এমন একটা সময় ছিল যখন না ছিল জমিনের কোনো নাম, না ছিল আসমানের কোনো নাম, না ছিল কোনো গল্প, না ছিল কোনো নিয়তি। তাহলে কীভাবে মিলিত হলো মিষ্টি সমুদ্র-আপসু আর লবণাক্ত সমুদ্র-তিয়ামাত? কেন দেবমাতা তিয়ামাতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো দেবতা মারদুক? ব্যাবিলন শহর সৃষ্টির ইতিহাস জানেন তো? কিংবা জানেন, কেন মহাপ্রলয়ে ভেসে গেল মর্ত্য? মানবজাতির রক্ষাকর্তা আত্রাহাসিস, সে আবার কে? কেনই বা পাতাললোকে গেল দেবী ইশতার, কীভাবে পিতা এনকির কাছ থেকে লাভ করল মি? পেল্লাই পাখি আনজুর দুষ্টুমির গল্প না শুনলে, অনেক বড়ো একটা আফসোস কিন্তু রয়েই যাবে! আর গিলগামেশ? এতকিছু জানলেন, তারটা আর বাকি থাকবে কেন? এমনই সব পৌরাণিক গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে 'গিলগামেশ: সুমের ও মেসোপটেমিয়ার পুরাণ' বইটি। সভ্যতার প্রথম শহরের প্রথম গল্পে আপনাকে স্বাগতম।
কাহিনীটা নিঃসন্দেহে ভালো, সেটা নিয়ে বলার কিছু নেই। অনুবাদের ভাষা সহজ সাবলীল। মাঝে মাঝে দেয়া ছবিগুলোও সুন্দর। তবে কিছু কিছু শব্দ আমার কাছে দৃষ্টিকটু লেগেছে। যেমন, পৃষ্ঠা ৫৮ তে লেখা,
পৃথিবীর প্রথম গল্পে মানুষের অনুভূতিগুলো যেমন ছিল, আজকের দিনের গল্পেও তার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। বইয়ের অনুবাদ খুবই সাবলীল হয়েছে। কিন্তু শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা বইয়ে বিমূর্ত চিত্রকলা আমার ভালো লাগে নি। তাছাড়া, একই ছবি একাধিক পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে। তাম্রলিপি এটা কী করল!
"যে দেখেছে সবকিছু যে জেনেছে সবকিছু যে ছিলো সাত হাত লম্বা যে তিন ভাগের দুই ভাগ দেবতা যে তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ যে ছিলো পৃথিবীর সেরা বীর যে ছিলো সব থেকে বিখ্যাত মানুষ যার সঙ্গী ছিলো এনকিদু..!!"
মানুষ প্রথম যখন কিছু তৈরী করে, সেই জিনিস খুব একটা ভালো হয় না। গ্রাহাম বেল এর চোঙ-টেলিফোন আর একালের মোবাইলের ভেতর বিস্তর ফারাক। তবে এই কথা গিলগামেশের বেলায় খাটে না। গিলগামেশ পৃথিবীর প্রথম গল্প হলেও এটি আজ অব্দি বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম সেরা কাহিনী। এই গল্পের পাতায় পাতায় শিহরণ আর উত্তেজনা। আছে পাওয়ার আনন্দ আর না পাওয়ার বেদনা, হিমশীতল মৃত্যু ও উৎসবের উষ্ণতা, যুদ্ধের দামামা এবং বিয়ের প্রস্তুতি, কুটিল ষড়যন্ত্র ও ত্যাগের মহিমা। টানটান উত্তেজনায় ভরা এই কাহিনী হাজার বছর ধরে আনন্দ দিয়েছে ছোট বড় সবাইকে। গিলগামেশের অনেকগুলো সংস্করণ বের হয়েছে।
খ্রিষ্টের জন্মেরও তিন হাজার বছর আগে এই গল্প লেখা হয়েছিল সুমেরীয় কিউনিফর্ম লিপিতে, নরম কাদার ফালির উপর প্রাচীন আরাক নগরীতে। এরপর কেটে গেল হাজার হাজার বছর। ধুলোয় মিশে গেল আরাক নগরী আর নগরী ঘেরা আকাশ ছোঁয়া ইয়া মোটা মোটা পাঁচিল। লাখ লাখ মণ মাটির নিচে চাপা পড়ল কাদার ফলকে লেখা গিলগামেশের গল্প। পাঁচ হাজার বছর পড়ে থাকল ঐভাবেই। শেষমেশ আজ থেকে দেড়শত বছর আগে রাসাম নামের এক লোক খুঁজে বের করল সেই মাটির ফলক। একটানা সতের বছর লেগে থেকে স্মিথ নামের আরেকজন হাজার হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কিউনিফর্ম লিপির পাঠোদ্ধার করে আধুনিক ভাষায় অনুবাদ করল গিলগামেশের কাহিনী। এই প্রথম একালের মানুষ ধর্মীয় কিতাবের বাইরের কোনো বইয়ের লেখা থেকে জানতে পারল নুহূর মহা প্লাবনের কথা। যদিও তা গল্পে ভিন্ন নামে এসেছে। গিলগামেশ, এনকিদু, হারিম, নিনসান, সাবিতু, উতনাপিশতিম আর আরশানাবিকে ঘিরে এই গল্প। সেই সাথে আছে প্রচুর দেব-দেবী।
গল্পপ্রসঙ্গ : দুই খন্ডের এই গল্পের প্রথম খন্ড দেবতার রাগ এবং দ্বিতীয় খন্ড ভবঘুরে গিলগামেশ। প্রথমটাতে আটটি অনুচ্ছেদ আর পরেরটাতে সাতটি অনুচ্ছেদ।
গিলগামেশ বাস করত ইয়া বড় বড় পাহাড় ঘেরা এক জায়গায়। লোকেরা এই পাহাড়গুলোকে বলত মাশু পাহাড়। বহুকাল আগে পাহাড়ের মাঝের জায়গাটা সমান ছিলো। এই সমান জায়গাটিকে বলা হতো সুমার। সুমারের ওপর তৈরী হয়েছিল সাতটি শহর। এই সাত শহরের একটির নাম আরাক নগরী। গিলগামেশ এই আরাক নগরীর রাজা। গিলগামেশ তার রাজত্ব আর প্রজাদের নিয়ে সুখেই দিন কাটাচ্ছিল। এরি মধ্যে নগরীর কয়েকজন একদিন দেবতাদের দেবতা মহান পিতা আনু'র কাছে এসে গিলগামেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। কিন্তু দেবতা আনু গিলগামেশকে দারুন পছন্দ করে তাই তাদের অভিযোগ ফিরিয়ে দেয়। দেবতাকন্যা দেবী ইশথারের জিদের কাছে মাথা নত করে দেবতা আনু। গিলগামেশের চাইতেও শক্তিশালী এক বীর মানুষ বানিয়ে তারা আরাক নগরীর পাশেই সিডার বনে পাঠায়। তার নাম রাখা হয় এনকিদু।
সিডার বনে থেকে এনকিদুর সাথে সব জন্তু জানোয়ারের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। ধীরে ধীরে সকল জন্তু এনকিদুর বস মানে। একদিন সিডার বনের পাশের গ্রামের এক বাচ্চা ছেলে এনকিদুকে দেখে ভয় পেয়ে বাড়ি গিয়ে তার বাবাকে বলে। পরে সেই বাবা আর ছেলে মিলে নগরীতে যেয়ে রাজা গিলগামেশকে জানায় সবকিছু। সবকিছু শুনে রাজা গিলগামেশ মন্দিরের পূজারী দেবী ইশথারের দাসী হারিমকে পাঠায় এনকিদুর কাছে। হারিম এনকিদুকে মানুষের মতো চালচলন আর আচার ব্যবহারে অভ্যস্ত করে নগরীতে নিয়ে আসে একদিন। গিলগামেশ আর এনকিদুর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মারামারি শেষে একে অপরকে বন্ধু মেনে বুকে জড়িয়ে নেয়। প্রতীজ্ঞা করে থাকবে সারাজীবন বন্ধু হয়ে। দুই বীর মিলে হামবাবা দৈত্যকেও মেরে ফেলে। ষড়যন্ত্রে ক্রুদ্ধ হয় দেবতারা। একদিন এক অজানা রোগ পেয়ে বসে এনকিদুকে। চোখের সামনে চেয়ে চেয়ে ভাইসুলভ বন্ধুর মৃত্যু যন্ত্রণা দেখে গিলগামেশ। এনকিদু মারা যায়। এই বেদনা সইতে না পেরে এনকিদুর সাথে দেখা করতে বের হয় গিলগামেশ অজানার উদ্দেশ্যে যেখানে অপেক্ষা করছে প্রতি পদে পদে মৃত্যু।
কি হয় শেষমেশ..? এনকিদুর সাথে কি দেখা করতে পারে গিলগামেশ..? গিলগামেশ কি জানতে পারে অমরত্বের কৌশল..? গিলগামেশ কি দেবতাদের আশীর্বাদ পায় নাকি অভিশাপ..? তিন হাজার বছর আগের গল্পের শেষটা কি ছিলো জানতে হলে পড়তে হবে ১১২ পৃষ্ঠার বইটি। যা অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আলমগীর তৈমুর।
পৃথিবীর প্রথম গল্প গিলগামেশ। মুহাম্মদ আলমগীর তৈমুরের অনুবাদে তাম্রলিপি প্রকাশনী থেকে এবছরের মেলায় বের হয়েছে বইটি। বাইন্ডিং, পেইজ, প্রচ্ছদ সব মিলিয়ে আমার কাছে মোটামুটি লেগেছে। অতটা ভালোও না আবার অতটা খারাপও না। শব্দগত ভুল ততটা নেই তবে আছে। আর যে ব্যাপারটা ভালো লাগে নি সেটা হলো লেখনীটা। গল্পটা পুরোপুরি নাহলেও অনেকাংশেই রূপকথার গল্পের মতো। আর রূপকথার গল্প পড়ে ছোটরা। তো সে হিসাবে লেখার দিকে ভালো নজর দিতে হয়। একটা সময় ছিলো আমরা কারো মুখে নেগেটিভ কথা শুনলে ভাবতাম লোকটা ভিনদেশী আর নয়তো পাগল। অথচ এখন নেগেটিভ বলা লোকটাই সবচাইতে বেশী সমাদৃত হয়। তো গিলগামেশে কিছু কথা পেয়েছি যেগুলা আমার কাছে নেগেটিভ লেগেছে ছোটদের জন্যে। যেমন তিন হাজার বছর আগে কি দশ বছরের একটা বাচ্চা ছেলেকে তার পিতা বলবে গাজা খাওয়ার কথা..? ব্যাপারটা বেশ চোখে লেগেছে। যেহেতু শুরুতেই লেখক বলেছেন মূল গল্প থেকে অনেক বর্ণনাই বাদ দেয়া হয়েছে ছোটদের বুঝার সুবিধার্থে সেহেতু এই ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করা উচিত ছিলো তবে গল্পের মাঝে মাঝে ছবির ব্যবহার বেশ ভালো লেগেছে। এছাড়া গল্পটাও বেশ ভালোই ছিলো। আমার মতে পাঠক হিসেবে ছোট বড় সবার পড়া উচিত। তিন হাজার বছর আগের পৃথিবীর প্রথম গল্প বলে কথা।
গল্পের প্রধান চরিত্র গিলগামেশ। এই গিলগামেশকে কেন্দ্র করে দেবতা ও মানুষের চমকপ্রদ ঘটনাবলীর বর্ণনা বইতে দেখতে পাওয়া যাবে। রাজা হিসেবে উদ্ধত অহংকারী মানুষ(!) এবং পরে গভীর জীবনবোধে আক্রান্ত হয়ে বিবাগী হয়ে যাওয়া, গল্পের এরুপ দ্রুত মোড় বইটার প্রতি পাঠককে আকৃষ্ট করে রাখে। লেখকের তথ্যানুসারে, আসল 'Epic Of Gilgamesh' থেকে প্রচুর সম্পাদনা করে বইটি রচিত। ফলে পার্শ্ব অনেক ছোট ঘটনা এখান থেকে বাদ পড়েছে। তবে মূল কাহিনী ঠিক রেখে বাচনভঙ্গি পরিবর্তন করা হয়েছে। সুপ্রাচীন মাটির ফলকে পাওয়া পদ্যের মাধ্যমে লেখা যে কাহিনী, সেটা খুব সহজ ও সাবলীলভাবে গদ্যের মাধ্যমে এই বইতে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যকার কথাবার্তা এবং শব্দের রসপূর্ণ ব্যবহার গল্পের পড়াকে আরও মজা দান করে। যেমনঃ "হড়াম হড়াম শব্দে বাজ পড়লো।" পড়ার সময় মনে হবে বুড়ো দাদু গোত্রের কেউ রুপকথা শোনাচ্ছেন আর আপনি চারপাশে গোল হয়ে বসা শ্রোতার মধ্যে একজন সেই গপ্পো শুনছেন। ছোটদের জন্য তো বটেই, এই অস্থিরতার যুগে বড়দের কেটে ছেঁটে করা বইয়ের তালিকার মধ্যেও বইটিকে রাখা যায়। বইটিকে রুপকথা বলা হয়েছে কারণ কাহিনী পৌরাণিক। পড়তে গিয়ে গ্রীক এবং মিশরীয় পুরাণের একটা অনুভব পাওয়া যাবে। মোটের উপরে ছোট আকারের বইটি বেশ উপভোগ্য।
মনে হল যেন সেই ছোটবেলার রূপকথার গল্প পড়ছি। অনেক সহজ,সাবলীল,সুন্দর গল্প।ছোটবেলার মতই আগ্রহ নিয়ে জানতে ইচ্ছে করবে কি হয়েছিল এরপর!এটা বেসিক্যালি আরাকের রাজা গিলগামেশ ও তার সহযোদ্ধা এনকিন্দুর বন্ধুত্বের গল্প।কিন্তু সাথেসাথে জানা যাবে খ্রিস্টপূর্ব তিনহাজার বছর আগেকার মানুষজনের কাছে পৃথিবী আসলে কি ছিল,তাদের ধ্যানধারণা,দেব-দেবী,যুদ্ধ,জীবনযাত্রার কাহিনী। সবমিলিয়ে আয়েশ করে ঘন্টাদেড়েক সময়েই পড়ে ফেলা যাবে পৃথীবির প্রথম গল্প "গিলগামেশ"। :)
পৃথিবীর প্রাচীনতম গল্পের কিশোর সংস্করণ। লিখনশৈলী খুব সুন্দর। তবে মাঝে মাঝে কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় অনুভুতিহীন ঘটনাপ্রবাহ পড়ছি। আরেকটু রঙচঙে করে হয়তো উপস্থাপন করা যেত গল্পটা।