‘‘আমি এমন কোনো অবস্থানে দাঁড়াতে পারিনি, যেখান থেকে আমার পাঠিকা/পাঠকের চেয়ে নিজেকে অনেক বেশি জ্ঞানী, সত্যের হকদার বলে মনে করতে পারি। ফলে লেখাটি নিজেকে খোঁজারই একটা প্রক্রিয়া বলতে পারেন, অনেক খামখেয়ালিপনা, অনেক বিভ্রান্তির ছিটে এর গায়ে লেগে আছে। তা ছাড়া আর কীই বা আমার পক্ষে সম্ভব! আমি গল্প-উপন্যাস লিখি —পণ্ডিত নই—আর সে-জন্য আমি সত্যিই জানি না, সত্য কাকে বলে। আমি শুধু বিভিন্ন মানুষকে দেখি—সূর্যোদয়, সূর্যাস্তে তার মুখের রঙ বদল দেখি — পাখির গান শুনি—নদীর গান শুনি—আকাশের ওপরে আকাশ দেখি। কাকে বলে আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা ও উত্তর-ঔপনিবেশিকতাই বা কী, এসব আমি ওই গল্প-উপন্যাসের ভূমিতে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেয়েছি। বা এই লেখা, আমার সঙ্গে ওইসব ধারণার ঠোকাঠুকির একটা বিবরণ মাত্র।’’
রবিশংকর বল পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৬২ সালে। বিজ্ঞানে স্নাতক। ২০১১ সালে দোজখনামা উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন।
গল্পগ্রন্থ দারুনিরঞ্জন রবিশঙ্কর বল এর গল্প আর্তোর শেষ অভিনয় জীবন অন্যত্র ওই মণিময় তার কাহিনী সেরা ৫০ টি গল্প
উপন্যাস নীল দরজা লাল ঘর পোখরান ৯৮ স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন মিস্টার ফ্যান্টম বাসস্টপে একদিন মিলনের শ্বাসরোধী কথা নষ্টভ্রষ্ট এখানে তুষার ঝরে দোজখনামা আয়নাজীবন আঙুরবাগানে খুন জিরো আওয়ার
কবিতা ত্রস্ত নীলিমা ঊনপঞ্চাশ বায়ু
প্রবন্ধ সংলাপের মধ্যবর্তী এই নীরবতা কুষ্ঠরোগীদের গুহায় সংগীত মুখ আর মুখোশ জীবনানন্দ ও অন্যান্য
সম্পাদিত গ্রন্থ সাদাত হোসেইন মন্টো রচনাসংগ্রহ
জাহিদ সোহাগ : মানে আমি বলছি এই কারণে যে, আমাদের বাংলাদেশে রবিশংকর বলকে চেনা হচ্ছে দোজখনামা দিয়ে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? মানে এখানেও একটা ট্যাগ আছে। রবিশংকর বল : এটা বলা কঠিন, তবু যদি বলো তবে আমি বলব, আমার "মধ্যরাত্রির জীবনী" উপন্যাসটা পড়া উচিত, "বাসস্টপে একদিন" উপন্যাসটা পড়া উচিত, "এখানে তুষার ঝরে" উপন্যাসটা পড়া উচিত। "স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর", "ছায়াপুতুলের খেলা" অবশ্যই। এই কটা লেখা অন্তত। আর "পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন" এই লেখাটা।
আমরা পৃথিবীটা নিজের মাপে মাপি। ফলে পৃথিবী ছোট হয়ে আসে।দেখার ভঙ্গিতে আসে সীমাবদ্ধতা। সাধারণ মানুষরা নয় শুধু, "অসাধারণ" মানুষরাও এই কাজটা করে থাকেন প্রতিনিয়ত। সাহিত্যিক, সমালোচকরাও এই ধারার উর্ধ্বে নন। "এরা" নিজেদের ভাবেন পণ্ডিত বা জ্ঞানী। এদের অনেকেই পাঠকদের জ্ঞানগরিমায় "ন্যূন" ধরে নেন অবলীলায়। এই অহং যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে। তারা যেভাবে আমাদের সাহিত্য বুঝতে শিখিয়েছেন আমরা তা-ই বুঝেছি। তারা আমাদের সবসময় খারাপ বুঝিয়েছেন বা তাদের কোনো গুরুত্ব নেই ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। কিন্তু পণ্ডিতদের সর্বব্যাপী প্রভাব ও তাদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই হয়েছে কাল। তারা যাকে মূল্যবান ভেবেছেন আমরাও তাদের বলেছি মূল্যবান।তাদের সাথে যাদের সাহিত্যবোধ মেলেনি, অনায়াসে তারা হয়ে গেছে "তুচ্ছ", "ব্যর্থ।" এই "ছাঁচ" আমাদের করে তুলেছে একচক্ষু হরিণের মতো।
রবিশংকর বল তার গদ্যগুচ্ছে সব রকম "ছাঁচ" বা বর্গের বাইরে থেকে মুক্তচোখে সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা করেছেন বা করতে চেয়েছেন(অল্প কিছু ক্ষেত্রে তার "ছাঁচহীনতা" হয়ে গেছে আরেক ধরনের অদৃশ্য "ছাঁচ।") তার লেখায় সবচেয়ে বেশি এসেছে জীবনানন্দ প্রসঙ্গ। কিছুটা পুনরাবৃত্তি আছে লেখায় কিন্তু স্বীকার করতেই হবে,এই গদ্যগুলো অনন্যসাধারণ। "নিরীক্ষামূলক সাহিত্য" নিয়ে তাৎপর্যবাহী বেশকিছু প্রবন্ধ আছে বইতে। যারা এ ধরনের লেখা একেবারেই পছন্দ করে না তারা প্রবন্ধগুলো পড়ে তাদের মত কিছুটা বদলালেও বদলাতে পারে। লেখকের ম্যাগনাম ওপাস "দোজখনামা" বা কুহকী "ছায়াপুতুলের খেলা" লেখার পেছনের কৌতূহলোদ্দীপক গল্প পড়ে দারুণ আনন্দ পেয়েছি। অন্নদাশংকর রায় বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো ছোট কিন্তু অকপট।
একজন গদ্যকারের সব কথা মেনে নেওয়া কখনো সম্ভব হয় না। মেনে নেওয়াটা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণও নয়। কিন্তু রবিশংকর বলের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত সারল্য আছে;আছে নিজের লেখার প্রতি নিভৃত অথচ সবল বিশ্বাস যা তার গদ্যকে দিয়েছে বিশিষ্টতা ও মাহাত্ম্য।