ইন্দ্রনীল সান্যালের জন্ম হাওড়ার বালিতে, ১৯৬৬ সালে। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস। প্যাথলজিতে এম ডি, পিজি হাসপাতাল থেকে।সরকারি চাকরির সূত্রে কাজ করেছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মহাকরণের ডিসপেনসারিতে, লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপ থেকে গঙ্গাসাগর মেলার হেল্থ ক্যাম্পে।বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।প্রথম প্রকাশিত গল্প ২০০৪ সালে ‘উনিশকুড়ি’ পত্রিকায়।শখ: বই পড়া, ফেসবুকে ফার্মভিল এবং হ্যাপি অ্যাকোয়ারিয়াম খেলা, সুদোকু সমাধান।
তোমার জন্য সাজিয়ে সূত্র সংকেতময় দেহ , তুমি শুধু দেখো যেন ছাড়া নাহি পায় কেহ ।
শরীর জুড়ে নাইফ কাঁচি গড়বে হাড়ের পাশা, তুমি না হয় বুঝে নিও অকেজো অঙ্গের ভাষা ।
যদি তল্লাশি করো চিরুনী আর তদন্ত করো ময়না , শবের রহস্য কখনো অমীমাংসিত হয়না ।
সদ্য শেষ করলাম ইন্দ্রনীল সান্যালের লেখা অটোপ্সি সার্জেন দীপশিখা মুখোপাধ্যায় সিরিজের দ্বিতীয় গোয়েন্দা উপন্যাস ময়না তদন্ত ।
প্রথমে একটু দেখা যাক , ময়না তদন্ত মানে কি ? কোথা থেকে এলো শব্দটা ? মুলত আরবি বা ফার্সি শব্দ ময়না এবং সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ তদন্ত মিলে এই শব্দের সৃষ্টি । আরবি শব্দ ময়না আবার একটি পাখির ও নাম । যার ঠোঁট হলদে হয় এবং গায়ের রঙ কুচকুচে কালো ও ভিন্ন প্রকার ভাবে ডাকতে পারে। গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণে ময়না পাখি সন্ধ্যারাতের আঁধারে নিজেকে মিশিয়ে রাখতে পারে । ময়নাকে কেবল মাত্র তার ডাক শুনে অভিজ্ঞ বিচক্ষণ ব্যক্তিই বুঝতে পারেন যে সেটি ময়না । তেমনই শব বা ডেডবডি ব্যবচ্ছেদ করে অন্ধকারে থাকা মৃত্যুর কারণকে আলোকিত করাই হল ময়না তদন্ত। আবার অনেকে বলেন ফার্সি শব্দ ময়না শব্দের অর্থ হল ভালো করে খোঁজা আর তৎসম তদন্ত মানে খুঁটিনাটি অনুসন্ধান । এই ময়না তদন্তের ইংলিশ শব্দ পোস্ট মর্টেম , যার সহজ বাংলা মৃত্যু-পরবর্তী কার্য । এছাড়া অটোপ্সি অথবা শবদেহ নিরীক্ষাও একে বলা হয় ।
গৌরচন্দ্রিকা থেকে এবার মূল কাহিনিতে আসা যাক । দীপশিখা বেঙ্গল মেডিকেল কলেজের ( সম্ভবত পিজির কাল্পনিক নাম ) ময়না তদন্তকারী শব পরীক্ষক। কোথাও কোনো Unnatural death হলে উনি পোস্ট মর্টেম করেন । বরুণ ভবানীপুর থানার পুলিশ অফিসার । তাদের প্রথম কাহিনি কর্কটক্রান্তি খুবই ভাল উপন্যাস , জি ফাইভে ওয়েব সিরিজ হয়ে গেছে । সেই বরুণ এক সকালে ভবানীপুর থানার অন্তর্গত কলকাতার খুব খ্যাতনামা ও প্রভাবশালী পরিবারের ব্রিটিশ আমলের বাড়ি পুনশ্চ থেকে সাইকায়াট্রিস্ট প্রিয়া দাশের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পান । সেই মরদেহের পোস্ট মর্টেম করেন দীপশিখা । সহজ ভাবে মনে হয়েছে বিষয়টা আত্মহত্যা । কিন্তু অফিসার বরুণ এবং দীপশিখার কাছে বিষয়টি অন্য রকম লাগে। তারা ভিসেরা রিপোর্টের অপেক্ষা করে।
এরপর জানা যায় এই পরিবারের বংশ পরম্পরায় এর আগেও একাধিক অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে । এই পরিবারের প্রত্যেকেই প্রায় ডাক্তার বা মেডিকেল লাইনের সাথে যুক্ত । অফিসার বরুণ কেন যেন কিছুটা ঢিলে দেয় তদন্তে এবং দীপশিখাকেই অনুরোধ করে তদন্ত করার । এরপর দীপশিখা পায় একের পর এক সাংঘাতিক সব সুত্র , যে সুত্র শুরু হচ্ছে ভবানীপুর থানার হাত ধরে, কিন্তু সেই সুত্র চলে যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালীন জার্মানিতে, যেই সুত্র চলে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের কাব্য গ্রন্থে , আবার কখনও যাচ্ছে আর্জেন্টিনার কোনও হাসপাতালে , কখনও বা বাংলার নকশাল আন্দোলনে , তো কখনও যাচ্ছে দুহাজার সালের পরে হওয়া মধ্য প্রাচ্যের গালফ যুদ্ধে । এর পাশাপাশি দীপশিখার উপর নেমে আসে সমুহ বিপদ। উপর মহল থেকে চাপ আসে যেইভাবেই হোক , সুইসাইড হয়েছে এমন রিপোর্ট থাকবে এবং রিপোর্ট লিখে তাড়াতাড়ি কেস ক্লোজ করা হোক। এর সাথে যুক্ত হয় দীপশিখাকে অচেনা নম্বর থেকে হুমকি ও তারপর হামলা । কে চালালো হামলা ?? কেন উপরমহল থেকে চাপ আসছে তাড়াতাড়ি কেস ক্লোজ করার জন্য ??? পরিবারে এর আগে হওয়া অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলির কারণ কি ?? তার সাথে কি প্রিয়া দাশের মৃত্যুর কোনও যোগসূত্র আছে ? ভয়াবহ অতীত কি কোন বিশেষ উপায়ে বর্তমানে ফিরে আসতে পারে ?? প্রিয়ার কেস হত্যা নাকি সুইসাইড? বরুণ কেন নিজে তদন্ত করতে বা বিশেষ মাথা খাটাতে চায়নি, সব দায়িত্ব দীপশিখাকে দিয়েছে ? সব প্রশ্নের উত্তর আছে এই উপন্যাসের শেষে ।
উপন্যাসটা মুলত মেডিকেল থ্রিলার , কিন্তু এর সাথে এটিকে আমি কিছুটা ঐতিহাসিক এবং সাথে সাইকো থ্রিলারও বলবো । আমি ইন্দ্রনীল সান্যালের লেখা যতই পড়ি ততই মুগ্ধ হই । অন্য উপন্যাসের মত এই উপন্যাসেও প্রেম আছে , তবে সেও এক অন্য মাত্রার । এই উপন্যাসেও মেডিকেল জগতের অন্য রকম কালো রহস্যময় দিক ফুটে উঠেছে । যে কোনো যুদ্ধের পশ্চাতে ডাক্তারদের কি কি ধরনের কাজ থাকতে পারে?? মহাভারত পড়ার সময়ে দেখেছিলাম, দেবতাদের বৈদ্য অশ্বিনীকুমার দ্বয়ের পুত্র নকুল ও সহদেব কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিরতির সময়ে কৌরব পক্ষের শত্রু শিবিরে সেনাদের ওষুধ পত্র দিতেন যাতে তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন, অন্বিচ্ছা সত্তেও দিতেন , কারণ তারা অশ্বিনী কুমারের সন্তান যার ধর্মই ছিলো আর্তের সুশ্রুষা করা । এই যুগে বাস্তব যুদ্ধের সময়ে কোনও কোনও ডাক্তার কি করেন ?? কোন ধরনের ওষুধ যুদ্ধবন্দীদের দেয়া হয়ে থাকে ?? কি করা হয় তাদের সাথে রিসার্চের নামে ?? উপন্যাসটার কিছু কিছু জায়গা পড়ার সময়ে খুবই শিউরে উঠতে হয় । উপন্যাসে এসেছে বায়ো-এথিক্সের কথা , মানবাধিকারের কথা , কিন্তু স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে তাদের বুড়ো আঙ্গুল দেখায় সেটার কথাও লেখক দেখিয়েছেন নির্মম সত্যের মতো। সেই বুড়ো আঙ্গুলের জায়গাতেই দাড়িয়ে থাকে কিছু মেগালো ম্যানিয়াক মানুষ। সে নিজের ভুল দেখতে পারেনা , বরং নিজের স্বার্থ বা উদ্দেশ্য কে সঠিক বা মহৎ ভেবে কাজ চালিয়ে যায় , দেশ থেকে দেশান্তরে , যুগ থেকে যুগান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই কাজ সফল করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সব শেষে লেখকের ডাক্তারি সত্তা হয়তো একটা প্রশ্ন করিয়েছেন তার চরিত্র মড়াকাটা ডাক্তার তথা গোয়েন্দার মাধ্যমে -
""মানুষ একে অপরকে কী ঘেন্না করে তাইনা?? এক ধর্ম অন্য ধর্ম কে , এক জাত অন্য জাতকে , এক ভাষা অন্য ভাষাকে , এত ঘৃণা আসে কোথা থেকে ?? অত্যাচারের পদ্ধতি নিয়ে এরকম ভাবে দিনের পর দিন না ভেবে বরং কিভাবে ভালবাসা যায় , এই নিয়ে রিসার্চ হতো , কতই না ভাল হতো।""
একজন মড়াকাটা ডাক্তার, তার জীবন কেমন ?? একজন দেহ ব্যবচ্ছেদকারী যখন একজন মন ব্যবচ্ছেদকারীর পোস্ট মর্টেম করেন এবং ভিডিওতে বিষয়টার বিবরণী দেন , কত অদ্ভুত লাগে । ময়না তদন্তের খুঁটিনাটি বিষয় সেই পর্বে আছে ।
সব শেষে বলবো এক দুর্দান্ত প্লটের থ্রিলার পড়লাম । কেন যে লেখক এই সময়ে বাংলার সেরা মেডিকেল থ্রিলার লেখক ও অন্যতম সেরা রহস্য সাহিত্যিক , সেটা এই উপন্যাস পড়লে বোঝা যায় । ওনার মগজকে কুর্নিশ । 🙏
ময়না তদন্ত Indranil Sanyal তিনটি মেডিকেল থ্রিলার আনন্দ পাবলিশার্স
ডঃ সান্যালের আরেকটি রুদ্ধশ্বাস মেডিক্যাল থ্রিলার। দীপশিখা ও বরুণের যৌথ বুদ্ধিদীপ্ত নিরীক্ষণ এবং অবশ্যই পর্যবেক্ষণের জোড়ালো ধাক্কায় সমাধান হয় এক জটিল ও বিচিত্র খুনের। রহস্য প্রেমীদের অবশ্যই পড়ার মত বই।