প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে ভূমধ্যসাগরের এক পর্বতময় উপদ্বীপে এক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে উঠেছিল, যা তার পূর্বে বা পরে আগত যে কোন সভ্যতা, গোষ্ঠী, সাম্রাজ্য বা শক্তির চেয়ে বহুবছর শুধু টিকেই ছিল না বরং পরবর্তী আরও হাজার বছরের ইতিহাসে নিজেদের নাম খোদাই করে রেখেছিল । কিভাবে তা সম্ভব হয়েছিল? আগে সেই সভ্যতার নাম জেনে নিন – রোমান সভ্যতা । “সব পথ রোমে শেষ হয়” (all roads lead to Rome) এই প্রবাদ একদিনে প্রচলিত হয় নি । এরকম আরও প্রবাদ শুধু নয়, রোমান জাতি তাদের পরবর্তী সময়ের জন্য আরও অনেক কিছু রেখে গিয়েছে । রোমান ভাষা অর্থাৎ ল্যাতিন ভাষা এখন মৃত হলেও বৈজ্ঞানিক নামকরণের মধ্য দিয়ে অদ্যাবধি টিকে আছে ।
অ্যালেকজান্ডার খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রাচ্যে সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুললেও তার মৃত্যুর পরেই সেই সাম্রাজ্যের এক্য ভেঙ্গে যায় । অথচ রোমান জাতি তাদের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছে খুব ধীরে ধীরে । শুরুতে তারা যে খুব প্রভাবশালী বা গুরুত্বপূর্ণ কোন শক্তি ছিল না তার প্রমাণ হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও মহাবীর অ্যালেকজান্ডার ইতালি আক্রমণ না করেই পূর্বে রওনা হন । কিন্তু তার মৃত্যুর অব্যবহতি পরেই রোমানদের উত্থান শুরু । গ্রীসের কাছে জ্ঞান বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প, সাহিত্যসহ অনেক বিষয়ে ঋণী হলেও আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো ও একে সফল ভাবে পরিচালনার সূত্র আমরা রোমানদের কাছেই পাই । তাদের অন্যতম অবদান- একটি সার্থক সফল প্রজাতন্ত্র গঠন । আইজাক আসিমভ তার ক্লাসিক গ্রন্থ “The Roman Republic” এ রোমান প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব, উত্থান ও কাল পরিক্রমায় সাম্রাজ্যে রূপান্তরের ইতিহাস সংক্ষিপ্তসারে লিখেছেন । বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন আফসানা বেগম, “রোমান প্রজাতন্ত্র” নামে ।
রোমানরা কত আগে এই প্রজাতন্ত্র গঠন করেছিল, আড়াই হাজার বছর আগে বললে অনেকের ঠিক বোধগম্য হবে না। যদি বলি, প্রজাতন্ত্রের শুরু নয় ইতি হয় যেই মহামতি জুলিয়াস সিজারের হাতে তিনি জন্মেছিলেন খ্রিস্টের জন্মের প্রায় একশ বছর আগে – তাহলে সামান্য ধাক্কা খেতে হয় । বইয়ে তারও পাঁচশ বছর আগের ইতিহাস থেকে শুরু যখন রোমে সভ্যতা বিকশিত হতে শুরু করে । কাল পরিক্রমায় তাকে লড়তে হয় ইতালি ভূখণ্ডে, তারপর ইতালির বাইরে । আর এসবের পরেও রোমান জাতি টিকে গেল শুধু তাদের গভীর রাজনৈতিক জ্ঞানের কারণেই । কি নেই তাদের রাজনীতিতে ? রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান, সীমানা বর্ধন, বহিঃশত্রুর সম্ভাব্য এবং অবধারিত আক্রমণ প্রতিহতকরণ, যা চমকপ্রদ, তাদের বৈদেশিক নীতি – এসবই আবর্তিত হয়েছে একটি মূলনীতিকে কেন্দ্র করে – নিজেদের টিকিয়ে রাখা, শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা । বিভিন্ন যুগে আগত রোমান নায়ক প্রতিনায়কদের চিন্তাও ছিল এই – কালের পাতায় নিজেদের অমর করে রাখা । তাদের বিবেচনা, বিচক্ষণতা, কৌশল আজও বিস্ময় জাগায় । আবার এই রোমানরাই প্রথম সাংগঠনিকভাবে ঔপনিবেশিক, প্রাদেশিক শাসন প্রবর্তন করে । নিজ জাতি ছাড়া আর সবার প্রতি তারা ছিল নির্মম ।
বইয়ের ব্যাপারে ফিরে আসি । মূল বই আর অনুবাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক, আমরা এখনও অনুবাদে সিদ্ধহস্ত হই নি । কিন্তু এরকম তথ্যবহুল ইতিহাসের বই অনুবাদ করতে ইতিহাস, ভূগোল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জ্ঞান নিয়েই কাজে নামা উচিৎ, নাহলে বিভিন্ন স্থান ও ব্যক্তির নাম বুঝা “বোঝা” হয়ে যায় । প্রকাশনী আরও এক কাঠি সরেস, মুদ্রণ ত্রুটি বানান ভুল দেখতে সত্যি বিরক্ত লাগে । অনুবাদকের ভাষার উপর দখল আছে, লেখা বেশ ঝরঝরে, মূল বইয়ের স্বাদ পাওয়া যায়, তবে বইয়ের বিষয়ে জ্ঞানে কিছুটা ঘাটতি আছে, তা বুঝা যায় নাম বিশেষ্যর ব্যবহারে ।
আইজাক আসিমভের মূল বই প্রসঙ্গে – লেখক কাহিনীর বর্ণনায় ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন । প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পূর্বের সূত্র টেনে এনেছেন । বর্ণনা অত্যন্ত সাবলীল , তাই সুখপাঠ্য । অনুবাদ পড়েও যথেষ্ট আমোদিত হয়েছি ।
পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস ২০০ পাতায় আঁটকে রাখা কঠিন কাজ । এই কাজ করতে গিয়ে লেখককে কাটছাঁট করতে হয়েছে । কিছু কিছু যুদ্ধ এবং শাসনতান্ত্রিক বর্ণনা আরও বিস্তৃত , খুটিনাটি সম্পন্ন হলে ভাল হত । তবে মনে রাখা দরকার লেখক একজন ব্যক্তি বা একটি সময়ের বর্ণনা দিচ্ছেন না; সম্পূর্ণ রোমান প্রজাতন্ত্রের সারমর্ম তুলে ধরেছেন ।
বই ছোট করার জন্যই হোক ��া যে কারণেই হোক, রোমানদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি ছাড়া অন্য কোন দিকেই লেখক আলোকপাত করেন নি । লেখক কোন অজুহাত ছাড়াই তাদের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক জীবন এড়িয়ে গেছেন । আমাকে একটা বিষয় ভাবিয়ে তুলেছে – রোমানদের ধর্মীয় জীবন । বইয়ে দুই এক জায়গায় রোমানদের দেব দেবীর পুজারি হিসেবে পাওয়া যায় । আমরা সবাই মোটামুটি জানি, গ্রিক দেবতাদেরকেই রোমানরা নিজেদের মত কল্পনা করে নিয়েছিল । ইতালিতে প্রবেশের সময় তারা নতুন কোন ধর্ম নিয়ে আসে নি । বরং কালক্রমে স্থানীয় জনগণ ও গ্রিকদের ধর্মকে আত্তীকরণ করেছে । অবশ্য শুরুতে রোমানরা নিজেদের ট্রয়ের বংশধর হিসেবে দাবি করত । সে যাই হোক, যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, অন্য রাষ্ট্র দখল ও বিজয়ের ক্ষেত্রে তারা ক্বচিৎ ধর্মকে ব্যবহার করেছে, যদি করে থাকে লেখক তা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন । একটা জাতি ধর্ম প্রচারকের ভূমিকা ছাড়াই এত বড় একটা সাম্রাজ্য গড়ে তুলল – ভাবলে বিস্মিত হই! ইতালির ভূখণ্ডে তাদের জাতীয়তাবোধ ছিল অটুট । সেই জাতীয়তাবোধ আর নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার ইচ্ছা দিয়েই কি তারা সমগ্র (আক্ষরিক এবং সত্যিকার অর্থে) ভূমধ্যসাগর জয় করেছিল ?