সমাজ যখন ছেয়ে যায় বৈষম্য আর অনাচারের চরম পর্যায়ে, দূর্নীতিগ্রস্থ কর্তৃপক্ষের দখলদারত্বের, যাতে অত্যাচারিতদের কন্ঠস্বর হয় ক্রমাগত স্তব্ধ। সেই সময়ই নৈরাজ্য হয়ে ওঠে এক অনিবার্য প্রতিক্রিয়া। অস্থিতিশীল সময়ে অনেকের জন্য নৈরাজ্য হয়ে ওঠে স্বাধীনতার স্বপ্ন। স্বপ্ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের মতো বাঁচার। তবে এই অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতাও ক্ষতিকর, যা সমাজকে দ্রুত ঠেলে দেয় বিশৃঙ্খলার দিকে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভাব সৃষ্টি করে ক্ষমতার শূন্যতা সেইসাথে ক্যাওস। তাই তা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে না পারলে সুতো কাটা ঘুড়ির মতো ধ্বংসের মুখে পতিত হবে সেই সমাজ।
Reality is aburd, You know. To live happily you must fracture your reality to find a path toward Utopia, for which you can sacrifice your life.
তবুও অনেকে মানতে পারে না এই সমাজ কিংবা কর্তৃপক্ষের অধীনে বাস করাটা। সেইসব মানুষদের ক্ষমতার চক্র ভাঙার ক্ষেত্রটা অনেক ক্ষেত্রেই রুপ নেয় চরমপন্থার। চরম ক্ষেত্রে, নৈরাজ্যবাদীরা পরিচালিত হয় ব্যবহারিক বাস্তবতার বাইরে থাকা বোধ দ্বারা, সেই সাথে সমাজের রীতিনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্যে তাদের মাঝে বাড়তে থাকে হতাশার গভীর অনুভূতি। সেই থেকেই তারা ক্রমেই সমাজে বাড়াতে থাকে বিশৃঙ্খলা, ক্যাওস। থ্রিলার লেখক এম. জে. বাবুর 'অ্যানার্কিস্ট' সিরিজ এই নৈরাজ্যবাদীদের নিয়েই। সিরিজের আগের দুই বই 'দিমেন্তিয়া' ও 'অ্যাবসেন্টিয়া'তে আমরা পেয়েছিলাম এমনই দুই অ্যানার্কিস্টের গল্প।
'অ্যাবসেন্টিয়া'র এন্ডিংয়ে আমরা দেখতে পাই, এক ভয়ংকর অন্ধকার অবতার আবার ফিরে এসেছে। যেই অন্ধকারের সাথে দানিয়ালের অতীতে ঘটেছিলো ভয়াবহ কিছু, এমনই ইঙ্গিত পাই পাঠক। কি সেটা? সময়টা একবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে। এমনই সময় কিডন্যাপ হয় ক্ষমতাসীন দলের এক ক্যাডার নেছার উদ্দিন। সাথে সাথে ঘটতে শুরু হলো একের পর এক ঘটনা। ঠিক ডমিনো ইফেক্টের মতো, এক ধাক্কায় এমনসব ঘটনা ঘটতে লাগলো, যা কিনা সাধারণের চিন্তার বাইরে। হেলাল সরকার, দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, ক্ষমতা আর অর্থের জন্য যে পাড়ি দিয়ে এসেছে এক হিংস্র জগৎ, যা টিকিয়ে রাখতেও যে কিনা যেতে পারে যেকোনো পর্যায়ে। সেই হেলাল সরকার কোনো এক অজানা কারণে এ ব্যাপারে তটস্থ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দানিয়াল, মা সেলিনা বেগম একজন সাংবাদকর্মী। সেই শৈশব থেকে মা-ই তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু হটাৎ নিখোঁজ হন তিনি। ছাপোষা এক সংবাদকর্মী নিখোঁজ হওয়ার পিছনে কারণ কী? বন্ধু মানিককে নিয়ে দানিয়াল নেমে পড়ে তার মাকে খুঁজে বের করার অনুসন্ধানে। কিছুদুর খোঁজখবর নিতে গিয়ে তারা টের পাই তাদের মায়ের অন্তর্ধানের রহস্য জড়িয়ে আছে নেছার উদ্দিনের কিডন্যাপারের সাথেও। যে কেসে কাজ করছে ডিবি পুলিশের অফিসার জাদিদ। ঘটনাক্রমে মেধাবী দানিয়ালও জড়িয়ে যায় কেসটার তদন্তকার্যে এবং নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দ্বারা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ধীরে ধীরে এই কিডন্যাপিং কেস মোড় নেয় এক ভয়ংকর দিকে যা পূর্বাভাস দেয় দেশজুড়ে হতে যাওয়া ভয়ংকর সব অরাজকীয় কার্যক্রমের।
অন্যদিকে সেলিনা বেগম নিজেকে আবিষ্কার করে এক ভূগর্ভস্থ অন্ধকার কক্ষে বন্দী অবস্থায়। এক বিকৃত মস্তিষ্কের সাইকো এসে সেখানকার বন্দিদের চামড়া তুলে নিতে থাকে জ্যান্ত অবস্থায়। এই আধাঁর জগতে ভয়াবহ মানসিক চাপেও সেলিনা বেগম চেষ্টা করেন এই খুনির কাছে মাথানত না করার। অন্যদিকে নির্দিষ্ট একটা চক্র, পরিকল্পনা করছে বেশ বড় কিছুর। সেই চক্রের প্রধান মাস্টারের আদেশে তার পালকপুত্র, নিষ্ঠুর, নির্মম খুনি জন ডো কর্তব্য পালন করতে নেমে পরে। ঘটছে একের পর ঘটনা, জড়িয়ে যাচ্ছে বহু মানুষ সেগুলোর সাথে। তবে কি আড়াল থেকে নাটাই টেনে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে কোনো মাস্টারমাইন্ড? যদি তাই হয় কি তার আসল পরিচয়, কেনই বা সে করছে এসব? দানিয়াল কি পারবে তার মাকে ভয়ংকর বিপদ থেকে রক্ষা করতে? এই অরাজকতা থামবে কোথায় গিয়ে? এইসব প্রশ্ন, তার উত্তরের অন্বেষণ এবং সবশেষে আরও কিছু প্রশ্ন নিয়ে এম. জে. বাবুর 'অ্যানার্কিস্ট' সিরিজের বই 'ইনসেন্টিয়া', যাতে পাঠক দেখা পাবেন এক বিভৎস জগতের।
এম. জে. বাবুর 'অ্যানার্কিস্ট'এর জগতটার সাথে পরিচয় সিরিজের প্রথম বই 'দিমেন্তিয়া' দিয়ে। যদিও Welcome To The Dark World বলে বেশ আগ্রহের সাথে সে গল্প স্বাগত জানালেও শেষমেশ খুব একটা সুবিধার হয় নি। তাই পরবর্তীতে একটু কম এক্সপেকটেশন নিয়ে সিরিজের পরবর্তী বই 'অ্যাবসেন্টিয়া' পড়ে মোটামুটি ভালো লেগেছিল। সেই বইয়ের বিশাল এক ক্লিফ হ্যাঙ্গার দেখার পর সিরিজের পরবর্তী বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মাই। তবে এরপরের বই 'ইনসেন্টিয়া'য় লেখক সেটার সমাধান করার বদলে, সমস্যাটা আর অ্যানার্কিস্টের দুনিয়াটা কত বড় সেটা দেখাতেই যেনো ফিরে গেলেন অতীতে, যাতে দানিয়ালকে লড়তে হয়েছিল সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রুর বিপক্ষে।
ইনসেন্টিয়ার জগতটা বেশ বড়। সিরিজের আগের দুই বইয়ের মতো এটা শুধুমাত্র মামুলি সিরিয়াল কিলিংয়ের কাহিনী না। এতে এদেশের রাজনীতির জগতের ক্ষমতা দখলের নোংরা-হিংস্র খেলা, সমাজের বহুরূপী মানুষের মধ্যকার অন্ধকার অবতার থেকে শুরু করে ম্যানিপুলেশন, দেশের সর্বোনিকৃষ্ট অপরাধীদের ক্ষমতার চূড়ায় পৌছে যাওয়া, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে করা নানা অকাম কুকাম, বেশ কিছু সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়াবল�� আর পাওয়া যাবে অপরাধের এক সুবিশাল জগত। সেই ভয়ংকর জগতে আড়াল থেকে নাড়া দিতে থাকা এক বুদ্ধিমান শত্রু, যার পরিকল্পনা চরিতার্থের সাথে জড়িয়ে যায় দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল মানুষটিও।
তাই সর্বোপরি বইটা অনেকগুলো জনরার অর্ন্তভুক্ত। শুরুতে মিস্ট্রি থ্রিলার যা ক্রমে মোড় নেয় পুলিশ প্রসিডিওরাল থ্রিলারের দিকে, সেইসাথে গল্পে আসে পলিটিক্যাল থ্রিলার আর ক্রাইম ফিকশনের উপাদান, আর শেষ ১০০ পাতা পড়ে মনে হবে পিওর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। এই সুবিশাল পরিসরের গল্পটা একইসাথে গুছিয়ে আর আগ্রোহদ্দীপকভাবে বলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। এম. জে. বাবু সেই চ্যালেঞ্জখানা বেশ ভালোভাবেই অতিক্রম করেছেন। শুরুর দিকটাই একাধিক পক্ষের আগমন, তাদের ইন্ট্রোডাকশন আর কাহিনীতে ভূমিকা প্রতিষ্ঠার জন্যে লেখক একটু বড় সময় ধরে বিল্ডআপ করেছেন। সেই অংশটা পার হলে পাঠক কাহিনীর প্রতি বেশ ভালোভাবেই আকর্ষিত হবে। টান টান উত্তেজনা, রকেট গতির থ্রিল না হলেও কাহিনী বেশ সাসপেন্সের সাথে এগিয়েছে, পরে কি হবে তা নিয়ে মনে আগ্রহ থাকবে। এম. জে. বাবুর লেখা এমনিতেই বেশ সাবলীল, এই বইয়ে তা আগের চেয়েও বেশী পরিপক্ক বলাই বাহুল্য।
বিশাল পরিসরের এই গল্পের রহস্যটাকে ভালোমতো গড়ে তোলা হয়েছে। শুধুমাত্র শেষের দিকের কিছু টুইস্টকে কেন্দ্র করে নয়, বরং লেখক শুরু থেকেই প্রতিটা বিষয়ের রহস্যময়তাকে বেশ ভালোভাবেই উপস্থাপন করেছে, এবং স্তরে স্তরে একটা রহস্য সমাধান করে আরেকটা রহস্য তৈরি করেছেন। তাই গল্পের প্রতি আগ্রহটা সবসময় বজায় থাকে। সেই রহস্য সমাধানে পুলিশের তদন্তকার্যটা এক কথায় দূর্দান্ত হয়েছে। দিমেন্তিয়ার সেই দূর্বল ইনভেস্টিগেশন থেকে এই বইয়ের এমন ডিটেইলড আর নিখুঁত পুলিশ প্রসিডিওরাল, এই সিরিজে লেখকের উন্নতি দেখবার মতো। সবমিলিয়ে শেষের দিকে টুইস্টগুলো ভালো হয়েছে খুব। সেগুলো গতানুগতিক হু ডান ইটের বাইরে যাবার কারণে আরো বেশী ভালো লেগেছে। সাইকোলজিক্যাল টুইস্টগুলোর লজিক নিয়ে যদিও একটু সমস্যা আছে, তবে ফিকশন হিসেবে মেনে নেওয়া যায়। এই বইয়ের টুইস্টগুলো আসলেই ভালো হয়েছে, বিশেষ করে শেষেরটা একদম চমকে দিয়েছে।
লেখক দক্ষতা দেখিয়েছেন এবার চরিত্রায়নে। এই বইয়ে প্রচুর চরিত্র, যেগুলোকে কাহিনীর গুরুত্ব অনুযায়ী বেশ ভালোভাবেই গঠন করা হয়েছে। প্রোটাগনিস্ট মহলে দানিয়াল আর তার মা'র সেলিনা বেগমের মানসিক টানাপোড়েনটা চিত্রিত হয়েছে সুন্দরভাবে। সেইসাথে ডিবির পুলিশ অফিসার জাদিদ আর হায়দারকে ভালো লেগেছে। সাইড ক্যারেক্টরগুলো ছিল ঠিকঠাক, এরমাঝে কয়েকটা চরিত্র বেশ ভালোভাবেই ডেভেলপড হয়েছে, যেমন ঝুটন। তবে লেখল আসল দক্ষতা দেখিয়েছেন মূল অ্যান্টাগনিস্টের চরিত্রায়নে। স্পয়লারের কারণে বেশী কিছু বলছি না, তবে বাংলা মৌলিক থ্রিলারে এমন শক্তিশালী ভিলেইন খুব কমই দেখেছি। ভিলেইনদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডার্ক দর্শন দেখানো লেখক আগের দুই বইয়েও করেছেন, তবে হু ডান ইট রহস্যের জন্যে ভিলেইনের পরিচয় লুকোতে গিয়ে তাদের মোটিভ বা বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশটা খুব একটা ভালো হয় নাই। কিন্তু এমনটা হয়নি ইনসেন্টিয়াতে।
এই বইয়ের ভিলেইন আড়াল থেকে সব চরিত্রের জীবনে কোনো না কোনোভাবে প্রভাব রাখে, তার পরিকল্পনা বিস্তৃত সবকিছুর আড়াল থেকেই; ম্যানিপুলেটিভ, নিহিলিস্ট, নার্সিসিস্ট এই ভিলেইনের অন্ধকার মনস্তত্ত্বকে লেখক অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার ব্যাকস্টোরি পড়তে গিয়ে রীতিমতো গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে এই ভিলেইনের কাহিনী পড়তে গিয়ে আমার প্রিয় অ্যানিমে 'মন্সটার' এর জোহান লিবার্টের কথা মনে পড়ছিল খুব। আর তার অ্যানার্কিজম দর্শন থেকে সমাজের অনিয়ম মুছতে নৈরাজ্যের ভূমিকা, কিংবা নৈরাজ্যের মাঝে অন্তর্নিহিত সুযোগের ব্যাপারটা আসলেই ভাবাবে। আর হ্যাঁ, পুরো বই জুড়ে বেশ ভালো কিছু সংলাপ আর উদ্ধৃতি আছে। আর সবকিছু যেভাবে শেষ করা হয়েছে তা বেশ লেগেছে; কিছু রহস্যকে রেখে, কিছু নতুন রহস্যকে উত্থাপন করে বইটির সমাপ্তিও ভালো হয়েছে।
তবে কিছু বিষয়ে একটু সমস্যা রয়েই গিয়েছে। বিশেষ করে এম. জে. বাবুর লেখনীর কিছু চিরাচরিত সমস্যা– সর্বনাম ব্যবহারে দূর্বলতা, একই কথার রিপিটেশন, চরিত্রদের অভিব্যক্তির বর্ণনা ডিটেইলে দিতে গিয়ে ভজকট পাকানো। বিশেষ করে শুরুর দিকে গল্প যখন হেলে দুলে এগোচ্ছিল তখন এসব সমস্যার আধিক্য বেশী ছিল, তবে ধীরে ধীরে তা কেটে যায়। এছাড়া দানিয়াল বাদে প্রোটাগনিস্ট মহলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের মানসিক চিত্রায়ণ করলে ভালো হতো। দানিয়ালের চরিত্রটাও একটা পর্যায়ে একটু একঘেয়ে হয়ে পরে। আর মানিক চরিত্রটার উপস্থিতি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, গল্পে তার তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না, আর তার কাজকর্ম ছিল অতি বিরক্তিকর। তাছাড়া ডেসক্রিপটিভ ন্যারেটিভে লেখক কিছুটা দূর্বল, গল্পে দুটো ছোটখাটো অ্যাকশন আর চেজ সিনে তা বোঝা যায়। যদিও সবমিলিয়ে বইটা আমার খুব ভালো লেগেছে। লেখক যেভাবে 'অ্যানার্কিস্ট' সিরিজের বইগুলোতে নিজেকে ইমপ্রুভ করেছে, সে থেকে ধারণা করাই যায় যে আরও কিছু দুর্দান্ত থ্রিলার বই পেতে যাচ্ছি আমরা। সবমিলিয়ে আমি আশাবাদী।
📚 বইয়ের নাম : ইনসেন্টিয়া
📚 লেখক : এম. জে. বাবু
📚 বইয়ের ধরণ : ক্রাইম থ্রিলার, মিস্ট্রি থ্রিলার, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, পলিটিক্যাল থ্রিলার
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫