গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল সমরেশ বসুর শেষ তথা বাংলা সাহিত্যের অশেষ কীর্তি ‘দেখি নাই ফিরে’।শিল্পী রামকিঙ্কর বেজ এই শতাব্দীরই এক বিস্ময়। আরও বিস্ময়কর বুঝি তাঁর জীবন। যে-জীবন অনিঃশেষ সংগ্রামের, সাধনার, সাফল্যের। যে-জীবন নিন্দার, বিতর্কের, অস্বস্তির। বিশ্বাসে অটল, জীবনবোধে অবিচল, নাটকীয়তায় উদ্বেল সেই বহুবর্ণ জীবনকেই চিত্রিত করতে চেয়েছেন সমরেশ বসু এই উপন্যাসে। যুগন্ধর লেখকের এই অসামান্য কীর্তিকে চিত্রিত করেছেন আরেক যুগোত্তীর্ণ শিল্পী, বিকাশ ভট্টাচার্য—অলঙ্করণের কাজ যাঁর এই প্রথম। এ এক দুর্লভ যুগলবন্দী।দুর্লভ এই প্রয়াসও। বাস্তব কোনও শিল্পীকে নিয়ে উপন্যাস রচনার দৃষ্টান্ত বিশ্বসাহিত্যেই অঙ্গুলিমেয়, বাংলায় নজিরবিহীন। লেখকের আকস্মিক প্রয়াণে অসমাপ্ত থেকে গেল এই কীর্তি। তবু কালের নৈকট্য এবং উপাদান-বিরলতার প্রতিবন্ধকতাকে যেভাবে জয় করেছেন সমরেশ বসু, দশ বছরেরও বেশি কাল ধরে অক্লান্ত শ্রমে-নিষ্ঠায় যেভাবে জড়ো করেছিলেন সমূহ সাক্ষ্য-বিবরণ-দলিল, সর্বোপরি এই জীবনকাহিনীর মধ্য দিয়ে যেভাবে মেলে ধরেছেন নিজেরও সংগ্রাম-সাধনার, যন্ত্রণা-লাঞ্ছনার এক অপরূপ প্রতিচ্ছবি—তা যেমন নতুনতর তেমনই মহিমান্বিত এক মাত্রা যুক্ত করেছে এই উপন্যাসে।
Samaresh Basu (Bengali: সমরেশ বসু) was born in December 22, 1924. He spent his early childhood in Bikrampur, Dhaka. He also wrote under the pen-name of Kalkut.
He would in later days recall the deep impressions that the Brata-kathas (fantastic folk-tales recited by women while performing certain religious rites) narrated by his mother left on him as a child. His adolescent years were spent in Naihati, a suburb of Kolkata, in West Bengal. His life was rich with varied experiences. At one point, he used to hawk eggs from a basket carried on his head; later, he worked for meager daily wages. From 1943 through 1949 he worked in an ordnance factory in Ichhapore. He was an active member of the trade union and the Communist Party for a period, and was jailed for during 1949-50 when the party was declared illegal. While in jail, he wrote Uttaranga,his first published novel. Soon after his release from the jail, he began to write professionally, refusing to join the factory even when offered his old job. When he was only 21, he wrote his first novel Nayanpurer Mati, later published in Parichay. it was never published as a book. Adab was his first short story published in Parichay in 1946. A prolific writer with more than 200 short stories and 100 novels, including those written under the aliases "Kalkut" and "Bhramar", Samaresh Basu is a major figure in Bangla fiction. His life experiences populated his writings with themes ranging from political activism to working class life to sexuality. Two of his novels had been briefly banned on charges of obscenity. The case against one of these, Prajapati (Bangla:প্রজাপতি), was settled in the Supreme Court of India which overturned, in 1985, the rulings of the two lower courts. Among other intellectuals, Buddhadeva Bose, himself once accused of similar charges for his রাত ভ'রে বৃষ্টি, came out strongly in support of Samaresh. To quote from Sumanta Banerjee's recent translation Selected Stories (Vol.1), Samaresh Basu "remains the most representative storyteller of Bengal's suburban life, as distinct from other well-known Bengali authors who had faithfully painted the life and problems of either Bengal's rural society or the urban middle class. Basu draws on his lived experience of Calcutta's `half-rural, half-urban,' industrial suburbs." While the pen-name "Kalkut" was adopted in 1952 for the immediate need to publish an overtly political piece, the real "Kalkut" can be said to have been born with the publication of Amritakumbher Sandhane, a hugely popular, semi-autobiographical narrative centered around the Kumbha-mela. The many subsequent books by Kalkut had depicted the lives of the common people from all over India and all walks of life (including those who live on the periphery of the "mainstream") with their varied cultures and religious practices in a unique style that was Kalkut's own. He also drew upon the recollections of the Puranas and Itihas; Shamba (Bangla:শাম্ব), an interesting modern interpretation of the Puranic tales, won the Sahitya Akademi Award in 1980. Samaresh Basu breathed his last on March 12, 1988.
"দেখি নাই ফিরে" আমার ভালো লেগেছে, কিন্তু যে অর্থে অনেকে এটাকে ম্যাগনাম ওপাস বলে সে অর্থে ভালো লাগেনি বিশেষ। মহাকাব্যিক বিস্তৃতি আছে আয়তনে, কিন্তু গভীরতায়? কিঞ্চিৎ সন্দেহ রয়ে গেলো। রামকিঙ্কর বেইজের জীবনভিত্তিক উপন্যাস কিন্তু অনেকবার মনে হয়েছে এটা জীবনীই, উপন্যাস নয়। এতো বিশাল( মানে বিশায়ায়ায়ায়ায়ায়াল) আয়োজন! এতো বিশাল যে লেখক সে আয়োজন সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। পড়তে কি খারাপ লেগেছে? একদম না। কিন্তু শুরু থেকে এতো বিস্তারিতভাবে প্রতিটা ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে তা উপন্যাসের চাইতে প্রামাণ্য বিবরণ হয়েছে বেশি। শান্তিনিকেতন অংশটায় মনে রাখার মতো অনেক ঘটনা আছে। ওখানকার শিক্ষাপদ্ধতি, জীবনযাপনের ধরন, আর্থিক অবস্থা, সার্বিক পরিবেশ খুব সুন্দরভাবে লেখকের কলমে ফুটে উঠেছে। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে শিক্ষক ও মানুষ নন্দলাল বসুকে; তাঁর মতো শিক্ষক মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। শিল্প নিয়ে রামকিঙ্করের ভাবনা, নন্দলাল বসুর সাথে আলোচনা মনোজ্ঞ। স্বীকৃতভাবেই লেখকের জীবনও নাকি মিশে গেছে রামকিঙ্করের সাথে; কোথায় কতোটুকু তা জানার আগ্রহ রইলো। রামকিঙ্করের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ শুরু হতে না হতেই সমরেশ মারা গেছেন। আমি নিশ্চিত, অলিখিত অংশটাই সেরা অংশ হতো উপন্যাসের। আর পুরো লেখাটা একদম এলানো। আঁটসাঁট হলে শিল্পীর জীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি অনেক তীব্রভাবে পাওয়া যেতো বলে আমার ধারণা।
এবার আনন্দ জুয়েলার্সের কথা বলি। চার রঙা পাতায় ৩০০০ রুপির একটা বই অথচ রামকিঙ্কর বেইজের সালভিত্তিক জীবনপঞ্জি নেই। সমরেশ বসু যে পর্যন্ত লিখেছেন সেখানে রামকিঙ্করের জীবনের বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হচ্ছে মাত্র। সমরেশ এ ঘটনাগুলো কীভাবে সাজাতেন আর রামকিঙ্করের মনোজগৎ কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন তা জানার উত্তুঙ্গ আগ্রহ হবে যে কারো, সাথে আফসোস। সমরেশ শেষ করে যেতে পারলেন না! কিন্তু রামকিঙ্করের জীবনের ঘটনাগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে অন্তত কয়েক পাতায় তো বর্ণনা করা যেতো। আনন্দ সে দায়িত্ব নেয়নি।
I love Samaresh Basu. His stories and novellas on the child-detective Gogol are a few of those things that define my childhood. But here, he kind of attempts Dickensian long-form storytelling to tell us the story of Ramkinkar Baij, which doesn’t always work. Like the very beginning feels a bit flat, with paragraphs (which supposedly set the atmosphere/tonality) that don’t take you anywhere. It’s a problem that I’ve often witnessed, a show-off of literary prowess, where authors stretch the story for God knows why. Dickens got money for that, but if you can easily condense your book into two-thirds of its original size, why not do it?
However, once it begins it starts getting really good. And the profoundness of the biography here is almost unparalleled in everything I’ve yet to read by an Indian author (S. Hussain Zaidi may count, but he never wrote about a person who made some positive contributions to society). As for Contextual Modernism, I was woefully ignorant before coming across this book, all I knew about Ramkinkar Baij was his sculpting skills and association with Tagore.
If you consider a book’s cover and illustrations when judging how good the ‘product’ is, then this book is for you, though. The paintings used here are spectacular, nothing less. Somehow that makes it come to the closest thing I’ve held in my hands like Walter Isaacson’s Leonardo Da Vinci.
কিছু কিছু বই থাকে না? বর্ণনার বাইরে। সমরেশ বসুর বইটা ঠিক এ রকম। ঠিক শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্যের মতো। রিয়েলিস্টিক কিন্তু জীবন্ত।
'উ চন্ডী লাপিতের বেটা নাকি আঁকা (ছবি) নেকা করে'
বাঁকুড়ার নিম্নবর্গের এক পরিবারের সন্তান শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ। অবশ্য পদবীটা তখন বেইজ ছিল না, ছিল প্রামাণিক। ক্ষৌরকার পরিবারের সন্তান সে, বাবা-মা, বৌদি-দাদা সকলেই ব্যস্ত নিজ নিন কাজ নিয়ে। ব্যতিক্রম কেবল রামকিঙ্কর। উয়া ইস্কুলে যায়, ছবি আঁকা নেকা করে আবার পিতিমে গড়বার গুরু অনন্ত জেঠার কাছকাছে ঘুরে। তার চরিত্রটা ঠিক অন্য সবার সাথে মেলে না। কাছের বন্ধুরা খুব কাছে থেকেও যেন দূরের, রামকিঙ্করের নাগাল পায় না। সংসারে চরম দারিদ্র্য, যেখানে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাই দায় সেখানে আঁকাজোকা তো বিলাসিতা মাত্র। তবুও জীবন চলে যায়... ভাগ্যক্রমে নাকি কাজের গুণে? অথবা দুটোই। রামকিঙ্কর ভর্তি হয় শান্তিনিকেতনে।
সেই শান্তিনিকেতন! যেখানে সর্বেসর্বা গুরুদেব। নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে রামকিঙ্কর। জীবন চলতে থাকে জীবনের নিয়মে। অবশ্য নিয়তি যাকে ঠিক করে রেখেছে বড় শিল্পী হবে, সে তো হবেই। তারপরেও আসে কত্তো রকমের বাধা। কখনও আর্থিক, কখনও মানসিক আরও কতো রকমের ঝামেলা! নবীন এই যুবা শিল্পীকে ক্রমাগত প্রেরণা দিয়ে গেছে গুরু এবং শিক্ষক নন্দলাল বসু। গুরুদেবও আছেন। সেই যে তিনি রামকিঙ্করকে বলেছিলেন পিছন ফিরে না দেখতে.. দেখেনি রামকিঙ্করও। গুরুদেবের আশীর্বাদ আর প্রেরণাকে সঙ্গে নিয়ে নিজেকে করে রেখেছেন অজর, অমর, অক্ষয়।।
সমরেশ বসু ইনিও আরেকজন যথার্থই শিল্পী। রামকিঙ্কর যেখানে মাটি আর রঙ তুলিতে মানুষকে বেঁধে ফেলতে পারেন, সমরেশ বসু সেটা করেন কাগজ কলমে। ৭৫২ পৃষ্ঠার এই বৃহৎ কিন্তু অসমাপ্ত বইয়ে ধারণ করেছেন শিল্পী রামকিঙ্করকে। আফসোস! এর শেষটা দেখে যেতে পারেননি কেউই।
বইটা পড়তে এখনও দোনামোনা করছেন? ভুল করবেন। হাইলি রেকমেন্ডেড!
দেখি নাই ফিরে — এক অসমাপ্ত মহাকাব্যিক অনুরণন (পুনর্পাঠ: ২রা আগস্ট, রামকিঙ্কর বৈজের প্রয়াণ দিবসে)
সমরেশ বসুর দেখি নাই ফিরে পড়া মানে কেবল একটি শিল্পীর জীবনকথা জানা নয়—এ যেন লাল মাটির গন্ধ মেখে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা, যেন পায়ের তলায় কাদার স্নিগ্ধ ঠান্ডা স্পর্শে অতীতকে ছুঁয়ে ফেলা। প্রতিটি শব্দ যেন খননযন্ত্রের মতো, ধীরে ধীরে তুলে আনে আমাদের শিল্পচেতনার, ইতিহাসের, দেশকালের ও ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার স্তর—যেন মাটির তলা থেকে উঠে আসে অজানা কোনো সভ্যতার নিঃশব্দ স্পন্দন।
এটি সমরেশ বসুর শেষ উপন্যাস। শেষ করতে গিয়েও শেষ করতে পারেননি — এই উপন্যাস যেন মৃত্যুর মুখোমুখি বসে লেখা এক দীর্ঘ আত্মকথন। বহু আগেই শুরু হয়েছিল কলমের পথচলা, কিন্তু শেষ অধ্যায়গুলো লেখা হয়েছিল শয্যাশায়ী অবস্থায়, শরীরের প্রতিটি কোষে তখন মৃত্যুর ধুকপুকানি, অথচ লেখার স্পন্দন থামেনি। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন: অসমাপ্ত কাজ কি কখনও পূর্ণতা পায়? দেখি নাই ফিরে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে—পায়, ঠিকই পায়। কারণ কখনও কখনও একটি উপন্যাস শেষ না হয়েও, একটা অন্যরকম 'সমাপ্তি' ছুঁয়ে ফেলে—যেখানে লেখকের না-বলা কথাগুলো পাঠকের মর্মে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, দীর্ঘ দিন ধরে। অশেষেই যে অনেক সময় শেষের চেয়ে বেশি কিছু থাকে—এই উপন্যাস তারই জীবন্ত প্রমাণ।
৭৫২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি রামকিঙ্কর বৈজের জীবনের ছায়া হয়ে ওঠে। একজন দরিদ্র নাপিতের পুত্র থেকে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর — সেই যাত্রাপথ নির্মিত হয়েছে নিখুঁত বাস্তবতা আর কবিত্বের মিশেলে।
উপন্যাসের প্রথম দিকটা বাঁকুড়ার কাদা-লেপা পথ দিয়ে শুরু। এখানেই আমরা ছোট্ট কিঙ্করকে দেখি, যার চোখে জেগে উঠছে এক অন্য রকম জগৎ। চারপাশের লোকজন, সাঁওতাল জীবনযাপন, মা-ঠাকুমার কন্ঠে গল্প—সব মিলিয়ে যেন একটা লোকজ রূপকথা। কিন্তু এটাকে রূপকথা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না, কারণ এর ভিতরেই জন্ম নিচ্ছে শিল্প।
শান্তিনিকেতনে প্রবেশ করতেই উপন্যাসের গতি, ভাষা, ভাব—সবই বদলে যায়। যেন রাম���িঙ্করের জীবনে নতুন আলোর প্রতিফলন ঘটে। নন্দলাল বসু যখন বলেন, “এখানে তোমার শেখার কিছু নেই”—তখনই বোঝা যায়, এই ছেলেটার মধ্যে রয়েছে এমন কিছু, যা শিক্ষা দিয়ে গড়া যায় না। তা জন্মগত। একরকম অভ্যন্তরীণ দাবানল।
সমরেশ বসুর ভাষা এখানে নিজেই রামকিঙ্করের ভাস্কর্য হয়ে ওঠে—খসখসে, অসম, কিন্তু প্রাণময়। তিনি সুন্দরকে খুঁজে পান ভাঙা দেউড়িতে, কাঠকয়লায়, মৃত পশুর চোখে। এই উপন্যাস কেবল শিল্পীর জীবন নয়, শিল্পের সংজ্ঞাও হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই উপন্যাসের আরেকটি স্তর আছে—নিজস্ব আত্মজিজ্ঞাসার। লেখক নিজে তখন অসুস্থ। ক্যানুলা হাতে, অক্সিজেন মাস্ক পরে, তিনি এই উপন্যাস লিখছেন। পত্রিকা অফিসে হাতে হাতে পাণ্ডুলিপি পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর ছেলে। এটা আর কেবল রামকিঙ্করের কাহিনি নয়, এটা সমরেশ বসুর আত্মজীবনীও—এক শিল্পীর বেদনা, এক পিতার হতাশা, এক লেখকের শুদ্ধিকরণ।
উপন্যাসটি যেখানে থেমে যায়, সেখানে থেমে থাকেন না পাঠক। বরং সেই অসমাপ্ততাই এক নতুন পাঠের জন্ম দেয়—যেমন ঘটে মারভিন পিকের Gormenghast সিরিজে। থেমে যাওয়া মানেই শেষ নয়, বরং এটা নতুন এক অনুরণন।
বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ভট্টাচার্যের অলংকরণ। বাংলা সাহিত্যে এটিই একমাত্র উপন্যাস যাতে তিনি ছবি এঁকেছেন। তাঁর আঁকাগুলোর মধ্যে যে স্বপ্ন, যে ধোঁয়াটে আলোছায়া—তা যেন উপন্যাসের ভাষারই চিত্ররূপ।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে সমরেশ বসুর দেখি নাই ফিরে কোথায় দাঁড়িয়ে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই ফিরতে হয় Irving Stone-এর Lust for Life-এ, ভ্যান গঘের জীবনভিত্তিক উপন্যাসে। ভ্যান গঘ ও রামকিঙ্কর দুজনেই ছিলেন নিজ নিজ সমাজ ও শৈল্পিক পরিসরের অননুসরণীয় পথিক। কিন্তু এই দুই চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দহন ও বাহ্যিক প্রতিবাদের ভাষা ভিন্ন। Lust for Life একটি ইউরোপীয় আত্মপীড়ার প্রতিচ্ছবি—রোমান্টিক, গথিক, এক গভীর মনঃসমীক্ষার ফল। সেখানে শিল্পীর সংকট একধরনের আত্মধ্বংসী সৌন্দর্যে পরিণত হয়। অপরদিকে, দেখি নাই ফিরে-তে রামকিঙ্করের সংকট আরো মাটির কাছাকাছি—সে কাঁদে না, সে গড়ে। তার ট্র্যাজেডি একান্ত বাঙালি—যার মূলে আছে ভূমির টান, গরিবের গর্ব, ও শিল্পের সামনে আপস না করার গোপন গৌরব। Van Gogh-এর কান কাটা এক ইউরোপীয় ক্যাথারসিস; রামকিঙ্করের জীবন সাঁওতাল-লোকজ এক প্রতিরোধের দলিল—“এ আমার মাটি, এ আমার ঝড়”।
পরবর্তী তুলনাটি Mervyn Peake-এর Gormenghast সিরিজ। অসমাপ্ত, দুরূহ, গূঢ় প্রতীক-আচ্ছাদিত সেই উপন্যাস এক কাব্যিক নির্জনতার স্তম্ভ, যেখানে ধ্বংসপ্রায় গথিক প্রাসাদের ছায়ার নিচে আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম চলে। সমরেশ বসুর দেখি নাই ফিরে-তেও অসমাপ্ততা আছে—তবে তা পরাজয়ের নয়, বরং এক প্রগাঢ় নান্দনিক কৌশল, যা পাঠকের হৃদয়ে কল্পনার দরজা খুলে দেয়। Peake-এর ভাষা সুররিয়াল, বহুবর্ণ, অলঙ্কারময়। সমরেশের ভাষা বহতা নদীর মতো—অপটমিক নয়, কিন্তু গভীর। সেখানে চিৎকার নেই, আছে স্তব্ধ গর্জন। Gormenghast যেখানে এক কাল্পনিক সাম্রাজ্যের ভেতর দিয়ে মানসিক জটিলতা আঁকে, দেখি নাই ফিরে আমাদের টেনে আনে কাঁদা-মাখা এক বাস্তবতায়, যেখানে শিল্পী শুধু নির্মাতা নয়—প্রতিনিয়ত নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে করতে লড়াকু এক মানুষ। এই দুই গ্রন্থেই বাস্তবতা ও কল্পনা গলে গিয়ে এক নতুন নৈতিক ভূগোল রচনা করে, যেখানে ‘অসমাপ্ত’ মানে ‘অপেক্ষমাণ’। শেষ না হওয়াটাই যেন জীবন হয়ে ওঠে।
একইভাবে তুলনীয় Elena Ferrante-এর Neapolitan Novels—যেখানে নেপলসের নিচুপল্লির নির্লজ্জ বাস্তবতা, নারীসত্তা, শ্রেণিসংগ্রাম ও স্মৃতির মর্মঘাতী চিত্র আঁকা হয়। Ferrante তাঁর দুই নারী চরিত্রের ভেতর দিয়ে সমাজের উত্থান, ভাঙন ও সম্পর্কের রাজনীতি তুলে ধরেন। দেখি নাই ফিরে-র কেন্দ্রেও রয়েছে শিল্পের পেছনের নিরব, কায়িক শ্রম। রামকিঙ্কর যেন নিজেকে গড়ার সময় গোটা জনপদের মাটি, শব্দ ও প্রতিরোধকে নিজের ভাস্কর্যে মিশিয়ে দেন। Ferrante-এর ভাষা কাঠামোবদ্ধ, স্মৃতিনির্ভর, আর বিশ্লেষণাত্মক; সমরেশের ভাষা সরল, কিন্তু সংলগ্ন—এক ব্যাকুল স্মৃতিচারণ, যা শিল্পকে কল্পনার নয়, বাস্তবতার পরিধিতে স্থাপন করে। শিল্প এখানে বুদ্ধিদীপ্ত অনুপ্রেরণার নয়, বরং ভূমির ঘামমাখা ফসল।
Orhan Pamuk-এর The Black Book-এ যেমন ইস্তানবুলের অলিগলি ধরে ব্যক্তি ও শহরের আত্মপরিচয় খোঁজার এক অন্তর্জাল রচনা হয়, দেখি নাই ফিরে-তেও রামকিঙ্করের শিল্প ও জীবন বারবার মিশে যায় লোকজ উপকথা, কল্পনা, স্মৃতি ও ইতিহাসের সীমানায়। Pamuk যেখানে নগর-নির্ভর প্রতীকে স্বর খোঁজেন, সমরেশ সেখানে গ্রামের কাঠুরে, সাঁওতাল, শ্রমজীবী মানুষের মুখে শিল্পের ভাষা খুঁজে পান। একদিকে মেঘে ঢাকা ইস্তানবুল, অন্যদিকে রোদে পোড়া শান্তিনিকেতন।
আর Rabih Alameddine-এর An Unnecessary Woman আমাদের নিয়ে যায় এক একাকী অনুবাদক নারীর নিঃসঙ্গ পাঠকজীবনে। আলিয়া ও রামকিঙ্কর—দুজনেই শিল্পে ডুবে থেকেও সমাজে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে বিবেচিত। অথচ তাদের শিল্প তাঁদের জীবনের সীমা ছাড়িয়ে স্থায়ী হয়ে যায়। রামকিঙ্কর যেমন কাঠে-পাথরে নিজের সত্তা গড়ে তোলেন, আলিয়া বইয়ের পাতায় নিজের নিঃসঙ্গতা লিপিবদ্ধ করেন। তাদের সন্ন্যাসী একাগ্রতা, কোলাহলবিমুখ নির্মাণ, এবং বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও শিল্পের মধ্যে জীবনের আস্ত অস্তিত্ব গড়ে তোলা—এই অনুরণন দুই উপন্যাসকে অদ্ভুতভাবে যুক্ত করে।
এইসব উপন্যাসের পাশে দাঁড়িয়ে দেখি নাই ফিরে কোনো অনুকরণ নয়—বরং এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি, যা একইসঙ্গে আত্মজৈবনিক, শিল্পবীক্ষণধর্মী ও উপন্যাসিক। এতে আছে জীবনের নির্লিপ্ত বাস্তবতা—না আছে ভ্যান গঘের মতো আত্মধ্বংস, না আছে পিক-এর অলৌকিকতা। ভাষার দ্বৈত প্রকৃতি—কোথাও সরল, কোথাও কবিত্বময়, কিন্তু কখনোই অলঙ্কারের ভারে নুয়ে পড়া নয়। এবং অসমাপ্ততার এক সৌন্দর্য—যেখানে উপসংহার নেই, আছে নির্মাণ। শিল্পী রামকিঙ্কর নিজেই এক চলমান মূর্তি।
দেখি নাই ফিরে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ব্যাকরণে পড়ে না—বরং তা নিজেই এক ব্যাকরণ গড়ে। এটি কোনো ধারার কপি নয়, এটি এক নতুন লোকধর্মী আত্মজীবনচিত্রণ, যা একইসঙ্গে ভূমির সন্তান এবং শিল্পের সাধক। Lust for Life এক ব্যক্তির যন্ত্রণার গথিক উপাখ্যান, Gormenghast এক অলীক স্থাপত্যের বিবমিষা; আর দেখি নাই ফিরে এক গাছতলার মঞ্চ—যেখানে নীরব ভাষায় দাঁড়িয়ে থাকে রামকিঙ্করের সাঁওতাল মা, কুঠারের কাঠুরে, আর তার অবয়বের মধ্যে জন্ম নেয় ‘মোক্ষের মতো শিল্প’।
দেখি নাই ফিরে এমন এক উপন্যাস, যা তৈরি হয়েছে তাপ দিয়ে, স্বেদবিন্দু দিয়ে, চোখের জল দিয়ে। এটা কেবল এক শিল্পীর বায়োগ্রাফি নয়, এটি বাংলার এক জনপদের আত্মা, এক সময়ের দলিল, আর এক মননশীল হৃদয়ের শেষ চিৎকার।
অসমাপ্ত বলেই এটি শেষ হয়ে যায়নি। বরং প্রতিটি পাঠে, প্রতিটি অনুরণনে, এটি নতুন করে জন্ম নেয়। হয়তো রামকিঙ্করেরই ভাষায় বলা যায়—“আমি ফিরে দেখি না, আমি শুধু সামনে হাঁটি।”
আর আমাদের, পাঠকদের, কাজ শুধু—পেছনে তাকিয়ে দেখা, থেমে গিয়ে না-বলা কথাগুলো শুনে নেওয়ার চেষ্টা করা।
"দেখি নাই ফিরে" বইটা প্রকাশিত হবার আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় এক বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। তাতে লেখা হয়েছিল এটা সমরেশ বসুর শেষ লেখা (কীর্তি), যা দেখে লেখক খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন এবং প্রকাশক সাগরময় ঘোষের কাছে চিঠি তে তা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তখন কে জানতো এটা আসলেই লেখকের শেষ কীর্তি।বাংলা সাহিত্যের এক ধ্রুপদী কীর্তি, ক্লাসিক এক অসমাপ্ত জীবনোপন্যাস। বইটাতে বিকাশ ভট্টাচার্��ের আঁকা অনেকগুলো ছবি আছে যা চমৎকার। বইয়ের পৃষ্ঠা ছবির ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠার মত পুরোটা বইয়ের পৃষ্ঠা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদিন রামকিঙ্করকে ডেকে নিয়ে বললেন, তুই তোর মূর্তি আর ভাস্কর্য দিয়ে আমাদের সবখানে ভরিয়ে ফেল। একটা শেষ করবি আর সমনে এগিয়ে যাবি। লেখক সমরেশ বসুর কাছে গল্প করতে গিয়ে এই কাহিনি বলে রামকিঙ্কর বলেন, তারপর আমিও আর ফিরে দেখি নাই। পরে লেখক সিদ্ধান্ত নেন এই কথা থেকেই তিনি নেবেন বইয়ের নাম-- সেই ভাবনা থেকেই " দেখি নাই ফিরে"।
আনন্দ প্রকাশনী থেকে সমরেশ বসুর ৭৫০ পৃষ্ঠার বড়সড়ো এক অসমাপ্ত জীবনোপন্যাস 'দেখি ন���ই ফিরে'। লেখক বইটা লেখার আগে কয়েকবার রামকিঙ্করের কাছে গেছেন তাঁর জীবন কথা শোনার জন্য কিন্তু উপন্যাস লেখার আগেই জীবন কথা বলতে বলতে অসমাপ্ত রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। আর উপন্যাস লিখতে লিখতে তা অসমাপ্ত রেখেই না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন লেখক।
যেহেতু জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস তাই ছোট থেকে বেড়ে ওঠা, চেনা পথঘাট, পরিচিত জন কাছের মানুষ ও রামকিঙ্কর প্রামাণিক থেকে রামকিঙ্কর বেইজ হয়ে ওঠা কতোটা কঠিন ও সংগ্রামের ছিলো সেই হিসেবে তথ্য সংগ্রহ ও তা সময় অনুসারে লেখাটা বেশ কঠিন একটা কাজ ছিলো লেখকের জন্য কিন্তু তিনি তা করতে চেষ্টা করেছেন। আড়ম্বর করে বিস্তৃত পরিসরে তিনি শুরু করেছিলে। তুচ্ছ, ক্ষুদ্র যতো কাহিনি, তাঁর সাথে কোথাও মিশে থাকা একেবারে গুরুত্বহীন, না বললেও চলতো এমন সব চরিত্র ও উঠে এসেছে।
"দেখি নাই ফিরে" এক জীবনোপন্যাস, তবে আমার মনে হয়েছে ঠিকঠাক উপন্যাস হয়ে উঠতে পারেনি, এটা জীবনীগ্রন্থ ই ঠিক ছিলো। উপন্যাসের বাহুল্যতা এখানে নাই তবে তত্ত্ব তথ্যের এতোটুকুও ঘাটতি নাই বরং জানার চেষ্টা করে অনেক ঘটনা তুলে আনা হয়েছে যা পরিছন্ন এক জীবনী গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। উপন্যাসের ব্যাপারগুলো এখানে ঠিক আনা যায় নাই, এটাকে জোর করে উপন্যাস করতে যাওয়াটা মনে হয় ঠিকও হতো না। লেখক অনেক কষ্ট করেছেন সময় দিয়েছেন, ভূমিকা পড়ে মনে হয়েছে বইটা লেখার পেছনের গল্প নিয়ে আর একটা বই লেখা সম্ভব ছিলো।
বইটা পড়তে গিয়ে অনেকের হয়তো মনে হবে অহেতুক এতো দীর্ঘ করার দরকার ছিলো না-- আমার মনে হয়েছে, দরকার ছিলো, ৭৫০ পৃষ্ঠার পর মনে হয় লেখক আরও ৭৫০ পৃষ্ঠা লিখতেন বইটা পুরোপুরি শেষ করতে গিয়ে এবং এটাই হওয়া দরকার। রামকিঙ্কর বেইজ কে নিয়ে আরও বই আছে তবে একটা " দেখি নাই ফিরে " এর বড্ড বেশী দরকার ছিলো। একটা মানুষ নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে যে নিজের নামটা উজ্জ্বল করলেন তার অনেক অনেক স্বীকৃতির মধ্যে এটাও একটা বড় স্বীকৃতি হয়ে রইলো। বইটা পড়ে যেমন মানুষ ও শিল্প রামকিঙ্করকে জানা যাবে তেমনি যানা যাবে সেই সময়ের শান্তিনিকেতনকে তবে তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাই বললেই চলে। উনাকে খুব একটা এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দীর্ঘএক বই আমি খুব আস্তে ধীরে পড়ে শেষ করেছি, আমার একটুও বিরক্তি আসেনি। তবে বইটার ওজনের কারনে আরামে পড়াটা সম্ভব না, খুবই কষ্ট করে বইটা সামলে পড়া লাগলো।
লেখকের অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়া কাজ হয়তো শেষ করা যেতো, প্রকাশক চাইলে শেষে দিনপঞ্জী জুড়ে দিতে পারতেন হয়তো। কিন্তু সব কিছুর তো সুন্দর সমাপ্তির দরকার হয় না, কিছু জিনিস অসমাপ্তই সুন্দর।
দেখি নাই ফিরে - সমরেশ বসু (শেষ উপন্যাস) (বিকাশ ভট্টাচার্য চিত্রিত)। বাংলা কথাসাহিত্যে সমরেশ বসুর তুলনা সমরেশ বসুই। তিনি জন্মেছিলেন ঢাকা জেলার ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরের রাজানগর গ্রামে। জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ। আর এ পরিশ্রমী লেখক ১৯৮৮-এর ১২ মার্চ যখন মারা যান তখনও তার লেখার টেবিলে ১০ বছরের অমানুষিক শ্রমের অসমাপ্ত ফসল শিল্পী রামকিংকর বেইজের জীবনী অবলম্বনে উপন্যাস ‘দেখি নাই ফিরে ’।
শিল্পী রামকিংকর বেইজ এই শতাব্দীর এক বিস্ময়। আরও বিস্ময়কর তাঁর জীবন। যে-জীবন অনি:শেষ সংগ্রামের, সাধনার, সাফল্যের। যে-জীবন নিন্দার, বিতর্কের, অস্বস্তির। বিশ্বাসে অটল, জীবনবোধে অবিচল, নাটকীয়তায় উদ্বেল সেই বহুবর্ণ জীবনকেই চিত্রিত করতে চেয়েছেন সমরেশ বসু এই উপন্যাসে। যুগন্ধর লেখকের এই অসামান্য কীর্তিকে চিত্রিত করেছেন আর এক যুগোত্তীর্ণ শিল্পী, বিকাশ ভট্টাচার্য - অলংকরণের কাজ যার এই প্রথম। এ এক দুর্লভ যুগলবন্দী।
দুর্লভ এই প্রয়াসও। বাস্তব কোনো শিল্পীকে নিয়ে উপন্যাস-রচনার দৃষ্টান্ত বিশ্বসাহিত্যেই অঙ্গুলিমেয়, বাংলায় নাজিরহীন। লেখকের আকস্মিক প্রয়াণে অসমাপ্ত থেকে গেল এই কীর্তি। তবু কালের নৈকট্য এবং উপাদান-বিরলতার প্রতিবন্ধকতাকে যেভাবে জয় করেছেন সমরেশ বসু , দশ বছরেরও বেশি কাল ধরে অক্লান্ত শ্রমে-নিষ্ঠায় যেভাবে জড়ো করেছেন সমূহ সাক্ষ্য-বিবরণ-দলিল, সর্বোপরি এই জীবনকাহিনীর মধ্য দিয়ে যেভাবে মেলে ধরেছেন নিজেরও সংগ্রাম-সাধনার, যন্ত্রণা-লাঞ্ছনার এক অপরূপ প্রতিচ্ছবি - তা যেমন নতুনতর তেমনই মহিমান্বিত এক মাত্রা যুক্ত করেছে এই উপন্যাসে।
দেখি নাই ফিরে - সমরেশ বসু আনন্দ পাবলিশার্স মূল্য - ২০০০
কিছু বই আছে, যে গুলোর কোন রিভিউ লাগে না। এই বইগুলো জন্য একটাই রিভিউ - "যদি এখনও না পড়ে থাকেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পড়ে ফেলুন", আর 'দেখি নাই ফিরে ' হচ্ছে সেই ধরনের একটা জীবনী মূলক উপন্যাস। সমরেশ বসুর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। রামকিঙ্কর বেইজের জীবন নিয়ে লিখা।
শুধু একটাই আক্ষেপ উপন্যাসটি অসম্পূর্ণ থেকে গেল। উপন্যাসটি পাঁচটি পর্বে শেষ হবার কথা ছিল, কিন্তু তৃতীয় পর্বের কিছু অংশ লিখেই উনি মারা যান। সমরেশ বসু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উপন্যাসের কিছু অংশ লিখেছেন। থাক না অসম্পূর্ণ, পরম স্রষ্টার সৃষ্টিওতো অসম্পূর্ণ।
এটি সম্পূর্ণ হলে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী, অনন্য এক সাহিত্য কীর্তি হিসেবে স্মরণ করা হত। লেখকের অকালপ্রয়াণে তা সম্ভব হবে না কোনদিন। বইটির শেষ পৃষ্ঠায় এসে আক্ষেপবোধ তীব্র হল। আমার প্রিয় Mervyn Peake এর অসম্পূর্ণ Gormenghast seriesএর পর আবার এই বইটির শেষে সেই একইরকম দুঃখ ও শূন্যতা অনুভব করলাম।
সুন্দর, মধুর লেখা, ছবির মতন, যে ছবিগুলি বিকাশ ভট্টাচার্য এঁকেছেন সেগুলিও খুব সুন্দর। সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছিলাম পড়তে পড়তে, ছায়াছবির মত যেন সব ভাসছে চোখের সামনে। Biographical novel subgenreএ Irving Stone এর Vincent van Gogh কে নিয়ে লেখা Lust for Life বইটি খুব ভাল লেগেছিল, এই বইটিতেও সেরকম উচ্চস্থানে পৌঁছনোর সমস্ত আভাস ছিল। Lust for Lifeএর থেকে এই বই আমার মনকে বেশী স্পর্শ করেছে কারণ এটি আমার দেশ - তার ভাষা, তার পরিবেশ, তার শিক্ষা (শান্তিনিকেতনের কলাবিভাগের কথা বিশেষভাবে বলছি), তার শিল্প ও স্থাপত্য - তার মাটির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক হয়ে গিয়েছে। আমাকে - বেশিরভাগ সময়ে এক concrete jungleএ বাস করা সাধারণ পাঠককে - এক অজানা দিগন্তের সন্ধান দিয়েছে বইটি। এক যুগান্তকারী ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা বইটিও মহান সাহিত্যের হওয়ার দিকে অগ্রসর হয়েছে।
কিন্ত লেখক শেষ করার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। বইটি অসমাপ্ত। আমাকে অনুমান করতে বললে (লেখনীর ধরণ এবং সম্পাদক সাগরময় ঘোষের মুখবন্ধ থেকে) আমার মনে হয় আমরা মাঝামাঝি জায়গা অব্দি বইটা পেয়েছি। অসম্পূর্ণ তাই potential masterpiece. এ দুঃখ কোনদিন ভোলার নয়। তাও এই সাহিত্যকীর্তি যে সম্ভব হয়েছিল, তার জন্য সমরেশ বসু, বিকাশ ভট্টাচার্য ও সম্পাদক সাগরময় ঘোষের প্রতি সশ্রদ্ধ নমস্কার।
It's such a great loss that the trilogy could not be completed due to the author's demise. In the foreword, the comparison with Lust for Life seems apt. The fact that, similar to the Borinage chapter, the coal mines also attracted Ramkinkar's artistic attention, is striking. The illustration of Bikash Bhattacharya adds an additional dimension to the book.