উত্তরাধিকার শুরু করারও আগে থেকে আমাকে আমার বন্ধুরা কালবেলা নিয়েই একরকম পাগল করে মেরেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম কালবেলা আসলে সিরিজের দ্বিতীয় বই। মাঝখান থেকে শুরু করার কোনোরকম ইচ্ছা ছিল না, তাই উত্তরাধিকার দিয়েই শুরু করি এই সিরিজ পড়া। উত্তরাধিকার শেষের পর, একরকম পাগল হয়ে উঠেছিলাম কালবেলা পড়ার জন্য আসলে শেষটা এমন যে কৌতূহল দমন করে রাখা বেশ কষ্টের ব্যাপার। অবশেষে কালবেলা শেষ করলাম কিছুদিন আগে। বেশ সময় নিয়েই পড়লাম। মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সময় কাটিয়ে দিতে মন্দ লাগে না।
যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন। তবু যারা এখনও পড়েননি, তাদের জন্য সংক্ষেপে বলি। 'উত্তরাধিকার' এর জলপাইগুড়ি ও স্বর্গছেড়ায় বড় হয়ে ওঠা কিশোর অনিমেষ 'কালবেলা'য় কলকাতার আদর্শ প্রাপ্তবয়স্ক নিবাসী হয়ে ওঠে। কারফিউ এর দিন কলকাতা পৌঁছে, পুলিশের গুলিতে জখম হয়ে তার পড়াশোনার একটা সম্পূর্ণ বছর নষ্ট হয়ে যায়। দুর্দান্ত সেই ক্ষতের চিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে সে ক্রমে এগিয়ে যেতে থাকে রাজনীতির অগ্ন্যুৎপাতের দিকে। কম্যুনিজম তাকে আকৃষ্ট করে। ক্রমে এই অগ্ন্যুৎপাতকেই নিজের জীবন করে তোলে অনিমেষ, যে জীবনেই শীতল বারিধারা হয়ে নেমে আসে মাধবীলতা। শীতলতা দরকার হলে সে যেমন ভিজিয়ে দিতে পারে অনিমেষকে তেমনই প্রয়োজনে প্রচন্ড তেজে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে অগ্ন্যুৎপাত। রাজনীতির উত্তপ্ত দাবদাহ, কম্যুনিস্ট পার্টির ভাগ, স্বার্থান্বেষী মানুষের লোভ, নকশাল আন্দোলনের জোয়ার, পুলিশের নির্মমতার মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে যেটা অনিমেষ কোনোদিন আবিষ্কার করতে পারেনি, তা ক্রমে পঙ্গুত্বের মাধ্যমে সে পরিষ্কার দেখতে পায়, যে বিপ্লব সে চিরকাল বাইরে খুঁজেছে, সেই "বিপ্লবেরই অপর নাম মাধবীলতা"। যে মেয়ে রাজনীতি না করেও অনিমেষের রাজনৈতিক সত্তার বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, নিজের জন্য কিচ্ছুই আশা করে না, অনায়াসে নিজের সুখ আহ্লাদ সব ছেড়ে আসে, শুধু ভালোবাসে, সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে। খরতপ্ত মধ্যাহ্নে যে শুধুই এক গ্লাস জল ছাড়া আর কিছুই হতে চায় না, সে মাধবীলতা। অনিমেষ বুঝতে পারে, যে দেশ গড়ার বিপ্লবে সে নেমেছিল তা বিফল হয়েছে কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরে যে লতা ডালপালা মেলেছিল, যে মাধবীলতা নিঃশব্দে বিপ্লব শুরু করেছিল তা প্রতি ক্ষেত্রে সফল।
কালবেলা সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি বই। প্রথমে এটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। রাজনৈতিক কার্যকলাপের পাশাপাশি একটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন লেখক বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে এবং যথেষ্ট যত্ন নিয়ে। মাধবীলতা ও অনিমেষ এই দুটি চরিত্রের জন্যই বেশিরভাগ বাঙালী এই সিরিজ মনে রেখেছেন, অথবা রাখবেন। তবে কেবল মাধবীলতার জন্যই 'কালবেলা' কে ভালোবেসেছেন অগুন্তি মানুষজন। মাধবীলতার মতো চরিত্রকে শ্রদ্ধা করেন, এমন মানুষের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়।
যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে 'কালবেলা' মনে রাখবো, নীলা, শীলা সেন, অনিমেষের ছোট মা, একরাতের জন্য বস্তির ঘরে ঠাঁই দেওয়া মাতাল ছেলের মা, সুবাস সেন, সিরিল, মহাদেবদা এবং দীপকের জন্য। মাধবীলতার মতো চরিত্র হয় না, একথা আমিও মানি, কিন্তু এই হয় না বলেই মাধবীলতার মতো চরিত্র অবাস্তবিক। অন্তত 2020 সালে দাঁড়িয়ে মাধবীলতার মতো আত্মত্যাগী, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক চরিত্রের যে কোনোরকম কোনো বাস্তবতা নেই তা আমি নির্ভয়ে হাজারবার চেঁচিয়ে বলতে রাজি আছি। কারণ এটা সত্যি। আজকের যুগে একটা মাধবীলতা খুঁজতে যাওয়া বোকামির থেকেও বেশি বোকামি। হয়তো এজন্যই মাধবীলতার আদর্শ, নিষ্ঠা ও ত্যাগকে জাপটে ধরে ভালোবেসেছেন এত মানুষ কারণ বাস্তবে এমনটা হয় না।
তুলনামূলক ভাবে শীলা সেন বা নীলা বা বস্তির মাতাল ছেলের মা এই চরিত্রগুলি যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে আজও একইভাবে ভীষণ বাস্তব। এরকম কতো শীলা সেনকে অ্যাসিড ঢেলে শেষ করে দিয়েছে তাদের স্বামী আমরা খবর রাখিনা। যদিও অ্যাসিড আক্রমণের বিরুদ্ধে আজকাল অনেক কিছু হচ্ছে, কতটুকু কি হচ্ছে তা তো ভীষণই স্পষ্ট। একইভাবে এরকম কত নীলা আজও স্পষ্ট কথা বলতে ভয় পায় না, আবার ভালোবাসার স্বার্থে নিজের সুখসমৃদ্ধ বৈভবে পরিপূর্ণ বাড়ি ছেড়ে আসতেও ভয় পায় না কিন্তু আদৌ সুখী হয় কিনা আমরা খবর নিই না। আবার এরকম কত বস্তির মা জানেন না এখনও যে আজ রাতে তার নিজের ছেলে বাড়ি ফিরবে কিনা কিন্তু জায়গা দিয়ে আগলে রাখছেন অন্য কারুর ছেলেকে পরম যত্নে।
কালবেলা নিয়ে আরেকটা জিনিস আমায় ভাবিয়েছে, তা হল, এর শেষ দৃশ্য। এই শেষটা পড়ার পর কালপুরুষ পড়ার কোনো খিদে আসে না। অন্তত আমার আসেনি। উত্তরাধিকার শেষ করার পর যে খিদের চোটে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম কালবেলা পড়ার জন্য সেটা কালবেলা শেষের পর আর অনুভব করলাম না। শেষটা একটা অধ্যায় শেষ হওয়ার মতোই। সুন্দর, আদর্শ, এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া শেষ যার পরের অধ্যায় না বলা থেকে গেলেও কারুর কোনো ক্ষোভ থাকে না। অবশ্যই কালপুরুষ পড়ব কারণ সিরিজটা শেষ করবো, এমন একটা প্রতিশ্রুতি নিজের কাছেই নিজে নিয়েছি, তবে পাগলামোটা নেই পড়ার।
অবশেষে বলি, নকশাল আন্দোলন নিয়ে এটাই আমার প্রথম বই। আন্দোলনের প্রত্যেকটি মুহূর্তের বর্ণনা, কার্যকলাপ, রীতিমতো গায়ে কাঁটা দিয়ে গেছে। মাও সে তুং এর নেতৃত্বে চীনের মুক্তি আন্দোলনের একটি বর্ণনা আছে এই বইতে যেটা আমি অনবরত কয়েকবার পড়েছি, যতবার পড়েছি ততবার শিহরিত হয়েছি। আবেগ, মানুষকে কি পরিমাণ শক্তিশালী ও অপরাজেয় করে তুলতে পারে তা সেই ঘটনা থেকেই পরিষ্কার হয়েছিল সমগ্র বিশ্বের সামনে। নকশাল আন্দোলন কেন্দ্রিক বই আরো পড়ার ইচ্ছে রইল ভবিষ্যতে।