শ্রীকান্ত মিত্র ওরফে কানুবাবু আর প্রদীপ গুপ্ত ওরফে ভোলাবাবু - দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু। কানুবাবু প্রচন্ড সাহসী আর টগবগে, অপরদিকে ভোলাবাবু নিতান্তই চুপচাপ আর ঘুমকাতুড়ে। স্বভাবের পাশাপাশি গঠনেও বৈপরীত্য। কিন্তু একটা জায়গায় দুই বন্ধুর দারুণ মিল। আর তা হলো কানুবাবুর ১৯৩২ মডেলের ট্যালবট ৭৫ সেডানে চড়ে ছুটির দিনগুলোতে পুরো ভারতবর্ষ চক্কর দিয়ে বেড়ানো। সহকর্মী মনোজ সেনের কলমে উঠে এসেছে সেসব অভিযানে দুই বন্ধুর নানা রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা।
মনোজ সেন-এর জন্ম ১৯৪০, বেলেঘাটায়। পড়াশোনা শুরু স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে। সেখান থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স। অতঃপর বি ই কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে বিই পাশ করে চাকরি জীবনের শুরু। প্রথম কাজ ভারী নির্মাণ সংস্থা হেড রাইটসনে, শেষ কাজ টার্নকী ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ায় ডিরেক্টর পদে। ১৯৯৭ থেকে অবসর জীবন, মাঝে মাঝে ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি।
১৯৭২ সালে প্রথম সাহিত্য পত্রিকা 'রোমাঞ্চ'-তে গল্প প্রকাশিত হয়। এরপর টানা কুড়ি বছর (১৯৭২-১৯৯২) 'রোমাঞ্চ' পত্রিকায় রহস্য, অলৌকিক, বিজ্ঞানভিত্তিক, রূপকথা ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় হাজার দেড়েক পাতা ছোটো ও বড়োদের উপযোগী কাহিনি লিখেছেন। ১৯৯২ সালে 'রোমাঞ্চ' পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দশ বছর লেখা বন্ধ ছিল। অনিশ দেব আবার লেখা শুরু করান ২০০১ সালে। 'রোমাঞ্চ' ছাড়া লিখেছেন 'সাপ্তাহিক বর্তমান', 'পরমা' ইত্যাদি পত্রিকায়। মহিলা গোয়েন্দা চরিত্র দময়ন্তী দত্ত গুপ্ত ও খুদে গোয়েন্দা সাগর রায় চৌধুরী-কে নিয়ে লিখেছেন অনেক কাহিনি।
সাহিত্যের অনুপ্রেরণা আগাথা ক্রিস্টি, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ঘোর নাস্তিক হলেও ইতিহাসের সন্ধানে পড়তে ভালোবাসেন ধর্ম সংক্রান্ত বই। এককালে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবলের মতো সব খেলাতেই ছিলেন পারদর্শী রসিক এই মানুষটি ভালোবাসেন ক্লাসিক গান, ভ্রমণ ও আড্ডা। তাঁর উল্লেখযোগ্য অধুনা-প্রকাশিত কিছু বই হল 'এবং কালরাত্রি', 'কালসন্ধ্যা', 'রহস্যসন্ধানী দময়ন্তী সিরিজ' প্রভৃতি।
শ্রীকান্ত মিত্র ওরফে কানুবাবু, প্রদীপ গুপ্ত ওরফে ভোলাবাবু, আর ১৯৩২ মডেলের একটি ট্যালবট সেডান ৭৫— এই তিনজনের (হ্যাঁ, গাড়িটির ভাবগতিক দেখে তাকে বস্তুর বদলে ব্যক্তি বলতেই হয়) রোমহর্ষক নয়কাহন নিয়ে গড়ে উঠেছে এই ছিমছাম বইটি। সেই গল্পগুলো হল~ ১. চাতলার জঙ্গলে; ২. তেঁতুলপাড়ায় বিপত্তি; ৩. দোমানির অভিজ্ঞতা; ৪. রাজস্থানে অযান্ত্রিক; ৫. মন্ত্রশক্তি; ৬. ছাতার উপকারিতা; ৭. কাঞ্চনজঙ্ঘার কাণ্ডকারখানা; ৮. জগাই-মাধাই; ৯. সুন্দরবনে গণ্ডগোল। গল্পগুলো সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য; আর সেখানেই এদের সার্থকতা! স্মৃতিচারণ-ভিত্তিক টল টেলস্ বা গুল্প যে কতখানি আনন্দদায়ক হতে পারে— সে-কথা আজকের পাঠক ভুলতে বসেছেন। সেই খাঁ-খাঁ-করা শূন্যস্থানে সরস বাচনভঙ্গি আর সূক্ষ্ম মূল্যবোধের এমন মেলবন্ধন ভীষণভাবে স্বাগত। গল্পগুলো ছোটোদের জন্যই লেখা; কিন্তু বড়োরাও (ইনফ্যাক্ট বড়োরাই) এদের ভরপুর উপভোগ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। বইটির ছাপা চমৎকার; সামান্য ক'টি ভ্রান্তি ছাড়া বানানও শুদ্ধ। তবে এমন চমৎকার গল্পগুলোর সঙ্গে একটি করে অলংকরণ থাকলে কেস একেবারে জমে যেত। শীতের অলস দুপুরে হোক বা ঝিমধরা সন্ধেবেলায়— এই বইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালে আপনি যে ভরপুর আনন্দ পাবেন, তা একরকম দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন!
প্রচ্ছদ আর ইন্ট্রো দেখে যাই মনে হোক - আদতে গল্পগুলো সাধারণ মানের। তেমন আকর্ষণীয় বা লোমহর্ষক কিছু না। রোমাঞ্চের চাইতে হাস্যরসই বেশি। ‘মন্ত্রশক্তি’ টা একটু বেটার।