আমাদের চারপাশ রহস্যে ভরপুর। এই রহস্যের উন্মোচন করতে চায় বিজ্ঞান। রহস্য এবং রহস্য উন্মোচনের চেষ্টার মোট দশটি বিজ্ঞান কল্পগল্পের সংকলন কিনাবালুর গান। একদিন সকালে আমজাদ আলী নামের সাধারণ এক দোকানের ম্যানেজার আবিষ্কার করে তার হাতের লেখা, টিপসই, এমনকি রক্তের গ্রুপ পর্যন্ত পাল্টে গেছে। হাওরের জেলে হাসন মিয়ার জালে উঠে আসতে থাকে বিরল প্রজাতির সব মাছ। ওদিকে বাংলাদেশের প্রাণিবিজ্ঞানী নিকিতা গবেষণার কাজে ইন্দোনেশিয়া গিয়ে ভয়ানক বিপদে পড়ে। ভয়ংকর অগ্ন্যুত্পাতের কবল থেকে কিনাবালু পর্বতের আদিবাসীদের সুরক্ষা দেয় প্রকৃতি। এসব রহস্য ও তার শিহরণ জাগানো ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞান কল্পগল্পের এ বই।
তানজিনা হোসেনের জন্ম ১৯৭৫ সালে। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞান কল্পগল্প ও ফিকশন দিয়ে লেখালেখির শুরু। পাশাপাশি নিয়মিত ছোটগল্প লিখে আসছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অগ্নিপায়ী’ (২০০৬)। তানজিনা হোসেন পেশায় চিকিৎসক। শিক্ষকতা করেন ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে।
ভালো লেগেছে - কিনাবালুর গান, অন্য জন্ম, আশ্চর্য ব্যাঙ, আমজাদ আলী যেভাবে নাই হয়ে গেলো। কিছু গল্পকে "বিজ্ঞান কল্পগল্প " বলার যৌক্তিকতা নেই। বিশেষ করে "শাহপরীর দ্বীপের দুর্গ" সরাসরি ভৌতিক গল্প ও একেবারেই পুরনো ধাঁচের।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখা বেশ দুরূহ একটা ব্যাপার। গ্রহান্তরে গিয়ে এলিয়েনের খপ্পরে পড়ে যুদ্ধ করার গল্প এখনও পাঠক সমাজে ঠিক অত চলে কিনা আমার জানা নাই। নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক টার্ম এনে সেগুলোর প্রয়োগে যেসব গল্প হয় সেগুলো পড়তে বরং আগ্রহ বেশি পাঠকের, আমার ধারণা। এবার বইমেলায় কল্পবিজ্ঞানের বই নতুন এলেই নেবার ইচ্ছা ছিল আমার। কিনাবালুর গান একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্পের বই। লেখিকা তানজিনা হোসেন, যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক, তিনি এর আগেও কিছু কল্পবিজ্ঞানের বই লিখেছেন, যেটা আমি জানতাম না। এটা পুরোটা ঠিক বিজ্ঞান কল্পগল্প হয়েছে কিনা এই মতামত আমি দিচ্ছিনা। এরচে বরং বইটার ব্যাপারে আমি আমার সৎ একটা মতামত দেই।
৪-৫টি গল্প ভালো লেগেছে। বিশেষ করে 'আমজাদ আলী যেভাবে নাই হয়ে গেল' গল্পটা অসাধারণ। অল্প কথায় দারুণ এক ওয়েবসিরিজ হবার মতো ম্যাটারিয়াল। এক ভদ্রলোকের অস্তিত্ব বদলায় গিয়ে এই সমাজে থেকেও হারায় যাবার গল্প। তারপর অন্য জন্ম, সোনার মাছ, রাত দুইটার আগন্তুক গল্পগুলোও ভালো লেগেছে। আশ্চর্য ব্যাঙ গল্পটার আইডিয়াটা ভালো, ওটাও ধরা যায়। প্রথম দুটি গল্প পড়ে আমার আসলে ভালো লাগেনি, আমার মনে হচ্ছিলো ভুল করলাম কিনা। মনে হচ্ছিলো ওই প্রথম লাইনে যেমন বললাম, অমন পরিচিত গল্পের বইই আবার পেলাম বোধহয়। 'অন্য জন্ম' থেকে ইন্টারেস্টিং লেগেছে আর এক বসায় শেষ। একদম ছোট ছোট গল্প। কোনো বাড়তি কথা নাই। সোজা নানীর কেচ্ছার মতো গল্প শুনিয়ে দেয়া। 'অন্য জন্ম' যেমন কিছুটা সময় নিয়ে বিল্ড হয়েছে, সুন্দর একটা ওয়ার্ল্ডবিল্ডিং হয়েছে, অন্য গল্পগুলোও তেমন সময় পেলে ভালো হতো আরো আমার ধারণা। গল্পগুলো সহজ, পরিচিত ভঙ্গিমায় লেখা। খুব কঠিন প্লটের অবতারণা ছিল না।
লেখিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানুষ লেখা পড়ে বোঝাই যায়। এখানে প্রায় সবগুলো গল্পই মেডিক্যালিও প্লটে লেখা। এটাও একরকমের মজা। আমার বোন খাবার টেবিলে নানান ডায়গনোসিস, রোগ নিয়ে তার ভাষায় যখন বলে আমরা কিছু না বলে হাঁ করে শুনি শুধু। কিছু ক্ষেত্রে এই বইতেও সে ব্যাপারটা ঘটেছে। ডাক্তারিয় ভাষা বোঝা খুবই কঠিন। তবু অভ্যাস আছে বিধায় বইটা আমি চেষ্টা করেছি বুঝতে। আরেকটু সহজ হলে টার্মগুলো ভালো হতো। বৈজ্ঞানিক গল্পে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অবশ্যই থাকা উচিত। সিওডো সাইন্স হলেও। কিন্তু সেটি সাধারণ পাঠকও যেনো বোঝে।
মোদ্দাকথা বইটি উপভোগ করেছি, পেট কিছুটা খালিই রয়ে গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞানের সাথে যুক্ত মানুষেরা বইটি অনেক উপভোগ করবেন আমার ধারণা।
এক কথায় বলতে হচ্ছে দুর্দান্ত এক সাইফাই গল্প সংকলন।"অন্য জন্ম", "আশ্চর্য ব্যাঙ",আমজাদ আলী যেভাবে নাই হয়ে গেল", " সোনার মাছ" এসব গল্পগুলো ছিল দুর্দান্ত।বিজ্ঞান কল্পকাহিনী মানেই দুনিয়া ধ্বংস করা এলিয়েন,প্রখর বুদ্ধীসম্পন্ন রোবট এসে মানুষের জায়গা নিবে এমন না।আমাদের দৈনন্দিন ঘটনা কে পুজি করেও যে কল্পকাহিনী লিখা যায়,মেডিকেল সাইন্স প্রয়োগ করেও কল্পকাহিনী লিখা যায় তা লেখিকা দেখিয়ে দিয়েছেন।
লেখিকার লেখনশৈলী অনবদ্য।পুরাটা সময় ধরে রাখে চুম্বকের মতো। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উনার গল্প পড়েই ফ্যান হয়ে গেছি।ডাক্তার হওয়ায় বিভিন্নভাবেই মেডিকেল রিলেটেড জিনিস তাঁর বিভিন্ন গল্পে প্রকাশ পেয়েছে।এবং খুন সুন্দরভাবে কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য করেছে যা এক কথায় দারুণ।
সাইফাই নিয়ে নিত্যদিন বাহারি গল্পের হিড়িকে দেশী লেখকদের উপর আস্থার মোটাসোটা আবরণ জন্মেছে। যা-ই পাতে নিচ্ছি, গিলে আমোদ পাচ্ছি। যুগান্তরের গৎবাঁধা ফর্মূলার চিলতে খোসা ছাড়িয়ে বিবর্তনের ফলে বিজ্ঞানের সাথে ফ্যান্টাসি, দর্শন, সাইকোলজি অথবা ভৌতিক কারসাজির মোড়কে অভিনবরূপে সজ্জিত সাইফাই ঘরানা। আক্ষরিক অর্থে সব-ই বিজ্ঞান। নব্বই/শূন্য দশকের গ্রহান্তরের আগুন্তকের স্পেসশিপে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন হতদরিদ্র মানুষের খুপড়ি ভেদ করে যায় নতুনত্বের প্রসারিত আলো।
সেরকম ধারায় তানজিনা হোসেনের কিনাবালুর গান নতুন সংযোজন। তাই, মলাটে বিজ্ঞান কল্পগল্প দেখে আর অন্দরমহলে দু/তিনখান গল্পে অতিপ্রাকৃত/ভৌতিক ফ্লেভারের আবেশে বিস্মিত হইনা, বরং ভালো লাগাটাই গ্রাস করে। লেখিকার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। অকপটে স্বীকার করতে সংকোচ নেই বইটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেও গল্পগুলো শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক পাস মার্ক নিয়ে উৎরে গেলো। বৈচিত্র্যময় প্লটের উপর দাঁড়ানো একেকটা গল্প। চারপাশে অফুরন্ত রহস্যর তল্লাট থেকে লেখিকা খুঁজে বের করেছেন গল্পের বিষয়বস্তু। অন্য জন্ম, শাহপরীর দ্বীপের দুর্গ, আমজাদ আলী যেভাবে নাই হয়ে গেলো, আশ্চর্য ব্যঙ, কিনাবালুর গান — গল্পগুলো বেশি ভালো লেগেছে। বলা যায়, দাঁত দিয়ে নখ কাটার মত ইনটেন্স বা সিরিয়াস গোছের কোনো গল্প (অন্যজন্ম হয়ত তালিকা-বর্জিত!) নেই, সব-ই বৈঠকি ঢঙে হালকা মেজাজে মজলিশি কেচ্ছা। কোথাও কোথাও গল্পের ওজনে খামতি দেখা যায় স্পষ্টত৷ তবে অভিযোগটা ধূলিসাৎ হয়ে যায় আড্ডার মাঝে চানাচুরের উপস্থিতির মতই লেখিকার স্বাদু-মচমচে মুখরোচক লেখনীর জোরে; গল্পপাঠ চাঙা হয়ে উঠে।
বিরলপ্রজ- শব্দটাকে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানে পাবেন না। বিরল, অসাধারণ, ব্যতিক্রমী- এগুলোকে শব্দটার দূরসম্পর্কের আত্মীয় বলা চলে। শব্দটা মনে পড়েছিল 'কিনাবালুর গান' বইটা পড়াকালীন। বিরলপ্রজ, তানজিনা হোসেনকে এই বিশেষণে অভিহিত করাই যায়।
আমার একটা বাজে স্বভাব আছে, লেখকদের যাচাই করার। এক- দুই- তিন মেথড। এক বই খারাপ, আরেকটা পড়ে দেখি। সেটাও মনমতো হলো না। বারে বারে তিন দান। এরপর টা টা, গুডবাই, খোদা হাফেজ। কিন্তু কেউ যদি তিন দানেই ছক্কা মারেন। সেক্ষেত্রে তার বিষয়ে আমি কখনোই কারও মতকে আর গণনায় ধরি না। সোজা কথায় আমি হয়ে যাই তার অন্ধ ভক্ত। এরকম লেখক হাতে গোণা। এবং আই এম অনার্ড দ্যাট তানজিনা হোসেন ইজ ওয়ান অফ দেম।
গল্পের বইয়ের রিভিউ করাটা কঠিন। কারণ কোনও গল্প ভালো লাগে, কোনোটা লাগে না। কোনোটা অতি অসাধারণ ভালো হয়, কোনোটা অত্যাধিক খারাপ। কিনাবালুর গান বইটাকে এদিক থেকে ব্যতিক্রম বলা যায়, কারণ প্রতিটা গল্পই চমৎকার। মান একটা নির্দিষ্ট সরলরেখা থেকে সরেনি।
ক্যানাবিস থেকে তৈরি করা হচ্ছে ভয়ংকর এক রাসায়নিক, তৈরি করা হবে নির্বোধ এক প্রজন্ম। কে ঠেকাবে এ মহাদুর্যোগ? কিনাবালু পাহাড়ের আদিবাসীরা কিভাবে প��চ্ছে মহাদূর্যোগের পূর্বাভাস? চারশ বছর আগের সভ্যতার মানুষেরা কি ফিরে আসছে নতুন রূপে? আসলেই কি ছোট্ট ছেলে ইফাত ভিনগ্রহের বাসিন্দা? শাহপরীর দ্বীপে রাখাইন দূর্গে ঘুরতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনলো না তো দুই বন্ধু। বঙ্গোপসাগরে থাকা ঘূর্ণিবর্তের মধ্য থেকে কিভাবে পাওয়া যাচ্ছে দূর সমূদ্রের মাছ? আসলেই কি পালটে যেতে পারে কারোও ডিএনএ? বিষাক্ত ব্যাঙ এ ছেয়ে গেলো মাধবীলতা রিসোর্ট। ভায়োলিন ক্লাসের নতুন ছেলেটা কে? দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরলো দুইজন, নাকি পুরোটাই ভ্রম?
ভিন্ন স্বাদের দশটা গল্পের সংকলন, কিনাবালুর গান বইটি। একটি বড়ো গল্প, বাকিগুলো ছোটোখাটো। কিছু সায়েন্স ফিকশন, কিছু ভৌতিক- সব মিলিয়ে উইয়ার্ড ফিকশনের সমাহার। তানজিনা হোসেন প্রতিটা গল্প লেখায় প্রচন্ড এফোর্ট দেন। বিজ্ঞানের কচকচানি বা ভৌতিক আবহের পশ্চাৎপট, অথবা যাপিত জীবনের বর্ণনা- তার জানার পরিধি, দেখার চোখ আর লেখার ধার গল্পে স্পষ্ট। ছোটো ছোটো বাক্যে লেখেন তিনি। বর্ণনাতে সিদ্ধহস্ত। হাতে গোণা চরিত্র থাকে গল্পে, আর তাদের কেন্দ্র করেই সবকিছু। মূল কাহিনি সব সময় শেষ হয়েও শেষ হয় না যেন, তবে রেশ রেখে যায় পড়ার অন্তে। গল্পের যে ধারণাগুলো তার মাথা থেকে বইয়ের পাতায় আসে, প্রতিটাই আকর্ষণীয়। আর দেখা যায়, সেই ধারণাটাই মূখ্য, গল্প বা বর্ণনা গৌণ। সমাপ্তিটা ওপেন এন্ড রাখাটা তার একটা শক্তি আবার দূর্বলতা কিছু ক্ষেত্রে।
বাংলা সাহিত্যের বর্তমান কৃতী একজন লেখিকার পাঠক হতে চাইলে, না যায় তানজিনা হোসেনকে অস্বীকার করা, না যাবে তার বই না পড়ে থাকা। হাইলি রিকমেন্ডেড।
সময় ভ্রমণ,মহাকাশ ভ্রমণ,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,রোবট কিংবা এলিয়েন- বিজ্ঞান কল্পগল্পের দুনিয়ায় আমাদের চেনা পরিচিত বিষয়বস্তু যেন একেকটি! এসবের বিপরীতে জিনতত্ত্ব,স্নায়ুবিজ্ঞান,প্রাণিবিদ্যা,পরিবেশ এমনকি মনস্তত্ত্বকে বিষয়বস্তু হিসেবে ধরে ভিন্নধর্মী বিষয়বস্তুর ১০ টি গল্পের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে তানজিনা হোসেনের বিজ্ঞান কল্পগল্পের বই 'কিনাবালুর গান'। লেখকের সাবলীল গদ্যের সাথে রহস্যের নিবিড় বেড়াজাল- পাঠককে বাংলায় বিজ্ঞান কল্পগল্পের দুনিয়ায় ভিন্নরকম এক স্বাদ দিতে বাধ্য।