"গন্তব্য এখনো এক সভ্যতা দেরি" - দেবারতি মুখোপাধ্যায়
দীপ প্রকাশন
মুদ্রিত মূল্য ₹২৯৫ (২০২৩)
গন্তব্য এখনো এক সভ্যতা দেরি। "সত্যিই আমরা নিজেদের যত সভ্য বলে দাবি করি না কেন, সত্যিকারের সভ্য হওয়ার গন্তব্যে পৌঁছতে গেলে আমাদের বহুদূর হাঁটতে হবে। হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। নতুন এক সভ্যতা গড়ে উঠবে। তখন আমরা সভ্য হব।... সেই নতুন পৃথিবীতে বিকৃতি থাকবে না, অপরাধ থাকবে না, শোষণ থাকবে না।"
এই রহস্য থ্রিলার উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র পুলিশ অফিসার রুদ্রানী ও তার স্বামী প্রিয়ম গোয়ায় বেড়াতে যায়। নর্থ গোয়ার ক্রাইম ব্রাঞ্চের এসপি রুদ্রাণীর প্রাক্তন সহকর্মী ও বন্ধু শংকর গঞ্জালভেজ তার নর্থ গোয়ার পুলিশ বাংলোতে রুদ্রানীদের থাকার ব্যবস্থা করেন। রুদ্রানী ও প্রিয়ম গোয়াতে পৌঁছানোর পর তারা স্থানীয় খবরের কাগজ থেকে জানতে পারে তার ঠিক আগের দিন রাতে নর্থ গোয়ার সেন্ট সেবাস্টিয়ান নামক এক অনাথ আশ্রমের ফাদার জেমসনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে যার তদন্ত করছে রুদ্রণীর বন্ধু এসপি শংকর। অন্যদিকে রুদ্রানী শংকরের কাছ থেকে জানতে পারে তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে নর্থ গোয়ার ভাগাতোর বিচের কাছে গুড রিটার্ন হোম নামক আরেকটি অনাথ আশ্রমের ফাদার দুয়ার্তের অনাথ আশ্রমে ঘুরতে আসা ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুইডেনের নাগরিক রূপা বলে একটি মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে যারও তদন্তকারী অফিসার শংকর। বন্ধু শংকর কে সাহায্য করার জন্য রুদ্রানী দুটি পৃথক রহস্যময় বিষয় নিয়ে খোঁজ খব��� শুরু করে এবং জড়িয়ে যায় তদন্তের সাথে। এর পরেই একদিন গোয়ার ভাগাতোর বিচ থেকে রূপা নেইলসনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। যাকে অনেকবছর আগে দত্��ক নিয়েছিলেন এক সুইডিশ দম্পতি। রূপা কী বারবার ভারতে আসত নিজের হারানো পরিবারকে খুঁজতে? এই রূপার সাথে ফাদার দুয়ার্তের কি সম্পর্ক? কেন তাকে খুন হতে হল? পিডোফেলিক ফ্রেডি পিটের সাথে ফাদার জেমসন, ববি গঞ্জালভেস, পিটার অ্যাণ্ড্রুজ কি সম্পর্ক ছিল?
মূলত তিনটি পৃথক সময় সরণীতে কাহিনি এগিয়েছে এবং শেষে একসাথে মিশেছে। প্রথম সময় সরণীতে রয়েছে বর্তমান সময়ে গোয়াতে হওয়া একটি খুন ও একটি রহস্যময় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শংকর- রুদ্রাণী- প্রিয়মদের তদন্ত অভিযান। দ্বিতীয় সময় সরণীতে আনুমানিক ১৫৬০ সালে পর্তুগীজ অধীনস্থ গোয়ার একটি অখ্যাত গ্রামের পটভূমিতে ইহুদি ও হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের একটি ছেলে মেয়ে প্রেমের করুন পরিনতির কাহিনী। তৃতীয় সময় সরণীতে আছে বর্তমান সময়ে আর্য়াল্যান্ডের একটি কলেজে সোশিয়োলজিতে গবেষণারতা আনন্দিনী নামক একটি বাঙালি মেয়ের কথা, যে তার গবেষণার কাজে গোয়ায় এসে জড়িয়ে পরে এক গভীর ষড়যন্ত্রে।
১৫০০ শতাব্দীতে পর্তুগিজ অধীনস্থ প্রাচীন গোয়ায় ইনকুইজিশন, ম্যানুফেকচারড অরফ্যান এবং পিডোফিলের মতো এক বিকৃত মানসিক রোগ এই তিনটি ঘৃণ্য অপরাধ নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি।
যারা খ্রিস্টান ধর্মকে মানত না, যারা বাইবেল ও পোপকে সম্মান করত না তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য মধ্যযুগে ক্যাথলিক চার্চগুলোতে ইনকুইজিশান অফিস তৈরি করা হয়েছিল। এই অফিসে ইনকুইজিটাররা থাকতেন যাদের কাজ ছিল গ্রামেগঞ্জে গিয়ে গ্রামবাসীদের ভয় দেখিয়ে, অত্যাচার করে খ্রিস্টান ধর্মান্তরিত করানো। গোয়াতে ইনকুইজিশনের প্রবর্তক ছিলেন ফ্রান্সিস জেভিয়ার।
Manufactured orphan - বাবা মা থাকা সত্ত্বেও তাদের কাছ থেকে বাচ্চা চুরি করে বা পয়সা দিয়ে কিনে এনে বা গরিব বাবা মাকে টাকা দিয়ে বা কুমারী মায়ের কাছ থেকে বাচ্চাদের নিয়ে এসে অরফ্যান বানানো কে বলা হয় ম্যানুফ্যাকচারড অরফ্যান। Inter country adoption এর মাধ্যমে বিদেশি দম্পতিরা ভারত থেকে বহু ম্যানুফ্যাকচারড অরফ্যান শিশুকে নিয়ে যায়।
ডাবল অরফ্যান মানে যার বাবা মা দুজনেই মৃত। মেটারনাল অরফ্যান মানে যার মা মারা গেছে বাবা জীবিত। পেটারনাল অরফ্যান মানে যার বাবা মারা গেছে মা জীবিত।
চ্যাপেল, চার্চ, ক্যাথিড্রাল এবং ব্যাসিলিকার মধ্যে পার্থক্য কি? চার্চ হচ্ছে যে কোন ধরনের গির্জা যেখানে পাত্রী থাকেন। চ্যাপেলের ক্ষেত্রে বিল্ডিং এর সাথে যুক্ত থাকে ছোট উপাসনা গৃহ। চার্চের প্রধান যদি কোন বিশপ হয় তবে সেই চার্চকে ক্যাথিড্রাল বলা হয়। ক্যাথিড্রা শব্দের অর্থ বিশপের চেয়ার। ব্যাসিলিকা মানে রয়্যাল হাউস।
এই উপন্যাসে ভারতের তথা কলকাতার এক বিখ্যাত মিশনারীয় সন্তের ও তার সংগঠনের কাজকর্মের এক অজানা অন্ধকারময় দিক নিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
থ্রিলার হিসাবে উপন্যাসটির প্লট বেশ জমজমাট। শংকর, দুয়ার্তে, মার্তণ্ড, শিরা, জোসেফ, গোকুল, ক্যাথারিন পিসি, জোশুয়াকাকা, ভূদেব গাঁওকর প্রভৃতি চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে ইতিহাস ও রহস্যকে একসাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। গোয়ার সাথে সাথে উঠে এসেছে মোলে গ্রাম, তাম্বুলি শিরা মন্দিরের কথা। আমরা জানতে পারি গার্সিয়া দে ওরতা নামক এক ইহুদি চিকিৎসকের কাহিনী যিনি প্রাচ্যের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রকে পরিচিত করিয়েছিলেন পাশ্চাত্যে। ইনকুইজিশন, খ্রিস্ট ধর্ম, গোয়া তথা ভারতের এবং আন্তর্জাতিক স্তরে শিশু পাচার চক্র, চাইল্ড সেক্স রাকেট এর মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখার জন্য লেখিকাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।