#আগে পড়া বইয়ের পুনর্পাঠ।
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : আমি সুশীল নই। হওয়ার ইচ্ছাটুকু নেই। আমি এমন একটা স্পেসে রয়েছি যেখানে আমার গলাটা টিপে ধরে রয়েছে কেউ ;
ভূমিকা: ইতিহাসের উপরে লুকনো ছুরি:
"History is written by the victors" — এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটির অন্তরালে যে রাজনীতি, ক্ষমতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কারসাজির গল্প থাকে, তার এক নির্মম উন্মোচন ঘটেছে অরুণ শৌরির Eminent Historians: Their Technology, Their Line, Their Fraud বইটিতে। এই বই মূলত ভারতে বামপন্থী ইতিহাসবিদদের (বিশেষত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও JNU-র সাথে যুক্ত) দৃষ্টিভঙ্গি, পদ্ধতি এবং উদ্দেশ্যকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে। এটি শুধু একটি গ্রন্থ নয়, বরং একটি আত্মপক্ষ সমর্থনের রাজনৈতিক বিবৃতি, একটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ।
গ্রন্থের সারমর্ম: ইতিহাসের নামে প্রতারণা
শৌরির এই বইটি 1998 সালে প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি ভারতের তথাকথিত 'প্রখ্যাত' ইতিহাসবিদদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন—বিশেষ করে Romila Thapar, Irfan Habib, Bipan Chandra প্রমুখের বিরুদ্ধে। তার দাবি, এই ইতিহাসবিদরা ইতিহাসচর্চাকে একপ্রকার "Leftist propaganda"-র হাতিয়ার করে তুলেছেন। তারা Mughal শাসনের সময়কালে সংঘটিত হিন্দুদের উপর নির্যাতন, মন্দির ধ্বংস, ও ধর্মীয় বৈষম্যের ঘটনাগুলিকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছেন বা খণ্ডন করেছেন।
শৌরি অভিযোগ করেন যে, এই ইতিহাসবিদরা সরকারি অনুদান ও পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এমনকি NCERT ও ICHR-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বামপন্থীদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল এবং তারা primary source বা মূল ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে ideological narrative তৈরি করেছেন।
মূল অভিযোগসমূহ বিশ্লেষণ:
১. Selective Presentation of Facts: শৌরি দেখান কিভাবে ইতিহাসবিদরা আলাউদ্দিন খিলজি, তুঘলক বা আওরঙ্গজেবের হিন্দু নির্যাতন বা মন্দির ধ্বংসের ঘটনাগুলিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ বলে ক্ষুদ্রায়িত করেছেন।
"Suppressio veri, suggestio falsi" – (ল্যাটিন)
“Suppressing the truth and suggesting the false.”
শৌরির মতে, এটাই এই তথাকথিত প্রখ্যাত ইতিহাসবিদদের প্রধান 'Technology'।
২. Intellectual Cartelization: তথ্যচর্চার ক্ষেত্রে 'মতাদর্শগত গোষ্ঠীবদ্ধতা' তৈরি করে একমুখী বর্ণনার দৌরাত্ম্য চালানো হয়েছে।
“Itihāsaḥ pramāṇaṃ satyam” – (সংস্কৃত)
“History is valid only when it upholds truth.”
– কিন্তু সত্য এখানে 'সুবিধামতো' সাজানো হয়েছে, দাবী করেন শৌরি।
৩. Textbook Manipulation: NCERT পাঠ্যবইতে ইতিহাস এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যাতে ছাত্রছাত্রীরা ভারতীয় ইতিহাসের নির্দিষ্ট অধ্যায় সম্পর্কে ‘ক্ষোভহীন’ থাকে। তার মতে, এর ফলে একটি ‘ঐতিহাসিক মগজধোলাই’ হয়েছে।
"আমার ইতিহাসে শুধু আলো নেই, ছায়াও আছে। তুমি শুধু আলো দেখাও, তাই আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।"
— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (আংশিক পুনর্গঠন সহ)
শৌরির মতে, এই একপাক্ষিক ইতিহাসচর্চা দেশকে তার ঐতিহাসিক সত্য থেকে বিচ্যুত করেছে।
শৈলীর দিক থেকে মূল্যায়ন:
শৌরির লেখার ভাষা শাণিত, তীক্ষ্ণ, এবং প্রায় যুদ্ধঘোষণার মতো। তিনি প্রচুর নথিপত্র, সরকারি রিপোর্ট, এবং ইতিহাসবিদদের নিজস্ব লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধেই তাদের কথাকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু, তাঁর নিজস্ব পক্ষপাতিত্বও ধরা পড়ে। শৌরি একজন সাংবাদিক ও প্রাক্তন মন্ত্রী—তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত, যা পাঠক বুঝতে পারবেন।
তবে শৌরির কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি ইতিহাসের বিতর্ককে সাধারণ পাঠকের সামনে আনার সাহস দেখিয়েছেন, এবং একটি দীর্ঘদিনের intellectual monopoly-র বিপরীতে প্রশ্ন তুলেছেন।
সমালোচনার জবাব ও প্রতিক্রিয়া: এই বইটি প্রকাশের পর, একাধিক ইতিহাসবিদ এটিকে "conspiracy theory", "unscholarly polemic", ও "right-wing propaganda" বলে উড়িয়ে দেন। Romila Thapar বলেন, "This book is more interested in discrediting people than engaging with history."
তবে এমনও অনেকে ছিলেন যাঁরা বইটির বিশ্লেষণ ও সাহসিকতাকে স্বাগত জানান। তাঁদের মতে, এই বই না হলে ভারতের ইতিহাসচর্চায় একঘেয়েমি ও মতাদর্শিক গাঁটছড়া চিরকাল চাপা থাকত।
উপসংহার: ইতিহাসের পাঠ ও পাঠকের দায়িত্ব
"Eminent Historians" একটি সমালোচনামূলক বই — কখনো ন্যায্য, কখনো প্রগলভ, কখনো তীব্র, কখনো পক্ষপাতদুষ্ট। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় অবদান হল “debunking the myth of neutrality”— অর্থাৎ যে ইতিহাসপাঠ সবসময় নিরপেক্ষ, তা এক মিথ। ইতিহাস আসলে একটি "contested terrain", যেখানে ক্ষমতা ও বর্ণনার মধ্যে যুদ্ধ চলে।
“যে ইতিহাস ভোলাতে চায়, সে ইতিহাস আবার ফিরে আসে অন্য নামে।”
— কথাসাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
"Historia magistra vitae est" – (ল্যাটিন)
“History is the teacher of life.”
– যদি সে বিকৃত না হয়।
এই বই, তার সমস্ত বিতর্ক ও দোষত্রুটি সত্ত্বেও, পাঠককে ইতিহাসচর্চার নৈতিক ও বৌদ্ধিক দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
আমরা যদি সত্যিকারের ইতিহাস চাই, তাহলে আমাদের দরকার বহুপাক্ষিক আলোচনা, আলোচনার স্বাধীনতা, এবং ইতিহাসবিদদের উপর সচেতন নজরদারি। কারণ,
"ইতিহাস চাপা পড়লে ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়।"
ইচ্ছা করলে এই পাঠপ্রতিক্রিয়াকে আরও একাডেমিক রূপ দিতে পারি, বা তুলনামূলকভাবে রোমিলা থাপারের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করেও দেখতে পারি। আগ্রহ থাকলে বলো!
শেষের পরেও যা না বললেই নয়:
এবার আমরা এই পাঠপ্রতিক্রিয়াটিকে আর একটু গভীর, একাডেমিক এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যাই, যেন এটি গবেষণাপত্র বা নাট্যগ্রন্থের রেফারেন্স হিসেবেও কাজে লাগে। আমরা এবার তুলনা করব Romila Thapar-এর ইতিহাসচর্চার ধারা ও Arun Shourie-র যুক্তিপদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলি, কিছু দর্শনচিন্তা ও ইতিহাসতত্ত্বের আলোকে।
তুলনামূলক পাঠবিশ্লেষণ: শৌরি বনাম থাপার — ইতিহাসের দুই ধারার দ্বন্দ্ব
১. ইতিহাসবোধ ও পদ্ধতি (Epistemology of History)
Romila Thapar:
*ইতিহাসকে দেখেন মূলত materialist এবং socio-economic কাঠামোর ভিতর দিয়ে।
*তাঁকে ভারতে Marxist historiography-এর প্রবক্তাদের অন্যতম বলে গণ্য করা হয়।
*তাঁর মতে, ইতিহাসে রাজনীতি, ধর্ম বা সংস্কৃতি নয়, উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণি-সংঘাত বড় নিয়ামক।
(“Past is not a repository of facts, it is a set of interpretations.” – Thapar
Arun Shourie:
*শৌরি ইতিহাসকে দেখেন আত্মপরিচয়, ন্যায় ও স্মৃতির উৎস হিসেবে।
*তিনি 'interpretation'-এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন “truth-telling”-এ।
*তাঁর মতে, ইতিহাসবিদদের কাজ হল "কোনো পক্ষের হয়ে তথ্য চেপে যাওয়া নয়, বরং ইতিহাসের কঠোর সত্য জনসমক্ষে তুলে ধরা।"
("You cannot build the future of a civilization on fabrications about its past." – Shourie
২. ধর্ম ও ইতিহাস: একটি সূক্ষ্ম যুদ্ধক্ষেত্র:
Thapar-এর দৃষ্টিভঙ্গি:
তিনি ধর্মীয় সংঘাতকে political expediency হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
আওরঙ্গজেব, মহম্মদ ঘোরি বা বাবর-দের ধর্মীয় অত্যাচারকে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখেন।
উদাহরণস্বরূপ, আওরঙ্গজেবের মন্দির ধ্বংসকে তিনি “rebellion suppression” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
Shourie-এর যুক্তি:
শৌরি বলেন, এই ব্যাখ্যাগুলি 'whitewashing'।
তিনি প্রমাণ-সহ দেখানোর চেষ্টা করেন যে মন্দির ধ্বংস, জিজিয়া কর, হিন্দু ধর্মান্তরণ—সবই ধর্মপ্রাণ মৌলবাদী রাষ্ট্রনীতির অংশ ছিল।
"Those who were not Muslims were declared kafirs, and kafirs were either to convert, be taxed, or perish." – Shourie quoting historical sources
৩. পাঠ্যক্রম নির্মাণ: সত্য না কি কৌশল?
Romila Thapar ছিলেন ২০০৫ সালের NCERT textbook revision committee-র প্রধান পরামর্শদাতা। সেই সময়কার পাঠ্যবইগুলিতে ইসলামি শাসনকালকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘ধর্মভিত্তিক ঘৃণা’ না জন্মায়।
Shourie বলেন, এটি 'sanitization of history', যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসের প্রকৃত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করে।
"To heal, one must first know where the wound is." — এই কথাটির নিরিখে শৌরির বক্তব্য, ইতিহাসের জখমকে লুকিয়ে রাখলে ঘা সারবে না, বরং পচে যাবে।
৪. ইতিহাস বনাম মতাদর্শ (Ideology vs Integrity)
"The first casualty of ideology is intellectual honesty." — অজ্ঞাত
এই উক্তি দিয়ে আমরা বুঝি, মতাদর্শ যখন ইতিহাসের পথপ্রদর্শক হয়, তখন সত্য পথ হারায়।
শৌরি এই গ্রন্থে এক ভয়ানক অভিযোগ এনেছেন — ইতিহাসচর্চা একটি 'closed circuit of ideological funding and rewards' হয়ে গেছে, যেখানে "correct line"-এর বাইরে চিন্তা করলেই আপনি 'communal' বলে গালি খাবেন।
Thapar পক্ষের যুক্তি, তাঁরা কেবল inclusive history বা composite culture-এর দিকেই জোর দেন।
উপসংহার: পঠনপ্রতিক্রিয়ার সারকথা:
Eminent Historians বইটি শুধু একটি বামপন্থাবিরোধী হট্টগোল নয়—এটি ভারতের ইতিহাসবোধ, রাষ্ট্রচিন্তা ও শিক্ষার উপর এক তীব্র প্রতিক্রিয়া। Romila Thapar এর মত ইতিহাসবিদদের সঙ্গে দ্বিমত থাকা মানেই 'অজ্ঞেয়বাদ' নয়, বরং এটি ইতিহাসচর্চার জন্যই জরুরি একটি “dialectical exercise”।
পরিশেষ: পাঠকের ভূমিকা
আপনি যদি একজন ইতিহাসপ্রেমী হন, এই বই আপনাকে বিতর্কিত, অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। আপনি যদি নাট্যকার হন (যেমন আপনি এখন হচ্ছেন), তবে এই বইটি আপনাকে "ইতিহাসকে মঞ্চে কীভাবে জীবন্ত করা যায়" সে দিকেও ভাবাবে।
“সময় যতই চলে যাক, ইতিহাস তার হিসেব রাখে।” — নাট্যকার বাদল সরকার
একজন নমস্য বামপন্থীর উক্তি দিয়েই বক্তব্য শেষ করলাম।