বীরবল’ একটি সর্বভারতীয় চরিত্র, জনমানসে যাঁর পরিচয় একজন বিদূষক হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। অথচ ঘটনা এই যে, বীরবল ছিলেন সম্রাট আকবরের চোখের মণি, কোনো সমস্যা হলেই আকবর শরণাপন্ন হতেন বীরবলের। এই উপন্যাস যেমন বীরবলের, তেমনি আকবরেরও, কেননা আকবরছাড়া বীরবলের কোনো অস্তিত্ব নেই। আকবরের নবরত্ন সভার অন্য রত্ন তানসেন, ফৈজি, আবুল ফজল, মানসিংহ, টোডরমল তাঁরাও এই উপন্যাসের এক-একটি চরিত্র। আছেন তৎকালীন আরও সংগীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী, কাসিদা ও বয়েৎ লেখক। আছেন মান্ডুর বাজবাহাদুর ও রূপমতীও। আছেন যোধাবাই।
যত পৃষ্ঠা ওলটানো যাবে পাঠক আবিস্কার করবেন অন্য এক বীরবলকে।
তপন বন্দ্যোপাধ্যায় (৭ জুন ১৯৪৭/২২ জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৪) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য লেখক। তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত সত্তর দশক থেকে। প্রথমে কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু হলেও ক্রমশ তিনি কথাসাহিত্যিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে একদিকে উঠে এসেছে গ্রাম বাংলার প্রকৃতি অন্যদিকে প্রতিফলিত হয়েছে বহু সুপ্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য জাতীয় পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। সতীকান্ত মহাপাত্রের কবিতা সংকলন 'ভারতবর্ষ' অনুবাদের জন্য ২০১৯ সালে তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০২২ এ বীরবল উপন্যাসের জন্য পেলেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। তাঁর সাহিত্য অবলম্বনে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও নির্মাণ হয়েছে।
Born in 1947, Tapan Bandyopadhyay, saw the light of this world as a refugee from then East Bengal. After completing the school studies, he came to Calcutta to study in the college and the university, earned a first class degree in Pure Mathematics. He then acted as a teacher in a higher secondary school for seven months, and then joined in nationalised bank as a clerk. After serving there for two years, he joined the state service in 1972 and retired in June 2007 as Special Secretary & ex-officio Director of Culture, Govt of West Bengal. Later on, he was re-employed as Secretary, Shishu Kishore Academy He started his literary career as ap poet, but ultimately got success as a short story writer and novelist.
তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আমি আগে কখনও পড়িনি। এই বই কেনার মূলত তিনটি কারণ ছিল - ১। এটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পাওয়া ২। বইটি দে'জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত। আর শেষ কারণ হল - ইতিহাস আশ্রিত গল্প - উপন্যাস আমার পছন্দের। আমার না দেখা সময়কে বইয়ের পাতায় দেখতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু শুরুতেই যখন বইয়ের শেষে থাকা লেখকের কথা , ‘বীরবলকে খুঁজতে গিয়ে প্রায় নতুন করে লিখতে হল ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।’ - পড়লাম , তখনই আমার আশঙ্কা হল। আর যত বইয়ের পাতা এগোল - সেই আশঙ্কা পরিণত হল বাস্তবে। এই বইটি যারা এখনও পড়েননি কিন্তু ভৱিষ্যতে পড়ার ইচ্ছা আছে, তারা এখানেই থেমে যাবেন। কারণ এরপর আমি যা লিখব তা এক প্রকার স্পয়লারই বলা চলে।
নতুন লেখা ইতিহাসে লেখক বলতে চেয়েছেন এই যে - আকবর মূলত একজন যুদ্ধবাজ ও নারী লোলুপ সম্রাট। পরবর্তীতে তাঁর জীবনে যে অল্প স্বল্প বদল এসেছিল তা মূলত মহেশ দাস ওরফে বীরবলের জন্যই! এই উপন্যাসে আকবরকে বই পড়া শেখানো থেকে শুরু করে ইবাদতখানা পরিচালনা পর্যন্ত সবকিছুর নায়ক বীরবল। রাজপুত রাজা টোডর মল, প্রথম মানসিং, তানসেন, মা হামিদা বেগম, ধাইমা মাহাম আনগা - সবাই এখানে পার্শ্ব চরিত্র। লেখক পুরো বই জুড়ে যুদ্ধ বাদে আকবরের যাবতীয় কাজের পেছনে উপদেষ্টা হিসেবে রেখেছেন বীরবলকে। লেখকের দাবি, এই গুণী ব্যক্তিটিকে ইচ্ছা করে বাদ দিয়ে, তাঁকে গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন বাদায়ুনী, আবুল ফজল। ভিনসেন্ট স্মিথ, ঈশ্বরী প্রসাদ, শ্রীবাস্তব, রমেশ চন্দ্র মজমুদারও কিছু না লেখায় লেখকের মনে হয়েছে 'কোনও বিশেষ কারণে উপেক্ষা করা হয়েছে বীরবলকে।'
বীরবল আকবরের নবরত্ন সভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন নিজের 'উইট' দিয়ে। অথচ লেখক এখানে বীরবল 'হিরো' বানাতে গিয়ে সেই 'উইট' পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছেন। বীরবল এখানে রসকষহীন এক জ্ঞানী মানুষ, রাজাকে জ্ঞান দেওয়া ছাড়া যার আর কোনও কাজ নেই।
এদিকে লেখার শুরুতে লেখক বলেছেন, বীরবল সম্পর্কে কোথাও বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না। আবার বইয়ের শেষে বলছেন বীরবলকে খুঁজতে গিয়ে প্রায় নতুন করে লিখতে হল ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে আমার লেখককে প্রশ্ন - এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ভিত্তি কি? শুধুই কল্পনা? তাহলে কি এবার আমাদের কল্পনাকে ইতিহাস বলেই বিশ্বাস করতে হবে?
এই বইয়ের অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে আরবী - ফার্সির ভুল ব্যবহার। যেখানে ব্যবহার করলে বাক্যটি অর্থপূর্ণ হতে পারত, সেখানে লেখক বাংলা ব্যবহার করেছেন। আর যেখানে ব্যবহার না করলেও চলে সেখানে অবলীলায় বসিয়ে গেছেন শব্দগুলো। কয়েকটি উদহারন দিচ্ছি এখানে। 'মায়ের হাতের গেঁহুর গরম রুটি আর ভেন্ডির তরকারি আজও পৃথিবীর রাতের শ্রেষ্ট ভোজ।' ' মহেশ দাস তাঁর পেটিকা থেকে বার করলেন সঙ্গে বয়ে নিয়ে আসা কিতাবগুলো।' - এই গেঁহুর জায়গায় গম, ভেন্ন্ডির জায়গায় ঢেঁড়স, আর কিতাবের জায়গায় বই লিখলে কি ক্ষতি হত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার আমার মনে। কোনও অবাঙালি যখন টেনে টেনে বাংলা বলেন, তখন যেমন শুনতে খারাপ লাগে, এই বই পড়তে ততটাই খারাপ লেগেছে আমার। আবার রূপমতী বাজ বাহাদুরকে যে গান শোনাচ্ছেন, তা পুরোটাই লেখা হয়েছে বাংলায়। (এই বই পড়তে গিয়ে আমার বার বার মনে পড়ছিল, দেজ – র’ই আরেক পুরষ্কার পাওয়া বই 'দোজখনামা'র কথা। রবিশঙ্কর বলের সেই উপন্যাসের মূল দুই চরিত্র আসলে কিন্তু উর্দুভাষী। অথচ উর্দু - আরবী - ফার্সীর ভারে সেই বই ন্যুব্জ হয়ে পড়েনি। গালিব আর মান্ন্টোর কথোপকথন কি সুন্দর, কি সাবলীল।)
এরপর আসি বানানে। এই বইয়ে বানান লিখতে গিয়ে কোনও নিয়ম মানা হয়নি বললেই চলে। আকবরের ঘোড়া কোথাও আশিক, কোথাও আসিক। বহুত খুব হয়ে গিয়েছে - বহুত খু, পেহেচান হয়ে গিয়েছে পহেচান। খুদখুশি হয়েছে খুদকুসি। এরকম অজস্র ভুল বইয়ের ছত্রে ছত্রে চোখে পড়বে।
শেষে বলি, কেউ যখন অন্য কোনও ধর্মের আচার অনুষ্ঠান বা নিয়ম নীতি নিয়ে লেখেন - সেটা সম্পর্কে অত্যধিক সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার বলেই আমি মনে করি। ক্রস চেক করা উচিত। কিন্তু এই বইয়ে ‘ক্রস চেক’ দূর অস্ত, ‘চেক’ই হয়নি। লেখক বইয়ের দুটি জায়গায় আজানের ধ্বনি লিখেছেন। একটি হল ৯৪ পাতায় অন্যটি ১২৩ পাতায় এবং দুটি জায়গাতেই সাংঘাতিক ভুল লিখেছেন। You tube - Google - এর যুগে দাঁড়িয়ে লেখক চাইলে অনায়াসে আজানের বাংলা সঠিক উচ্চারণ খুঁজে পেয়ে যেতেন। কিন্তু লেখক সেসব না করে বইয়ের শুরুতে লিখেছেন ঝাড়খণ্ডের কোন এক মুসলিম পণ্ডিত নাকি তাঁকে ফোন করে আশ্বস্ত করেছেন যে - তিনি মুসলিম রীতিনীতির দিক গুলো ঠিকই লিখেছেন!!!
এই বইয়ে আকবর বৈরাম খাঁ'কে সম্বোধন করেছেন 'পরওয়ারদেগার' বলে। লেখক যদি মুসলিম রীতিনীতি সম্পর্কে নূন্যতম পড়াশুনা করতেন তাহলে জানতেন কোনও মুসলিম এই শব্দটি কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতেই পারেন না। ১১১ পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন - ' তিনি আগে সাক্ষাৎ করছেন আল্লার সঙ্গে যাঁর টানে এসেছেন এত দূরে - আজমেড়।' তারকয়েক লাইন পরে লিখেছেন - 'সম্রাট মাথা ঝুঁকিয়ে দোয়া চাইলেন আল্লাহর কাছে।' পাতার নিচের দিকে লেখা - ' সারা হিন্দুস্থান থেকে হাজার হাজার আদমি আজমেড় শরিফে আসে আল্লাহর কাছে দোয়া পেতে।' এখানে আমার লেখককে প্রশ্ন আজমেড় শরিফে 'আল্লাহ' আছেন এই তথ্য কোথা থেকে পেয়েছেন? নিজে কোথাও থেকে জেনেছেন নাকি এটিও ঝাড়খণ্ডের কোন এক মুসলিম পণ্ডিতের দেওয়া তথ্য? আজমেড় সুফি সাধক মইনুদ্দিন চিশতির সমাধি মাত্র। এই রকম বহু সুফি সাধকের সমাধি এই ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে আছে। এইটুকু বোধহয় বহু অমুসলিমও জানেন - লেখক ছাড়া। আর লেখক জানার চেষ্টাও করেননি। কারণ নিজের জানা নিয়ে তিনি বোধ করি 'ওভার কনফিডেন্ট'। আমার এই দীর্ঘ লেখা শেষ করব একটা টাইম লাইন উল্লেখ্য করে। আপনারা যারা বইটি পড়েছেন আমাকে একটু বিষয়টি বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়। এই বইয়ের শুরুতেই আকবরের সঙ্গে পরিচয় হল মহেশ দাসের। আকবর তাঁর কাছে শুনলেন রূপমতী - বাজ বাহাদুরের গল্প। এরপর আকবর ফিরে গেলেন আগ্রা। মহেশ দাস হিন্দুস্থানের সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার কথা জানালেন রেওয়ারাজ রাজা রামচন্দ্রকে। তিনি আশঙ্কা করলেন আকবর রূপমতীকে পেতে মালোয়া আক্রমণ করবেন। তার সেই আশঙ্কা সত্যি হল পরের দিন। তিনি জানতে পারলেন আকবরের দূত ছুটে গিয়েছে মালোয়ার দিকে। রেওয়ারাজ মহেশ দাসকে বললেন আগ্রা গিয়ে আকবরকে বুঝিয়ে অনর্থক এই যুদ্ধ থেকে বিরত করতে। মহেশ দাস রাজি হলে তিনি তাঁকে বললেন ঘোড়ায় চেপে আগ্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে। উত্তরে মহেশ দাস বললেন - তিনি হেঁটে যেতে চান আর হেঁটে দুদিনেই আগ্রা পৌঁছে যাবেন। (৫৪ পৃষ্টা) অন্যদিকে, আকবর প্রথমে দূত পাঠিয়েছেন মালোয়াতে। তার পিছনে পাঠিয়েছেন আধম খানকে। সে গোটা মালোয়াকে এক প্রকার ধ্বংসই করে দিয়েছে বলা যায়। বাজ বাহাদুর পালিয়ে গিয়েছেন। আত্মঘাতী হয়েছেন রূপমতী। হত্যা যজ্ঞের খবর পেয়ে আকবর মালোয়া ছুটে গেলেন আধম খানকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু মহম অনাগা কারণে আধম খানকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারলেন না। হতাশ ও ক্রুদ্ধ বাদশা আগ্রার দিকে যাত্রা করলেন। 'মালোয়ার আটত্রিশ দিনের এই ভয়ংকর স্মৃতি তাঁকে মজনুন করে তুলল।' (৬১ পৃষ্টা) । আগ্রা ফ���রার পর আকবরের দেখা হল মহেশ দাসের সঙ্গে। ---- এখানে আমার প্রশ্ন - যে হামলা আটকানোর জন্য মহেশ দাস রেওয়া থেকে বেরিয়েছিলেন, সেই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আকবরের দেখা হল কেন? তিনি দুদিনে আগ্রা পৌঁছে যাওয়ার কথা বলেছিলেন, অথচ সম্রাটের সঙ্গে দেখা হচ্ছে আটত্রিশ দিন পর! মাঝের দিনগুলোতে মহেশ দাশ কোথায় ছিলেন, কি করছিলেন? আবার এই দেখা হওয়ার পর মহেশ দাস আকবরের আতিথেয়তা গ্রহণ করলেন, তাঁর সঙ্গে শিকারে গেলেন, তাঁকে আজমেড় যাওয়ার পরামর্শ দিলেন অথচ রূপমতী বিষয়ে নীরব থাকলেন। কেন?
This entire review has been hidden because of spoilers.
আমার পড়ার আওতায় এইটা হইল দে'জ পাবলিশিংয়ের সবচেয়ে বাজে প্রোডাকশনের বই। প্রোডাকশন বলতে কাগজ, ছাপা ঠিক আছে কিন্তু বানান ও তথ্যে দে'জ বা আনন্দ এমন কাজ করে না। এইদিকে তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ও এমন আধ খ্যাচড়া লেখা কোনো ইতিহাস জানা লোকের হাতে না দিয়েই ছাপায়ে কেন দিলেন জানি না।
লেখার দুইটা ভূমিকা আছে, একটা শুরুতে আরেকটা শেষে। শুরুতে লেখক বলছেন ওনার এই লেখা তৈরির তরীকা এবং অন্যান্য বিষয়। কে মুর্শিদাবাদ থেকে ফোন করে লেখা নিয়ে কী বলছে তাও আছে। শেষে আবার যে 'ভূমিকা' আছে সেখানে বলছেন মোগল দরবারী ইতিহাস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বীরবল সম্পর্কে তথ্য খুবই কম। তপন বাবুর লেখার টোন অনেকটা এমন যে বীরবলকে ইচ্ছা করে বাদ দেওয়া হইছে। ইঙ্গিতটা অবশ্যই বাদায়ুনী, আবুল ফজলদের দিকে। কিন্তু উপন্যাসে তিনি বীরবলের প্রতি অন্তত আবুল ফজলের মনোভাব ভালোই দেখাইছেন। সে যা-ই হোক, ইতিহাসে বীরবলের উল্লেখ না থাকার নানাবিধ কারণ আছে। সেখান থেকে বীরবলের আবিষ্কারে বেরনো কোনো দোষ না। এমনকি তাকে নিয়ে উপন্যাস লেখা খুবই ভালো একটা বিষয় কিন্তু লেখক লিখেছেন, ‘বীরবলকে খুঁজতে গিয়ে প্রায় নতুন করে লিখতে হল ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।’
এই কথাটায় দুই রকম সমস্যা আছে। প্রথমত, তিনি ইতিহাস লেখেন নাই। লিখছেন উপন্যাস। দ্বিতীয়ত, ইতিহাসই যদি লিখতেন বা ইতিহাসের অধ্যায় লিখতেন তাহলে সেই সম্পর্কে যথেষ্ট ‘সঠিক’ তথ্য দেওয়া জরুরী ছিল। তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাস ইতিহাসকে অনুসরণ করে কিন্তু ঐতিহাসিকতাকে পুরোপুরি উপস্থাপন করে না। তিনি ইতিহাসের আলোকে বীরবলকে উপস্থাপন করেছেন নিজের মতো করে। তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বীরবল একটি ‘ফিকশনাল ক্যারেক্টার’, কোনোমতেই আকবরের নবরত্নের একজন, বীরবলের বস্তুনিষ্ঠ চিত্র নয়। লেখকের মগজে থাকা একটি চিত্র যা কখনও উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
মহেশ দাস প্রচলিত ধারার ‘বিদূষক’ ছিলেন না। কিন্তু তার ‘উইট’ ছিল এবং আকবরের সামনে তিনি তা ব্যবহার করতেন এতে সন্দেহ নেই। ইতিহাস তাই বলে। তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরবল ‘কবি’ এবং ‘কবিবর’ থেকে আকবর তাকে ‘বীরবর’ ডাকতেন, সেই নামটি বিকৃত হয়ে বীরবল হয়েছে—উপন্যাসের এই হলো বয়ান। সেও মেনে নেওয়া যায় কিন্তু লেখক পুরো বই জুড়ে যুদ্ধ বাদে আকবরের তাবৎ কাজের পেছনে উপদেষ্টা হিসেবে রাখলেন বীরবলকে। অথচ আকবরের নানা সিদ্ধান্তের পেছনে অবদান ছিল শেখ মুবারক, আবুল ফজল থেকে শুরু করে রাজপুত রাজা এমনকি তার মা হামিদা বেগমের। এই উপন্যাসে আকবরকে বই পড়া শেখানো থেকে শুরু করে ইবাদতখানা পরিচালনা পর্যন্ত সবকিছুর নায়ক বীরবল। আহা!
বীরবলকে নায়ক করতে গিয়ে তার উইটের কোনো পরিচয় আর রাখলেন না লেখক। তাও মেনে নিতে পারলাম কিন্তু এরকম একটা বই লেখার আগে ভাষা ও ধর্মজ্ঞান খানিক ঝালিয়ে নেয়া খুবই জরুরী। আরবি, ফারসি শব্দে প্রচুর ভুল বানান ও ব্যবহার। আশিক কখনও আশিক হয়ে যায়। পারস্যের কবি নিজামী গঞ্জাভি হয়ে যান ‘গঞ্জারি’। ইংরেজি বই দেখে লিখেছিলেন বলেই হয়ত শামসুদ্দিন আতগা খানের (Shamsuddin Atga Khan) নাম লিখেছেন ‘আটগা’। মরিয়ম জামানীকে করেছেন ‘মেরী’, আকবরের ছেলে দানিয়ালকে লিখেছেন ‘ড্যানিয়েল’ (আমি সাধারণত বই দাগাই না কিন্তু এই বই পেন্সিলের দাগে ভরা)। হিন্দিতে ‘বহত খুব’ কথাটা খুবই পরিচিত কিন্তু সেটাকেও লেখক ‘বহত খু’ লিখে রাখেন, ‘ব’ আর দেওয়া হয় না।
আকবরের প্রতি ভিন ধর্মীদের সহনশীল হতে দেখা যায়। এখানে ব্যতিক্রম না কিন্তু বারবার কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধ আর নারী প্রসঙ্গ এনে তার ‘নেতিবাচক চরিত্র’ দেখানোর প্রবণতা চাপা পড়ে না। একথা উল্লেখ করতাম না কিন্তু করতে হলো কেননা লেখায় যদি কোনোভাবে ধর্মের বিষয় চলে আসে সেখানে ওই ধর্ম সম্পর্কে খানিক পড়াশোনা করে নেওয়া উচিৎ। কলকাতার লেখকদের কেন যেন ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে গাদা গাদা ভুল ধারণা ও বিশ্বাস আছে। (কার বইয়ে যেন সম্প্রতি এক মুসলিম চরিত্রের মুখে একটা স্বগত সংলাপ পেয়েছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের উদ্দেশ্যে মনে মনে সে বলে, ‘সত্যি, আমাদের সম্পর্কে ওরা কতো কম জানে!’)। আজানের ধ্বনি অনুসরণে ১২৩ পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন, ‘হাই আলে আসবোলা/ হাই আল্লেল ফলা’। সালাম অনেকে অনেকভাবে উচ্চারণ করে কিন্তু আজান তো তা না।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৮০ টাকা খরচ করে কেনা এই বইয়ের শেষে দেখলাম মোগল ইতিহাসের চোস্ত বই লেখক পড়েছেন (তথ্যসূত্র অনুসারে) দশটি। আমার বিশ্বাস আরও পড়েছেন। তবে বিশ্বাসটা পোক্ত করতে পারছি না। যাই হোক, টাকার অঙ্ক উল্লেখ করলাম, কারণ আমার মনে হচ্ছিল এই বইয়ের দামটা অপচয় হইল কিন্তু পরে মনে হইল এটা পড়ে ‘আমি কী লিখব না’ সেটা জানতে পারলাম। সে কারণে হলেও তপন বন্দ্যোপাধ্যায় ধন্যবাদ পাবেন।
লেখকের লেখনী বেশ দ্রুত গতির যার জন্য বেশ বড় উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসি। ভালো লাগার তালিকায় আর একটি বই যোগ হলো।
বীরবল আর আকবর জুটির কথা শুনলেই মনটা নেচে ওঠে। আজও এই দুই ভিন্নধর্মী জুটি, দুই অসম বয়সী জুটি, দুই ভিন্ন সামাজিক স্তরের জুটি, আমাদের অনাবিল আনন্দ দেয়।এত অসম, তবুও এত বিশ্বাস, এত ভরসা, এত ভালোবাসা।
এই দুই মহান চরিত্র সম্বন্ধে লিখতে গেলে যতটা যত্নশীল হওয়ার প্রয়োজন ততটা হয়েছে বলে মনে হয় নি। ‘প্রুফ রিডিং’ করা হয়েছে বলে মনে হয়নি। প্রায় পাতায় পাতায় নানান ধরনের অসামঞ্জস্য । এতে পডার রস ভঙ্গ হয়েছে বারংবার।
এই বই কিসের ভিত্তিতে একাদেমী পুরস্কার পেয়েছে জান্তে ইচ্ছা করে।