তথাগত বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের পর শতাধিক বর্ষ অতিবাহিত। মগধের সিংহাসনে নন্দবংশের ইন্দ্রিয়াসক্ত অযোগ্য রাজা ধননন্দ। ধননন্দের ভ্রষ্ট জ্ঞানসভায় অপমানিত হয়েছিলেন এক মেধাবী ব্রাহ্মণ। সেই জ্ঞানসভাতেই এক ভীষণ সংকল্প নিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ— নন্দবংশের সমূলে উচ্ছেদ। তাঁর প্রয়াসে অতঃপর আর্যাবর্তের রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন জনৈক নামগোত্রহীন যুবক, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।
মরুনির্ঝর। এই রাগিণী সুরে সুরে বহন করছে মানুষের চিরন্তন বিরহবিলাপ। সুররাজ্যের সেই অমরাবতী নির্মাণ হয়েছিল মরুধর ও নির্ঝরিণী নামে দুই মানুষ-মানুষীর মিলনে। কীভাবে এই রাগিণী জড়িয়ে গেল মহাকালখণ্ডের মহাসন্ধিক্ষণে নন্দ-মৌর্য রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনাপ্রবাহে? মহাকালের মন্দিরায় কীভাবে বেজে উঠল হিংসা, বিদ্বেষ, সংঘাত, প্রেম ও সুরের আশ্চর্য সংগীত !
লেখকের লেখনির মধ্যে অদ্ভুত এত মাদকতা আছে, যার ভেতর দিয়ে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম সূদূর অতীতে। ইতিহাসের সত্য অসত্য নির্ণয় করতে বসে এই উপন্যাস পড়া ঠিক নয়। কিন্তু ক্ষণিকের অতীতের মাদকতায় মাঝে তো ডুবে যাওয়া যেতেই পারে।
📜🌿সদ্য পড়ে শেষ করলাম সাহিত্যিক সূর্যনাথ ভট্টাচার্যের লেখা ‘মরুনির্ঝর’ উপন্যাসটি। লেখকের লেখা এর আগে পড়া হয়নি। ‘ মরুনির্ঝর ’ উপন্যাসটির মাধ্যমে আমার প্রথম পরিচয় হলো লেখকের লেখার সাথে!
📜🌿~উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনা~🌿📜 ...................................................................................
🍃📚উপন্যাসের শুরু টা হয় একজন ঐতিহাসিকবিদ যে কিনা একটা পুরানো পুঁথি থেকে তার বন্ধুকে ঘটনাটা শোনায় - ঘটনাটা ঠিক এমন “নন্দবংশের পতনের ব্যাকগ্রাউন্ডে এক সাংগীতিক কাহিনী”! সময়টা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝি.....
🍃📚ঐতিহাসিক নন্দবংশের পতন এবং আচার্য্য চাণক্য বিষ্ণুগুপ্তের নেতৃত্বে মৌর্যধিপতি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থান, এই ঐতিহাসিক কাহিনীর মূল বিষয়...... মগধের নন্দ বংশের রাজা ধননন্দ। ধননন্দের কাছে অপমানিত হয়েছিলো চাণক্য। তার সংকল্পে পরবর্তী সময়ে ধননন্দকে অপসারণ করে রাজা হয়ে ছিলো চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। এই গল্প ইতিহাসে কম বেশি আমরা সবাই পড়েছি.......
🍃📚মরুনির্ঝর-এর পিতা রাজা অমাত্য রাক্ষস নীতিগত ভাবে একজন আদর্শবান মানুষ। সেই পিতার পচ্ছন্দ করা পাত্রকে ত্যাগ করে নিজের পচ্ছন্দের পাত্র ‘অরন্যর সাথে চলে যেতে চেয়েছিল’ কিন্তু অরন্য ফিরিয়ে দিয়েছিলো। কেন অরণ্য ফিরিয়ে দিল মরুনির্ঝর কে? শুধু কি বন্ধুর বাগদত্তা বলে নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোন রহস্য? শেষ পর্যন্ত পিতার পচ্ছন্দ করা পাত্রের সাথেই বিবাহ সম্পন্ন হয় মরুনির্ঝরার। কিন্তু ফুলসজ্জার পর দিনই জামাতা এসে ফিরিয়ে দিয়ে যায় মরুনির্ঝরাকে। কেন তার স্বামী তাকে গ্ৰহণ করতে পারলো না? এই ঘটনার পর পিতার কাছে কন্যা হয়ে ওঠে কলঙ্কিনী। পিতার গৃহে তার স্থান হয়নি...... এর পর মরুনির্ঝরের জীবন কোন খাতে বইতে চলছে.......
🍃📚অন্যদিকে নির্ঝরের বাল্য সখী ধৃতি, ধৃতি ও নির্ঝর একসাথে গুরুকূলে গান শিখবার জন্য ভর্তি হয়। গুরু মরুধর হলেন এক দূল'ভ ব্যাতিক্রমী সুরাকার। ‘গুরু মরুধর’ ও ‘নির্ঝর’ দুজন মিলে মরুনির্ঝর নামে এক সুর তৈরি করে। যেটা শুধুমাত্র নির্ঝর ই গাইতে পারে....... ধৃতির পিতা ‘সহিংস’ তাঁর মৃত্যু ধৃতির পৃথিবীকেও চূর্ণ করে দিয়েছিলো। কিন্তু এতেও ধৃতির ভাগ্য বিপর্যয়ের শেষ হলো না, কুটিল আচার্যজের চক্রান্তে তার ব্যক্তিগত জীবনও এবার বিষময় হতে চলেছে.... ধৃতি কি বেড়িয়ে আসতে পারবে এই চক্রান্ত থেকে? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে!
🍃📚কিছু কিছু বই থাকে যার গল্প গুলো পড়ার পর মনে থেকে যায় এটা তেমনই একটা বই। এই উপন্যাস আমার পড়ে বেশ ভালো লেগেছে। যেসব পাঠক ইতিহাস সম্পর্কিত গল্প পড়তে পছন্দ করে তাদের জন্য এটা একটা দারুন বই হতে চলেছে। পুরো উপন্যাস জুড়ে লেখক প্রত্যেকটি চরিত্রকে সুনিপুণ হাতে বিশ্লেষণ করেছেন। এটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আর সুপ্রকাশ এর বই নিয়ে তো কোনো কথা হবে না। বইয়ের বাঁধাই আর Page Quality তো অসাধারণ। আর এই বইয়ের প্রচ্ছদটাও ভীষণ সুন্দর।
ঐতিহাসিক উপন্যাস বা গল্প বলতে পড়েছিলাম শরদিন্দু বাবুর কিছু ছোট গল্প ও উপন্যাস। কিছুদিন আগে হটাৎ ই কিছু বই আমাকে উপহার হিসেবে পাঠান সুপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে। তার মধ্যে থেকে মরুনির্ঝর বইটি প্রথম পড়া শুরু করি। এই বইটি প্রথম শুরু করার কারণ অবশ্যই বইটির প্রচ্ছদ, অসাধারণ আকর্ষণীয় একটি প্রচ্ছদ সৌজন্যে সৌজন্য চক্রবর্তী। লেখকের এর আগে তিনটি ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে, আমার পড়া এটিই লেখকের প্রথম উপন্যাস। আলাদা করে এই উপন্যাসটি আগের গুলোর সঙ্গে জড়িত নয়, আলাদা করে বইটি পড়েছি কোনো অসুবিধা হয়নি।
পটভূমি -
তথাগত বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের পর শতাধিক বর্ষ অতিবাহিত। মগধের সিংহাসনে নন্দবংশের ইন্দ্রিয়াসক্ত অযোগ্য রাজা ধননন্দ। ধননন্দের ভ্রষ্ট জ্ঞানসভায় অপমানিত হয়েছিলেন এক মেধাবী ব্রাহ্মণ। সেই জ্ঞানসভাতেই এক ভীষণ সংকল্প নিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ— নন্দবংশের সমূলে উচ্ছেদ। তাঁর প্রয়াসে অতঃপর আর্যাবর্তের রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন জনৈক নামগোত্রহীন যুবক, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। লেখকের কথা অনুযায়ী "বর্তমান উপন্যাসটি সংস্কৃত নাটক "মুদ্রারাক্ষস" আধারিত। আধারিত বা অনুপ্রাণিত হলেও এই উপন্যাস এই উপন্যাস মুদ্রারাক্ষসের নবরূপায়ণ প্রয়াস নয়। নাটকের সময়কাল , কয়েকটি চরিত্র ও কিছু ঘটনাকে সুবিধামতো ব্যবহার করে এক সম্পুর্ণ পৃথক কাহিনী নির্মাণ করা হয়েছে।" মরুনির্ঝর। এই রাগিণী সুরে সুরে বহন করছে মানুষের চিরন্তন বিরহবিলাপ। সুররাজ্যের সেই অমরাবতী নির্মাণ হয়েছিল মরুধর ও নির্ঝরিণী নামে দুই মানুষ-মানুষীর মিলনে। কীভাবে এই রাগিণী জড়িয়ে গেল মহাকালখণ্ডের মহাসন্ধিক্ষণে নন্দ-মৌর্য রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনাপ্রবাহে? মহাকালের মন্দিরায় কীভাবে বেজে উঠল হিংসা, বিদ্বেষ, সংঘাত, প্রেম ও সুরের আশ্চর্য সংগীত !
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
কিছু কিছু উপন্যাস পড়ার পরে মনে হয় গল্পের রেশটা থেকে গিয়েছে। এটিও আমার মনে হয়েছে ঠিক সেই স্তরের একটি উপন্যাস। ঘটনার সময়কাল এবং কিছু চরিত্র এক রেখে লেখক যে গল্পটি বলতে চেয়েছেন, সেটি অনবদ্য, যেকোনো থ্রিলার গল্পের থেকে কোনো অংশে কম নয়। ঐতিহাসিক উপন্যাস মানেই রাজনীতি, কুচক্রী, ক্ষমতার হস্তান্তর, রাজনৈতিক পালাবদল, হিংসা, দ্বেষ, সংঘাত, প্রেম, পরকীয়া এইসব থাকবেই, এইগুলোকে সাজিয়ে নিয়েই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এর সিংহাসন দখল, ধননন্দ এর মৃত্যু, ও তার মৃত্যুর বদলা নিতে মহামাত্য রাক্ষস এর একের পর এক নৃপতি হত্যার প্রচেষ্টা, আর বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য এর বুদ্ধি, দূরদৃষ্টিতা সত্যিই এই গল্প পড়তে গিয়ে দারুন উপভোগ করেছি। সঙ্গে মরুনির্ঝর রাগিণীর উৎপত্তি, কেমনভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম এই সুর এই রাগ স্থানান্তর করেছে আর মিশে গেছে এক বিশাল রাজনৈতিক পালাবদলের অংশ হিসেবে তা আমি দারুন উপভোগ করেছি লেখকের লেখনীর মধ্যে দিয়ে। এরকম জমজমাট ঐতিহাসিক উপন্যাস বেশ উপভোগ করেছি,আমার মতো যে কোনো ইতিহাস প্রেমী পাঠকের জন্য' মরু নির্ঝর ' একটি লোভনীয় বই। আর সবাইকে অনুরোধ করবো একবার হলেও বইটি পরে দেখুন নিরাশ হবেন না। আমার এখন এই লেখকের দুটি ঐতিহাসিক উপন্যাস জোগাড় করতে হবে তারপর পড়ে সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।