ভারতে সম্প্রতি 'Chhaava' সিনেমা বেশ হইচইয়ের সৃষ্টি করেছিলো। সেই হইচইয়ের মাত্রা ছিলো হতবাক করে দিবার মতো। তিনশত বছর আগে মরে যাওয়া আওরঙ্গজেবের 'কৃতকর্মে'র ফলে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বর্তমানের মানুষদের। আসলে পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মের লোকেরা নিজেদের অবস্থা অস্বীকার করতে অতীত গৌরবের আস্ফালন করে। উপমহাদেশে বৃহৎ দুটো ধর্মের লোকেদের মাঝেই এই সমস্যার উপস্থিতি বিদ্যমান। যাইহোক, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমের বইয়ের রিভিউতে এসব আনছি কারন ' Chhaava সিনেমার স্ক্রিপ্ট পুরোপুরি বঙ্কিমের বানানো রেসিপির তৈরী। বলতে গেলে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র এবং সেই রাষ্ট্রের বহিরাগত শত্রু মুসলমান এই কনসেপ্টের দ্রষ্টা বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের। বন্দেমাতরম ' তাঁর ই লেখা, এবং তাঁর ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তা বেশ প্রভাবশালী। কয়েক জায়গায় বঙ্কিমচন্দ্রের নামের আগে সাহিত্য সম্রাটের বদলে মহর্ষি উপাধি দেখে ছোটবেলায় অবাক হয়েছিলাম। পরে আহমদ ছফার বই 'বঙ্কিমচন্দ্র: শতবর্ষের ফেরারি' পড়তে গিয়ে যখন বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাবলীর দ্বিতীয় খন্ড সবটা বুঝে না-বুঝে পড়ে ফেললাম তখন খানিকটা বুঝতে পারলাম। বঙ্কিমের নিজস্ব ধর্মচিন্তার খোঁজ পাওয়া যাবে তাঁর রচিত ' কৃষ্ণ চরিত্র ' ও ' শ্রীমদ্ভগবতগীতা'য়। বিশেষ করে সবার 'কৃষ্ণ চরিত্র' পড়া উচিত। বঙ্কিমের কৃষ্ণ মহাভারত কিংবা পুরাণের কৃষ্ণ নয়, বরং তাঁর পলিটিকাল আইডিয়ালজির পারসোনিফিকেশন।
সীতারাম' উপন্যাসখানি ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে স্বীকৃত আর নাম চরিত্রটি ঐতিহাসিক হলেও প্রকৃত ইতিহাসের সাথে এর কোন লেনাদেনা নেই। বঙ্কিমের পলিটিকাল ন্যারাটিভ সেট করার ভুজুংভাজুং অবিশ্বাস্য গাঁজাখুরি কাহিনী। তবে কাহিনীকার যে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের আদি ও এখনো শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা গ্র্যান্ডমাস্টার শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ! তাঁর অতি শক্তিশালী এবং মনোহরা ভাষার ইন্দ্রজালে পাঠক গল্পে হারিয়ে যেতে বাধ্য। তাঁর কল্পনাশক্তির ধারেকাছে পাঠকের যাবার সাধ্যি নেই। মেলোড্রামা হলেও ভাষার গুণে পড়ে আনন্দ পেয়েছি।
সীতারাম একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। এটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ উপন্যাস। প্রচার পত্রিকায় (শ্রাবণ, ১২৯১ – মাঘ, ১২৯৩; মাঝে কয়েকমাসের বিরতি সহ) প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৪১৯। তৃতীয় ও শেষ সংস্করণ বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশায় মুদ্রিত হলেও প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, ১৮৯৪ সালের মে মাসে।
রাজা সীতারাম এর রাজ্য ছিল মাগুরার মোহাম্মাদ পুরে। এই রাজ্য ঘিরেই গড়ে উঠেছে উপন্যাস এর প্লট। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মাগুরায় পোস্টিং থাকা অবস্থায় এই উপন্যাস লেখেন। এই উপন্যাসে হিন্দুধর্মের নবজাগরণ এর গান গাওয়া হয়েছে বেশি তাই এই বইয়ে ঐতিহাসিকতা রক্ষা করা যায়নি বোধ করি।
অনেক দিন ধরে বইটি পড়লাম। শেষ পর্যন্ত টান টান উত্তেজনা রয়েছে গল্পে। আমি যেহেতু নিজে মাগুরার মানুষ তাই আমার আগ্রহ ছিল আলাদা।
জাত গৌরব আর বিদ্বেষ কোন সাহিত্যকর্মের মান অনেকটা নামিয়ে দিতে পারে, সীতারাম এর একটা উদাহরণ। কিছু ঐতিহাসিক চরিত্র থাকলেও সীতারাম ঐতিহাসিক উপন্যাস না। ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর খুব একটা ভূমিকা উপন্যাসে নেই। সীতারাম উপন্যাসের নায়ক। হিন্দু ধর্মের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে ব্রতী। নায়িকা শ্রী কোষ্ঠী দোষে স্বামী পরিত্যক্তা। জয়ন্তী, ভৈরবী, দেবীর বেশে সীতারামকে বিপদ থেকে পরিত্রাণ করে। গঙ্গারাম উপন্যাসের প্রথম দিকে চরিত্রটিকে খলনায়ক মনে করার কারণ না থাকলেও এই উপন্যাসের খলনায়ক সেই। মানুষের চরিত্রের কৃতঘ্নতার প্রবৃত্তি উঠে এসেছে এই চরিত্রে। গল্পের বেশিরভাগ অংশই দখল করে রেখেছে মোটামুটি সাম্প্রদায়িক মারপিট। চরিত্রগুলোতে সবকিছুই অতি... যেমন অতি আবেগী, অতি নাটকীয়, অতি মানবীয়। পুরো বাস্তবতা বর্জিত অন্য কোন ইউনিভার্সের গল্প মনে হচ্ছিল। খুব সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সবচেয়ে দুর্বল লেখা।