আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার। তিনি মাত্র দুটি উপন্যাস রচনা করলেও সমালোচকরা তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঔপন্যাসিক হিসেবেই বিবেচনা করেন। এই দুটি উপন্যাসের বাইরে ইলিয়াস মাত্র তেইশটি ছোটগল্প এবং বাইশটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ইলিয়াস সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের একজন একাগ্র পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর লেখার চরিত্রগুলোকে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং অবস্থানের প্রতীক হিসেবে সুদক্ষভাবে রূপায়ন করতেন। লেখার সময় তিনি চেষ্টা করতেন ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল থাকতে, ফলে তিনি পাঠকের স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে লেখার অন্তর্নিহিত গুরুত্বকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুর ফলে তাঁর সৃজনশীল জীবন খুব দীর্ঘায়িত হতে পারেনি, কিন্তু তাঁর লেখাগুলো বাংলা সাহিত্যে ধ্রুপদী সৃষ্টি হিসেবে স্থান পেয়েছে।
Akhteruzzaman Elias was a Bangladeshi novelist and short story writer. Despite the fact that he only wrote two novels, critics consider him to be one of the finest Bengali novelists. Besides these two books, Elias wrote only 23 short stories and 22 essays. Elias was a good observer of society, state, and people as he created his characters symbolising social classes and positions. He always strived to be historically accurate when writing, even if it meant pushing readers out of their comfort zones. His creative life was cut short by a premature death from cancer, but his writings are regarded as Bangla literature classics.
পুরো বিকেলটা নিরন্তর বৃষ্টির দমকে কেটে যায়। অযথা একটা বিকেল অপচয় হয়ে যাচ্ছে এই চিন্তাটাই ৩/৪ বার মাথায় ঘুরপাক খেয়ে নিউরনে খেলা করে। জানালার ধারে ইলিয়াসের সঙ্গে বসে অবিরাম বৃষ্টির নাচন দেখছি..কোন সারা নেই..মুখে কথা নেই..চুপচাপ। একসময় হঠাৎ নিজের লুপ্ত অস্তিত্বের কথা ভুলে গিয়ে লেখক নিজে থেকেই সাপ খেলানো সুরে "মিলির হাতে স্টেনগান" কোথা থেকে এলো সেই কথাই বলতে শুরু করলেন।
'৭১ এর যুদ্ধের পর মিলির ভাই এবং তার বন্ধুবান্ধব বন্দুক জমা-না-দিলে আজকের এই ঝড়ো বৃষ্টির মতো কেমন একটি ব্যর্থ দিনের সূচনা হয় সেটাই বললেন তিনি। আব্বাস পাগলার তীব্র গলায় এবং মিলির নিরন্তর জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে লেখক নিজের চেতনাকে বুঝিয়ে দিলেন।
এসময় প্রবল বিস্ময়ে লেখকের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। টিনের চালে বৃষ্টির ধরে আসা শব্দে লেখকের কন্ঠকে আমার ধীরে ধীরে মনে হয় দারুণ অপার্থিব এবং আবেশঘন। . এরপর মাঝখানে বেশ কিছুদিন কেটে যায়। লেখকের সাথে আমার মোলাকাত হতে খানিকটা সময় লাগে। তারপর বৃষ্টি-বাদলা কমে এলে আমাদের পরবর্তী গল্পটি শুরু হয়।
এবার গল্পটি দানা বাঁধে একেবারে তিস্তানদীর পাড় ঘেঁসে যখন ইলিয়াসের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই খোলমহাটির মৌলবী কসিম উদ্দীনের বাড়ি। সেখানে মৌলবীর স্ত্রী জয়নব এবং তার ৫ সন্তান ক্ষুধার তাড়নায় সামান্য "দুধভাতে উৎপাত" শুরু করে দেয়।
লেখক এই গল্পের প্রতিটি খুঁটিনাটি এবং কলকব্জা এতো চমৎকার নিখুঁতভাবে বর্ণনা করে যান যে মনে হয় সমস্তই চোখের সম্মুখে দেখতে পাচ্ছি।
চোখের সামনের এইসব বেপরদা দৃশ্য খুলে খুলে পড়তে কিছুটা সময় লাগে। ফের থিতু হয়ে উঠলে নতুন একটি গল্প শুনবার ইচ্ছে প্রকাশ করি। ইলিয়াস সাহেব এসময় সামান্য নীরব থাকেন। হয়ত গল্পের প্রয়োজনে কিংবা অন্য যে কোন কারণেই হোক তিনি কথা বলেন না। একদিকে বিস্তীর্ণ জমি আর অন্যদিকে বিপুল জলরাশি।নদীর পার ধরে দুজনে নীরবে হাঁটছি। আমাদের "পায়ের নীচে জল"। হঠাৎ স্মিত হেসে লেখক হাত নেড়ে নেড়ে গ্রাম এবং শহরের প্রেক্ষাপটে গল্প শুরু করেন।
একদিকে আতিক উচ্চশিক্ষার জন্য সমস্ত জমিজমা বিক্রি করে দিলে অন্যদিকে আলতাফ মৌলবি বিপুল সংখ্যক জমির বদৌলতে জমিদারি পালতে চায়। এই গল্পের মূল আবেশটি তৈরি হয় যখন আতিক জমির কথা তোলে। তখন যেন সমস্ত আচ্ছন্ন সুর একটি ওঙ্কার তুলে বিস্মৃতির দিকে উড়ে যায়..
অত্যন্ত শক্তিমান গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস--- এই ১ টি কথাই তিনি ফের স্মরণ করিয়ে দেন আমাকে "দখল" গল্পটি বলতে গিয়ে।
গল্প শুনতে শুনতে আমার কানমাথা ক্রমশ ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। বারবার মনে হয় এই গল্পটি এভাবে লেখা কিছুতেই সম্ভব নয়। অথচ সমস্ত অসম্ভবকে এক লহমায় সরিয়ে দিয়ে লেখক যে গল্পটি তৈরি করেন সেটি অবিশ্বাস্য। কী বিপুল লেখকের অভিজ্ঞতা! কী প্রচণ্ড তীব্র তাঁর কন্ঠস্বর!
'৭২ এর প্রেক্ষাপটে আওয়ামীলীগ শাসিত বাংলাদেশ। সেখানে ভূমিহারা প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদকে লেখক তুলে ধরেন এক আশ্চর্য কৌশলে।
আমি বিস্মিত হই..মুগ্ধ হই..দারুণ হতবাক হয়ে যাই।
ফের আচমকা ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে এলে আমি এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জানালার ধারে বসে অবিরাম বৃষ্টির নাচন দেখি..কোন সারা নেই..মুখে কথা নেই..চুপচাপ।
প্রচণ্ড বিরক্তি লাগা এইসব দিনকালে কিছু ভাবতে ইচ্ছা করেনা। ভাবতে কষ্টলাগে। যা কিছু করতে ভাল লাগতো সবকিছু বিরক্ত লাগে। অস্তিত্ব কে প্রশ্ন করতে বিরক্ত লাগে। পার্সিসেন্ট ডিপ্রেসিভ ডিসর্ডার না কি ঐসব কোন কিছু ভাবতে ইচ্ছা করেনা। নিজেকে উদ্ভ্রান্ত মনে হয়। আখতারুজ্জামান এর লেখা সাইকেডেলিক জার্নির মতো লাগে। আমার কি হচ্ছে? আমাদের কি হচ্ছে?
খানকতক বই পড়ার পরে আমি এই ধারণায় উপনীত হইলাম যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একজন খতরনাক লেখক। লেখার গাঁথুনিতে এরকম ভয়াবহ শব্দ স্থাপনের সক্ষমতা সম্ভবত খুব বাংলাদেশি লেখকের আছে!
তবে টানা ইলিয়াস পড়ার কারণেই কিনা এই বইটা সেভাবে উপভোগ করতে পারলাম না। ইলিয়াসের লেখার ম্যাজিক রিয়েলিজমের প্রয়োগ থাকে, সেটা না থাকলে সমস্যা নেই। তবে আগের লেখাগুলোতে প্রখর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সরব উপস্থিতি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছিলো।
এই বইটা সমাজ বাস্তবতাকে তুলে ধরার ভালো উদাহরণ হতে পারে। তবে কোনোকালেই সোশ্যাল রিয়েলিজম প্রকাশের এপ্রোচটা আমার পছন্দ হয়নি। সামাজিক বাস্তবতা নিজের চোখে যা দেখেছি সেটা কারো লেখায় দেখতে ভালো লাগে না আমার।
দুধভাতে উৎপাত, প্রায় ৩৫ বছর আগে লেখা একটি গল্প। কিন্তু এখনও কি ভীষণ পাংক্তেয়(এটা কি আদৌ কোন শব্দ নাকি আমি মাত্র বানালাম?)! প্রলেতারিয় দুর্দশা এবং বুর্জোয়া শোষণের বাস্তব একটা ছবি দেখিয়েছেন ওহিদুল্লার মায়ের অভাবের তাড়নায় 'কালা গাই' বিক্রি করে দেয়ায় পরেও ছেলেমেয়েদের দুধভাত খাওয়ানোর খায়েসের মধ্যে। শেষাংশে নির্দেশ পালনের জন্যে ওহিদুল্লাহ অজান্তেই যেভাবে নড়ে ওঠে, সেটাও কি শোষিতের দিকে ইঙ্গিত করে না? এই সঙ্কলনের প্রথম গল্প 'মিলির হাতে স্টেনগান' আমার অন্যতম পছন্দের একটা ছোটগল্প। সেটা নিয়ে পরে বিস্তারিত লেখবো।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা নিয়ে খুব বেশি মন্তব্য করা যায়না। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ছায়া পাওয়া যায় লেখাগুলোতে। ���বে, মিলির হাতে স্টেনগান নামক বিখ্যত গল্পটা আমি খুব একটা বুঝতে পারিনি। তাসত্বেও পড়তে আমার বেশ ভালই লেগেছে। গল্পগুলোর বিশেষত্ব হল, কাহিনী এবং তার পরিনাম তেমন একটা মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি, কাহিণী বলবার জন্য বা কাহিনীর পরিনাম পর্যন্ত পৌছতে যে বর্ণনা এবং ঘটনা পরম্পরা, তাই মুখ্য এখানে এবং সেখান থেকেই গল্পের মূল স্বাদ পাওয়া সম্ভব। বার বার হাতে নেবার মত বই। পড়বার জন্য রেকমেন্ডেড। এক বসায় পড়েছি।
দূরের নয়, নিজেদের আপনকার ঘটনাকে গল্পচ্ছলে শুনিয়ে দিলেন ইলিয়াস সাহেব। কতো নিবিড়, কতো মুগ্ধকর ভাষা আর কথার গাঁথুনি দিয়ে ঘেরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পগুলো।
১৯৮৫ সালের রচিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াস "দুধভাতে উৎপাত" গল্পগ্রন্থটি আছে চারটি গল্প। প্রতিটি গল্প আলাদা। প্রতিটি গল্প গেঁথে যায় মনের গভীর থেকে গভীরে, পাঠক সত্ত্বার শেকড়ে।
প্রথম গল্পটি হল মিলির হাতে স্টেনগান। প্রচণ্ড সাহসী লেখা একটি গল্প। সেই সত্যকে নিয়ে রচিত যাকে নিয়ে প্রাবান্ধিক আলোচনা হলেও ফিকশনে উল্লেখ এসেছে খুব কম। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ আগ্নেয় অস্ত্র যেন হাওয়া মিলিয়ে যায়। সেই সাথে বিপথে চলে যায় কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা। সেই কখনো না খুঁজে না পাওয়া অস্ত্র দিয়ে কি হয়েছিল একটা ধারণা পাওয়া যায় এই গল্পটি থেকে।
দ্বিতীয় গল্পটি নাম শিরোনামে দুধভাতে উৎপাত। দেশীয় যাজকতন্ত্রের আড়ালে সামাজিক শোষণকে খুব সূক্ষ্মভাবে আর পুঁজিবাদকে সরাসরি বিধেছেন লেখক। গল্পটি পাঠ্য পরবর্তি প্রভাব অনেক বেশি। ঘোরলাগা। যেন ঘটল মাত্র সবকিছু চোখের সামনে।
তৃতীয় গল্পটির নাম পায়ের নিচে জল। পিতৃ সম্পত্তি বিক্রি করতে আতিক নামে একজন তরুণ আসে যমুনার তীরবর্তী একটি গ্রামে। নদীভাঙ্গন প্রবণ এলাকায় মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন একমাত্র বাঁধ। এখানেও লেখক তীব্র শ্রেণী বৈষম্যকে নগ্ন করে উপস্থাপন করেছেন। পূর্ব-পুরুষের ভিটা যেখানে আমাদের পিতাদের শৈশব কেটেছে, কৈশোর কেটেছে কিন্তু সে জায়গার প্রতি আমাদের নেই কোন যত্ন, কোন আবেগ সেই শেকড়কে নাড়া দিয়ে যায় গল্পটা।
সবথেকে সাহসী এবং প্রিয় ছিল এই শেষ গল্পটি। গল্পটির নাম ছিল দখল। কমিউনিষ্ট আদর্শের উপর এই গল্পটি ছিল লেখকের ট্রিবিউট। তবে রক্ষীবাহিনীকে এই গল্পে যে নেতিবাচক রূপে অঙ্কন করেছেন সেখানে লেখকের সাহসের ব্যাপারটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। মৃত কমিনিউষ্ট পুত্রের কবরের পাশে মৌলবাদী পিতার কবরস্থ হবার তীব্র আকুলতা। কিন্তু আকুলতা শুধু সন্তান বলে নয়, সেই আকুলতার মাঝে ছিল অমরত্বের লোভ। যে অমরত্ব মানুষ, মানুষের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম বুকে বয়ে বেড়ায়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে সৃষ্টি নিয়ে লেখাও আমার জন্য ধৃষ্টতা। তবুও মনে হল গল্পগ্রন্থটি সম্পর্কে কিছু লিখলে যদি একজন পাঠকও গল্পগুলো পড়ে স্বার্থক হবে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, "কী পশ্চিম বাংলা কী বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।" লিখেছেন, "ইলিয়াস-এর পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।"
গল্পগুলো আমাদের খুবই পরিচিত। আমরা সবাই জানি এমন ঘটে। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কেমন ঘটে? শহুরে লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার দুধভাতে উৎপাতে শহর হয়ে নিয়ে আমাকে গেছেন দূরবর্তী গ্রামে।
মিলির হাতে স্টেনগানের প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই তৈরি হয়নি। দেশটা এখনও মুক্ত হয়নি, স্বাধীনতার বহুবছর পরও আমরা শুদ্ধ রাজনীতির ছোঁয়া পাইনি।
দুধভাতে উৎপাতে অহিদুল্লার বয়ানে দেখতে পাই তার পরিবারের দারিদ্রতার চিত্র। যখন আধ মন চালের ঋণ শোধ করতে না পারার অপরাধে তার গাই নিয়ে যাওয়া হয় তখন অপরাধ হয় না কিন্তু সেই গাইয়ের কিছু দুধ চাইতে গেলে সেটা হয়ে যায় মহাপাপ। তবে লেখক দমবার পাত্র নন, তাই আভাস দিয়েছেন লড়াই চালাবার, নিজের গাই ফিরিয়ে আনবার।
পায়ের নিচে জল গল্পে আমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বঞ্চনা দেখতে পাই। ধনকুবেররা দিনকে দিন আরও ধনী হবার সংকল্প করেই যেন সুবিধাবঞ্চিতের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে। আর দখল গল্পে গ্রাম বাংলার পুঁজিপতিদের আচরণের বিপরীতে কৃষকদের অবস্থান পরিষ্কার করেন যার মাধ্যমে আমরা দেখি শ্রেনি সংগ্রামের ইঙ্গিত।
শ্রেনি সংগ্রাম আমি খুব ভালো বুঝি না। শুধু বুঝি দখল আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ধ্বনি যা সমাজের উচু থেকে নিচু পর্যন্ত সমস্ত শ্রেনি থেকে তোলা সম্ভব এবং আবশ্যক।
মন এবং দেহের সাথে মিলন ঘটিয়ে এক অপূর্ব সমন্বয় করার ক্ষমতা আছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মধ্যে।এক বদ্ধতার আবেশ থেকে মানুষের যে মুক্তি -মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার উৎপত্তি কোথায়??এর উত্তর তিনি দিতে চেষ্টা করেছেন তার গল্পপটে। মানুষের জীবনবোধ এবং সমাজ অবস্থান সংগ্রহ করেছেন প্রকৃতি থেকে, তার সাথে কিছুটা রুপকল্পনা।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার জীবনে গল্প লিখেছেন মাত্র ৩০ ট, তবে এই ত্রিশ গল্পই তাকে বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক হিসেবে প্রকাশ করে দিয়েছে। এই বইয়ে মোট গল্প আছে পাঁচটি। প্রিয় গল্প মিলির হাতে স্টেনগান।
দুধভাতে উৎপাতে তিনি মার্ক্সবাদী হিসেবে কিছুটা আত্মপ্রকাশ করেছেন। সেটা ভালই লেগেছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক না বরং যুদ্ধ পরবর্তী যে অসহযোগতা সারা বাংলায় দেখা দিয়েছিল তার প্রভাব এই বইয়ে এসেছে। একাত্তরের পরের কয়েকবছর বেশ শক্ত অবস্থানে রাজনীতিরর হাল-চাল প্রকাশ করেছেন। এছাড়া তার গল্পে উঠে এসেছে সাম্যবাদ, উত্তর-আধুনিক বাংলাদেশের সমাজ ব্যাবস্থা, যেখানে দলে দলে মানুষ শহরবাসী হচ্ছে। গ্রামের শিকড় উপড়ে পাখা মেলছে শহরের ডানায়, আকাশে।
ছোট্টো একটা বই মাত্র চারটি গল্প নিয়ে-- ♦ মিলির হাতে স্টেনগান ♦দুধভাতে উৎপাত ♦পায়ের নিচে জল ♦দখল প্রতিটি গল্পে রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। পরিবেশ সমাজ ও সময়টা হয়তো এক তবে প্রেক্ষাপট আলাদা। মুক্তিযুদ্ধ, দারিদ্র্য, শোষণ ও নিপীড়ন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তখনকার সমাজ ব্যবস্থার সাথে শোষণ আর দারিদ্র টা যেন আষ্টেপৃষ্টে রয়েছে।
ইদানীংকালের ভোল পালটানো সোনার ছেলেদের মত ক্যাডার গোছের চটিনেতা কাম স্মাগলার রানার ভাষায় ইনটলারেবল বাস্টার্ড আব্বাস পাগলা যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। পরিস্থিতির প্যাঁচে পড়ে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে আব্বাস পাগলার। ক��ন্তু সত্যিই কি মস্তিষ্কের বিকৃতি আব্বাসের নাকি এই পুরো সমাজের? আব্বাসের প্রতিটা কথাবার্তা আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়লেই বুঝতে পারা যায় আব্বাসের কথাগুলো কতটা নির্মম চাঁচাছোলা। আব্বাস কী আসলেই পাগল নাকি পুরো সমাজটাই অদ্ভুত বেশ্যাবৃত্তি করতে বাজারে নেমেছে? রানা-সোহেল-সিডনি-ফয়সাল এই একএকজন কী এই বেশ্যাদের বাজার গরম করে দালালদের কাতারে পড়ে না? ইলিয়াস প্রশ্ন রেখে যায়...
সেই ইনটলারেবল বাস্টার্ড আব্বাস পাগলা পাগলাগারদে বসে কলা খায়, জয়নাবের পেটের ব্যামো কিন্তু দুধ-কলা দিয়ে ভাত মেখে খেতে মন চায়। কিন্তু কলা খেয়ে আব্বাসের মনের আশ মিটে না, জয়নাবের পেটের ব্যামো বাড়তেই থাকে, কমার নাম নেয় না। ওহিদুল্লার পেটে ক্ষিদে চো চো করে। ক্ষিদের ঠেলায় জয়নাবের পেটের নাড়িভুঁড়ি জমাট বেধে ঘলঘল করে ভেতর থেকে সব বেরিয়ে আসে, হাজেরা জয়নাবেত বমি করা দেখতে দেখতে ডান হাত দিয়ে পরম মমতায় চালের কুড়া গোলা খায়। ওহিদুল্লার খিদে বাড়তেই থাকে। আতিকের পেটে আর খিদেটা নেই, আউশের মোটা বাজে গন্ধওয়ালা চালের ভাত খেয়েই তার খিদে উবে গেছে, ৮ টা পঞ্চাশে তার বাস ধরতে হবে, ঢাকার বাস। ইকবাল বাপের পাশে দাদার জন্য খুঁড়ে রাখা কবরে শুয়ে অপেক্ষা করতে থাকে... কীসের অপেক্ষা?
আমার পড়া লেখকের প্রথম বই এটি। ছোটগল্পের একটা সুন্দর দিক হল, লেখক পুরোটা সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার 'দুধভাতে উৎপাত'-এ বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম নন। চারটি ভিন্ন গল্প, প্রত্যেকটি ভিন্ন-ভিন্নভাবে নিজ জায়গায় সুন্দর।
গল্পগুলো একান্ত বাংলাদেশের । বাংলা ভাষাভাষী এই অঞ্চলের মানুষের । ইলিয়াসের গল্পের ঠাস বুনটে এসেছে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, সাধারণ জীবন, প্রবাহমান জীবন, অতীত, বর্তমান, চাওয়া পাওয়া । ইলিয়াসের বর্ণনাতে ভিজুয়ালের জোর আছে । প্রকৃতি-প্রতিবেশের বর্ণনা যেভাবে করেছেন এমনটা নিজের অভিজ্ঞতায় নিয়ে আসতে পারাটাও এক বিশেষ প্রাপ্তি । ধন্যবাদ ইলিয়াস । গল্পের ভাষা, বর্ণনা যত যাই হোক গল্পটাই কিন্তু আসল । আর এমন গল্পের স্বাদ শুধু ইলিয়াসই দিতে পারেন । বাংলাদেশের মানুষের জীবনের ঘাত প্রতিঘাতের স্তরে স্তরে এমন সব দিক থেকে আলো ফেলে গল্প ফেদেছেন ইলিয়াস যে তার এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা আর মানুষের মনোজগৎ নিয়ে বোঝাপড়া, তার ধীশক্তির প্রমাণ পেয়ে অবাক না হয়ে পারা যায় না । মস্তিষ্কে কারো বিচিত্র সব কল্পনার উৎপাত না থাকলে কলমের ডগায় এমন সব গল্প আসে না । তবে যাই হোক, গল্পগুলো আধুনিক সময়ের । এই আধুনিক সময় এক বিচিত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যুগ । এই যুগে, এই মহান ব্যবস্থার স্বভাববশত এমন কিছু মানুষর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক যারা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তাদের মধ্যে মেরুদণ্ডের অভাব লক্ষণীয় । এমন সব চরিত্র যে খুব খারাপ প্রকৃতির তা কিন্তু না । মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই ম্যান্দা মারা দলের প্রতিনিধি বলেই মনে হয়েছে "পায়ের নিচে জল" আর 'দখল" গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র দুটি যে সেই বিশেষ দলের প্রতিনিধি তা বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না । অনেকটা কামুর মরসোঁ বা কাফকার গ্রেগর সামসার ধাঁচের । তবে শুধু চরিত্রের গভীরে যা মিল, গল্পের স্বাদে ইলিয়াস স্বতন্ত্র নিশ্চয়ই । মজার ব্যাপার হচ্ছে, "মিলির হাতে স্টেনগান" গল্পে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যেভাবে বাস্তবতার জলে জাদুবাস্তবতা মিশিয়েছেন তাও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা ।
দূর্দান্ত সব গল্পগুলো। ছোট্ট বইটাতে যদিও মোটে ৪ টা ভিন্ন ভিন্ন গল্প। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প বলায় আছে আঞ্চলিকতা, আঞ্চলিক জনজীবনের টানাপোড়েন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়কাল, দু:খ, কষ্ট, যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর মানুষের গল্প। সবগুলো গল্পেই তার নিজের সময়কালকে আঁকার তীব্র চেষ্টা ছিল।
এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে লেখকের সেই সময়ের গল্পগুলোকে বাস্তব মনে নাও হতে পারে। গল্পগুলোতে তিনি মহান কোন চরিত্র রচনা করেননি কিন্তু তাদের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যুগে যুগে বুর্জোয়াদের শোষণ, নতুন দেশ গড়ার প্রাক্কালে সুবিধাবাদীদের দাপট। শ্রেণিবিভেদ ঘোচাতে হবে তা সে শহরে হোক কিংবা গ্রামে এটাই যেন তার প্রতিটি গল্পের মূল গন্তব্য।
সবগুলো গল্পের পটভূমি এক অঞ্চলেই গাঁথা; উত্তরবঙ্গ। লেখার মাঝে বামধারার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী বেশ লক্ষ্য করার মত। লেখক ঐ অঞ্চলের এবং বামধারার ছিলেন বলে হয়তো লেখায় এসবের সহজাত ছাপ ছিল কিংবা হয়তো এভাবে লেখাটাই তার জন্য সুবিধাজনক ছিল।
হাতে সময় কম থাকলে নিমিষেই পড়ে ফেলা যায় গল্পগুলো। জড়তা ছাড়াই গল্প এগুতে থাকে বহতা নদীর মত। সময় একটু বেশি থাকলে চিন্তা-ভাবনারও অবকাশ থাকে বৈকি।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ছোটোগল্পে পাঠককে আটকে রাখতে ওস্তাদ। তাঁর গল্পের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ‘রেইনকোট’-এর মাধ্যমে। রূপকের আশ্রয়ে কী সুন্দর করে গল্পটা ফেঁদেছেন! এরপর তাঁর (সেরা) দুটো উপন্যাস কলেজে থাকাকালেই শেষ করে ফেলি। রেইনকোট গল্পটা ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’ গল্পগ্রন্থের। সেটাও এবছর বইমেলা থেকে নিয়েছিলাম। দুধভাতে উৎপাত বইটাতে চারটে গল্প। দ্বিতীয় গল্পের নামেই বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে। এবং এই গল্পটাই পাঠক মনে গভীর একটা আঁচড় দিয়ে যাবে। নিশ্চিত। মানুষের কত ছোটো ছোটো শখ যে থাকে, অধিকাংশই অপূর্ণ থাকে। পূরণ হলেও সেটা মনকে ‘বোঝ’ দেওয়ার এক বৃথা চেষ্টা। সামান্য একটা শখই কারও কাছে মৃত্যুর সমান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটা গান খুব মনে পড়ছে— “ছোটো ছোটো মানুষের ছোটো ছোটো আশা, কে রাখে খবর তার!”
দক্ষিণ বঙ্গের মেয়ে হওয়ার সুবাদে সেখানকার প্রতিটি আনাচেকানাচের সাথে পরিচয় জন্মসূত্রে,ভাষা ঐতিহ্য রীতিনীতি সবকিছু যেখানে নখদর্পনে সেখানে উত্তরবঙ্গের সবকিছুই আমার কাছে ধোঁয়াশাময়,আনিসুল হকের এক আয়েশামঙ্গল পড়ে সেখানকার ভাষা আর অবস্থানটা হালকার উপর ঝাপসা ভাবে জানতে পারলেও ইলিয়াস সাহেবের এই বইটা ছিল আমার জন্য অনেকটা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো.
মন্দা, দুর্ভিক্ষ,স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রক্ষীবাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের সংঘর্ষ প্রতিটা জিনিস এত সুন্দর করে ফুটে উঠেছে যে আমার মনে হচ্ছিল তাদের সাথে যুগ যুগান্তর ধরে পরিচয় আমার
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা বা চিলেকোঠার সেপাই গল্প দিয়েই বেশিরভাগ লোকের হাতেখড়ি হয় তাঁর সৃষ্টির সাথে, কিন্তু এই চিরায়ত পথে না হেঁটে দুধভাতে উৎপাত দিয়ে শুরু করাটা নেহাতই মন্দ হয়নি চারটি গল্পের মধ্যে আমার দুধভাতে উৎপাত আর দখল এই দুটো গল্প দাগ কেটেছে বেশি
গল্পসমগ্র থেকে গল্পের ক্রম ধরে যত সামনে এগোচ্ছি প্রিয় লেখক ইলিয়াসের ছোটগল্পের প্রতি মুগ্ধতা যেন খানিকটা ফিকে হয়ে আসছে। মোটাদাগে এ বইয়ের ‘পায়ের নিচে জল’ আর ‘দখল’ গল্প দুটি একই রকমের। শহরে বড় হওয়া সন্তানের গ্রামে গিয়ে বাপের রেখে যাওয়া জায়গাজমি বিক্রি সংক্রান্ত প্যাঁচে পড়া, সঙ্গে আছে গ্রাম্য রাজনীতি এবং শোষিত আর শোষকের দ্বন্দ্ব। গল্পের সময়কাল, পরিণতি বা বার্তায় ভিন্নতা থাকলেও এই মিলের ব্যাপারটা আমার কাছে বড় হয়েই ধরা দিয়েছে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসেও আনোয়ারকে গ্রামে গিয়ে ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে পড়তে দেখি। আবার ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পের মিলি ও আব্বাস পাগলার কর্মকাণ্ড মনে করিয়ে দেয় ওসমান আর হাড্ডি খিজিরকে। ইলিয়াস খুব বেশি লেখেননি, এই অল্প লেখার মধ্যে এমন পুনরাবৃত্তি দেখে ভাবছি তাঁর কম লেখা নিয়ে আমাদের আফসোস বোধহয় অকারণ!
- বই নিয়ে কথা- দুধভাতে উৎপাত- আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
বাংলাদেশের একক অনন্য ও ব্যতিক্রমী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে ছোট্ট কাজের পরিসরের অন্যতম ও অত্যন্ত ভারী কাজ “দুধভাতে উৎপাত” গ্রন্থটি। তিনি ১৯৮৫ সালে এই গল্পগ্রন্থটি লিখেছিলেন। গল্পগ্রন্থের চারটি প্রশস্ত গল্প তিনি লিখেছেন ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী নানান জটিলতা, গ্রামীণ জনসমাজ, অভাব অনটন, নদীপাড়ের মানুষ ও কুসংস্কৃতি, ধর্মকে ব্যবহার করে এক শ্রেণীর মানুষের মোড়ল হয়ে উঠা, রাজনৈতিক চালচিত্র ইত্যাদি যেন গলার মালার মতো একের পর এক গেঁথে গেঁথে সাজিয়েছেন পুরো বই জুড়ে।
“দুধভাতে উৎপাত” গল্পে লেখক নিম্নশ্রেণীর অর্থনৈতিক জটিলতায় ভোগা, আশা আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতায় জর্জরিত যন্ত্রণাদায়ক এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে এক স্বপ্নদ্রষ্টা কায়ক্লিষ্টতা ভেঙ্গে চুরমার করে তার সন্তানদের মৃত্যুঅব্দি ‘দুধেভাতে’ রাখার স্বপ্ন দেখেন। তৎকালীন মুসলিম অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত, প্রলেতারিয়াৎ মানুষের পুনরায় সিঁড়ি বেয়ে উঠার সংকল্পটি তীক্ষ্ণ সূচের ন্যায় গল্পের মাঝে নিহিত রাখতে সফল হয়েছেন। তার এই সংলাপে ব্যবহৃত ইউনিক সব ভাষাশৈলী আরও এক ধাপ বাড়তি তার সত্ত্বার অনন্য ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র প্রকাশ করেছে।
চারটি গল্পের মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প “দখল” গল্পটি। এটি বইয়ের শেষ গল্প। গল্পটি স্বাধীনতার নিকট পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। অত্যন্ত সাহসী ও অপ্রতিম এক ফুটস্টেপ আই গেস। সমাজতান্ত্রিকে বিশ্বাসী এক ছেলের সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠায় প্রাণনাশের পরে যে ফেম তার পিতার জিহ্বায় লেগেছিল তার এক ভিন্নধর্মী দৃষ্টিকোণ উক্ত গল্পে চিত্রায়ণ হয়েছে। তার চিন্তার পরিধি সত্যিই অপরিমাপযোগ্য। যুগে যুগে কেবল একটিই আখতারুজ্জামান পাওয়া যায় প্রতি সমাজে। এই গল্পে তিনি রক্ষীবাহিনীকে নেতিবাচকভাবে এঁকেছেন তার শব্দের স্রোতে। কখনও হয়ত কেউ চিন্তাও করবে না যে একজন পিতা তার সন্তানের পপ্যুলারিটি পাবার তাড়নায় সন্তানের মৃত্যুকেও হাতছাড়া করতে চায় না, বেঁচে থাকাকালীন তো নয়-ই, ইভেন কবরস্ত ছেলের পাশে নিজের কবর খুঁড়ে মৃত্যুর পরেও সেই পিতার অবিনশ্বর যশ ও বৈভব লাভের লালসা, লিস্পা তা লেখকের অভিনবত্বের পাশাপাশি লেখকের আদর্শকেও ইঙ্গিত করে। এই গল্পের প্লট ও বাস্তবতা লেখককে বিয়ন্ড দ্যা আর্থ মাত্রায় বিশেষায়িত করেছে। একটি সিরিয়াস ঘরানার লেখার মাঝে তিনি যে স্যাটায়ার ঢুকিয়েছেন যা আমরা “পায়ের নিচে জল” গল্পেও স্বাধীনভাবে লক্ষ্য করি তা পড়তে পারা একজন পাঠকের জন্যও বিশেষ ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বলে মনে করি।
সামগ্রিকভাবে বললে, লেখক তার গদ্যতে একটা অনন্য সাধারণ দৃষ্টিকোণ প্রোথিত করার চেষ্টা করেছেন। আঞ্চলিক ভাষার সহজ-সদ্ভাব-সঠিক ব্যবহার গল্পের মধ্যে পাঠকের চিত্তে কোনো ধরনের কাঠিন্যতা তৈরি করেনি। বরং গল্পটিকে বানিয়েছে অতীব প্রাঞ্জল, বাস্তবধর্মী ও অসম্ভব সচেতন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা শুধু বিনোদনের অংশ নয়, এটি সমাজের প্রতিফলক, জাতীয় ও প্রান্তিক সমস্যাচিহ্নিত মানুষের জন্য মুখপত্র, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার পর্যবেক্ষণ। যা গল্পগ্রন্থ কিংবা উপন্যাস থেকে পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হয়। একজন পাঠক কিংবা লেখক উভয় শ্রেণীর মানুষের নিজস্ব সত্তা, দর্শন, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি-বাহু বিক্ষেপণ জানতে ও গঠনে “দুধভাতে উৎপাত” পরিধানযোগ্য ও অসন্দিগ্ধ।
গল্পগ্রন্থটি বেরিয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে। চারটি গল্প ৯৪ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত এই ছোট্ট পুস্তকটির মুদ্রিত মূল্য রাখা হয়েছে দুই'শ টাকা। এর প্রচ্ছদটাও কম আকর্ষণীয় নয়; প্রচ্ছদ করেছেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী "কামরুল হাসান"।
জীবন্ত কিংবদন্তি কবি হেলাল হাফিজ সাকুল্যে কবিতার বই ছেপেছেন তিনটি। তাঁর একটি কবিতার বই 'যে জলে আগুন জ্বলে'-ই ১৯৮৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দোর্দন্ড প্রতাপে রাজত্ব করছে। কবির কবিতাগুলো পড়লে মনে হবে অমরত্ব পেতে অনন্তকাল লিখে যাবার দরকার নেই। সেরাটুকু সযত্নে অল্প একটু ছিটিয়ে দিলেই যথেষ্ট।
কথাগুলো বলছি, কারণ, একই উপলব্ধি বারবার হবে, যখন আপনি স্বল্পপ্রজ লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পগুলো পড়তে যাবেন। পরিমাণে সামান্য লিখে গেছেন ইলিয়াস। 'চিলেকোঠার সেপাই' খ্যাত ইলিয়াস যা লিখেছেন, সাহিত্যমানে তা বাংলা সাহিত্যের অনন্য এক উচ্চতায় উঠে বসে আছে। চারটি গল্পের সংকলন 'দুধভাতে উৎপাত' গল্পের বইটি বের হয় ১৯৮৫ সালে। মাত্র চারটি গল্পঃ 'মিলির হাতে স���টেনগান', 'দুধভাতে উৎপাত', 'পায়ের নিচে জল' আর 'দখল'। চারটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের আর স্বাদের। এক 'মিলির হাতে স্টেনগান' নিয়ে বলতে বসলে একটা রচনা ফাঁদা যাবে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের এক ভিন্নরূপের বাস্তব চিত্রায়ন আছে গল্পগুলোতে। বুর্জোয়া শোষণ এবং প্রলেতারিয় দুর্দশার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে পরতে পরতে। পাওয়া যায় শ্রেণি সংগ্রামের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত।
স্ল্যাং যে চরিত্র ও দৃশ্যের বৈষয়িক রুপায়নে কতটা দরকারি, তার পুরোটা বুঝেছেন ইলিয়াস। গালি নিয়ে কাজ আসলেই আগে দেখিনি। যে সহজসাধ্য সাবলীলতায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গালিগুলো লিখেছেন, সংবেদনশীল পাঠক তাতে ধাক্কা খাবেন! আব্বাস পাগলা পুরান ঢাকার টানে যে গালিগুলো মুহুর্মুহু দিতে থাকে তা একদম মনে-মগজে গিয়ে বিঁধবে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সবমিলে দুটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন রেখে গেছেন। 'দুধভাতে উৎপাত'-বইটি বাকি বইগুলো পড়বার উত্তুঙ্গ আগ্রহ তৈরি করে দিল।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্য দায়সারাভাবে পড়ার কোন সুযোগ নেই- কেননা তাঁর লেখায় মূখ্যতঃ কাহিনী নয়, পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে ভাষার কারুকার্যময় যাদু বাস্তবতা ও অন্তর্নিহিত বক্তব্য। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির উচ্চকিত প্রতিধ্বনি 'দুধভাতে উৎপাত' নামের সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী গল্প সংকলনটি। আইন শৃঙ্খলার চরম অধঃপতন, অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাদের লুটপাট-রাহাজানি, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফারাকে হতাশা ও ক্ষোভ, জোতদার-ফড়িয়া দালালদের দৌরাত্ম্য, ক্ষমতাসীনদের শোষন দূর্নীতি ও রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, গরীব চাষাভুষা বাস্তুহারা মানুষের মর্মন্তুদ দুঃখ দূর্দশা, বাম আদর্শে বিশ্বাসী সহিংস সর্বহারা চরমপন্থার উত্থান- এ সব কিছুই উপস্থিত মাত্র চারটি গল্পের এই ছোট্ট বইটিতে। ইহজাগতিক পাষাণ কঠোর বাস্তবতা ইলিয়াসের লেখনীর হাত ধরে প্রবেশ করেছে সাহিত্যের পরাবাস্তবতার জগতে- আদর্শবাদীদের মোহভঙ্গ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্ব, লুটেরাদের বাড়বাড়ন্ত আর সভ্য শহুরে সমাজের নির্লিপ্ততার বহিঃপ্রকাশ কি এর চেয়ে সুস্পষ্ট, সুলিখিত হতে পারে?