাদু অনুবাদ সামনে আরো আশা করছি ওর কাছ থেকে।
প্রচ্ছদের কথাটা উল্লেখ না করলেই নয়। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে - জানেন তো? সেই সূত্র ধরেই অনুবাদক এক্ষেত্রে প্রচ্ছদশিল্পী। টারকয়েজ কালারের নজরকাড়া এই প্রচ্ছদ বইটির উৎকর্ষে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
খারাপ দিক হচ্ছে, স্পেলিং/ প্রিন্টিং মিস্টেক। খুঁটিনাটি ভুল বানান এবং কিছু কিছু জোড়া লেগে যাওয়া শব্দ 'চাঁদে কলঙ্ক' হিসেবে ধরা দিয়েছে। এই ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।