"যার কোথাও যাওয়ার নাই সে যাইবে ঢাবাকায়, সেই ঢাবাকায়, যে সবার আশ্রয়দাত্রী, জননীর মতো কোলে ঠাঁই দেয়, তারপরও মাতৃসম নহে।"
ঢাবাকার শ্মশানে জমে উঠেছে গল্প, যে গল্প জন্ম নিয়েছিলো গৃহস্থালিতে, পথেঘাটে। দালানকোঠার মতোই গল্পগুলো একটার সাথে আরেকটা জড়িয়ে আছে । সেখানে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর মতোই গল্পগুলো ঢাবাকার বাইরের গল্পের সাথেও আছে লেপ্টে। এখন মানুষগুলো অপেক্ষায় আছে কিছু গল্পের জট খোলার।
বাকি ছিলো শূণ্য গোয়াল ঘরটা, ভোরের দিকে সেটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় হামিদ ফকিরের। ভুলুয়ার চরের গ্রামটা নদীগর্ভে বিলীন হবার পর, প্রতিবেশি প্রেমানন্দ বাউলকে নিয়ে পেটকাটা খাল হয়ে এক গ্রাম হেঁটে লঞ্চে উঠে বসে সে, সেই লঞ্চ তাদেরকে পৌঁছে দেয় মঞ্জিলে মকসুদে, ঢাবাকায়।
কাওকাবুন্নেসা, দইভাঙ্গা গ্রামের লোকজনও বাপের জনমে এমন মেয়ে দেখেনি। সেই ভয়ডরহীন মেয়েটাও মেম্বারের ছেলে এজাবরকে মে'রে, মেম্বারের ভয়ে বসতে হলো বুড়ো চেয়ারম্যানের চার নম্বর বিয়েতে । আর প্রথম রাতেই চেয়ারম্যানের আয়ু ফুরিয়ে দিয়ে পালিয়ে আসে ঢাবাকায়। স্থান হয় জামদানী নগরের জননী স্বর্ণালয়ের বয়স্ক পান্ডবদার তিনতলা বাড়িটাতে পরিমলের ঘরে। অভিনয় পাগল পরিমল তখন এক যাত্রাদলের সঙ্গে কোথায় যে চলে গেছে, কেউ জানে না।
পান্ডবদা রহস্যময় এক চরিত্র, যে একাত্তরের রেশনশপের চাকর থেকে হয়ে উঠেছে স্বর্ণকার। যার সাথে যোগসূত্র আছে মকিম গ্রুপের নায়েব সিরু মিয়ার। সিরু মিয়া রহস্যের চাদরে মোড়ানো ঢাবাকার এক চরিত্র, যে চরিত্রে পরতে পরতে আছে রোমাঞ্চ, অন্ধকার অতীত। সেই মকিম গ্রুপের সর্বেসর্বা আবার মনাক্কা বেগম, এক চোলাই বিক্রেতার মেয়ে, তারও আছে একটা গল্প।
বাবা-মা ছাড়া বুড্ডা বাবুল, মানুষ হয়েছে লাট মিয়ার কাছে যে মানুষটা পেশা হিসেবে নিয়েছিলো মানুষ খু'ন করাকে। যে কথাটা জানে কেবল পান্ডবদা। তবে এবার এমন একজনকে সরাতে বলা হয়েছে যাকে সে পছন্দ করে, প্রচন্ড পছন্দ করে। আর সেই পছন্দই ঢাবাকার গল্পের সুতোয় ঢান পড়ে, যে গল্প ঢাবাকার বাইরেও লেপ্টে আছে।
এমনি অনেক চরিত্র একত্রিত হয়েছে, ঢাবাকায় তাদের নিজস্ব গল্প গুলো নিয়ে, অপেক্ষা রহস্যের জট খোলার।
প্রতিটি গল্পেরই একাধিক দিক থাকে, প্রতিটি মানুষেরই থাকে এক একটা গল্প। জীবনের গল্প, যে গল্প কখনও উত্থানের, কখনও বা পতনের। যেখানে ছন্দে ফিরতেও যেমন দেরি হয় না, ছন্দ পতন হয়ে জীবনাশ কিংবা জীবনের গতিপথ বদলে যেতেও সময় লাগে না।
ঢাবাকা, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনের তেমনি এক গল্প। যে গল্প বিস্তৃত হয়েছে ঢাবাকা নামক এক পরাবাস্তব এক নগরীকে ঘিরে যেখানে অতীত আর বর্তমান চলছে হাত ধরাধরি করে। যেখানের প্রতিটি চরিত্রের গল্পগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, আসলে বিচ্ছিন্ন নয়, একটার সাথে একটা যা জড়িয়ে জট লেগে গেছে, সময়ের পরিক্রমায় সেই জট কখনও কখনও খুলেও যেতে পারে। ঢাবাকা বইটিতে তেমনই এক জট খুলতে শুরু করেছিলো। যার বিস্তৃত ঢাবাকার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত, ছড়িয়ে গেছে প্রমত্তার চর থেকে দইভাঙ্গা গ্রামকেও ছাড়িয়ে।
বইটা যখন প্রকাশিত হয়েছিলো, গ্রাফিক নভেলা করার কথা বলেও লেখক না করায় কেবল কয়েকটা আর্টওয়ার্ক সাঁটিয়ে দেওয়াতে অনেকেই হতাশ হয়েছিলো দেখেছিলাম। বইটা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে গ্রাফিক নভেলা পুরোপুরি না করাটাই খুব ভালো হয়েছে। করলে এতোটা উপভোগ করতে পারতাম না, নগরীর নিম্নশ্রেণীর মানুষগুলোর ভাষায় আঞ্চলিকতাটা পুরোপুরি ভাবেও উপভোগ্য হতো না। সেই সাথে গল্পের পরিপূর্ণ আবহটাও ঠিক ফুটে উঠতো কি না সন্দেহ। আবার কিছু আর্টওয়ার্ক নিয়ে বললে সবগুলোই চমৎকার, ডিটেলিং তারপরও কিছু আর্টওয়ার্ক ১৮+ না করলেও চলতো, বিষয়টা অতিরিক্ত লেগেছে। অবশ্য আর্টওয়ার্ক গুলো না থাকলেও গল্প উপভোগে কোনো প্রভাবই পড়তো না।
বইটাতে গালিগালাজ, গ্রামাঞ্চলের ভালো কিংবা অশ্লীল শ্লোকে ভর্তি, যার অধিকাংশেরই মোকাবিলা করি আমরা নিত্যদিন আমাদেরই জীবনযাপনে। কিন্তু সেই শ্লোক, কথাগুলো যখন বইয়ের পাতায় চোখে পড়লো অনেক অস্বস্তি হয়েছে, তবুও উপভোগও কম করিনি। তারপরও মনে হয়েছে বিষয়টা আরেকটু শালীনতার মধ্যে আনা যেতো।
গল্পটির প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে রাজনীতি, কূটনীতিতে ভরপুর। যা কখনো বা ক্ষমতার জন্য, নিজেকে জাহির করার জন্য কিংবা দুমুঠো অন্ন সংস্থানের জন্য। গল্পের প্রতিটি চরিত্রই মুগ্ধ করেছে। তারপরও গল্প জুড়ে মনে হয়েছে বুড্ডা বাবুল, কাওকাবুন্নেসা চরিত্রদুটো লেখক যেভাবে উপস্থাপন করেছে, তা শেষ পর্যন্ত বজায় ছিলো না, শেষদিকে এসে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। ঢাবাকার সবথেকে ভালো লাগার চরিত্র হলো প্রেমানন্দ বাউল।
সবমিলিয়ে গল্পটা দারুণ, গল্পের পাতায় পাতায় থ্রিল না থাকলেও গল্প বর্ণনা, চরিত্রগুলোর নিজস্ব গল্প আবার সেই গল্প একই সুতোয় মিলিত হওয়ার ব্যাপারটা দারুণ উপভোগ করেছি। চরিত্রগুলোর কোনো কোনো গল্প রোমাঞ্চকর তো কোনো কোনো গল্প ইন্টারেস্টিং। তবে দিনশেষে এটাকে একটা সাধারণ জীবনের গল্পই বলতে হয়। আর জীবন তো উত্থান, পতন, রোমাঞ্চ -রহস্যে ভরপুর আবার বিরক্তিকরও কম না।