ঢাকা শহরে নৃশংসভাবে খুন হলো গৃহবধূ আফসানা হুমায়রা জেরিন। সরেজমিনে খিলগাঁও থানার ওসি শাহজাহান সর্দার। লাশ দেখে চাপা একটা যন্ত্রণায় বিদ্ধ সে। এক সুন্দরী নারীর মসৃণ গলা ধারালো অস্ত্র দিয়ে দুফাঁক করে গেছে খুনি; সারা শরীর করেছে ফালি ফালি। জানা গেল, পাঁচ বছরের ছেলে চিকুকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাটে একা থাকত জেরিন। স্বামী কর্মসূত্রে দেশের বাইরে। এই নারীর আপাতদৃষ্টে কোনো শত্রু পাওয়া গেল না। আফসানা হুমায়রা জেরিনের বড় বোন ও স্বামী ক্ষমতাবান মানুষ। ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা চাপ দিতে শুরু করে ওসি শাহজাহান সর্দারকে_যত দ্রুত সম্ভব পাকড়াও করতে হবে জেরিনের হত্যাকারীকে। এদিকে নিজের বাসায় গোদের উপর বিষফোড়ার মতো হাজির নজরুল, শাহজাহান সর্দারের দূরসম্পর্কের শ্যালক। কারা যেন তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে গেছে বাসার সামনের গলিতে। শাহজাহান সর্দারের স্ত্রী স্রেফ জানিয়ে দিয়েছে, নজরুলের আততায়ীকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলবে না সে। একদিকে ঘর, অন্যদিকে আফসানা হুমায়রা জেরিন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। দিশা হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা ওসি শাহজাহান সর্দারের। কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এল কেউটে!
বছরের প্রথম থেকেই টার্গেট ছিল সুস্ময় সুমনের এই বইটা পড়ব। বছরের শেষ নাগাদ পড়ে ফেললাম। এখন শান্তি লাগতেছে। 'সেই সাপ জ্যান্ত' মোটাদাগে মার্ডার মিস্ট্রি। মেদহীন ঝরঝরে লেখা। আলাদা আলাদা চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনার বর্ণনা পুরো গল্পটাকে আরো বেশি উপভোগ্য করে তুলেছে। প্রথমেই অনুমান করে ফেলেছিলাম অপরাধী কে। শতভাগ ঠিক না হলেও তিনি যে কর্ম করেছিলেন তার প্রেক্ষিতেই এই মার্ডার। বেশি কিছু বললেই স্পয়লার হয়ে যাবে আবার। তাই থাক। শেষ অংশটা আরেকটু উপভোগ্য করা যেত। ও হ্যাঁ, নজরুলের অশ্রু বিসর্জনের ব্যাপারটাও ঠিক বোধগম্য হয় নি।
এবছর বেশ কিছু নতুন লেখকের সাথে পরিচিত হয়েছি, যাদের বই আমি কখনো পড়ি নাই। সুস্ময় সুমন তেমনি একজন। প্রথম পড়াতেই মোটামুটি ইমপ্রেজড। নির্দ্বিধায় এখন অন্যান্য বই গুলো শুরু করার সাহস পাব।
বই: সেই সাপ জ্যান্ত লেখক: সুস্ময় সুমন জনরা: মিস্ট্রি থ্রিলার প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রি প্রকাশনী: গ্রন্থরাজ্য প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪৪ মুদ্রিত মূল্য: ৩৭০/-
❝নিজের হাতে প্রিয় মানুষটিকে তিলে তিলে মারার যে যন্ত্রণা, সেটা করতে দেওয়াটাও একরকমের শাস্তি, তাই না?❞
জেরিন বাসার দরজা খুলে দিলো মৃত্যুদূতের জন্য! সে কী জানতো না এমনটা একদিন হওয়ারই ছিল?
সদ্য নির্মিত বিল্ডিং এর একটি ফ্ল্যাটে ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া গেছে। ইন্সপেক্টর শাহজাহান এতো রক্ত কোনোদিনই দেখেননি। চরম ঘৃণায় নৃশংসতার সাথে হত্যা করা হয়েছে ভিক্টিমকে। একমাত্র বোনের ভয়াবহ পরিণতি দেখে মেনে নিতে পারেন না জিনাত। পাঁচ বছরের ছোট চিকু মাকে ছাড়া থাকবে কী করে? কেঁচো খুড়তে সাপ বের হয়ে আসে! নজরুল কী কোনোভাবে জড়িত? শাহজাহানের বুক কেঁপে ওঠে। জেরিনের কললিস্টে কমিশনার নাসিম তালুকদার নম্বর কেন? সাব-ইন্সপেক্টর কবির চমকে ওঠেন প্রতিশোধের ভয়াবহ খেলা দেখে। শেষ কোথায়?
শিকার শিকারীকে নিজের শিকার করতে দিচ্ছে! শুনতে কেমন জানি লাগছে না? আবার নিজের ভয়াবহ পরিণতি কল্পনা করেও মজা পাচ্ছে! কারণ শিকারী যে নিজেও কষ্ট পাবে! গোলমেলে লাগে? এমনই গোলমেলে কিছু প্রশ্ন দিয়ে সাজানো ❝সেই সাপ জ্যান্ত❞। প্রতিশোধের এক মারাত্মক খেলা নিয়ে বইয়ের প্লট।
শুরুতেই লেখক কিছু প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখানো হয়েছে ঘটনা। কে মূল চরিত্র? বলবো না কারণ নিজেও জানি না। বইয়ের চরিত্রায়নই আসলে এমন। অধিকাংশ চরিত্রকেই ভালোমন্দের মিশেলে দেখানো হয়েছে। কে প্রোটাগনিস্ট আর কে এন্টিগনিস্ট দ্বিধায় পড়ে গেছিলাম। সাসপেন্স, থ্রিলের পরিমাণ ভালোই ছিল সাথে কিছু প্রেডিক্টেবল- আনপ্রেডিক্টেবল টুইস্ট। শেষটা আরও গোছানো হলে ভালো হতো। খুনির জবানিতে যদি খুনের সময়টা বর্ণনা করা হতো তাহলে আরও ইন্টারেস্টিং হতো। সমাপ্তিতে ঝুম বৃষ্টিতে ব্যক্তিটির কান্নার কারন বুঝলাম না। লেখনশৈলী বেশ সাবলীল। শেষ না করা পর্যন্ত ❝কেন? কেন?❞ প্রশ্নগুলো পিছু ছাড়েনি।
অল্পস্বল্প কিছু বানান ভুল আছে। বইয়ের ওভারঅল প্রোডাকশন বেশ ভালো হয়েছে। বইয়ের কভার জ্যাকেটও শক্ত, সহজে ছিড়ে যাবে না। প্রচ্ছদও চোখে পড়ার মতো।
সুস্ময় সুমনের লেখার সাথে পরিচয় অপার্থিব দিয়ে, এর পর লেখার সাথে পরিচয়। ছোট ছোট বাক্যে, ঝরঝরে লেখায় লেখকের দখল বেশ। এই উপন্যাসটা একটা মার্ডার মিস্ট্রি। টানটান মার্ডার মিস্ট্রি বলব না, তবে লেখকের লেখার গতি আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, থ্রিলের মুখোমুখি করে ছাড়বে। লেখক মেসেজ দিতে গেছেন কিনা জানি না, তবে এই গল্পে পরকীয়ার এক ভয়াবহ পরিণতি দেখানো হয়েছে। সেই সাথে দেখানো হয়েছে হিংসা, ক্রোধ মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে- যেখানে আপনজনও শত্রু হয়ে যায়।
•প্রথমেই আসি গল্প নিয়ে, গল্প একেবারে সাধারণ থ্রিলার গল্পের মতো। তবে গল্পে কোনো অতিরিক্ত কথা নেই। গল্প বলাল জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই আছে, এই ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। বই শুরু একজন মহিলাকে হত্যা দিয়ে৷ বই এর অর্ধেক না যেতেই রহস্য উন্মোচন হতে থাকে। প্রতি অধ্যায়ে মনে হয় যেন পরের অধ্যায়েয় বই শেষ। কিন্তু পরের অধ্যায়ে আসে নতুন টুইস্ট। বই শেষ পযন্ত এভাবেই চলতে থাকে। শেষ অধ্যায়ে যেয়ে হয় রহস্যের ব্যাবচ্ছেদ। আমি ধারণাও করতে পারিনি যে বই এর চলমান চরিত্রের মধ্যে কেউ খুনি হবে। কিন্তু শেষের রহস্য আসলেই সার্থকতা দিয়েছে বই পড়ার। •এইবার আসি প্রোডাকশন নিয়ে, গ্রন্থরাজ্য এর বই এর আগে আমি পড়িনি। তবে প্রোডাকশন খুব ভালো। বাইন্ডিংও অনেক ভালো। লিখার ফন্ট মানানসই। বানান শুধু দুই জায়গায় ভুল চোখে পড়েছে। •প্রচ্ছদ নিয়ে কিছু না বললেই না, আমার পারসোনালি মানুষের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ ভালো লাগে না। তবে এই বইতে সাদার উপর ছবিটা ভালো মানিয়েছে। আর শিল্পী মহিলার চেহারায় মৃত্যুর যে সুক্ষ্ম যন্ত্রণা আনতে চেয়েছেন তা একটু গভীর ভাবে দেখলে বোঝা যায়, তিনি অনেকাংশেই সফল হয়েছেন।