লেখক ল্যু আন্দ্রিয়াস-সালোমে (১৮৬১-১৯৩৭) ছিলেন অদম্য জ্ঞানপিপাসু এক নারী । ১৭ বছর বয়সে তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন এক ডাচ ধর্মযাজক । তারপর কে তাঁর প্রেমে পড়েননি? দার্শনিক ফ্রিডরিশ নিৎসে, কবি রাইনার মারিয়া রিলকে, মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও লেখক পল রি । সবাই তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছেন । সাড়া দেননি তিনি । শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেন অধ্যাপক কার্ল আন্দ্রিয়াসকে এই শর্তে যে, তাঁদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক থাকবে না । ল্যু সালোমে জানতেন নারীর স্বাধীন সত্তা কীভাবে রক্ষা করতে হয়। এই বই যেকোনো পাঠককে আগ্রহী করে তুলবে।
Anwara Syed Haq is a writer of Bangla literature. She has written a number of novels, short stories, children's books and also written a number of essays. She has been praised for using her knowledge of human psychology beautifully in her writings. She is a psychiatrist by profession.
After completing her SSC and HSC in Jessore, Haq moved to Dhaka in 1959 and enrolled in Dhaka Medical College. She obtained her MBBS degree in 1965. In 1973 went to the United Kingdom for higher education. After having completed her post graduate degree in medical psychiatry in 1982 she returned home from the UK. She has since then worked at a number of institutions, among which are Bangladesh Airforce, Dhaka Medical College and BIRDEM.
Haq's first short story "Paribartan" was published in Sangbad in 1954. From 1955 to 1957, she regularly wrote for Ittefaque's "Kachi Kanchar Ashor". Her first novel was published in Sachitra Shandhani in 1968. After her first novel, she has written a number of novels and short stories. Many of her novels are set in Dhaka and London where she spent much of her time. Her publications consist of twenty-five novels, three volumes of poems, eight collections of short stories, eight collections of essays, three autobiography volumes, two collections of travel writing, forty fictional stories for young readers.
আচ্ছা, আমি ল্যু সালোমের নাম জানতাম না কেন? এই মহীয়সী নারীর জীবন তো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়! বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা আছে, "ল্যু আন্দ্রিয়াস-সালোমে (১৮৬১-১৯৩৭) নারীর স্বাধীন সত্তার এক মূর্ত প্রতীক। জন্ম রাশিয়ায়। ১৭ বছর বয়সে এক ধর্মযাজকের কাছে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন সম্পর্কে পাঠ নেন। সালোমের প্রেমে পড়েন এই যাজক। তাঁকে এড়াতে সালোমে যান জুরিখে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ নেন। এরপর যান রোমে। সেখানে পরিচয় হয় দার্শনিক নিৎসে ও লেখক পল রির সঙ্গে। দুজনই সালোমের প্রেমে পড়েন এবং তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সালোমে তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণ না করে চলে যান জার্মানিতে। তিনি বিয়েতে আগ্রহী ছিলেন না। তা সত্ত্বেও অধ্যাপক ফ্রিডরিশ কার্ল আন্দ্রিয়াসের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সালোমে তাঁকে বিয়ে করেন এক শর্তে—তাঁদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক থাকবে না। সেই শর্ত পালন করেছেন আন্দ্রিয়াস। বিবাহিত সালোমের সঙ্গে কবি রাইনার মারিয়া রিলকের প্রেম হয়। এ সম্পর্ককে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হবে? তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডও। সেই প্রেমেই-বা কীভাবে সাড়া দিয়েছেন সালোমে? আসলে ল্যু সালোমে নিজের মতো করে জীবন যাপন করেছেন। তাঁর সেই ঘটনাবহুল ও বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে লেখা এই বই যেকোনো পাঠককে আগ্রহী করে তুলবে, আনন্দ দেবে।" কথা সত্য। বিপুল বিস্ময় নিয়ে বইটা পড়েছি।ল্যু সালোমে ছিলেন একাধারে সাইকো এনালিস্ট, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক।নিজের সমাজ ও সময়ের চেয়ে তিনি ছিলেন যোজন যোজন এগিয়ে।নারী বলেই কি ইতিহাস তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দ্যায়নি নাকি তার খামখেয়ালি জীবনযাপন এর জন্য দায়ী? ভেবে দেখার ও গবেষণার বিষয় বৈকি! আনোয়ারা সৈয়দ হকের গদ্য ভাষিক সৌন্দর্যে ভরপুর। তরতর করে পড়ে ফেলা যায়। বইয়ের অসম্পূর্ণতা একটাই -ল্যু সালোমেকে নিয়ে লেখিকার নিজস্ব কিছু মন্তব্য খাপছাড়া ও পরস্পরবিরোধী। এছাড়া পুরো বইটি অসাধারণ।
ল্যু সালোমে এমন একজন নারী যে ফ্রিডরিশ নিৎসের মতো দার্শনিক, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো মনোবিশারদ, রিলকের মতো কবি'র অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। এছাড়াও আরও অনেক নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্বের একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিল ল্যু সালোমে। নাট্যকার হপ্টম্যান সালোমের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে 'লাভলি পিপল' লিখে ১৯১২ সালে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। ল্যু সালোমের ভালোবাসার দাবানলে পুড়ে দার্শনিক পল রি, মনোবিজ্ঞানী স্কট আত্মহত্যা করেছে। এছাড়াও উনিশ শতকের ইউরোপের সকল দার্শনিক-সাহিত্যিক-শিল্পীরা সালোমের অনুরক্ত ছিল।
ল্যু সালোমে ছিল জ্ঞানসাধক, স্বাধীনচেতা, মুক্তচিন্তার দিশারি স্বাতন্ত্র্য ব্যক্তিত্বের স্বতৃবান। যে বিয়ে আর শারীরিক সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিল না; তাঁর বিশ্বাস ছিল ইন্দ্রিয় স্পর্শাতীত প্লেটোনিক ভালোবাসায়; যেখানে মনের সাথে মনের সম্পর্ক থাকবে, শরীরের স্পর্শ থাকবে না। সে চেয়েছিল পল রি আর নিৎসেকে সাথে নিয়ে তিন রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া করে সারাক্ষণ একসাথে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন নিয়ে আলোচনা করবে। যদিও সালোমের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল স্বল্পদিনের জন্য। ল্যু সালোমে, পল রি আর নিৎসের ত্রয়ী প্লেটোনিক ভালোবাসা সফল হয়নি। তাঁদের প্লেটোনিক ত্রয়ী ভালোবাসা বাস্তব রূপ দেখতে পারেনি।
পল রি আর নিৎসের মতো দার্শনিকের কামনার গ্রাসে সালোমে শেষ পর্যন্ত বিয়ে না করে থাকতে পারেনি। তাঁর প্রথম জীবনের শিক্ষাগুরু ধর্মযাজক ল্যু গিলেট, সাহিত্যিক বন্ধু পল রি, দার্শনিক নিৎসের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বহু ভাষাবিদ জ্ঞানবিশারদ ল্যু ফন আন্দ্রিয়াসকে ৩৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন সালোমে। কারণ তাঁদের রক্তে ছিল রাজপরিবারের ঘ্রাণ। দুজনেই ছিলেন রাজপরিবারের। একজন রাশিয়ার জেনারেলের জারের মেয়ে আর অন্যজন ইরানের রাজার বংশধর। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিল না; আমৃত্যু আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল দুজনে।
পল রি আর নিৎসে মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের অবসান হয় সালোমের জন্য। সালোমেকে পাওয়ার জন্য নিৎসে তাঁর বন্ধু পল রির লেখালেখির ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেয়। কারণ পল রির সদ্য প্রকাশিত বই 'অরিজিন অব কনসান্স' বের হওয়ার পর নিৎসে সমালোচনা করে বলে যে, পল রির বইটা যথেষ্ট একঘেয়ে আর বিরক্তিকর। একই সময়ে সালোমের লেখা 'স্ট্রাগলিং ফর গড' বইটা বেস্টসেলার হয়েছিল। নিৎসের সামান্য এই সমালোচনায় পল রির ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যায়। শেষমেষ রাগে, দুঃখে, হতাশায়, যন্ত্রণায় পল রি পাহাড়ে বেড়াতে গেলে সেখান থেকে পা পিছলে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। তবে সালোমে পল রির মৃত্যুকে আত্মহত্যা ভেবে সারাজীবন যন্ত্রণা পেয়েছে।
নিৎসের সাথে যখন সালোমের প্রথম দেখা হয় তখন নিৎসে অবাক হয়ে সালোমেকে বলে, "আকাশ থেকে যেন দুই উজ্জ্বল তারা খসে পৃথিবীর এইখানে মিলিত হয়েছে।" তাই ছিল তো। সালোমের সাথে পরিচয় হওয়ার পরই নিৎসের দ্বৈত সত্তা ডায়োনিসাস আরও বেশি উন্মোচিত হয়েছে। যেখানে ছিল- বেদনা আর আশীর্বাদের মিশ্রণের জয়োল্লাস। সালোমের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল বলেই তো আমরা নিৎসের কাছ থেকে জরথুস্ত্র নামক মহান গ্রন্থ পেয়েছি। যা পরবর্তীকালে পৃথিবীতে দর্শনের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।
সালোমের সাথে নিৎসের সম্পর্কের অবনতির নেপথ্যে ছিল নিৎসের বোন লিজবেথ। লিজবেথ সালোমের বিরুদ্ধে নিৎসের কাছে মিথ্যা অপবাদ দিতে দিতে সালোমের প্রতি নিৎসেকে অপরাগ করেছে। যার ফলে পরবর্তীতে নিৎসের সাথে সালোমের যোগাযোগ রক্ষা করা হয়নি। যদিও নিৎসে তাঁর মৃত্যুর আগে বোন লিজবেথের শয়তানি বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছিল। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিৎসের মৃত্যু সালোমেকে অসহ্য যন্ত্রণা দিয়েছিল।
জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে যার শৈশব ছিল চরম যন্ত্রণার আর বর্ণনাতীত আত্মপরিচয়হীনতার। যাকে কবি রূপে পৃথিবীর ইতিহাসে অমরতা দিয়েছে সালোমে। রিলকের সাথে সালোমের প্রথম পরিচয়ে রিলকে তাঁর ডায়েরিতে লিখে, "অনন্য ঘটনা, জন্মের মতোই অনন্য, যার প্রভাবে জীবনে আবার নতুনভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছিল। যার প্রভাব ছাড়া আমার লেখার অগ্রগতি হতো না।"
যে সালোমে জ্ঞানসাধনার লালসায় শারীরিক সম্পর্কে যেতে নারাজ ছিলেন সে সালোমেই তার থেকে ১৪ বছরের ছোট কবি রাইনার মারিয়া রিলকের প্রেমে পড়ে জীবনের প্রথম শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তারপর ডাক্তার পাইলেসের সঙ্গেও সালোমের শারীরিক সম্পর্ক হয় । এছাড়াও সালোমের সাথে তখনকার সময়ের বিশ্বখ্যাত বহু পুরুষ সাহিত্যিক, দার্শনিক, মনোবিশারদ, কবিদের ছিল দৃঢ় বন্ধুত্ব।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে রাইনার মারিয়া রিলকের 'দুইনো এলিজি' গ্রন্থের এলিজিগুলো এখন পড়ছি। রিলকের এলিজিগুলো লেখার অনুপ্রেরণা ছিল সালোমে। প্রথম এলিজির শুরুতেই সৌন্দর্য এবং প্রেমের ধ্বংসাত্মক আগমনের প্রশংসা করা হচ্ছে— "কেননা, সুন্দর আর কিছুই নয়, ভয়ংকরের সূচনা, যাকে এখনও পর্যন্ত আমরা সইতে পারি এবং পুজো করি, কারণ সে খুব শান্তভাবে আমাদের ধ্বংস করতে এগিয়ে আসে। প্রতিটি দেবদূতই ভয়ংকর ;"
দ্বিতীয় এলিজিতে সৌন্দর্য এবং প্রেমের দেবদূতদের স্বাগত জানাচ্ছে এভাবে — "প্রত্যেকটি দেবদূতই কি ভয়ংকর—তবু, তা সত্ত্বেও, হায়, হে প্রায়মৃত আত্মার পাখিরা আমার, তোমরা তা জেনেও আমি মিনতি করছি, তুমি এসো— হে ভালবাসার মানুষজন, তোমাদের কথা ওই দেবদূত যদি বুঝত, হয়তো তাহলে মধ্যরাতের বাতাসে ছড়িয়ে দিত বিস্ময়কর কথাগুলি, তার কারণ পৃথিবীর সমস্ত প্রয়াস আমাদের লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে চলেছে, ভালবাসা এবং বিদায় আমাদের কাঁধে হাত রাখে ভারহীন, আমাদের ছাড়া যেন অন্যকিছু দিয়ে তৈরি ওই ভালবাসা, ওই বিদায়"
আর ফ্রয়েড তো প্রথম দর্শনেই সালোমের প্রেমে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটা বক্তৃতা দেওয়ার সময় সালোমের চোখের দিকে চেয়ে বক্তৃতা দিতে হতো। যেদিন সালোমে না থাকতো সেদিন সালোমের বসা খালি চেয়ার থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বক্তৃতা শুরু করতো। সালোমের কারণে ফ্রয়েড তার অনেক ছাত্রকে বহিষ্কার করে। এমনকি স্কট নামের একজন ছাত্রকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে। ফ্রয়েডের ছাত্রদের অপরাধ ছিল এই, তারা কেন সালোমের সাথে গল্প করে। তার প্রিয় ছাত্র অ্যাডলার ছিল ফ্রয়েডের চোখের বিষ। কারণ সালোমে ফ্রয়েডের আলোচনা সভায় আসার পাশাপাশি অ্যাডলারের আলোচনা সভায়ও যেতো। কারণ অ্যাডলার ছিল ফ্রয়েডের মতো জ্ঞানী কিন্তু চিন্তায় বিরোধী।
যখন নিৎসে, রিলকে, ফ্রয়েডের মতো বিশ্বখ্যাত মানু্ষেরা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে তখন সে বুঝতে পারে যে পৃথিবীর সব পুরুষের কাছে নারীর জ্ঞান, সাধনা, কর্মস্পৃহার চেয়ে যৌন কামনার স্পৃহা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিশারদ ফ্রয়েড আর দার্শনিক নিৎসের বহু ত্রুটি জানা যাবে সালোমেকে জানার মাধ্যমে। মানুষ হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত বরণীয় মানুষেরাও যে সাধারণ মানুষের মতো ত্রুটিপূর্ণ তা উপলদ্ধি করা যাবে।
ফ্রয়েডের টেবিলের ডানপাশে যার ফ্রেমে বাঁধানো ছবি সবর্দা থাকতো, নিৎসে যার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একের পর এক বই লিখেছেন যা নিৎসেকে দিয়েছে অমরতা, রাইনার মারিয়া রিলকের কবি হওয়ার পিছনের যার একমাত্র অবদান, যার কথা আর কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে পেয়েছেন নোবেল প্রাইজ, সে আর কেউ নয়; সে ল্যু ফন আন্দ্রিয়াস সালোমে। একজন জ্ঞানসাধক স্বাধীনচেতা মুক্তচিন্তার অধিকারী বিশ্বের ইতিহাস তছনছ করা একমাত্র নারী। যার জন্য পৃথিবীর ইতিহাস বদলে গেছে, সময় স্তব্ধ হয়ে গেছে, জ্ঞানীরা তার পায়ের নীচে নতজানু হয়েছে।
সালোমের লেখা প্রতিটা গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে সকলের বিশেষ করে নারীদের জন্য আছে বিশাল অনুপ্রেরণা আর নিৎসে, ফ্রয়েড, রিলকের আত্মার স্পর্শ। যাকে না জানলে আমাদের কাছে বিশ্ব ইতিহাস পরিবর্তনের পিছনের গল্পটা অজানা থেকে যাবে৷
অনন্য এই বইটার মাধ্যমে ফ্রয়েড, নিৎসে, রিলকের কীর্তির নিচে বিলীন হয়ে যাওয়া, এখনও পর্যন্ত অবহেলিত ল্যু সালোমের বরণীয়-স্মরণীয় জীবনকে আমাদের সম্মুখে উন্মোচিত করার জন্য আনোয়ার সৈয়দ হকের প্রতি আমি অশেষ কৃতজ্ঞ। নানান রকম বইপত্র ঘেঁটে লেখক এখানে ল্যু সালোমের এমন এক জীবনী তৈরি করেছেন, যা কেবল তাঁর জীবনেই আবর্তিত থাকেনি, বরং এতে পাওয়া যাবে উনিশ শতকের ইউরোপের সাংস্কৃতিক চালচিত্রের খতিয়ান, আর নিৎসে, ফ্রয়েড, রিলকে, হপ্টম্যান, পল রি, স্বামী আন্দ্রিয়াস, ধর্মযাজক শিক্ষাগুরু গিলেট এবং বহু নোবেলজয়ী মনীষীর আত্মার ছোঁয়া।
ল্যু আন্দ্রিয়াস সালোমে-কে প্রতিটা বাঙালি নারীর পড়া উচিত। আজ আধুনিক যুগেও বাঙালি নারীরা ভীষণভাবে অবহেলিত। এখনও আমাদের পিতা-মাতা কন্যা সন্তান গর্ভে ধারণ করে গর্বিত হতে পারে না। ভীষণ লজ্জার ব্যাপার এটা। নারীদের জন্য ল্যু সালোমের থেকে বড় অনুপ্রেরণা আর কেউ হতে পারে না।
ল্যু সালোমের জীবন প্রতিটা নারীর জন্য আদর্শ হতে পারে। আনোয়ারা সৈয়দ হকের লেখা এই বইটা সবার জন্য অবশ্যপাঠ্য। বইটার মাঝখানে ল্যু সালোমে, ফ্রিডরিশ নিৎসে, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, পল রি, হাইনরিখ গিলোট, কবি রাইনার মারিয়া রিলকে, স্বামী ল্যু ফন আন্দ্রিয়াস, আর ল্যু সালোমের বইয়ের প্রচ্ছদ এবং সমাধির কিছু ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এই বইটাকে পূর্ণতা দিয়েছে। তবে বইয়ের শেষে কিছু বইয়ের রেফারেন্স দেয়া থাকলে আমার মতো পাঠকের অনেক উপকার হতো।
রিভিউ লেখার আগে রিলকের জীবন নিয়ে জাহানারা পারভীনের লেখা 'রিলকে নৈঃশব্দ্যে ও নিঃসঙ্গতায়' বইটা পড়েছি। যেখানে শিষ্য কাপুসের কাছে রিলকের লেখা ১০টি জীবনঘনিষ্ঠ চিঠি রয়েছে। চিঠিগুলো পড়ে মনে হয়েছে যেন আমার জন্যই লেখা। উপযুক্ত সময়ে চিঠিগুলো পড়ে নির্ভার হয়েছি। এজন্য হয়তো বলা হয়ে থাকে যে, 'প্রতিটা বই তার পাঠক খুঁজে নেয়।' অষ্টম চিঠিতে কাপুসকে উদ্দেশ্যকে করে রিলকে বলেছেন— "বিষণ্নতা, দুঃখ, হতাশা, অস্বস্তি থেকে দূরে সরে থাকতে চাও? তুমি জান না তোমার মনে এরা কত বড় ভূমিকা রাখছে। এসব কেন ঘটছে, এর গন্তব্যইবা কোথায়? এসব ভেবে অযথা কেন হয়রান হচ্ছ? কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব এসব তত্ত্ব নিয়ে অযথা মাথা ঘামিও না। শুধু জেনে রেখো, তুমি একটি পরিবর্তিত অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ; পরিবর্তিত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছ। আর এই পরিবর্তন ছাড়া তেমন কোনো প্রত্যাশাও ছিল না তোমার। তোমার আচরণে বা প্রতিক্রিয়ায় যদি কোনো অস্বাভাবিকতা থাকে, মনে রেখো, রোগমাত্রই জীবাণু থেকে মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। রোগ থেকে সেরে ওঠার জন্য অসুস্থতাকে প্রশ্রয় দেয়া চাই।"
এই বইটা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্রয়েডের স্বপ্ন, যৌনতা আর মনঃসমীক্ষার তিনটা বইও কিনে ফেললাম। ভবিষ্যতে তো নিৎসে, রিলকে, ফ্রয়েড, সালোমে, পল রি সবই পড়া হবে আমার। সেক্ষেত্রে এই বইটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
ল্যু আন্দ্রিয়াস সালোমের বায়োগ্রাফি মুভি 'Lou Andreas-Salomé, The Audacity to be Free' শীঘ্রই দেখবো। মুভিটা দেখে রিভিউ লেখা উচিত ছিল। মুভি দেখে রিভিউ আরও বর্ধিত করতে পারি।
এই বইটা রেকমেন্ড করার জন্য প্রিয় হারুন ভাইয়ার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞ। আর পড়তে প্যারা দেওয়ার জন্য শিপন ভাইকে ধন্যবাদ।
ল্যু সালোমে, আশ্চর্য এক নারী! নাকি নারী মাত্রেই আশ্চর্য ঠেকে পুরুষদের কাছে যারা নারী নামক মনুষ্য প্রজাতির অপর অংশকে নিজ কল্পনা, কাম আর অধিকারের চেষ্টায় অহেতুক রহস্যাবৃত করে রেখেছে। উক্ত গ্রন্থটি পাঠ শেষে আমার নারী বিষয়ক ধ্যান-ধারণা খানিকটা হলেও পালটেছে। সৈয়দ আনোয়ারা হকের চমৎকার গদ্যে বইখানি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাগরপাড়ের একটা ছোট্ট গাঁ। নাম গোবেল বীচ। জর্জ গোবেলের নানার-নানার-বাবার নামে সেই গাঁ আর সমুদ্রবক্ষে অদূরে থাকা একটি দ্বীপ। যে দ্বীপের মালিক ও জর্জ গোবেল। জর্জ গোবেল বলে আসলে কেউ নেই। জরজিনা পারকার তার নাম। টমবয় মেয়েটি কেন নিজের নাম জর্জ বলত আর নিজেকে ছেলেদের সাজে সাজিয়ে রাখত এর অনুসন্ধানে পাওয়া যায় এক করুণ গল্প। তার এক ভাই হয়ে মারা যায়, পরবর্তীতে জিনার জন্ম। তার মা-বাবা তাকে দিয়েই ছেলেসন্তানের আক্ষেপ পূরণ করেন৷ অনেক পরে নিজেকে ফিরে পায় জিনা। মেয়েলি হাব-ভাবের চাইতেও নারীসুলভ বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতিতে৷ ল্যু সালোমের গল্প বলতে গিয়ে তিন গোয়েন্দা সিরিজের কাল্পনিক চরিত্র জিনার কথা বলছি কারণ ল্যু সালোমের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে জরজিনা পারকারের মিল আছে। জিনা আমার অত্যন্ত প্রিয় চরিত্র হওয়ায় আমি প্রায়ই চরিত্রটির মনস্তত্ত্ব বুঝতে চেষ্টা করতাম। ল্��ু সালোমে পড়তে গিয়ে সেই সূত্রটাই হঠাৎ যেন চোখে পড়ল। ল্যু সালোমে এমন একজন নারী যিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন৷ মায়ের ভাবনার বিপরীতে গিয়ে মেয়ে হয়ে জন্মানোটা তাঁকে আমৃত্যু পীড়া দিয়েছে৷ এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ভুগে নিজে নারী এই ভাবনাটাই তিনি ভাবতে চাইতেন না। জ্ঞান, দর্শন, শিল্পের প্রতি অদম্য স্পৃহা থাকা মানুষটির প্রেমে পড়েছিলেন নিৎসে, পল রি, ফ্রয়েড, রিলকে প্রমুখ বিখ্যাত ব্যক্তিরা। তাঁকে অনুপ্রেরণা মেনেছেন৷ সাহচর্যে লাভ করেছেন নবজীবন ধারা। যৌনতাকে এক ধরনের ভীতির চোখেই দেখতেন সালোমে৷ আর তাই বিবাহিত জী���নে একটিবারও স্বামীর সঙ্গে সহবাস করেন নি৷ অদ্ভুত ফ্যান্টাসিতে ভোগা মানুষটির জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার অভাব ছিল না৷ অথচ তিনি কি উল্লিখিত ব্যক্তিদের মতো পরিচিত বা বিখ্যাত? এর কারণ কি তিনি নারী? হয়তো তাই৷ কারণ দুর্বোধ্য সালোমেকে তাঁর বন্ধুদের কেউই পুরোপুরি বুঝতেন না৷ আর নারীরা তাদের সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সত্ত্বেও সেরা পুরুষদের চোখেও অনেক সময় স্নেহ-ভালোবাসার আধার রূপেই ধরা পড়েন৷ এটা দু:খজনক৷ কিন্তু সেই যুগে ল্যু সালোমের কাজ এবং জীবনযাপন ছিল গোটা সমাজব্যবস্থার মুখে একটা চপেটাঘাত। নীরবে নিভৃতে নিজের জীবন এবং কাজের মাধ্যমেই প্রতিবাদের এক অনন্ত শিখা জ্বালিয়ে রেখে গেছেন এই মহিয়সী নারী।
রিলকের সাথে এই মহিলার কাজ-কাম পড়ার পর মনে মনে একটা কথাই বারবার বলতে হয়েছে, বেডি মানুষ, হা হা হা। [আমার এবং আপনার হাতে দুটো চায়ের কাপ কল্পনা করে নেন]
মানে, বেডি মানুষরা(বেশিরভাগ) যে আসলে কী চায় তা এরা নিজেরাও জানে না। জীবন সম্পর্কে, প্রেম সম্পর্কে, ভালোবাসা সম্পর্কে, নিজের চাওয়া সম্পর্কে, নিজের আবেদন সম্পর্কে, নিজের অধিকার সম্পর্কে, নিজের রাগ, ঘৃণা সব কিছু সম্পর্কে এদের কোন স্পষ্ট ধারণা নাই।(অনেক বেডা মানুষও এরকম অবশ্য)
যাই হোক, বইয়ের কথায় আসি। বইয়ের নাম ল্যু সালোমে এবং নিৎসে, রিলকে ও ফ্রয়েড । নাম পড়েই বোঝা যাচ্ছে, ল্যু সালোমে এমন একজন নারী যার সাথে এই তিন বিখ্যাত ব্যাক্তির সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কেমন সেই সম্পর্ক? সেই সম্পর্কের গভীরতা ছিল কতটুকু? সেই সম্পর্কের ধরণটাই বা ছিল কেমন? সেই সম্পর্ক থেকে ল্যু সালোমে কী চেয়েছিল এবং তার সাথে যারা সম্পর্কে যুক্ত ছিল তারাই বা কী পেয়েছিলো এবং চেয়েছিল? একজন নারী তার জ্ঞানের সর্বচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার পরও, এতো বড় মাপের মানুষদের সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার পরও তার নিজের সম্পর্কে, তার নিজের চাওয়া সম্পর্কে যে অস্পষ্টতা আমি দেখলাম (বইয়ের কল্যাণে) তা আমার ভিতর নারীজাতির প্রতি অনেকটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
বিউটি উইথ ব্রেইন বলতে একটা কথা আছে। এ দুটোর কম্বিনেশন সাধারণত হয় না। কিন্তু ল্যু সালোমে মাঝে এ দুটোর কম্বিনেশন ছিল এবং এই কম্বিনেশন নিয়ে এই নারী পুড়িয়ে দিয়েছে তার চারপাশের সকল যুবকের চোখ, হৃদয়। অধরা ভালোবাসার আগুন বিলিয়ে দিয়েছে তার চারপাশের সকল পুরুষের হৃদয়ে। জীবনকে চিন্তার ছাঁচে গড়তে চেয়েছিলেন ল্যু সালোমে, আবেগের গলা টিপে ধরে সে তার জীবন সাজাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আসলেই কি পেরেছিলেন? কেউ কি পারে? পারা কি উচিত? পরিপূর্ণ মানুষ হওার জন্য আবেগর মত ক্ষতিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যপারটাকে কি চাইলেই আমরা গলা টিপে মেরে ফেলতে পারি?
Pride and Prejudice বইয়ের প্রথম লাইনের সাথে অনেকেই পরিচিত, "It is a truth universally acknowledged, that a single man in possession of a good fortune, must be in want of a wife". লেখিকা যদি ল্যু সালোমে কে নিয়ে কোন উপন্যাস লিখতেন, তাহলে লিখতেন, "It is a truth universally acknowledged, that a single woman in possession of a good fortune, must be in want of a husband. যাই হোক, বই পড়ার পর আফসোস হচ্ছিলো, কেন এই নারীর নাম আমি আগে শুনি ই নাই আর কেন এই বই আগে পড়ি নাই! যে সকল নারীরা একটু(অথবা অনেক) স্বাধীনচেতা, সংগ্রামী, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সৎ সাহস রাখেন, তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য বই।
পুরো বইটা কন্টেন্ট হিসেবে ৪/৫ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। লেখিকার লেখার ধরন খুব সাবলীল, কিন্তু একই কথার রিপিটেশন আসছে কয়েক যায়গায়। শুধু রিপিটেশন না, হুবহু একই বাক্য উনি ব্যবহার করেছেন, মনে হচ্ছিলো যেন Déjà vu. তার পর উনি বছরের হিসাবে উলটা পালটা লিখেছেন। বইয়ের শেষের দিকে এসে ল্যু সালোমের মৃত্যুর কথা লিখে আবার তার জীবনের কথা লিখা শুরু করলেন, তার স্বামীর মৃত্যুর কথা লিখে আবার তার স্বামীর বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে লিখতে শুরু করলেন। টাইম ফ্রেমিং নিয়ে লেখিকার আরেকটু যত্ন নেওয়া উচিত ছিলো। এর জন্য এক তারা কম দিলাম।
বইয়ের কিছু ভালো লাগা লাইনঃ উন্মাদনাপূর্ণ জীবন, আত্মহারা আনন্দ ও স্ফূর্তির তুঙ্গে যখন মানুষ ওঠে, তখনই অনুতাপ, অনুশোচনা এবং ক্ষতির পদধ্বনি শোনা যায়। - নিৎসে
আনন্দের ভেতরেই ব্যথা এবং অনুশোচনার জন্ম। - নিৎসে
ঘনিষ্ঠ যেকোনো সম্পর্ক মানুষের অন্য কাজের সময় খেয়ে ফেলে, সম্পর্কের মহিমা বজায় রাখতে গিয়ে আর অন্য কোনো কিছুর দিকে গভীরভাবে মনোযোগ ধরে রাখা যায় না।
হয়তো কালজয়ী প্রতিভার প্রশংসা করা এক জিনিস, সেই কঠিন প্রতিভার সঙ্গে ঘর করা আরেক জিনিস।
মানুষের শরীরের অসুস্থতা তার মনের ওপরে ভীষণ ইতিবাচক এক প্রভাব ফেলতে পারে। এবং অসুখ থেকে আরোগ্য লাভের সময় মানুষ নতুন অভিজ্ঞান সঞ্চয় করতে পারে। যেন কষ্টের নির্বাণ ঘটে যাওয়ার পর সেই পুড়ে যাওয়া ছাই থেকে বেরিয়ে আসে নতুন আরেকজন মানুষ।
জীবনের সমস্ত পথ, এমনকি বিভ্রান্ত একটি পথও পরিপূর্ণতা পায় যখন সেটি এমন এক নারীর কাছে গিয়ে শেষ হয় যে নারী হয় বিদগ্ধ ও শান্ত, এবং বিশাল, যেন গ্রীষ্মের রাতের মতো, যে পুরুষের সমস্ত কথা শোনে, সমস্ত কিছু উপলব্ধি করে। - ল্যু সালোমেকে লেখা রিলকের চিঠির অংশ।
মানুষের মূল্যবোধ এবং যৌনতা একটা সমঝোতার ভেতর দিয়ে চলে, যখন এই সমঝোতার ভেতরে ভুল-বোঝাবুঝি হয়, তখনই মানুষের ভেতরে শুরু হয় দ্বন্দ্ব এবং তখনই মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
শোক শুধু প্রিয়জন হারিয়ে ফেলার আবেগময় আচ্ছন্নতা নয়, এটা হলো হারিয়ে ফেলা মানুষটির সঙ্গে আবিশ্রান্ত কথোপকথন।
মানবজীবন একই সঙ্গে দ্বৈত জীবন যাপন করতে ভালোবাসে। একদিকে তার আবেগ, আরেক দিকে তার বাস্তবতা।
পুরুষ সত্তা হলো সক্রিয় এবং গতিশীল, নারীসত্তা হলো পুরুষের সক্রিয়তাকে পূর্ণতার সঙ্গে আলিঙ্গনকারী। পুরুষের সৃজন হচ্ছে বাস্তবমুখী, নারীর সৃজন হচ্ছে স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত; যেমন গাছ থেকে ফল পেকে পড়ে যায় মাটিতে। পুরুষ এবং নারী ভিন্নভাবে সৃজন করে, এখানে কেউ কারও চেয়ে ছোট নয়।
জীবনে অর্ধেক মানুষ হয়ে কখনোই বাঁচবে না, বাঁচবে সৌন্দর্য এবং পূর্ণতার ভেতরে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে। - নিৎসে
ফুলের বাগানের একমুঠো ফুল মানুষকে ফুলের সৌন্দর্য দেখাতে সক্ষম। কিন্তু আমরা যদি বাগানে প্রবেশ না করি এ কথা ভেবে যে বাগানের সব ফুল আমি মুঠোয় ভরতে পারব না অথবা আমাদের একমুঠো ফুলকেই যদি সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে বলি, এটাই হলো পুরো বাগানের ছবি, তখন এ ফুলের মহিমা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। আমাদের কাছে সে মহিমা অচেনা থেকে যায়। আমরা তখন একাকী হয়ে যাই।
মায়া অ্যাঞ্জেলোর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে— "Each time a woman stands up for herself, without knowing it possibly, without claiming it, she stands up for all women." "যখনই একজন নারী নিজের জন্য দাঁড়ান, সম্ভবত তিনি না জেনে, দাবি না করেই, সকল নারীর জন্য দাঁড়ান।"
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর ইউরোপে এই উক্তিটির মূর্ত প্রতীক ছিলেন ল্যু আন্দ্রেয়াস-সালোমে। রুশ বংশোদ্ভূত এই অসামান্য নারী ছিলেন একাধারে লেখিকা, দার্শনিক এবং মনোবিজ্ঞানী। তিনি কেবল প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহই করেননি, বরং তাঁর মেধা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে তৎকালীন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ তিন পুরুষ নিৎশে, রিলকে এবং ফ্রয়েডকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন।
ল্যু সালোমে ছিলেন স্বাধীন চেতনার অগ্রদূত। তাঁর জীবন ও দর্শনকে তাঁর নিজের বলা কিছু উক্তির মাধ্যমে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়-
"নারীত্বের সবচেয়ে বড় ধর্ম হলো নিজের সত্তাতে বিশ্বস্ত থাকা। বাইরের কোনো সংজ্ঞা দিয়ে নিজেকে মাপতে নেই।" তিনি কোনো পুরুষের জীবনের 'অনুপ্রেরণা' বা 'মিউজ' হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চাননি, বরং তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার নিজের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে চেয়েছি।"
তাঁর মতে, "মুক্তি মানে পুরুষের কাছ থেকে স্বাধীনতা নয়, মুক্তি মানে নিজের মনের শৃঙ্খল ভাঙা এবং নিজের পথ নিজে তৈরি করা।" তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনকে ভয় না পেয়ে তাকে গ্রহণ করাই আসল সাহসিকতা। প্রেমের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও আধ্যাত্মিক। তিনি বলতেন, "প্রেম আমার কাছে আত্মার মিলন, শরীরের দাসত্ব নয়।" তিনি এমন এক সম্পর্কের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে দুজন দুজনকে জানবে, কিন্তু কেউ কারো ওপর অধিকার ফলাবে না। কারণ তাঁর ভাষায়, "স্বাধীনতাই হলো সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ শর্ত।"
ল্যু সালোমের জীবন ছিল ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি তাঁর সময়ের তিনজন যুগান্তকারী চিন্তাবিদের জীবনে ধ্রুবতারার মতো ছিলেন।
১৮৮২ সালে ল্যু সালোমের সাথে নিৎশের পরিচয় হয়। নিৎশে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বে এতটাই মুগ্ধ হন যে, তাঁকে 'সবচেয়ে স্মার্ট নারী' হিসেবে অভিহিত করেন এবং একাধিকবার বিবাহের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সালোমে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি বিবাহকে তাঁর স্বাধীন সত্তার পরিপন্থী মনে করতেন।
এই প্রত্যাখ্যান নিৎশের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং তাঁর মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। তবে অনেক মনে করে এই মানসিক আলোড়ন ও বিচ্ছেদের বেদনা থেকেই নিৎশে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'Thus Spoke Zarathustra' রচনার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে সালোমে নিৎশের দর্শন নিয়ে “Friedrich Nietzsche in seinen Werken” নামে একটি বই লেখেন, যা নিৎশের কাজের অন্যতম সেরা বিশ্লেষণ হিসেবে স্বীকৃত।
বিখ্যাত কবি রিলকের সাথে সালোমের সম্পর্ক ছিল প্রেম, বন্ধুত্ব এবং গভীর আধ্যাত্মিকতার এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ। বয়সে রিলকে ছোট হলেও সালোমে ছিলেন তাঁর মেন্টর ও প্রেমিকা। সালোমের অনুপ্রেরণাতেই রিলকে নিজের নাম পরিবর্তন করেন এবং রাশিয়া ভ্রমণ করেন, যা তাঁর কাব্যিক সত্তাকে নতুন রূপ দেয়। রিলকে সালোমেকে তাঁর 'অমরত্বের রহস্য' বলে অভিহিত করতেন এবং তাঁর অনুপ্রেরণাতেই বিখ্যাত 'Book of Hours' রচনা করেন।
জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে সালোমে মনোবিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শিষ্য হন। ফ্রয়েড তাঁকে কেবল একজন ছাত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন অত্যন্ত মূল্যবান সহকর্মী হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। সালোমে 'নার্সিসিজম' এবং মেয়েদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তিনি ছিলেন প্রথমদিকের সফল নারী মনোবিশ্লেষকদের একজন, যার বিশ্লেষণাত্মক গভীরতা ফ্রয়েড নিজেও স্বীকার করতেন।
ল্যু সালোমে তাঁর জীবনকে নিজের শর্তে সাজিয়েছিলেন। তাঁর বিবাহিত জীবনও ছিল শরীরী সম্পর্কহীন, নিছক বন্ধুত্ব ও বৌদ্ধিক সাহচর্যের ওপর ভিত্তি করে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একজন নারী কেবল তাঁর রূপ দিয়ে নয়, বরং তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনা দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
তাঁর লেখা “Der Mensch als Weib” নারীত্বকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ মানবসত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে। নিৎশে, রিলকে বা ফ্রয়েডের প্রভাব তাঁর ওপর থাকলেও, তাঁর চিন্তার স্রোত সবসময় ছিল তাঁর নিজস্ব। তিনি ছিলেন সেই নারী, যিনি নিজের জন্য দাঁড়িয়ে প্রকারান্তরে সকল স্বাধীনচেতা নারীর জন্যই দাঁড়িয়েছিলেন।
জগতে আমার মতন নবিশ পাঠকরা মূলত সুন্দর কভার দেখেই বই কেনে। কেননা, শত শত বইয়ের মাঝে বাছাই করা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। অলস ব্যক্তির বই পড়তেই অর্ধেক প্রাণ যায়, খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতন বই খুঁজতে গেলে তো বাকিটা কবেই নির্বিশেষ হয়ে যেত। আর "ল্যু সালোমে" নামটা এই বই হাতে তুলে নেয়ার যথেষ্ট না। বরঞ্চ সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সালোমের পরের তিনজনের নাম। নিৎসে, রিলকে ও ফ্রয়েড - এই তিনজনের নাম শুনে নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আকর্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে বাঘা বাঘা লেখক, কবি, মনস্তত্ববিদ, দার্শনিক নীল চোখা এই নারীর প্রেমে পড়েছেন। অদম্য জ্ঞানপিপাসু এই নারী যদিও শেষে বিয়ে করেন অধ্যাপক কার্ল আন্দ্রিয়াসকে, তবে শর্ত ছিল ভয়ংকর। তাদের মধ্যে থাকবে না কোন শারীরিক সম্পর্ক। ল্যু সালোমের নাম কিন্তু শুরুতে ল্যু সালোমে ছিল না। রাশিয়ান জারের জেনারেল পিতার দেয়া নাম ছিল মূলত লোলা। সেই নামকে খোলনলচে বদলে দেন সালোমের জীবনের প্রথম এবং মোড় ঘুরিয়ে দেয়া শিক্ষক পাদ্রী গিলোট। লোলা থেকে পরিবর্তন করে ল্যু তে, ছেলেদের নামের মতন। সালোমের মায়ের ইচ্ছে ছিল, হাফ ডজন ছেলের জন্ম দেয়া, সালোমের কারণে সেই ইচ্ছেতে ভাটা পড়ে। তাই হয়ত পরবর্তীতে নিজের নাম ছেলেদের মতন পরিবর্তন করে পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। পাদ্রী গিলোটের কাছে লুকিয়ে লুকিয়ে শিক্ষালাভ শুরু করেন সালোমে। সালোমের মেধায় মুগ্ধ হয়ে তাকে দীক্ষার দান আন্তরিকতার সাথেই নেন গিলোট। কিন্তু, ঈশ্বর তুল্য সেই গুরু যখন ল্যু সালোমের প্রেমে পড়েন তখনই ল্যু সালোমের মনস্তত্ত্বের এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে, সামনে আকাশ থেকে মর্ত্যের পৃথিবীতে আছড়ে পড়লেন গিলোট। গিলোট থেকে বাঁচতে সালোমে মাকে নিয়ে পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। সেখানে অত্যধিক অধ্যয়ন ও ঠান্ডা আবহাওয়ার দরুন অসুস্থ হয়ে যান সালোমে। তাই হাওয়া পরিবর্তনের জন্য তাকে নিয়ে ইতালি তে পাড়ি জমান তাঁর মা। দৃশ্যপটে তখন আগমণ ঘটে দার্শনিক পল রি এর। পল রি এর সাহচর্যে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে একসাথে থাকার প্রস্তাব দেন সালোমে। কিন্তু, তাদের মধ্যে থাকবে না কোন শারীরিক সম্পর্ক, তাদের সম্পর্ক হবে শুধুই জ্ঞানের। প্রস্তাবে হতভম্ব পল রি এ কাহিনী জানান তার জার্মান বন্ধু ছিলেন ফ্রিৎসেকে। ফ্রিৎসে ই জগদ্বিখ্যাত নীৎসে। তিনি তখন পৃথিবী ভ্রমণের উদ্দ্যেশে বেরিয়েছেন। বন্ধু পল রি এর অনুরোধে রোমে আসেন তিনি। কাহিনীতে আবির্ভাব ঘটে আরেক মহারথির। নিৎসে এর জীবন এবং দর্শনচর্চা নিয়েও বেশ খানিক আলোচনা রয়েছে। নিৎসের বয়সের সাথে সাথে মনস্তাত্ত্বিক বৃদ্ধির যে বর্ণনা এসেছে তা আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে৷ তাকে নিয়ে সালোমে বলেছেন, "নিৎসের অন্তর্জগৎ এতখানি জীবন্ত ছিল যে বাইরের পৃথিবী সেখানে মূল্যহীন হয়ে পড়ত।" নিৎসের জীবনের প্রথম বই, "দ্য বার্থ অফ ট্র্যাজেডি" তে তিনি লিখেন, "উন্মাদনাপূর্ণ জীবন, আত্মহারা আনন্দ ও স্ফুর্তির তুঙ্গে যখন মানুষ উঠে, তখনই অনুতাপ, অনুশোচনা এবং ক্ষতির প্রতিধ্বনি শোনা যায়।" ফ্রয়েড এবং রিলকে দুজনই এই মতবাদে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সবচেয়ে অবাক হয়েছি এটি জেনে, নিৎসের আপন বোন লিজবেথ নিৎসের মৃত্যুর পর পান্ডুলিপি পরিবর্তন করে নিজের চিন্তাধারা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যার ফলে বদনাম হয় নীৎসে এর। এমনকি সালোমের সাথে সম্পর্কতেও বাগড়া দেন তিনি। হয়তো সিবলিং জেলাসি কাজ করেছে এখানে। নীৎসের সাথে পরিচয় হবার এক পর্যায়ে তিনি পল রি কে আমন্ত্রণ জানান তারা যেন এক বাসা নিয়ে তিনজন একসাথে বসবাস করেন জ্ঞানচর্চার তাগিদে। তখনকার ইউরোপে যেখানে মেয়েদের উচ্চশিক্ষাই ছিল নিষিদ্ধ, সেখানে একসাথে তিন��ন থাকা নিয়ে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। তারা একদিন স্টুডিও তে ছবি তুলতে গিয়ে দেখতে পান ঘোড়াচালিত চাকাওয়ালা একটা ঠেলাগাড়ি। ঘোড়া অবশ্য ছিল না। সালোমে শখ করে গাড়োয়ান এর ভূমিকা নিলেন, একি হাতে চাবুক, আরেক হাতে লাগাম। আর দুই বন্ধু হলেন সেই ঘোড়া। ছবিটি নিঃসন্দেহে তারুণ্যের ছেলেমানুষি ছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু সমাজে হৈ চৈ পড়ে যায়, যে এক ভিনদেশী নারী দুজনকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে৷ ছবির আদলে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন ও আঁকা হয়েছে তাদের নিয়ে। এরই মাঝে সালোমে কি ঘিরে নীৎসে এবং রি এর মাঝে ঘটতে থাকে টানাপোড়েন। নীৎসে সালোমে কে ভালবেসে ফেলেছিলেন, রি তা জেনেও সালোমে কে বুঝান নিৎসে শুধু শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতেই ইচ্ছুক। তিনি আশ্রয় নিলেন সে বিখ্যাত উক্তির, প্রেম ও যুদ্ধে কোন নৈতিকতার স্থান নেই। নিৎসের সাথে সম্পর্ক তাই চূড়ান্তভাবে খারাপ পর্যায়ে যায় সালোমের। রি ও সা��োমে দুজন পাড়ি জমান জার্মানি তে। একই বাড়িতে বসে লেখা শুরু করেন দুজন। ১৮৮৪ সালে সালোমের লেখা "স্ট্রাগলিং ফর গড" বেরোনোর পর বেস্ট সেলার হয়ে যায়। কিন্তু পল রি এর লেখা "অরিজিন অব কনশান্স" নাম করতে পারল না। সবচেয়ে বাজে মন্তব্য করে রি এর বন্ধু স্বয়ং নীৎসে। হয়তো সেখানে পুরনো ক্রোধ কাজ করেছিল। রি এর ক্যারিয়ার যেন নষ্ট হয়ে গেল, এরই মাঝে সালোমের চেয়ে দশ বছর বড় অধ্যাপক কার্ল আন্দ্রিয়াস সালোমের বই পড়ে মুগ্ধ হয়ে তার দোরগোড়ায় হাজির হলেন। তিনি অর্জনও করে নেন সালোমে কে। ১ বছরের মাথায়ই বিয়ে করেন তাঁরা। রি কে সালোমে তাদের সাথে রাখতে চাইলেও তিনি নিঃশব্দে মেডিকেল স্কুলে চলে গেলেন। শেষ বয়সে এসে সালোমে ফ্রয়েড এর সাথে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। ব্যক্তিত্বের জাদুময় আকর্ষণ তখনো শেষ হয়নি। ভিয়েনায় পৌঁছেই তিনি সাহসী মুখে ঘোষণা দিলেন, সাইকোঅ্যালালিসিসের কাজ করবেন যাকে ফ্রয়েড স্বয়ং বলতেন, নোংরা কাপড় পরিষ্কার করা। অদ্ভুত এক নারী ল্যু সালোমে। যারই সান্নিধ্যে এসেছেন, করেছেন মুগ্ধ। নিজের ব্যক্তিত্বে মাতিয়ে রেখেছেন গুণধর সব মানুষকে। এই বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় যদি কেউ ল্যু সালোমের মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব এবং তাকে ঘিরে থাকা বিখ্যাত সব ব্যক্তির কাহিনীতে সীমাবদ্ধ রাখেন তাহলে রচনার মূল কৃতিত্ব হারাবে। আনোয়ারা সৈয়দ হক শুধু এক মলাটে ল্যু সালোমে কে আনেন নি, পল রি, নিৎসে, রিলকে ও ফ্রয়েড কেও টেনেছেন। জ্ঞানচর্চায় মহারথিদের নিজস্ব চিন্তাধারা, তাদের জীবনের কিছু চুম্বকাংশ ও তাদের মানসমনের ছবি এঁকেছেন। সৈয়দ হকের লেখনী বেশ। সুলিখিত এই বইটি মূলত এক নারীর ধর্ম থেকে ভালবাসা, যৌনতা, পুরুষ সঙ্গ যাবতীয় বিষয়ে মানসিক অবস্থার ভাঙ্গা গড়া, মনস্তাত্ত্বিক পুননির্মাণের আখ্যান। নারীর মনস্তত্ত্ব আসলেই পৃথিবীর জটিলতম রহস্যের একটি, যার খন্ডন নীৎসে কিংবা ফ্রয়েড এর মতন জ্ঞানী ব্যক্তির দ্বারাও সম্ভব হয়নি। বইটি আরোও বেশি প্রচারণা পেতে পারত, রোমাঞ্চকর এক জীবনকাহিনী ল্যু সালোমের!
ল্যু ফন আন্দ্রিয়াস সালোমে বা ল্যু সালোমে, ডাকনাম লোলা। রাশিয়ান এক সাইকোএনালিস্ট, দার্শনিক ও সাহিত্যিক। অদ্ভুত স্বভাবের দৃঢ় প্রত্যয়ী ও প্রচন্ডরকম স্বাধীনচেতা। নতুন নতুন জ্ঞান আহরণের প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ। তৎকালীন রক্ষনশীল সমাজ ল্যু'র এই অদম্য ইচ্ছাকে কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারে না। ১৭ বছর বয়সে বাড়ির সবার কাছ থেকে লুকিয়ে এক ধর্মযাজকের কাছ থেকে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের পাঠ নেন। ল্যু'র আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর তীব্র জ্ঞানস্পৃহা দেখে ল্যু'র প্রেমে পড়েন সেই যাজক, নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ল্যুকে বিয়ে করতে চান। তাকে এড়াতে মা'কে নিয়ে জুরিখ পাড়ি দেন ল্যু। সেখানে এসে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। একে একে পরিচয় হয় বিশ্ববিখ্যাত সব ব্যক্তিদের সাথে। দার্শনিক ফ্রেডরিক নীটশে'র সাথে ল্যু'র ছিলো গভীর চৈতন্যবোধ আলোড়িত এক আত্মার সম্পর্ক, দার্শনিক পল রি'র সংগে ছিলো কামহীন প্লেটোনিক ভালোবাসা, বহুভাষাবিদ ফ্রেডরিক কার্ল আন্দ্রিয়াস ছিলেন ল্যু'র স্বামী, যাঁর সংগে কখনোই তাঁর দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। তবুও মুত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একে অপরের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পাশাপাশি ছিলেন, ভালোবাসারও কমতি ছিলো না দুজনের মাঝে। বিবাহিত অবস্থায় ল্যু'র সাথে প্রেম হয় বিখ্যাত কবি রাইনার মারিয়া রিলকে'র। মনোস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড ছিলেন ল্যু'র পিতৃসমতুল্য, তবুও ল্যু'র প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু কেন? এত এত সব বিখ্যাত মানুষেরা কেন এই এক নারীর প্রেমে পাগল ছিলেন? ল্যু'র ব্যাক্তিত্ব্বে এমন কী ছিলো যা তাঁরা এড়াতে পারতেন না? কেন কোনদিনও তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হবে না জেনেও আন্দ্রিয়াস আজীবন ল্যু'র স্বামী হয়ে রইলেন?
ল্যু সালোমে তাঁর জীবদ্দশায় ইউরোপের সাহিত্যজগতে এক অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, তৈরী করেছিলেন একটি মিথ। নিজের চিন্তাধারা দিয়ে ইয়োরোপীয় সাহিত্যের নানা দিককে প্রভাবিত করেছিলেন, শুধু তাঁর নিজের লেখাই নয়, ল্যু’র দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছেন কবি রাইনার মারিয়া রিলকে, ল্যু’র সাথে পরিচয়ের পরেই নীটশে তাঁর ম্যাগনাম অপাস ‘দাজ স্পোক জারাথুস্ত্র’ বইটি লেখার ধারণা ও উৎসাহ পেয়েছিলেন। ফ্রয়েডের সাইকো-এনালিসিসের বিভিন্ন মতবাদে ল্যু’র অবদানও আছে অনেক। তবুও ফ্রয়েড, নীটশে বা রিলকের মত সম্মান তিনি তাঁর জীবদ্দশায় পাননি। পুরুষশাসিত সমাজে অসম্ভব প্রজ্ঞা, মেধা বা প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর সমসাময়িক পুরুষদের সমকক্ষ বলে গণ্য হতে পারেননি। নারী জাগরণ বা নারী অধিকার নিয়ে দিনের পর দিন শক্ত হাতে কলম ধরে থাকলে তৎকালীন নারীদের কাছেও অতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি ল্যু। অবশ্য এর জন্য সেই সময়ের সামাজিক রক্ষনশীলতা, নারীদের ভীরুতা অনেকটাই দায়ী, অনেক নারীই প্রকাশ্যে ল্যু কে সমর্থন করতে ভয় পেতেন। ল্যু’র অজনপ্রিয়তার পেছনে অবশ্য ফ্রেডরিক নীটশে’র বোন এলিজাবেথ নীটশে’র অবদানও কম নয়, প্রিয় ছোট ভাই নীটশের জীবনে ল্যু সালোমে’র প্রভাব এবং ল্যু’র প্রতি নীটশের গভীর আকর্ষণ মেনে নিতে না পেরে ল্যু’কে প্রতি পদক্ষেপে ছোট করতে, তাঁর বিরুদ্ধে আজীবন নানা কুৎসা রটনা করতে পিছপা হননি এলিজাবেথ। তবে এত বাধা বিপত্তির পরও ল্যু ছিলেন নিজ প্রতিভার গুণে ভাস্বর, সংসার, প্রেম, শারিরীক প্রেম এর চেয়ে যে নারী জ্ঞানচর্চাকেই জীবনের আরাধ্য বলে ধারণ করেছিলেন সেই ল্যু সালোমে’র কাজ, তাঁর ভাবনা ও দর্শন এযুগেও অনেক গবেষণার দাবী রাখে।
ল্যু ফন সালোমের বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক নিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হকের এই সংক্ষিপ্ত বই। প্রথম পৃষ্ঠা থেকে এক নি:শ্বাসে পড়তে পড়তে কখন যে শেষ হয়ে যাবে ১৭৫ পৃষ্ঠার এই বই, টেরই পাবেন না।
বইয়ের লেখা নিয়ে সমালোচনা করার মত জ্ঞান এখনো আমার হয়নি, তবে একসাথে এতগুলো বিখ্যাত মানুষের কথা এত সহজভাবে জানতে পারাটাও কি কম মূল্যবান?