দেখি নাই ফিরে — এক অসমাপ্ত মহাকাব্যিক অনুরণন (পুনর্পাঠ: ২রা আগস্ট, রামকিঙ্কর বৈজের প্রয়াণ দিবসে)
সমরেশ বসুর দেখি নাই ফিরে পড়া মানে কেবল একটি শিল্পীর জীবনকথা জানা নয়—এ যেন লাল মাটির গন্ধ মেখে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা, যেন পায়ের তলায় কাদার স্নিগ্ধ ঠান্ডা স্পর্শে অতীতকে ছুঁয়ে ফেলা। প্রতিটি শব্দ যেন খননযন্ত্রের মতো, ধীরে ধীরে তুলে আনে আমাদের শিল্পচেতনার, ইতিহাসের, দেশকালের ও ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার স্তর—যেন মাটির তলা থেকে উঠে আসে অজানা কোনো সভ্যতার নিঃশব্দ স্পন্দন।
এটি সমরেশ বসুর শেষ উপন্যাস। শেষ করতে গিয়েও শেষ করতে পারেননি — এই উপন্যাস যেন মৃত্যুর মুখোমুখি বসে লেখা এক দীর্ঘ আত্মকথন। বহু আগেই শুরু হয়েছিল কলমের পথচলা, কিন্তু শেষ অধ্যায়গুলো লেখা হয়েছিল শয্যাশায়ী অবস্থায়, শরীরের প্রতিটি কোষে তখন মৃত্যুর ধুকপুকানি, অথচ লেখার স্পন্দন থামেনি। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন: অসমাপ্ত কাজ কি কখনও পূর্ণতা পায়? দেখি নাই ফিরে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে—পায়, ঠিকই পায়। কারণ কখনও কখনও একটি উপন্যাস শেষ না হয়েও, একটা অন্যরকম 'সমাপ্তি' ছুঁয়ে ফেলে—যেখানে লেখকের না-বলা কথাগুলো পাঠকের মর্মে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, দীর্ঘ দিন ধরে। অশেষেই যে অনেক সময় শেষের চেয়ে বেশি কিছু থাকে—এই উপন্যাস তারই জীবন্ত প্রমাণ।
৭৫২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি রামকিঙ্কর বৈজের জীবনের ছায়া হয়ে ওঠে। একজন দরিদ্র নাপিতের পুত্র থেকে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর — সেই যাত্রাপথ নির্মিত হয়েছে নিখুঁত বাস্তবতা আর কবিত্বের মিশেলে।
উপন্যাসের প্রথম দিকটা বাঁকুড়ার কাদা-লেপা পথ দিয়ে শুরু। এখানেই আমরা ছোট্ট কিঙ্করকে দেখি, যার চোখে জেগে উঠছে এক অন্য রকম জগৎ। চারপাশের লোকজন, সাঁওতাল জীবনযাপন, মা-ঠাকুমার কন্ঠে গল্প—সব মিলিয়ে যেন একটা লোকজ রূপকথা। কিন্তু এটাকে রূপকথা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না, কারণ এর ভিতরেই জন্ম নিচ্ছে শিল্প।
শান্তিনিকেতনে প্রবেশ করতেই উপন্যাসের গতি, ভাষা, ভাব—সবই বদলে যায়। যেন রামকিঙ্করের জীবনে নতুন আলোর প্রতিফলন ঘটে। নন্দলাল বসু যখন বলেন, “এখানে তোমার শেখার কিছু নেই”—তখনই বোঝা যায়, এই ছেলেটার মধ্যে রয়েছে এমন কিছু, যা শিক্ষা দিয়ে গড়া যায় না। তা জন্মগত। একরকম অভ্যন্তরীণ দাবানল।
সমরেশ বসুর ভাষা এখানে নিজেই রামকিঙ্করের ভাস্কর্য হয়ে ওঠে—খসখসে, অসম, কিন্তু প্রাণময়। তিনি সুন্দরকে খুঁজে পান ভাঙা দেউড়িতে, কাঠকয়লায়, মৃত পশুর চোখে। এই উপন্যাস কেবল শিল্পীর জীবন নয়, শিল্পের সংজ্ঞাও হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই উপন্যাসের আরেকটি স্তর আছে—নিজস্ব আত্মজিজ্ঞাসার। লেখক নিজে তখন অসুস্থ। ক্যানুলা হাতে, অক্সিজেন মাস্ক পরে, তিনি এই উপন্যাস লিখছেন। পত্রিকা অফিসে হাতে হাতে পাণ্ডুলিপি পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর ছেলে। এটা আর কেবল রামকিঙ্করের কাহিনি নয়, এটা সমরেশ বসুর আত্মজীবনীও—এক শিল্পীর বেদনা, এক পিতার হতাশা, এক লেখকের শুদ্ধিকরণ।
উপন্যাসটি যেখানে থেমে যায়, সেখানে থেমে থাকেন না পাঠক। বরং সেই অসমাপ্ততাই এক নতুন পাঠের জন্ম দেয়—যেমন ঘটে মারভিন পিকের Gormenghast সিরিজে। থেমে যাওয়া মানেই শেষ নয়, বরং এটা নতুন এক অনুরণন।
বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ভট্টাচার্যের অলংকরণ। বাংলা সাহিত্যে এটিই একমাত্র উপন্যাস যাতে তিনি ছবি এঁকেছেন। তাঁর আঁকাগুলোর মধ্যে যে স্বপ্ন, যে ধোঁয়াটে আলোছায়া—তা যেন উপন্যাসের ভাষারই চিত্ররূপ।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে সমরেশ বসুর দেখি নাই ফিরে কোথায় দাঁড়িয়ে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই ফিরতে হয় Irving Stone-এর Lust for Life-এ, ভ্যান গঘের জীবনভিত্তিক উপন্যাসে। ভ্যান গঘ ও রামকিঙ্কর দুজনেই ছিলেন নিজ নিজ সমাজ ও শৈল্পিক পরিসরের অননুসরণীয় পথিক। কিন্তু এই দুই চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দহন ও বাহ্যিক প্রতিবাদের ভাষা ভিন্ন। Lust for Life একটি ইউরোপীয় আত্মপীড়ার প্রতিচ্ছবি—রোমান্টিক, গথিক, এক গভীর মনঃসমীক্ষার ফল। সেখানে শিল্পীর সংকট একধরনের আত্মধ্বংসী সৌন্দর্যে পরিণত হয়। অপরদিকে, দেখি নাই ফিরে-তে রামকিঙ্করের সংকট আরো মাটির কাছাকাছি—সে কাঁদে না, সে গড়ে। তার ট্র্যাজেডি একান্ত বাঙালি—যার মূলে আছে ভূমির টান, গরিবের গর্ব, ও শিল্পের সামনে আপস না করার গোপন গৌরব। Van Gogh-এর কান কাটা এক ইউরোপীয় ক্যাথারসিস; রামকিঙ্করের জীবন সাঁওতাল-লোকজ এক প্রতিরোধের দলিল—“এ আমার মাটি, এ আমার ঝড়”।
পরবর্তী তুলনাটি Mervyn Peake-এর Gormenghast সিরিজ। অসমাপ্ত, দুরূহ, গূঢ় প্রতীক-আচ্ছাদিত সেই উপন্যাস এক কাব্যিক নির্জনতার স্তম্ভ, যেখানে ধ্বংসপ্রায় গথিক প্রাসাদের ছায়ার নিচে আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম চলে। সমরেশ বসুর দেখি নাই ফিরে-তেও অসমাপ্ততা আছে—তবে তা পরাজয়ের নয়, বরং এক প্রগাঢ় নান্দনিক কৌশল, যা পাঠকের হৃদয়ে কল্পনার দরজা খুলে দেয়। Peake-এর ভাষা সুররিয়াল, বহুবর্ণ, অলঙ্কারময়। সমরেশের ভাষা বহতা নদীর মতো—অপটমিক নয়, কিন্তু গভীর। সেখানে চিৎকার নেই, আছে স্তব্ধ গর্জন। Gormenghast যেখানে এক কাল্পনিক সাম্রাজ্যের ভেতর দিয়ে মানসিক জটিলতা আঁকে, দেখি নাই ফিরে আমাদের টেনে আনে কাঁদা-মাখা এক বাস্তবতায়, যেখানে শিল্পী শুধু নির্মাতা নয়—প্রতিনিয়ত নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে করতে লড়াকু এক মানুষ। এই দুই গ্রন্থেই বাস্তবতা ও কল্পনা গলে গিয়ে এক নতুন নৈতিক ভূগোল রচনা করে, যেখানে ‘অসমাপ্ত’ মানে ‘অপেক্ষমাণ’। শেষ না হওয়াটাই যেন জীবন হয়ে ওঠে।
একইভাবে তুলনীয় Elena Ferrante-এর Neapolitan Novels—যেখানে নেপলসের নিচুপল্লির নির্লজ্জ বাস্তবতা, নারীসত্তা, শ্রেণিসংগ্রাম ও স্মৃতির মর্মঘাতী চিত্র আঁকা হয়। Ferrante তাঁর দুই নারী চরিত্রের ভেতর দিয়ে সমাজের উত্থান, ভাঙন ও সম্পর্কের রাজনীতি তুলে ধর���ন। দেখি নাই ফিরে-র কেন্দ্রেও রয়েছে শিল্পের পেছনের নিরব, কায়িক শ্রম। রামকিঙ্কর যেন নিজেকে গড়ার সময় গোটা জনপদের মাটি, শব্দ ও প্রতিরোধকে নিজের ভাস্কর্যে মিশিয়ে দেন। Ferrante-এর ভাষা কাঠামোবদ্ধ, স্মৃতিনির্ভর, আর বিশ্লেষণাত্মক; সমরেশের ভাষা সরল, কিন্তু সংলগ্ন—এক ব্যাকুল স্মৃতিচারণ, যা শিল্পকে কল্পনার নয়, বাস্তবতার পরিধিতে স্থাপন করে। শিল্প এখানে বুদ্ধিদীপ্ত অনুপ্রেরণার নয়, বরং ভূমির ঘামমাখা ফসল।
Orhan Pamuk-এর The Black Book-এ যেমন ইস্তানবুলের অলিগলি ধরে ব্যক্তি ও শহরের আত্মপরিচয় খোঁজার এক অন্তর্জাল রচনা হয়, দেখি নাই ফিরে-তেও রামকিঙ্করের শিল্প ও জীবন বারবার মিশে যায় লোকজ উপকথা, কল্পনা, স্মৃতি ও ইতিহাসের সীমানায়। Pamuk যেখানে নগর-নির্ভর প্রতীকে স্বর খোঁজেন, সমরেশ সেখানে গ্রামের কাঠুরে, সাঁওতাল, শ্রমজীবী মানুষের মুখে শিল্পের ভাষা খুঁজে পান। একদিকে মেঘে ঢাকা ইস্তানবুল, অন্যদিকে রোদে পোড়া শান্তিনিকেতন।
আর Rabih Alameddine-এর An Unnecessary Woman আমাদের নিয়ে যায় এক একাকী অনুবাদক নারীর নিঃসঙ্গ পাঠকজীবনে। আলিয়া ও রামকিঙ্কর—দুজনেই শিল্পে ডুবে থেকেও সমাজে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে বিবেচিত। অথচ তাদের শিল্প তাঁদের জীবনের সীমা ছাড়িয়ে স্থায়ী হয়ে যায়। রামকিঙ্কর যেমন কাঠে-পাথরে নিজের সত্তা গড়ে তোলেন, আলিয়া বইয়ের পাতায় নিজের নিঃসঙ্গতা লিপিবদ্ধ করেন। তাদের সন্ন্যাসী একাগ্রতা, কোলাহলবিমুখ নির্মাণ, এবং বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও শিল্পের মধ্যে জীবনের আস্ত অস্তিত্ব গড়ে তোলা—এই অনুরণন দুই উপন্যাসকে অদ্ভুতভাবে যুক্ত করে।
এইসব উপন্যাসের পাশে দাঁড়িয়ে দেখি নাই ফিরে কোনো অনুকরণ নয়—বরং এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি, যা একইসঙ্গে আত্মজৈবনিক, শিল্পবীক্ষণধর্মী ও উপন্যাসিক। এতে আছে জীবনের নির্লিপ্ত বাস্তবতা—না আছে ভ্যান গঘের মতো আত্মধ্বংস, না আছে পিক-এর অলৌকিকতা। ভাষার দ্বৈত প্রকৃতি—কোথাও সরল, কোথাও কবিত্বময়, কিন্তু কখনোই অলঙ্কারের ভারে নুয়ে পড়া নয়। এবং অসমাপ্ততার এক সৌন্দর্য—যেখানে উপসংহার নেই, আছে নির্মাণ। শিল্পী রামকিঙ্কর নিজেই এক চলমান মূর্তি।
দেখি নাই ফিরে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ব্যাকরণে পড়ে না—বরং তা নিজেই এক ব্যাকরণ গড়ে। এটি কোনো ধারার কপি নয়, এটি এক নতুন লোকধর্মী আত্মজীবনচিত্রণ, যা একইসঙ্গে ভূমির সন্তান এবং শিল্পের সাধক। Lust for Life এক ব্যক্তির যন্ত্রণার গথিক উপাখ্যান, Gormenghast এক অলীক স্থাপত্যের বিবমিষা; আর দেখি নাই ফিরে এক গাছতলার মঞ্চ—যেখানে নীরব ভাষায় দাঁড়িয়ে থাকে রামকিঙ্করের সাঁওতাল মা, কুঠারের কাঠুরে, আর তার অবয়বের মধ্যে জন্ম নেয় ‘মোক্ষের মতো শিল্প’।
দেখি নাই ফিরে এমন এক উপন্যাস, যা তৈরি হয়েছে তাপ দিয়ে, স্বেদবিন্দু দিয়ে, চোখের জল দিয়ে। এটা কেবল এক শিল্পীর বায়োগ্রাফি নয়, এটি বাংলার এক জনপদের আত্মা, এক সময়ের দলিল, আর এক মননশীল হৃদয়ের শেষ চিৎকার।
অসমাপ্ত বলেই এটি শেষ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিটি পাঠে, প্রতিটি অনুরণনে, এটি নতুন করে জন্ম নেয়। হয়তো রামকিঙ্করেরই ভাষায় বলা যায়—“আমি ফিরে দেখি না, আমি শুধু সামনে হাঁটি।”
আর আমাদের, পাঠকদের, কাজ শুধু—পেছনে তাকিয়ে দেখা, থেমে গিয়ে না-বলা কথাগুলো শুনে নেওয়ার চেষ্টা করা।
অলমতি বিস্তরেণ।