Essays on Lord Shiva in Faith, Belief and Legends.
শিব। কে তিনি ? তিব্বত থেকে নেমে আসা কোনো মানুষ ? নাকি দেবতা ? নাকি স্বয়ং ব্রহ্ম ?
উপমহাদেশে তাঁর প্রসার কোন সুদূর অতীতের সাক্ষ্য বহন করে? সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা হয়ে বৈদিক, পৌরাণিক সমাজ থেকে এই আধুনিক সভ্যতায় কীভাবে বিবর্তিত হয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব?
'নমঃ শিবায়' মূলত তাঁর এই বিবর্তন, প্রতীক অর্থাৎ শিবলিঙ্গ নিয়ে তাত্ত্বিক, দার্শনিক আলোচনা করার সঙ্গেই তাঁর নানা অচেনা-অজানা রূপের কথা পাঠককে জানাবে। বেদ, পুরাণ, শৈবাগম ও মহাকাব্যের পাতায় চলবে তাঁর অনুসন্ধান। লিঙ্গরূপে ভারতমৃত্তিকায় প্রোথিত শৈবধর্মের বিভিন্ন তীর্থস্থল, যেমন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ, পঞ্চভূতস্থল, অষ্টলিঙ্গ, পঞ্চারামক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সে যাত্রাপথের অঙ্গ। আর শেষে বাংলার ইতিহাস, লিখিত ও মৌখিক সাহিত্য, সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি পরতে লুকিয়ে থাকা শিবচেতনার নিবিড় উপলব্ধিতে হবে তার পরিসমাপ্তি। তিনিই যে বাংলার প্রকৃত গণদেবতা এই উপলব্ধি নিয়েই 'শিবোহম' উচ্চারণে শিবে বিলীন হতে আহ্বান জানায় 'নমঃ শিবায়'।
ইনস্টাগ্রাম অ্যালগরিদমের সনাতন পাড়ায় স্ক্রল করতে গিয়ে সেদিন আচমকা একটা মজার রিল খুঁজে পাই। সাবজেক্ট খোদ দেবাদিদেব। ওনার একগুচ্ছ পিন্টারেস্ট ছাঁকা ছবির সাথে বলিউডি শিবগীতের মেল। সাথে আজব ক্যাপশনে লেখা, মেটাল এ এফ! মুক্তমনা, দুঃসাহসিক, হেভি মেটাল জীবনধারণের রূপক স্বরূপ শিবের প্রতিচ্ছবি। আইডিয়াটা সামান্য মিম-ঘেষা ঠিকই, কিন্তু আধুনিক যুগের নিরিখে চমকপ্রদই বটে। নাক কুঁচকে লাভ নেই। 'ইনস্টাভক্তি' ও দেখনদারি নিয়ে আপনার বিরূপতা থাকতেই পারে। সেটা অল্প হলেও ভ্যালিড। তবে, ভাষার অপপ্রয়োগ মার্জনা করে, রিলের তাৎপর্যটা বুঝুন। ভেবে দেখুন একবার।
এই কৃত্রিম, অসহজ পৃথিবীতে, মহাদেব এক আজলা ঠান্ডা জল যেন। নমনীয়তার মাপকাঠি, উনি সকল পাত্রে মিশে যান। বাছবিচারহীন এক উদার বটবৃক্ষ হয়ে বাস করেন মর্ত্যে। আক্ষরিক অর্থে স্বর্গসুখ উপেক্ষা করে থেকে যান ভক্তদের সাথে। লৌকিক আবরণে হয়ে ওঠেন সাধারণের কাছের মানুষ। নিজেতে গ্রহণ করেন চরাচরের সমস্ত গ্লানি। সমস্ত কলুষ। বারংবার। সনাতন জগতে এমন এক ত্রিমাত্রিক ব্যক্তিত্ব সত্যি অপ্রতিম। তাই নয়া প্রজন্ম যে নিজেদের মতো করে ওনাকে জেনারেশনের খাতিরে গড়ে পিটে নেবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী? পুঁথিগত নিয়মাবলীর কণ্টকময় ফাঁদে আটকে থেকে রামগরুর হওয়াতে আনন্দ কোথায়?
এই পালের হাওয়াতেই পুরনোর জৌলুশ। ইতিহাসের চাকায় আদিমের নবরূপ। আর এই নতুনের সন্ধানে এমন একটি গ্রন্থ আদতেই দুর্মূল্য। কথাটা, আমি বইয়ের সমস্ত প্রাথমিক ত্রুটি উপেক্ষা করেই বলতে পারি। নইলে লেখিকার এহেন আসুরিক শ্রমের অবমাননা হয়। অবিচার হয়, এমন নির্মল, সৎ ও নির্ভেজাল চেষ্টার প্রতি। লেবার অফ লাভ শব্দটার সাথে পরিচয় আছে, নিশ্চই? উপমায় ক্লিশের গন্ধ পেলেও, এই বইটা ওই জিনিসেরই চূড়ান্ত উদাহরণ। এক সময়সাপেক্ষ হারকিউলিয়ান প্রচেষ্টা, যা শব্দ প্রকাশনের দুর্ধর্ষ পরিবেশনে দামি হয়েছে আরো। সুবিনয় দাসের প্রচ্ছদ নিয়ে বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠি। সর্বদা এত সুন্দর কাজ করেন শিল্পী। এখানেও উনি অনন্য। যথারীতি।
এই অনেক অনেক তথ্য, রিসার্চ ও পুরাণচর্চার মাঝে অবশ্য বইটিতে আমার ভালো লেগেছে লেখিকার সততা। উনি আজন্ম শিব-ভক্ত। পারিবারিক সূত্রে সদা বিশ্বাসী। এই নিয়ে কোনোরূপ লুকোছাপা করেননি বইয়ের পাতায়। ভালোবেসেই ভালোবাসার ব্যাক্তিটিকে নিয়ে লিখে গিয়েছেন পাতার পর পাতা। এতে বায়াসের ছায়া দেখতে পান কি? পেলে, দোষ দেবো না আমি। কিন্তু এই যে বিশ্বাসী হয়েও দেবদ্বীজ নিয়ে লেখা। এটা সবাই পারে না। পারলেও, ফাইনাল রেজাল্টে পাওয়া যায় অতি-ভক্তি ও নৈর্ব্যক্তিকতার আজব খিচুড়ি। দিনশেষে, সুচারু পন্থায় কমিট করাটা নেহাতই কঠিন কাজ। বইতে লেখিকা একটা সহজ চেষ্টা করেছেন। যা হয়তো বা একেবারে একশোয় একশো পাওয়ার দাবি জানায় না। তবুও বাহবা না দিয়ে যাই কোথায়?
তবে এখানে বলে রাখা ভালো, বইটা শুরুতে আমায় ছেড়ে যেতে চেয়েছে বেশ কয়েকবার। এর জন্য আমি সরাসরি বইয়ের বিন্যাস ও লেখার ধরণকেই দায়ী করব। প্রথম ভাগে, সিন্ধু সভ্যতা, বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, সবেতেই শিবকে খুঁজতে গিয়ে লেখিকার কলম বারংবার আশ্রয় নিয়েছে কেজো, শুষ্ক, টিমটিমে রিসার্চশৈলীর আধারে। যা তথ্যবহুল হলেও, সুপাঠ্য নয়। যার নিয়মমাফিক স্ট্রাকচারে প্রবন্ধশিল্পের সাহিত্যরস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই পর্যায়ের একমাত্র সূর্যকিরণ পৌরাণিক সাহিত্যে শিব! গল্পের ছলে চেনা অচেনা পুরাণ কাহিনীর পুনরাবৃত্তি। যা পরবর্তীতে, মহাদেবের নানাবিধ রূপ অন্বেষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ উল্লেখ্য।
যখনই লিস্ট, ফ্লোচার্ট ও টেবিলের বাইরে বেড়িয়ে, আচার উপাচার সরিয়ে রেখে, স্রেফ মহাদেবের ভিন্ন রূপ ও কীর্তি নিয়ে সরব হয়েছেন লেখিকা, তখনই যেন বইটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আপনি আমাকে ধমক দিতেই পারেন। ভাবতেই পারেন ফালতু নিট-পিকিং করছি। এ তো কোন পাতি মিথলজিকাল রিটেলিং নয় যে স্রেফ আমার মতো অধৈর্য পাঠকের দাবি মেটাতে, গল্পের পর গল্প বলে যাবেন লেখিকা! এ এক অ্যাকাডেমিক প্রাইমার সম। এতে শুকনো তথ্য থাকাটা মোর দ্যান স্বাভাবিক। আমি জানি সেটা। আর জানি বলেই ন্যারেটিভের অসমতা নিয়ে গাঁইগুঁই করছি। এই প্রথম অংশটিতে, গল্প শুনে যতটা আনন্দ পেলাম। তথ্য সংগ্রহ করে তার সিকি ভাগও পেলাম না। এটাই আমার মূল আক্ষেপ।
উপরন্ত লেখিকার লেখনশৈলীতে সামান্য আলগা, গা-ছাড়া ভাব। ইনফরমাল হওয়ার খাতিরে অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে 'আসুন', 'বসুন', 'এবারে চলুন দেখে নি'র ছড়াছড়ি। যা সারাটা বই জুড়ে স্পিডব্রেকারের কাজ করে। বিরক্তি হয় একটু। বরঞ্চ অল্পের মধ্যে লেখিকার কেদারনাথ অ-দর্শন ও অপ্রাপ্তির কাহিনী অনেক বেশি মনখারাপিয়া। অনেক বেশি দামি। এসব অ্যানেকডোট আগ্রহের সাথে বৃষ্টি নামায় মনে। পার্সোনালের ছোঁয়ায়, পড়তে লাগে ভালো। মন বলে, এভাবেই প্রবন্ধের ফাঁকে ফাঁকে, আরাধ্যের সান্নিধ্যে ওনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো গল্পের ছলে লিখতে পারতেন লেখিকা। লিখলে, বইটার ভ্যালু হুহু করে বেড়ে যেত আরো অনেকটা।
যাই হোক। যা নেই, তা নিয়ে শব্দ খরচ করা বৃথা। তবে সুখের বিষয়, বইয়ের পাতায় এই অযাচিত মেঘ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমি পেরেছি। একটু ধৈর্য ধরলেই হয়। একে একে, শিবের অংশাবতার, অষ্টভৈরব বা একাদশ রুদ্রদের সাথে মোলাকাত শেষ করেই পাওয়া যায় ভূগোলের পাঠ। পাওয়া যায়, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, গল্প, তথ্য ও ছবির সমন্বয়ে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ, অষ্টলিঙ্গ ও পঞ্চারামক্ষেত্রদের হদিস। এইতো কদিন আগে কার যেন এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখলাম। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে, নিজ উদ্যোগে বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করার প্রাপ্তিযোগ। ফলাও করে পৃথিবীকে জানানোর মতো কান্ডই বটে। দেখে অল্প ঈর্ষা হল। ভালোও লাগল আবার। যতই হোক, সবাই কি আর আমার মতো তালকানা লেট ব্লুমার? সেই কবে কোন স্কুলে থাকতে কাশী বিশ্বনাথ দর্শন। তারপর আর কোথায় কী?
ওদিকে লেখিকা সচেতন প্রচেষ্টায়, শিব নামের পরিপ্রেক্ষিতে নানারূপ জনশ্রুতি, কুৎসা ও অশ্লীলতা নিয়ে সরব হয়েছেন বইয়ের পাতায়। এরূপ মিথ খণ্ডনে ভক্তিরসের তাড়না থাকলেও, আধুনিক ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিকায় এ জিনিস ভীষণ প্রাসঙ্গিক। কতকটা এহেন বিভ্রান্তি ও রূপায়ণের ভিত্তিতেই লেখিকা সময় নিয়ে আতশকাঁচ ধরেছেন বঙ্গভূমির মাথায়। প্রশ্ন রেখেছেন অনেক প্রকারের। যার মাঝে মাথা উঁচিয়ে জানান দেয় একটাই জিজ্ঞাসা। আধুনিক বাংলার সামাজিক হৃদয়ে শিব কোথায়? মাতৃ পূজনে সিদ্ধ এক জাতির অন্তরে মায়ের ভৈরব রূপে নাহয় আদিযোগীকে পাওয়া গেল, কিন্তু ওনার আঞ্চলিক ও কালীন প্রকারভেদ কেমন? কেমন করে সময়ের প্রকোপে বারংবার বিবর্তিত হলেন বাঙালির মহাদেব? গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের সামুদ্রিক উত্থান ও সনাতন উপাসকদের আধুনিক প্রক্ষেপণের মুখে কেমন করে অস্তিত্ব টিকিয়ে আছেন শিব-শম্ভু?
উত্তরটা চেনা। তবে এই কদিন আগে নতুন করেই পেলাম বলা যায়। সেদিনটা রামনবমী। রবিবার, ছুটির দিন। একটু বেলা করে ঘুমাচ্ছিলাম। কিন্তু ব্যাঘাত ঘটলো প্রচন্ড মাইক ও হর্নের আওয়াজে। মেইন রোডের পাশে বাড়ি হলে যা হয়। উৎসব-পার্বণ হলেই হয়ে গেল। উপরন্ত এটা ২০২৫ সাল। জয় শ্রী রাম ডিজে রিমিক্সের তাণ্ডবে বিছানায় শুয়ে উথালপাথাল করছি। (একটু শ্রুতিমধুর গান চালাতে কি হয়, কে জানে। জগতে কত্ত সুন্দর সুন্দর সব রাম ভজন আছে।)
এমন সময়, হঠাৎ শুনি পাতলা কাঠির ঢাকের আওয়াজ। কতকটা, ক্যারক্যার করে ক্যানিস্টার বাজানোর মতো। ব্যাপার কী? বিছানা ছেড়ে, চ��মা পড়ে, ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ালাম। দেখলাম, বাড়ির সামনে লাল কাপড়ে মোড়া কয়েকজন তরুণ চাঁদা-প্রার্থী। তাদের কাঁধে, রক্তিম পরিধানে আবৃত একটি নৌকো শেপের মূর্তি খন্ড। আমাদের দেলঠাকুর। শিবের আরেক আঞ্চলিক রূপ!
ঠিক এইভাবেই উনি আছেন। থেকে গেছেন সেই প্রাচীনকাল থেকে। উনি রুদ্র। উনি বাংলার প্রতীকী গণদেবতা। সরল, উৎসবমুখী, অন্ত্যজ গ্রামীণ মানুষের আপন বাড়ির লোক। আঞ্চলিক বিশ্বাসের কপালে এক প্রজ্জ্বলিত চিহ্ন স্বরূপ উনি সদা-বিদ্যমান। আর ঠিক এসব নিয়েই বইয়ের অন্তিম তথা শেষ অংশে আদ্যোপান্ত এক রত্নপেটিকা উন্মোচিত করেছেন সুচেতনা সেন কুমার। ইতিহাসে, সাহিত্যে, মন্ত্রে, ধাঁধায়, সিনেমায়, ব্রতকথায় সবেতেই শিবসন্ধান করে, চিনিয়ে দিয়েছেন বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র শিব মন্দিরদের হদিস। আবার, একই সাথে অনেকটা সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, উক্ত উল্লেখিত লৌকিকতার হিসেব। লোকগান, লোকনৃত্য, লোকউৎসব। সবেতেই শিবের পদচিহ্ন দেখিয়ে দিয়েছেন চোখে আঙুল দিয়ে। এ এক মুগ্ধ অভিজ্ঞতা! লেখিকাকে অনেক ধন্যবাদ!
তাই শিবঠাকুর যে আজ জেন জি হনুগিরির কল্যাণে মেটালরুপি কুল ডুড্ হয়ে যাবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী? বছর দুয়েক আগে, নতুন এক হিন্দি সিরিয়ালে দেখেছিলাম, প্রথম এপিসোডে বসে মহাদেবের জটাজুটো ছাড়িয়ে দিচ্ছেন খোদ মা শক্তি! লঘু স্বরে ধমক দিচ্ছেন শিবকে। নিজের একটু যত্ন করেন না কেন, হ্যাঁ? সিরিয়ালটা আঠারোটি এপিসোডের বেশি আমি দেখিনি। বলা যায়, দেখে উঠতে পারিনি। কিন্তু আমার শুরুর ঐ আর্গুমেন্টটা থেকেই যায়। গোঁড়ামির চৌকাঠে আর যাকেই আটকে রাখুন, বাবা ভোলানাথকে ধরতে পারবেন না কিছুতেই। খোদ মহাকালকে কী আর কালের পাশে আটকানো যায়? বলুন দেখি?
এই লেখাটা যতক্ষণে শেষ করছি, হঠাৎ ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে বাবার নম্বর থেকে একটা ভিডিও মেসেজ এসে ঢোকে। খুলে দেখি একটা বাচ্চা ছেলে, আমাদের বাড়ির সামনে, ধরা চুড়ো ফুল ত্রিশূল, সব নিয়ে একেবারে শিব সেজে দিব্যিসে নেচে বেড়াচ্ছে! কখন ওরা দল বেঁধে এসেছিল কে জানে। আমি জানতাম না। কিন্তু ভিডিওটা দেখে ভালো লাগল। ভারী সুন্দর কোয়েন্সিডেন্স। উত্তরবঙ্গের মানুষ তো। শিবের দেশে থাকি। জানি, ওরা এখন আসতেই থাকবে। ওরা এখন পথের নাবিক। সামনেই যে গাজন। ঐ শোনা যায় ব্যোম নিনাদ! শুনতে পাচ্ছেন না?
সম্প্রতি বাংলায় শিবকে নিয়ে বেশ কিছু বই লেখা হয়েছে। তার উদ্দেশ্য বহুবিধ। কেউ ভক্তদের জন্য পৌরাণিক কাহিনিদের সহজ ভাষায় পরিবেশন করতে চেয়েছেন। কেউ চেয়েছেন তাঁর তথাকথিত 'অনার্য' শিকড়টি তুলে ধরে শতাব্দীপ্রাচীন 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নামক খেলাটি চালিয়ে টুকরে-টুকরে গ্যাঙের হাত শক্ত করতে। কিন্তু তথ্য ও তত্ত্ব, ইতিহাস ও ভূগোল— সবদিক মাথায় রেখে শিবকে নিয়ে একটি রেডি রেকনার বাংলায় এযাবৎ লেখা হয়নি। এবার হল।
সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেওয়ার চেষ্টা করছি না। বরং লিখি এই বই কোন-কোন পর্বের মাধ্যমে আমাদের শিবদর্শন করিয়েছে। সেগুলো হল~ ১. প্রাগিতিহাস— সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা; ২. বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও আগমে শিবানুসন্ধান; ৩. শিবলিঙ্গের স্বরূপ-সন্ধানে; ৪. মহাকাব্যে মহাদেব; ৫. নানারূপে নীললোহিত— শিবের নানা নাম ও পরিচয়; ৬. মিথের মায়াজালে মহেশ— শিবকে নিয়ে প্রচলিত ও সচেতনভাবে প্রচারিত নানা মিথ্যে; ৭. জ্যোতির্লিঙ্গ এবং অন্য নানা রূপে পূজিত শিবক্ষেত্র; ৮. "বাংলায় ফিরে এসো বাবা"— শিবের বঙ্গীকরণ এবং লৌকিক রূপে তাঁর আত্তীকরণ (তার উল্টোটাও)।
লেখাটা পড়তে গিয়ে তিনটি কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। প্রথমত, এ লেখায় গবেষণার কোনো অভাব নেই। বিস্তৃত পাঠ-নির্দেশিকা এবং নির্ঘণ্টের সাহায্যে এই বই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ছাত্র, উৎসুক পাঠক, এমনকি গবেষকদের কাজে লাগার মতো করেই নির্মিত হয়েছে বইটি। দ্বিতীয়ত, বৈদিক স্বীকৃতি বা রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে শিবের 'গণপূজ্য' রূপটিকে ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই সাজানো হয়েছে তাঁর পরিচিতিটিকে। ফলে বইয়ে শিবের যোদ্ধৃরূপের নানা বর্ণনা থাকলেও তাঁকে যোগী, নট, এমনকি শক্তির সহচর হিসেবেই পরিবেশন করেছেন লেখক। তৃতীয়ত, ঘৃণ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে শিব ও শিবলিঙ্গের নামে চলা নানা অবমাননাকর প্রচারের যথোচিত উত্তর দিতে সচেষ্ট হয়েছেন লেখক। সেজন্য তিনি সযত্নে নানা লৌকিক দেবতার রূপ ও বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে নানা লৌকিক বিশ্বাস এবং সামাজিক ধ্যানধারণা আরোপিত হয়েছে শিবের উপরে।
বইটি কি শিবের একটি সামগ্রিক রূপ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে? তা অবশ্যই পেরেছে। বইটির বাইরে কি শিবকে নিয়ে জানার কিছু নেই? অতি অবশ্যই আছে। আমার সীমিত জ্ঞানবুদ্ধিতেই অন্তত পাঁচটি বিষয় উঠে আসছে, যাদের নিয়ে কম-সে-কম আরও একটি আস্ত বই লেখা যায়। সেগুলো হল~ (ক) ভাস্কর্য ও স্থাপত্যে শিব তথা তাঁর মূর্তিতত্ত্ব; (খ) বিশেষত কাশী এবং সেথায় শিবকে নিয়ে চর্চিত, আলোচিত, অনালোচিত যাবতীয় কাহিনির সংকলন; (গ) শিব, পার্বতী এবং গণেশের পারস্পরিক সম্পর্ক— নৃতত্ত্ব ও লোকায়ত দর্শনের নিরিখে; (ঘ) ঐতিহাসিক উপাদানের নিরিখে বৈদিক রুদ্র ও অবৈদিক পশুপতি/আদিযোগী থেকে পৌরাণিক শিবের প্রতিষ্ঠার প্রতিটি পর্যায়; (ঙ) জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রুদ্র।
সযত্নে, শুদ্ধভাবে, অলংকরণ ও দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদে শোভিত আকারে বইটি প্রকাশ করার জন্য প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই। আর অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই লেখকের উদ্দেশে। 'ভোলেবাবা পার করেগা' ধ্বনির আড়ালে যাঁকে আমরা ভুলেই থাকি, তাঁকে নিয়ে এমন একটি প্রামাণ্য এবং নির্ভরযোগ্য কাজ করার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। আশা করি, এখানেই লেখক থেমে যাবেন না। বরং আগামী দিনে তিনি শিবকে নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখবেন এবং উপরোক্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে আরও নানা প্রসঙ্গ নিয়ে একাধিক খণ্ড উপহার দেবেন আমাদের। মহাকাল তাঁর সহায় হোন।
দেবাদিদেব মহাদেব সম্পর্কে জানবার আগ্ৰহ অনেক বছর ধরেই ছিল। হিন্দি সিরিয়াল 'দেবোকে দেব মহাদেব' দেখেছি, দেবদূত পট্টনায়েকের লেখা 'Seven secrets of Shiva' পড়েছি ।পরে শব্দ প্রকাশনার পেজ থেকে এই বইটি সম্পর্কে জানতে পারলাম কন্টেন্ট দেখে ভালো লেগেছিল। গতবছর সংগ্ৰহ করেছিলাম কিছুটা সময় নিয়েই ধীরে ধীরে এই বইটি পড়া শেষ করলাম। শিব অথবা যেকোন দেব দেবীকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পৌরাণিক কাহিনির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে কিন্তু এই বইতে পুরাণ সম্পর্কিত ঘটনাবলীর সাথে ইতিহাসের পাতায় প্রাচীন সভ্যতায় মহাদেবের সন্ধান করা হয়েছে।বেদ ও উপনিষদে শিবের উপস্থিতি, রামায়ন মহাভারতে শিবের ভূমিকা, অংশ অবতার ও লীলা অবতার এরা কারা, কি পার্থক্য এদের মধ্যে, নটরাজ , শিব তান্ডব ও চিত্র সহ তার প্রকারভেদ এই অভিনব বিষয়গুলি খুব সুন্দর ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। বেশ ভালো লেগেছে শিবলিঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা করা অংশটি ।সুস্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে এই শিবলিঙ্গের তাৎপর্য যা নিয়ে অনেকেই ভুল ভাবেন। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখা পড়তে ভালো লাগলো। বিশেষ ভাবে ভালো লাগলো বঙ্গে শিব আরাধনার ইতিহাস নিয়ে লেখা অধ্যায়।��ই অংশে বাংলার ইতিহাসে মহাদেবের কিভাবে ছিলেন, বিভিন্ন শিব সংকির্তন কাব্যে, লৌকিক আচার অনুষ্ঠান,ব্রতকথা ,বাংলার প্রাচীন শিব মন্দির ইত্যাদি বিষয়গুলি আলোচনা রয়েছে যা আমার কাছে বেশীরভাগ অজানাই ছিলো। একদম শেষ অংশে মহাদেব সম্পর্কে লেখিকার নিজস্ব উপলব্ধি অংশটি ছোট হলেও অনুধাবন করতে ভালো লাগে।
শিব সম্পর্কে জানতে গেলে আমার মতে এই বইটি দিয়েই আগ্ৰহী পাঠকদের শুরু করা উচিত বলেই মনে হয়েছে। তার কারন এই বইটিতে প্রতিটি আলোচনা সে পুরাণ হোক বা ইতিহাস, মিথ হোক বা মন্ত্রের অর্থ। লোকাচার , মন্দির হোক বা বিভিন্ন রকমের মূর্তি, চিত্র, সিনেমা এই সমস্ত বিষয়গুলি সুবিন্যস্তভাবে ও তালিকার মাধ্যমে যতটা সম্ভব সহজ করে পারা যায় পাঠকদের কাছে লেখিকা উপস্থাপনা করেছেন। লেখনী সরল ও মনোগ্ৰাহী। পড়তে ভালো লেগেছে।বই এর নামকরণের কারন মন্ত্রের মাধ্যমে ব্যাখা - এই অংশটি অসাধারণ লেগেছে আমার।
বইতে প্রচুর অলংকরণ ও ছবি রয়েছে।যা লেখার সাথে রিলেট করতে সাহায্য করেছে। তবে কিছু ছবি যদি রঙিন হতো তাহলে আরো ভালো হতো । প্রচ্ছদ ও কভার দারুন লেগেছে। ফন্ট সাইজ বড়ো। বইএর শুরুতে ঋজু গাঙ্গুলীর লেখা ভূমিকাটিও সুন্দর।
এই বইটির জন্য লেখিকা ও প্রকাশনা উভয়কেই আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। যারা পড়েছেন তারা আশা করি আমার সাথে একমত হবেন যে বইটি পড়লে বোঝা যায় যে এই বিষয়ে বই লেখা ও তৈরী করা কতটা পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের প্রয়োজন। শিবকে কেন্দ্র করে হয়তো আরো বই আছে কিন্তু যারা মহাদেব সম্পর্কে জানতে আগ্ৰহী তারা সবার আগে এই বইটি সংগ্ৰহ করে পড়ুন।
ভোলা বাবার stature, তাঁর swag, তাঁর উপস্থিতি এক্কেবারে আলাদা।
কল্পনা করুন এমন একজন বাবার, যিনি এক্কেবারে নির্লিপ্ত। স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা নিজের নিজের স্ব স্ব পথে গমন করছে।
প্রত্যেকের সমস্যা এবং অভিযোগের incidence এক্কেবারে ভিন্ন। মানুষটা সব শোনেন কিন্তু। স্রেফ react করেননা বিশেষ। আমার বাবাও ঠিক এমন ছিলেন। সকালের খবরের কাগজ হাতে উপবিষ্ট বাবার কানের সামনে অভিযোগ করে চলেছেন আমার মা নীলিমা চট্টোপাধ্যায়।
আর আমরা দুই ভাইবোন, ততোধিক উচ্চকিত স্বরে নিজেদের case অনর্গল present করে চলেছি।
শেষে বাবা একবার কাগজের দিকে চোখ রেখে একটা হুঙ্কার ছাড়তেন। সকলে তটস্থ হয়ে যেতাম। 'জানোয়ারের দল' বলে বাবা একটা সাংঘাতিক হুঙ্কার দিতেন। চমকে উঠতাম আমরা। অন্তত আমার 'ঐটা' technically 'শর্ট' হয়ে যেত।
ভোলাবাবাও এমনটাই করতেন মাইরি।
মোদ্দা কথা এটুকুই যে শিক্ষকদের থেকে শিব সম্পর্কে basic text তিনটি :
১) শিব পুরাণ (বহু ভাষায় পাওয়া যায় , গীতা প্রেসেরটা পড়বেন আগে) ;
২)লিঙ্গ পুরাণ (এটিও বেশ অনেক প্রকাশক এনেছেন। তবে গীতা প্রেসের Original version সবচেয়ে উমদা, অসামান্য); আর অবশ্যই
৩) স্কন্দ পুরাণ। (একটু একঘেয়ে শোনালেও এই বইকেও গীতা প্রেস সর্বোৎকৃষ্ট আদলে এনেছেন!! হিন্দি সিল্কহে নাও গুবলুবেড়াল! (একজনকেই এই নামে ডাকি! সে বুঝে নেবে! Original version সবচেয়ে উমদা, অসামান্য
এই বইয়ের লেখক উপরোক্ত মূল তিনটি বইয়ের সবটুকুই এনেছেন নিজের লেখার মধ্যে।
আরো specifically বলতে গেলে, আমার নিজের জন্ম একটা সোমবারে। আর সোম হল শিবের বার। সোমেই উপচে পড়ে অনেকানেক শিবধাম।
বেদের শিব, কল্পনার শিব আর ভক্তির, সমর্পনের সবগুলো শিব আমদুধে মিশে একাকার মিশ্রণ এই বইয়ে।
লেখিকার কপালে চুমু খেলুম। তার গাল টিপে দিলুম।
আর তার কান মুলে তাকে এই encyclopedic কাজের পরবর্তী ভল্যুম নিয়ে আসার আদেশ দিলুম।