প্রথম কথা-বইয়ের ব্লার্ব বা কাহিনি সংক্ষেপ। অত্যন্ত আগ্রহ-জাগানিয়া। বাংলাদেশের সাহিত্যে সিরিয়াল কিলিং নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। আসলে দিবাকর দাসের ছায়াবাজি, সোহেল রানার আমর্ষ আর সালমান হকের তিন ডাহুক বাদে সমসাময়িক আর কারও কাজ মনে করতে পারছি না। তারমাঝে আবার তিন ডাহুক বাদে অন্যগুলোয় সিলিয়াল কিলিং ব্যাপারটাকে ফোকাসে আনা হয়নি। তাই অবশ্যই কাহিনি সংক্ষেপ এখানে অনেক বড় একটা প্লাস পয়েন্ট।
দ্বিতীয় প্লাস পয়েন্ট বইতে ব্যবহৃত সিরিয়াল কিলিঙের ধারণার ব্যাখ্যা। তার স্থায়িত্ব মাত্র দুই পাতা। অর্থাৎ লেখক এই জায়গাটা তথ্যের ভারে ওজনদার করেননি। তবে যেহেতু আইডিয়া পেতে অসুবিধা হয়নি, তাই এতটুকু ব্যবহার যথার্থ ছিল বলেই মনে হয়।
এরপর আশা যাক চরিত্রায়নের কথায়। বইটি ২৭২ পৃষ্ঠার হলেও, বইয়ের পাতা থেকে লাফিয়ে উঠে চোখের সামনে ভাসতে থাকে এমন চরিত্রের সংখ্যা হাতে গোণা। তার মাঝে নায়ক দানিয়াল সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত। তবে আফসোসের কথা, দানিয়ালের চরিত্র একেবারেই সরলরৈখিক, তাতে আপস-ডাউনস খুব একটা নজরে আসে না। অবশ্য ব্যাপারটাকে খুব একটা বড় হিসেবে দেখার উপায় নেই, এমন চরিত্রের অবস্থান আমাদের জীবনেও আছে। কম, কিন্তু আছে। এরপর সবচেয়ে বেশি ফোকাস পাওয়া চরিত্র শফি। তবে এই চরিত্রটা টালমাটাল। সেই হিসেবে স্পয়লার না দিয়ে বলা যায় যে চরিত্রায়ন ভালো হয়েছে। আছে নায়িকা-ইশিকা, অত্যন্ত লঘু এবং বিরক্তি-উদ্রেককারী একটা চরিত্র; লেখক তেমনটাই দেখাতে চাইলে একেবারে সফল। তবে তার চিত্রায়নের মূল সমস্যাটা মোডারেট মুসলিম হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা। সে নেকাব পরে ভার্সিটিতে যায়, আবার বন্ধুদের সঙ্গে নেকাব ছাড়া বসে আড্ডা দেয়, আবার চার বছর আগে দেখা দানিয়ালকে চার বছর পর দেখে প্রেমে কাতর হয়ে পড়ে; আবার যার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা চলছে তার বাড়িতে গিয়ে রাত কাটিয়ে আসে (হবু-শাশুড়ির সঙ্গে)। বর্তমানের আধুনিকতা আর ধার্মিকতার মাঝে পড়া একটা চরিত্র, যার চিত্রায়নটা ভাল লাগেনি।
ডিটেইলিং আছে প্রচুর, তবে এখান থেকে বইটির দুর্বল দিকের শুরু। ডিটেইলিঙে হয় লেখক একটু কম মনোযোগ দিয়েছেন, নইলে তার সোর্সগুলো পুরোপুরি ভাবে তার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল না। তবে সেই বিস্তারিত বিবরণে আসছি। দিন-তারিখ-ক্ষণের হিসেবে অত্যন্ত অপটুতা দেখিয়েছেন লেখক যা বই পাঠের অনুভূতি বারংবার আন্দোলিত করেছে, বেশিরভাগ থেকে খারাপের দিকেই। কাহিনির পেসিংটা একটু অন্যরকম। বড় বইতে এই ধরনের একটু সমস্যা হয়। প্রথমে গ্রিপিং থাকে, তারপর থাকে শ্লথ অংশ। শেষে আবার গ্রিপিং। আমার কাছে বইয়ের শ্লথ অংশ বেশিই শ্লথ মনে হয়েছে।
বাঁধাই, ছাপা, পাতার মান ভালো; তবে এত দামের যোগ্য বলে মনে হয় না। প্রচ্ছদ নিয়ে আমার মাথাব্যথা কস্মিনকালেও ছিল না, এখনও নেই। শেষের দিকে ঘটনাগুলোও ঘটে গেল প্রত্যাশিত ভাবেই। ৫০ পাতা পড়ার পর কাহিনি যা মনে হয়েছিল, শেষেও তাই। তাই অন্তত আমাকে টুইস্টটা হতবাক করতে পারেনি।
এবার আসা যাক বিস্তারিত কথায়।
প্রথমত নাম নিয়ে। 'দিমেন্তিয়া' শব্দটা কৌতূহল জাগায়, যা পরবর্তীতে (বইয়ের মাঝে) লেখক পরিষ্কার করেননি। ওয়ার্ড প্লে হতে পারে, হতে পারে হয়তো চতুর ইঙ্গিত, কিন্তু বইটি থেকে তা পরিষ্কার না। প্রিন্টার্স লাইনে লেখা Dimentia by M.J. Babu তেও যে বর্ণগুলো ব্যবহার করে বইয়ের নাম লেখা হয়েছে তার উচ্চারণ যেকোনো বিচারে ডিমেনশিয়া-ই আসে। খানিকটা অসন্তুষ্টির কারণ আছে বৈকি।
আমি পুরানো দিনের মানুষ, তখনও ভাষার বানান পরিবর্তনের জোয়ার আসেনি। এখনকার অনেক বানান নিয়েই আমাকে সন্দিহান হতে হয়, বানানে আমি দক্ষও নই।। তবে মোটামুটি নিশ্চিত যে 'ওনি' (উনি) বানানটি বাংলা ভাষায় নেই। যেমন নেই- মাঝাড়ি, কাওকে, ইম্প্র্যাস (ব্যাবহারিক অর্থে), বাকী- শব্দগুলোও। বানানে ছোটখাটো ভুল হয়তো আমাদের অনেকেই নজরে আসে না, কিন্তু বড় ধরনের ভুল অগ্রাহ্য করা কঠিন হয়ে যায়।
লেখনশৈলী পরিশীলিত নয়। তবে শুরুর দিকে বিরক্তি অনেকটাই কেটে যায় পরের পাতাগুলোয়। প্রথম বই হিসেবে লেখনশৈলীর দুর্বলতাকে অবশ্যই ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা যায়। কাব্যের ধারায় লাইনের একটা শব্দকে কেন্দ্রে ধরে পরের শব্দে যাবার প্রচলন দেখলেও, গদ্য রীতিতে পরপর একাধিক লাইনে একরকমের ভাষ্য কিংবা শব্দের ব্যবহার বিরক্তির উদ্রেক করে বৈকি। যেমন প্রথম প্যারার কথা ধরা যাক:
অনেকক্ষণ যাবত 'মোবাইল'টা 'বাজছে'। 'মোবাইল' 'বাজার' শব্দে ঘুম ভাঙ্গে শফির। সেই থেকে একটু পর পর থেমে থেমে 'মোবাইল'টা 'বেজে' উঠছে। কতক্ষণ যাবত 'বেজে' চলছে সেটা খেয়াল নেই।
এরকম গদ্যরীতিকে ব্যক্তিগত মতানুসারে আমি অপরিশীলিতই বলব। পরের দিকে এই প্রবণতা কমে গেলেও, আছে বেশ কিছু স্থানেই।
ডিটেইলিং করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলাটা বইয়ের মারাত্মক একটা অসঙ্গতি। সেটা ব্যাপারে বলতে গেলে অনেক লম্বা রচনা হয়ে যাবে। লম্বা মানে...ল-ম্বা... উদাহরণ স্বরূপ বলতে গেলেও অনেক হয়ে যায়। তাও বলছি:
***স্পয়লার অ্যালার্ট***
৯-১০ পৃষ্ঠা: সাত বছর পুলিসে আছে শফি, বর্তমানে সে চিফ ইন্সপেক্টর (বইতে বানানটা প্যাক্টর হিসেবে লেখা আছে)। আবার তার বন্ধু রেজাও চিফ ইন্সপেক্টর।
পৃ. ১৪: 'ঢাকা ভার্সিটি থেকে দর্শনে পাশ করে পুলিসের এসআই পদে যোগ দেয় দানিয়াল; এখন সে ওসি।' পাঁচ বছরের মাঝে ঢাকার থানার ওসি হওয়াটা একটু বেশি দ্রুত। আবার পাঁচ বছরের মাঝে মার্ডার কেস মাত্র দুটো (পৃ. ৩৫)।
পৃ. ২২: 'স্যার ভিক্টিমকে ছয় টুকরো করা হয়, তাও আবার ছয় টুকরো করে।' প্রথম দিন পা কাটা হলে দেহের দুই টুকরো হলো-এক পা ও অবশিষ্ট দেহ। পরের দিনে আরেক পা কাটা হলে দুই দিনে তিন টুকরো। এভাবে পাঁচ দিনে ছয় টুকরো হয়। ছয় দিনে ছয় টুকরো করার মতো করে পাঁচ দিনে পাঁচ টুকরো, চার দিনে চার টুকরো টাইপের উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। যেহেতু দিন আর কর্তিতাংশের ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তাই এখানে বইয়ের প্লট একটা বিশাল ধাক্কা খায়।
'যে অস্ত্র ব্যবহার করে হয়েছে সেটা প্রায় আধা সেন্টিমিটার পুরু, প্রস্থ প্রায় তিন সেন্টিমিটার। বলতে গেলে চাপাতি।' এখানে সম্ভবত ইঞ্চি হবে।
পৃ. ২৭: একটা ড্রাগের কথা বলা হয়েছে-বিউটিলিয়াম ৩৬, যা ভিক্টিমের দেহে প্রবেশ করাবার পর রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। ফিকশনে কিছু অস্বাভাবিক কথা থাকবেই, নইলে তো ব্যাপারটা চটকদার হলো না; কিন্তু সেই চটকদার ব্যাপারের পেছনেও খানিকটা লজিক থাকতে হয়। হ্যারি পটার জাদুর ছড়ি দুলিয়ে রক্তপাত বন্ধ করে দিতে পারে, হগওয়ার্টসের দুনিয়ায় সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পোয়ারো তা করলে তো হলো না। যে ওষুধ রক্ততঞ্চন করে ফিমোরাল আর্টারি থেকে রক্তপাত বন্ধ করতে পারে, সেটা তো শরীরের ভেতরেই রক্ত জমিয়ে দেবে! এখানে আরেকটা অসঙ্গতি-এই ড্রাগের পেছনে অনেকটা সময় দেয়া হয়েছে। কোথাও পাওয়া যায় না, শুধু আর্মির হাতে আছে ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তীতে একটা কথা বলে ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দেয়া হলো-যেকোনো কেমিস্টই নাকি বানাতে পারে। ইনহ্যারেন্ট লজিক সিস্টেম ছাড়া আসলে কোনো থ্রিলারই চলে না। বুদ্ধির খেলা হয় এখানে পাঠক-লেখক-চরিত্রের। সেখানে লজিকই আসল।
পৃ. ৬২: দ্বিতীয় কেসটাও সেইম, ছয় টুকরো করে ফেলে রাখা হয়েছে। অথচ পৃষ্ঠা ৮০ অনুসারে: খুনি পাঁচ দিন আগে কাজ শুরু করেছে। ১৬২ পৃ্.তে লেখা পাঁচ টুকরার কথা।
পৃ. ৬৮: উপস্থিত রয়েছেন দুজন, একজন কেসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার। অন্য জন তার সহকারী। আপডেট জানাবে কে? অবশ্যই অফিসার, সহকারী নন।
পৃ. ৭৭: 'প্রথম ভিক্টিমের ৬ দিনে ৬ পার্টস আলাদা করা হয়, তার মানে প্রথম ভিক্টিমকে জানুয়ারির ২৭-২৮ তারিখ থেকেই ডিসইন্ট্রিগেট করা হয়। তার মৃত্যু ঘটে ১ তারিখ। আমরা লাশ পাই ২ তারিখ, সেক্ষেত্রে আমরা লাশ পাই খুন হবার ৬ দিন পর।' কোনো ভাবেই কোনো হিসাব মেলে না। যদি বাঁচিয়ে রাখাই হয়, তাহলে ১ তারিখের পর ২ তারিখ লাশ পেলে কীভাবে খুন হবার ৬ দিন পর হয়?
একই পৃষ্ঠায়: 'ঢাকা শহরে ৩ দিয়ে শুরু কোনো রাস্তা নেই।' প্রথমটা ছিল গ্রিন রোডের ১/ক, দ্বিতীয়টা ধানমণ্ডি ২। এমন তো বনশ্রী ৩ নম্বর রোড থেকে শুরু করে অহরহ থাকার কথা।
পৃষ্ঠা ৬৮: রুবানা জামান নিখোঁজ হয়ে ৬ জানুয়ারি, আবার পৃষ্ঠা ১০৫ নিখোঁজ হয় ৯ তারিখে।
পৃষ্ঠা. ১২১: চরিত্রের নাম সাবরিনা, ১৩৯ পৃষ্ঠায় সাবরিন।
১২২-অবন্তি, ১৫৩ অবন্তী
১৪৩-ভিক্টিমের চোখ অনুপস্থিত, ১৬৯-হৃদপিন্ড
২১৮-টাইমলাইন: 'এক জানুয়ারি খুন হয় রাজু শীল, সেদিন নিখোঁজ হয় কেয়া ইসলাম। একমাস পর, দুই ফেব্রুয়ারি প্রথম লাশ পাওয়া যায় কেয়া ইসলামের। দ্বিতীয় লাশ ৪ ফেব্রুয়ারি, সেই ভিক্টিম আবার নিখোঁজ হয় জানুয়ারি (তারিখ নেই)। তার পরের ভিক্টিম নিখোঁজ হয় একুশ জানুয়ারি আর লাশ পাওয়া যায় সাত ফেব্রুয়ারি, লাশ ডাম্প করা হয় ছয় ফেব্রুয়ারি। ছয় ফেব্রুয়ারি সকালে কিডন্যাপ হয় ইন্দ্রানি স্যানাল।...তার পরের ভিক্টিম নিখোঁজ হয় সতেরো জানুয়ারি, লাশ পাওয়া যায় আট জানুয়রি। পরের কিডন্যাপ হয় ২৬ জানুয়ারি, লাশ পাওয়া যায় দশ জানুয়ারি।
২৬৯-রেজার স্ত্রীর নাম একখানে দেয়া রেজওয়ানা (২৪২), আরেকখানে অর্পা।
মেডিকেল তথ্য প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ভুল:
বিউটিলিয়ামের কথা তো আগেই বললাম।
পৃ. ২৮: জরায়ু দেখে লক্ষণ বুঝবে কীভাবে? একটা যুক্তি হতে পারে-স্পার্ম দেখা। সেটার জন্য যোনিই যথেষ্ট।
পৃ. ৮১: অ্যাবোরশন করাতে গেলে লাশের তলপেটে চিকন একটা দাগ ফুটে ওঠে না।
ভিক্টিমের ব্লাড থেকে অ্যালকোহল বুঝতে হলে তাকে বারো ঘণ্টার মাঝে মদ খেতে হবে। অ্যালকোহলিক বোঝার জন্য যকৃৎ বা লিভার দেখা যেত, কিংবা ইসোফ্যাগাসের নিচের দিকে ম্যালোরি-ওয়েজ টিয়ারের উপস্থিতি।
পৃষ্ঠা ৮২: বিউটিলিয়ামের সাইড ইফেক্ট-দেহের কোষ নষ্ট করে ফেলা, সোজা কথায় ক্যান্সার। ক্যান্সার এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত গ্রোথ যা দেহের কোষের সংখ্যা আসলে বাড়ায়, সাধারণ কোষ নষ্ট করে। যেহেতু বইটার স্ট্রং সেলিং পয়েন্ট হিসেবে ফরেনসিককে টানা হয়েছে, তাই ছোটখাটো ভুলও নজরে পড়ে।
পৃষ্ঠা. ২০৭: আমি সাইকোলজিস্ট নই, তবে সাইকিয়াট্রির কিছু জিনিস তো আমাদেরও পড়তে হয়। অ্যাবরশনের এগেইন্সটে কেউ গেলে সে কীভাবে এতিম হয়, তা আমি মিলাতে পারিনি। এতিমখানার কথা বলা হয়েছে যদি ধরেও নেই (এই ধরনের তথ্যের দিকে পরিষ্কার করে দেয়াই ভালো, পাঠক তিলকে তালও ধরে নিতে পারে), তাহলেও মেলে না। এতিমখানায় যদি পিতৃ-পরিচয়হীন কেউ যায় তো তার সমস্যা হবে অনৈতিক আচরণে লিপ্ত নারী-পুরুষদের সঙ্গে। অ্যাবরশন কীভাবে।
২১৮-রুবানা, অবন্তি, সাবরিন আর ইন্দ্রানীর অ্যাবরশন বাহাউল্লাহ করে। বাহাউল্লাহ মেডিসিনের ডাক্তার (পৃ. ১৯৬)। বাকিদেরটা বুঝলাম, স্বনামধন্য একজন উঠতি ডাক্তার কেন মেডিসিনের ডাক্তার দিয়ে অ্যাবরশন করাতে যাবে? আর সে গেলেও, ধনীর কন্যা রুবানা কেন যাবে? সে তো বাবার সম্পত্তি নিয়েই অ্যাবরশন করিয়েছিল, ক্রিমিনাল অ্যাবরশন করায়নি। মেলে না।
***ম্যাসিভ স্পয়লার***
তবে সবচাইতে বড় অসঙ্গতি শুরু ১৮৬ পৃষ্ঠায়, যেখানে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া।
প্রথম ভিক্টিমের নাম কেয়া ইসলাম, এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে রুবানা।
'যারা খুনগুলির শিকার তারা সেভেন কার্ডিনাল সিন করেছে, বাংলায় ষড়রিপু।' আসলে কোনটা? সাতটা কার্ডিনাল সিন? নাকি ছয়টা রিপু? কোনটা দায়ী? এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন ইন্টারচেঞ্জেবল। কেস দাঁড়িয়ে আছে ছয় রিপুর ওপর, কিন্তু খুন হতে যাচ্ছে সাতটা। কীভাবে?
এবার ষড়রিপুর ব্যাখ্যা। ক্রোধ, মদ, মাৎসর্য, লোভ, কাম, মোহ-ছয়টা রিপু। কিন্তু সেভেন কার্ডিনাল সিনে-ক্রোধ, লোভ, মদ, মাৎসর্য, মোহ, অতিভোজন (gluttony), আলস্য (sloth)।
ভিক্টিমদের দেখা যাক:
কেয়া-স্বেচ্ছায় বিয়ে হয়নি বলে স্বামীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি-ক্রোধ (মেনে নিলাম)।
রুবানা-প্রাইড (মদ অর্থ আত্মগৌরব)। কীভাবে? বড়লোকের মেয়ে, বাপের অমতে বিয়ে করেছে। আবার বাপের কথা শুনে ফিরে এসেছে, আবার অ্যাবোরশন করিয়েছে বাপের কথা শুনে। তাহলে অতিরিক্ত আত্মগৌরব কীভাবে যুক্তিযুক্ত হলো?
সাবরিন-ঈর্ষা (মাৎসর্য)। এটাও তো মেলে না। ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে যে স্বামীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, কারণ স্বামী সন্তান জন্মদানে অক্ষম। যদি ধরেও নেই যে অন্য মায়েদের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল, তাহলে সেটা ভালোভাবে উল্লেখ করতে হবে না?
অবন্তী-লোভ। মেনে নিলাম।
ইন্দ্রানী-কাম, মেনে নিলাম।
২১৯ পৃষ্ঠায় আবার ক্যাজুয়ালি বলা হলো-খুনি ছয়টা না, সাতটা খুন করবে। কেন? বাহাউল্লাহ যদি তার টার্গেটের একজন না, সেইজন্য? তাহলে রাজু শীলকে কেন হিসেবে আনা হচ্ছে না?
আবার শেষ ভিক্টিম হিসেবে দেখানো হচ্ছে রোখসানাকে, যে নাম ভাঁড়িয়ে অ্যাবরশন করাতে যায়। এখানে এসে রিপুর খেলা পুরাই শেষ। তাহলে এখানে কোন রিপুর ব্যাখ্যা আসবে? বাকি আছে মোহ, এক্ষেত্রে ব্যাখ্যা কী। আর যদি মাঝখানে আনি বাহাউল্লাহকে, আর সে মোহ নিয়ে নেয় তো খুন হচ্ছে সাতটা। সেভেন কার্ডিনাল সিনের শেষ দুটোর সঙ্গে মিল নেই ষড়রিপুর তাহলে?
পুরো ব্যাখাই কি তাহলে একেবারে উড়ে যায় না?
২৬৩-বোঝা যায় যে শফির একধরনের অডিটরি ও ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হতো। সে দেখতে পাচ্ছে আজরাঈলকে যে মৃত্যুর ফেরেশতা, আবার শুনতে পাচ্ছে তার কথা। সো তার পক্ষে সেভেন কার্ডিনাল সিন বা ছয়রিপুর দ্বারা এভাবে চালিত হওয়াটা যৌক্তিক নয়।
তাছাড়া রেজা কেমিস্ট্রিতে দক্ষ ছিল, শফি না (যতদূর মনে পড়ে)। শফির মাঝে রেজার ক্যারেক্টার গ্রো করলেও, তার জ্ঞান তো চলে আসে না। তাই বিউটিলিয়ামের জ্ঞানও শফির থাকার কথা না। শেষ কথা-রেজার স্ত্রী তো অ্যাবোরশন করেনি। তাহলে কেন অ্যাবোরশন শফির মাঝে জন্ম নেয়া রেজার কাজে ইম্পরট্যান্ট হলো? সে এতিমখানায় বড় বলে? তার সঙ্গে অ্যাবোরশনের সম্পর্ক একটু বেশিই কষ্টকল্পনা হয়ে যায় না?
রেজার জীবনের ধাক্কাগুলো-
ক. এতিম খানায় বড় হওয়া।
খ. কমবয়সে অর্থ-সংক্রান্ত বিশ্বাসঘাতকতা।
গ. স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতারিত হওয়া।
ঘ. অন্যের ঔরসে স্ত্রীর সন্তান জন্ম দেয়া (যেটা রেজা ভাবে, কিন্তু সত্যি না)।
তো রেজার যে চরিত্র শফির মাঝে গ্রো করে, যুক্তি বলে (হ্যাঁ, মানসিক ভারসাম্যহীনদেরও একটা ইন্টারনাল লজিক থাকে; সেটা আমাদের লজিকের সঙ্গে মেলে না-এই যা): খুনি টার্গেট করবে:
যাদের চাল-চলন সুবিধার না (Sexually Promiscuous)
যাদের লেন-দেন পরিষ্কার না
যে মহিলারা স্বামীর সঙ্গে প্রতারণা করে, অথবা স্বামীরা স্ত্রীর সঙ্গে
এবার ভিক্টিমদের কথা ধরা যাক (বাহাউল্লাহ ছাড়া): কেয়া, সাবরিনা, ইন্দ্রানীর ক্ষেত্রে ১ আর ৩ নম্বর যুক্তি খাটলেও, ২ খাটে কিনা পরিষ্কার না। কিন্তু রুবানা আর অবন্তীর ক্ষেত্রে বলা যায়-এরা তো স্বামীর সন্তানকেই ধরেছিল গর্ভে! তাহলে>
আর রোখসানা তো বিবাহিতও না।
I can't find a pattern, and without a pattern, there can't be a definitive 'Serial Killer 'claim.
এরকম ছোটখাটো আরও অনেক অসংগতি বই পড়ার অভিজ্ঞতায় প্রায়শই তিক্ততার জন্ম দিয়েছে।
যেকোনো নতুন লেখ��ের প্রথম বইটা আসলে অনেক অনভিজ্ঞতার মাঝে প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে তার সাহায্যের দরকার হয় অনেকটাই, গুছিয়ে নেবার জন্য। থ্রিলার বই ফিকশন বলেই তাতে তথ্যগত অসঙ্গতি থাকা অনুমোদিত, আমি এই নীতিতে বিশ্বাসী নই। বরঞ্চ আমার কাছে থ্রিলারেই লজিক ও তথ্যের শক্তিশালী বুনোট দরকার বলে মনে হয়।
সেই বিশ্বাস থেকেই বলা-প্রেমিস যতটা ইন্টারেস্টিং ছিল, এক্সিকিউশন ততটাই দুর্বল। অথচ চাইলেই আরও সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন করা যেত বইটি। (উল্লেখ্য, বইটি শেষ করার বেশ কিছুদিন পর রিভিউ লেখা, তারও কয়েকদিন পর পোস্ট করা। সম্ভবত ভুল করিনি, করে থাকলে অত্যন্ত দুঃখিত।)