প্যাস্টিশ লিখতে হলে, মূল লেখকের অরিজিনাল স্টাইলটি মেনে চলতেই হবে। তবে ফ্যান ফিকশন লিখতে গেলে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। একটি সফল প্যাস্টিশ লেখার জন্য গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরী। পাঠক হয়ে যখন তরতর করে বইটি পড়ে চলেছেন তখন এক কথা, আর যখন লেখকের জুতোয় পা গলিয়ে তাঁকে যথাযথ ভাবে অনুকরণ করে লেখার চেষ্টা করছেন সে আরেক কথা। কাজটি বলতে গেলে অপরিসীম কঠিনও। বাঙালি গোয়েন্দাদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন ফেলুদা। ফেলুদাকে নিয়ে প্যাস্টিশ নেই, তবে ফ্যান ফিকশন আছে বেশ কিছু। ফেলুদার প্রথম গল্পের পঞ্চাশ বছপূর্তি উপলক্ষে ‘টগবগ’ পত্রিকার উৎসব সংখ্যার (২০১৬) জন্য প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লিখেছিলেন ফেলুদা প্যাস্টিশ ‘রাজধানীতে তুলকালাম’। যা প্যাস্টিশ হিসেবে পাঠকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। রাজধানীতে তুলকালামের পর এবার সম্পূর্ণ নতুন আরেকটি ফেলুদা প্যাস্টিশ ‘টেরাকোটা টালমাটাল’।
প্যাস্টিশ নামক এই খটোমটো শব্দটার তর্জমা করলে মোটামুটি এমন দাঁড়ায়, গভীর গবেষণা পরবর্তী ফ্যানফিকশন যেখানে মূল লেখকের লেখার প্রকৃত ধাঁচ বা স্টাইল ফলো করা হয়। ‘টেরাকোটা টালমাটাল’ সত্যজিত রায়ের অমর সৃষ্টি ফেলুদাকে নিয়ে একটা পুনর্জীবন দেয়ার প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। এমন না যে বাংলায় প্যাস্টিশ প্রথম লেখা হচ্ছে। খোদ সত্যজিৎ রায়েরই আরেক কালজয়ী চরিত্র প্রোফেসর শঙ্কুকে নিয়ে সুদীপ দেব এর আগে লিখেছেন ‘স্বমহিমায় শঙ্কু’.. বইটিতে ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা আর ইনটেলেকট্রন এই অসমাপ্ত গল্প দুটিকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন সুদীপ দেব। তারও আগে ব্যোমকেশের অসমাপ্ত কাহিনী ‘বিশুপাল বধ’ কে পূর্ণতা দিয়েছিলেন নারায়ণ সান্যাল। ফ্যান ফিকশন বা প্যাস্টিশের ক্ষেত্রে যে বিষয়টার অভাব থেকেই যায়, সেটা হলো মূল লেখকের পার্সপেক্টিভ। তার চরিত্রকে যে লেন্সে তিনি দেখেন,সেটা হাজার গবেষণা করার পরও খুব কম ক্ষেত্রেই ধরতে পারা সম্ভব পর হয়েছে। এজন্য এসব ক্ষেত্রে কাহিনীর গভীরতা খুব একটা থাকে না। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় ফ্রেডা ওয়ারিংটনের Dracula The Undead এর কথা। এতো দুর্দান্ত গভীর প্যাস্টিশ আমি ক্ষুদ্র পাঠক জীবনে খুব কমই পড়েছি।
‘টেরাকোটা টালমাটাল’ নামের এই প্যাস্টিশে প্রবীরেন্দ্র চক্রবর্তী সত্যি বলতে গবেষণার অভাব রাখেন নি। কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়িয়েছে কাহিনীর গভীরতা সৃষ্টিতে। গল্পটা এতো টাইট আর ফাস্ট পেসড যে,বলতে গেলে ব্রিদিং স্পেস নাই সেই অর্থে। ৭২ পৃষ্ঠার এই ফেলুদা অ্যাডভেঞ্চার নভেলায়(নাকি বড় গল্প) বেশ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিটেইলিং করেছেন। টিপিক্যাল ফেলুদা কাহিনীর প্রায় সব এলিমেন্টই এখানে উপস্থিত। ফ্রম সিধু জ্যাঠা টু গড়পারের কবি বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কবিতা। স্রেফ ছুটি কাটাবার উদ্দেশ্যে গিরিডিতে বেড়াতে যায় থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। আর স্বভাবতই নির্জলা ছুটি কাটানো,অখণ্ড অবসরের দেখা মেলে না। তারা জড়িয়ে পড়ে এক ব্ল্যাকমেইলিং কাম মার্ডার কেসের সাথে। কাহিনী মোটামুটি এইরকম।কিন্তু তার শার্পনেস নেই। প্রিয় চরিত্রগুলোকে নস্টালজিক হয়ে পড়তে গিয়ে বেশ হতাশই হলাম বলা যায়।
অনর্থক কথাবার্তা: আমার কাছে ব্যোমকেশ কাহিনীকে ম্যাচিউরড মনে হয় বেশি।ফেলুদাকে একদম সাধু সাধু দেখায় রায় সাহেবের কলমে। অনেক সেন্সরিং! না তো এত্তো হ্যান্ডসাম, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের কোনো ফিমেল ইন্টারেস্ট নাই। কাউরে পছন্দ হলে তোপসেকেও বলতে পারতো না মেবি,লালমোহনবাবুকে বলতো। মাঝে মাঝে কেস সলভ করতে গেলে সাইকো টাইপের মেয়েরা কামড়ে টামড়ে দিতো। এই সবকিছুই কিশোর উপযোগী কাহিনী বলে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে ফিনাইল দিয়ে।
একেবারে ভালোও নয়,আবার ফেলে দেয়ার মতো মতো ও নয়। এক কাপ কফি বা চা পান করতে করতে আরামসে শেষ করার মতো ছোট্ট উপন্যাসিকা ‘টেরাকোটা টালমাটাল’। অনেকদিন পর ফেলুদা,তোপসে আর লালমোহন বাবুর সাথে দেখা হয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। হাজারহোক কৈশোরের আবেগ বলে কথা!
সত্যজিৎ রায়ের নামের সমার্থক যেমন ফেলুদা, তেমনি ফেলুদা নামের সমার্থক রহস্য সমাধান। ফেলুদা, তোপসে, জটায়ু জুটি কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে মানেই কোনো রহস্য শুরশুর করে তাদের সামনে হাজির হচ্ছে। এবারেও তাই। গিরিডিতে ফেলুদা বাহিনী যাচ্ছেন তার বন্ধুর বাড়ি ছুটি কাটাতে। গিরিডির পথঘাট আর সেখানকার জঙ্গল ঘুরে দেখবেন। ফেলুদার বন্ধু ভরদ্বাজবাবু নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তার জ্যাঠা সুধাংশুবাবু আতিথেয়তা করবেন। গিরিডি ভ্রমণে এবার তারা জোড়বাংলার মন্দির কিংবা টেরাকোটার মন্দির দর্শনসহ আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখবেন। আর ঘুরতে ঘুরতেই দৃশ্যপটে আসে ডেভিড, রণবীর, হিতেশরা। টেরাকোটার মন্দির ঘিরে রহস্যের ঘনঘটা, অনেক প্রশ্ন কিন্তু সীমিত তার উত্তর। এদিকে আবার চিঠিতে করে কে যেন হুমকি দিয়েছে সুধাংশুবাবুকে। একদিকে রহস্য সমাধান করতে গিয়ে আরেক রহস্য হাতছানি দেয়। জটায়ু কিছু হাইপোথিসিস দাড় করিয়েছেন। কিন্তু ফেলুদার মতে, এই রহস্যে ফেলুদার নিজের অবস্থান এখনো অন্ধকার। বুঝতে পারছেন না রহস্যের সুতোগুলো কোথায় গিয়ে মিলেছে। ফেলুদা হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন। অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। রহস্যের জালে টেরাকোটা টালমাটাল হয়ে গেলেও ফেলুদা খেই হারাবেন না। এই কেসেরও শেষ দেখেই ছাড়বেন।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফেলুদা, তোপসে, জটায়ুর নতুন এক রহস্য সমাধানের কাহিনি সত্যজিতীয় ঢঙে লিখেছেন প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পড়া শুরু করলে মনেই হবেনা এটা সত্যজিতের নয়, প্রবীরেন্দ্রবাবুর ফেলুদা। এখানেও নতুন এক রহস্য সমাধানের জন্য ফেলুদা তার মগজাস্ত্রের খেল দেখিয়েছেন। পড়ার শুরুর দিকে যখন রহস্যের জাল ছড়াতে শুরু করে তখন মনে হতে থাকে এ বুঝি আসল খলনায়ক। আবার কয়েক পেইজ আগালেই মত বদলে যায়। এভাবে মতের ওদল বদল হতে হতে শেষে গিয়ে পুরোই হতবাক। কাকে ছেড়ে কাকে খলনায়ক হিসেবে ধরবো সে চিন্তা করতে করতে মঞ্চে এতসব নাটক হয়ে যায় যে পড়া শেষে মুগ্ধ হতেই হয়। ফেলুদা, তোপসে, জটায়ুর চরিত্র লেখক দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজধানীতে তুলকালাম এর তুলনায় আমার কাছে টেরাকোটা টালমাটাল বেশি পরিপূর্ণ মনে হয়েছে। এখানে রহস্য অনেক বেশি ছিল। আর অনুমান করতেও অনেক ভাবতে হয়েছে। এজন্য পড়তেও ভালো লেগেছে। ফেলুদা প্যাস্টিশের এক মলাটে দুই রহস্যের বইটি আমার মতে একবার পড়াই যায় এবং নিজের সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।
প্যাস্টিস বলতে যে কিছু আছে সেটা এই বইটা কেনার আগে জানতামই না আমি। পড়ার পরে বুঝতে পারলাম কি আসলে। ফ্যান ফিকশনই তবে পুরোপুরি লেখকের লেখার স্টাইল কপি করে। এভাবে আসলে চরিত্র গুলোর অরিজিনাল ফ্লেভারটা থেকে যায় কিছুটা হলেও। ফেলুদা মানেই একটা আবেগ। তাই পড়তে ভালো লেগেছে। যদিও অনেক ফাস্ট পেসড। পড়তে পড়তেই মনে হয় শেষ হয়ে গেলো। যদিও আমি ফ্যান ফিকশনের ফ্যান না তবে এটা পড়ে মনে হলো এরম প্যাস্টিস হলে মাঝেসাঝে পড়তে মন্দ লাগবে না।
প্যাস্টিশ হিসেবে লেখক সফল হয়েছেন বলা যায়। সত্যজিত রায়ের সৃষ্ট চরিত্র ফেলুদা, তোপসে আর লালমোহন বাবুকে আবার নতুন করে পেয়ে ভালো লেগেছে। তবে বইয়ের ব্যপ্তি আরেকটু হলে ভালো লাগতো।
প্রথমেই বলি প্যাস্টিশ অর্থ যারা জানেন না। বই এ সম্পর্কে বলা আছে তাই আমি যা বুঝলাম, আমরা যখন কোনো বিখ্যাত লেখা(গল্প/উপন্যাস যেকোনো কিছু) পড়ি স্বাভাবিক ভাবেই ভক্তরা কাল্পনিক অনেক ফ্যান ফিকশন লিখে ফেলেন। দুটোর মধ্যে পার্থক্য যে, ফ্যান ফিকশন স্টাইল বা সবকিছু ফলো না করলেও চলে আপনার মনমতো। মূলত প্যাস্টিশ লিখতে হলে, মূল লেখকের অরিজিনাল স্টাইল মেনে চলতে হয়। এর জন্য অনেক গবেষণার প্রয়োজন।
ভূমিকা- লালমোহনবাবু উত্তেজনার চোটে আমার কনুইটা খামচে ধরলেন, “বলেন কী মশাই! জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা মন্দির! এরকম থ্রিলিং ব্যাপার মিস করা যায় নাকি! বাঘটাঘ না থাকলেই হলো।” (মনে হচ্ছে এর ভূমিকা আমি বানালে স্পয়লার না আবার দিয়ে দিই৷ বই এর ভূমিকা টাই দেয়া হোক, আমি আমার অনূভুতি বলি বরং)
আমার কাছে প্রথম বই (রাজধানীতে তুলকালাম) থেকে এই বইটা ভালো লেগেছে। কারণ, এটাতে গভীরতা ছিল, স্টোরি টা একটু বড় লাগল। আর মনে হচ্ছিলো কাহিনি শেষ করার জন্য এত তাড়াহুড়ো নেই। এটাতে ভালোভাবে ফিল পাচ্ছিলাম ফেলুদার আর স্টোরিও তেমন থ্রিলটা দিচ্ছিল। হুটহাট কি হতে পারে তা আগে থেকে ক্যাচ করতে পারছিলাম না, তবে হ্যাঁ ভাবতে ভাবতে আন্দাজ তো হয়ই। ঠিক যেমন সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা পড়লে হয় তেমনই ভালোলাগা কাজ করছিলো পড়তে পড়তে। কিছু ইতিহাসের রেফারেন্স জুড়ে জুড়ে, একটার পর একটা চরিত্রে আবির্ভাবের সাথে রহস্য যেভাবে ঘনীভূত হত, তেমন ফিল পেলাম। কিছু অসামঞ্জস্য লেগেছে, তারপর ও ভালো লেগেছে বেশি। লেখক এর মুনশিয়ানা বলতে হবে তিনি যেন এই তিনজনকে তার গল্পে এনে উপস্থিত করতে পেরেছেন আমি এজন্য ধন্যবাদ দিবো।
আমার মনে আছে, যখন আমি অনেক বছর আগে প্রথম ফেলুদা সমগ্র পড়ে শেষ করি, আমি কেঁদেছিলাম। ফেলুদাকে আমি মনের গভীরে ধারণ করে ফেলাতে হয়তো খারাপ লেগেছিলো বেশি, শেষ হয়ে যাওয়ার আফসোসে আবেগাপ্লুত ছিলাম। ভেবেছি লেখক কেনো আর লিখে গেল না৷ অসমাপ্ত গল্প গুলো কেনো শেষ করে গেলো না। ফেলুদাকে আর নতুন করে কোথাও খুঁজে পাবো না, ভেবেই খারাপ লাগতো। খুঁজতে হলে পুরোনো লেখায় ঘুরেফিরে খোঁজা লাগবে। খুব কম বই তেমন রিপিট করে পড়ি নি, ফেলুদা যতবার রিপিট করে পড়তাম। যাইহোক, এখন আর সেই আবেগ নাই৷ কিন্তু তবুও অনেক দিন পরে একটা পরিচিত আনন্দ পেলাম, যেনো ফেলুদা এসে ঘুরে গেলো।
গিরিডি আর উশ্রী নদীর ধার বলতে এতদিন শঙ্কুকে চিনতাম, এবার সেখানে ফেলুদা এন্ড কোম্পানির পদার্পণ হলো! 'রাজধানীতে তুলকালাম'-এর পর আরেকটি ফেলুদা প্যাস্টিশ, এবং এখানে লেখা আরও পরিণত। সত্যজিতের লেখার স্টাইল, মায় খুঁটিনাটি অবধি গবেষণা করে লেখক এই লেখা লিখেছেন বোঝাই যাচ্ছে। সত্যজিৎ যেমন ফেলুদার মুখ দিয়ে তোপসেকে (আর আমাদেরকেও) অনেক ছোটখাটো তথ্য (trivia) দিতেন, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি, এটা বেশ ভালো লাগলো। রহস্যের প্লট এখানে অপেক্ষাকৃত গভীর, "কে সত্য বলছে, কে মিথ্যা, আর কে-ই বা সত্য গোপন করছে" তা বোঝার জন্য মগজাস্ত্রই ভরসা! তবে শেষ অবধি পাকুড় গাছের আড়ালে কে থাকতো তার রহস্যভেদ হলো না! মোটের ওপর সব বয়সের জন্য উপযোগী বেশ ভালো ফেলুদা নভেলা (অথবা বড়গল্প), সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন।
ভবিষ্যতে লেখকের থেকে এরকম আরও লেখা উপহার পাওয়ার অপেক্ষায়...
আমার কাছে মোটামুটি ভালো লাগলো। প্যাস্টিশ লিখতে হলে, মূল লেখকের অরিজিনাল স্টাইলটি মেনে চলতেই হবে। তবে ফ্যান ফিকশন লিখতে গেলে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। একটি সফল প্যাস্টিশ লেখার জন্য গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরী। পাঠক হয়ে যখন তরতর করে বইটি পড়ে চলেছেন তখন এক কথা, আর যখন লেখকের জুতোয় পা গলিয়ে তাঁকে যথাযথ ভাবে অনুকরণ করে লেখার চেষ্টা করছেন সে আরেক কথা। কাজটি বলতে গেলে অপরিসীম কঠিনও।🌷
রাজধানীতে তুলকালাম প্যাস্টিসটার চেয়ে টেরাকোটা টালমাটাল এটা বেশ ভালো লেগেছে আমার। তবে দুটোই উপভোগ্য ছিলো। অনেকদিন পর সত্যজিৎ রায়ের লেখার স্বাদ আস্বাদন করতে পেরেছি।