সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ হচ্ছে এই সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ। পত্র-পত্রিকা, টিভি এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে এই যুদ্ধ সম্পর্কে, এই যুদ্ধে জড়িত বিভিন্ন বাহিনী সম্পর্কে এবং এই যুদ্ধে ইন্ধন দেওয়া বিভিন্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে আমরা অনেক তথ্যই জানি।
কিন্তু এই যুদ্ধের প্রধান শিকার, সিরিয়ার সাধারণ জনগণ সম্পর্কে তেমন কিছুই আমরা জানি না। আমরা জানি না কীভাবে তারা অবরোধ, দুর্ভিক্ষ আর বিমান হামলার মধ্য দিয়ে একটা একটা করে দিন অতিবাহিত করেছে, কীভাবে অপহৃত আত্মীয়-স্বজনদের বেঁচে ফেরার আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষার প্রহর গুনেছে, কীভাবে জীবন বাজি রেখে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করেছে, কীভাবে নতুন জীবনের আশায় মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে।
“গল্পগুলো সিরিয়ার” বইটি সেই হৃদয় বিদারক অজানা কাহিনীগুলোই তুলে এনেছে পাঠকদের সামনে। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে উঠে এসেছে সিরিয়ার ইতিহাস এবং রাজনীতির সংক্ষিপ্ত বয়ানও– আসাদ পরিবারের উত্থান, হামা ম্যাসাকার, আরব বসন্ত, সিরিয়ার সরকারবিরোধী আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক ছায়াযুদ্ধ ইত্যাদি।
বুলেট, রক্ত, রাজনীতি এবং বিপন্ন মানবতার স্পর্শকাতর ঘটনাপ্রবাহে পাঠককে স্বাগতম।
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা। জন্মের পর থেকেই লিবিয়াতে পড়ে আছি। পড়াশোনাও করেছি এখানেই - প্রথমে বাংলাদেশী স্কুলে, পরে লিবিয়ান ইউনিভার্সিটিতে।
২০১১ সালের গৃহযুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে ছিলাম গাদ্দাফীর জন্ম এবং মৃত্যুস্থান সিরতে। এরপর চাকরির সুবাদে দিন কাটিয়েছি ত্রিপোলিতে, বেনগাজিতে এবং ব্রেগায়।
পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, তবে শখ বিচিত্র বিষয়ে। সেগুলো নিয়ে জানতে, চিন্তা করতে এবং লেখালেখি করতে পছন্দ করি। লিখি ফেসবুকে এবং অনলাইন মিডিয়া হাউজ Roar বাংলায়।
নিজেই নিজের বইয়ের রিভিউ এবং রেটিং দেওয়ার ব্যাপারটা অড। তবে বইটা যেহেতু পুরোপুরি মৌলিক না, চারটা ভিন্ন ভিন্ন বই অবলম্বনে লেখা, সেহেতু বলতে পারি, ঐ চারটা বই-ই পাঁচে পাঁচ পাওয়ার যোগ্য।
এটা রিভিউ না, বরং বইটা যে চারটা সত্য কাহিনীর সংকলন, সেগুলোর কাহিনী সংক্ষেপ:
১। রাক্কা থেকে পলায়ন:
আমেরিকার নিরাপদ জীবন ছেড়ে তুরস্কের সীমান্ত দিয়ে রিয়াদ ছুটে যাচ্ছে সিরিয়ার রাক্কা শহরের দিকে। বিদ্রোহীদের হাতে শহরটার পতনের পর থেকেই সেখানে বসবাস করা মা এবং ছোট ভাইয়ের সাথে তার সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তার পরিকল্পনা, মা এবং ভাইকে খুঁজে বের করে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবে সে। আর যদি তারা বিপদের মুখে থাকে, তাহলে তাদেরকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনে সে যুদ্ধে যোগ দেবে। এখন হয়তো সে আমেরিকায় আছে, কিন্তু ভার্সিটিতে পড়ার সময় সিরিয়াতে সে দুই বছরের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছিল। যুদ্ধকে সে ভয় পায় না!
কিন্তু সে কি পারবে তাদেরকে খুঁজে বের করতে? তার চেয়ে বড় কথা, তারা কি রাক্কা ছাড়তে রাজি হবে?
২। লাতাকিয়ার অপহৃত বোনেরা:
বিদ্রোহীরা দামেস্ককে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে শুরু করলে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তালাল তার পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। তার বিশ্বাস ছিল, রাজধানী দামেস্কের তুলনায় লাতাকিয়ার পার্বত্য অঞ্চলেই তারা নিরাপদে থাকবে। কিন্তু সে বছরের আগস্ট মাসে বিদ্রোহীদের চরমপন্থী কিছু দল অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে লাতাকিয়ার ১১টি গ্রামে; তারা হত্যা করে নারী ও শিশুসহ ১৯০ জন বেসামরিক নাগরিককে, অপহরণ করে আরও ১০৬ জন আলাউই গ্রামবাসীকে। অপহৃতদের মধ্যে ছিল তালালের স্ত্রী এবং চার ছেলেমেয়েও।
কী ঘটেছিল তাদের ভাগ্যে? তাদের সবাইকে কি মেরে ফেলা হয়েছিল? নাকি বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল সরকারের সাথে দেন-দরবারের মাধ্যমে বন্দী বিনিময়ের উদ্দেশ্যে? সরকার কি বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হবে?
৩। ইয়ারমুকের পিয়ানোবাদক:
দামেস্কের ইয়ারমুক শরণার্থী শিবিরের ফিলিস্তিনি পিয়ানিস্ট আইহাম এবং তার বাবার ব্যবসা দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠছিল। তাদের ওয়ার্কশপে তৈরি হওয়া অ্যারাবিক মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট 'ওউদ' আরব বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে রপ্তানি হচ্ছিল ইউরোপেও। কিন্তু এরপরেই গৃহযুদ্ধ এসে তাদের জীবন ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আসাদ সরকার কর্তৃক আরোপিত অবরোধ এবং মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে তাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাদেরকে বেঁচে থাকতে হয় ঘাস আর লতাপাতা খেয়ে।
এরপর যখন জঙ্গি সংগঠন আইসিস তাদের এলাকা দখল করে নেয়, তখন পিয়ানিস্ট হিসেবে সে পরিণত হয় তাদের টার্গেটে। সে কি পালাতে পারবে আইসিসের কবল থেকে?
৪। দেরার সাঁতার না জানা তরুণী:
জীবন বাঁচানোর জন্য দোয়া এবং তার পরিবার সিরিয়ার দেরা ছেড়ে আশ্রয় নেয় মিসরে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মুরসির সরকারের পতনের সাথে সাথে পাল্টে যায় মিসরে আশ্রয় নেওয়া সিরিয়ান শরণার্থীদের ভাগ্যও। জেনারেল সিসির পক্ষের গণমাধ্যমগুলো মিসরের বিভিন্ন সঙ্কটের জন্য দায়ী করতে থাকে সিরিয়ানদেরকে। ফলে দোয়াদের ঘর থেকে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাটে তারা আক্রমণের শিকার হতে থাকে।
দোয়া এবং তার স্বামী সিদ্ধান্ত নেয়, ট্রলারে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় নেবে তারা। কিন্তু সেই ট্রলার কি ইতালিতে পৌঁছতে পারবে? নাকি মাঝ সমুদ্রেই ডুবতে শুরু করবে দোয়ার মতো সাঁতার না জানা কয়েকশো যাত্রীকে নিয়ে?
রাত যত গভীর হতে থাকে, জীবিত মানুষের সংখ্যা তত কমতে থাকে।
শরনার্থীদের জীবন এমনিতেই ভয়াবহ রকমের হয়। এজন্যই মনে সংশয় ছিল যে আসলেই এই বই পড়ে কান্না না আসলেও খারাপ লাগবে কিনা!
তাই, শুরুতে খুব একটা কাবু করতে পারেনি বইটা। কিন্তু যত পড়ছিলাম ততই যেন যুদ্ধের গভীরে নিজেকে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছিলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম বই পড়ছি।
মনে হচ্ছিল আমি এই গৃহযুদ্ধের এক প্রত্যক্ষদর্শী। বইয়ের পাতা উল্টাতেই মনে হতো যেন মাথা গুঁজে কোনোকিছুর আশ্রয়ে বসে আছি আমি। চারিদিক থেকে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে দুই পক্ষের লোকজন।
তারপর এক সময় সবকিছু ফিকে হয়ে আসে। ম্লান হয়ে যায় চারপাশ। অন্ধকারের চাদর ছেড়ে আবার আলো এসে পড়ে সিরিয়ার কোন এক ভগ্নপ্রায় দেওয়ালের উপরে। ধ্বংসোন্মুখ সেই দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে নিজেদের অসহায় মনে হয় তাদের।
একজন সরকারি সেনা ও একজন বিদ্রোহী সেনা যুদ্ধ ভুলে গিয়ে বন্দুক নিচে নামিয়ে রেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে এক অদ্ভুত ঘোরলাগা আর মনের আকুতি মাখানো দেয়াল লিখনের দিকে। তাদের কাছে মনে হয় বন্দুকের চাইতে ভয়াবহ আর তলোয়ারের চাইতেও তীক্ষ্ম বোধহয় এটাকেই বলে। কারণ দেওয়ালে লেখা,
একদিন যুদ্ধ শেষ হবে, আর আমি..আমি ফিরে যাবো আমার কবিতার কাছে।
আজকে ছুটি শেষে যখন বাসে করে ঢাকা ফিরছি, একদম শেষ কাহিনীটা মানে "দেরার সাঁতার না জানা তরুণী" পড়ার পালা পড়ে যায়।
সত্যি বলতে কি, দোয়া আর বাসেম যুগলের জীবনকাহিনী এতটাই ট্র্যাজিক আর মর্মস্পর্শী ছিল যে, মনে হচ্ছিল বাসায় পড়ে আসা ভালো ছিল। না পারছিলাম ভালো মত কাঁদতে, কারণ আশেপাশে সব যাত্রী। আর না পারছিলাম সামাল দিতে।
সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক কষ্টে শব্দ না করে ফুঁপিয়ে কান্না করলাম কিছুক্ষণ। ততক্ষণে সুবিধা পেয়ে গেছি, রাত তো, খেয়াল করলাম অলমোস্ট সবাই ঘুমে। শুধু আমিই ফোনের আলোয় পড়ে চলেছি তোহা ভাইয়ের এই মাস্টারপিস। সেটাও আবার ফ্ল্যাশলাইটের গায়ে আঙ্গুল দিয়ে ডিম আলোতে। নাহলে সবার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটবে যে!
বইটা শেষ করে ঘন্টাখানেক পর ধাতস্থ হয়ে আসলাম রিভিউ লিখতে। তোহা ভাইয়ের সাথে আগেই কথা হয়েছিল রিভিউ লিখতে পারিনা। ভাবলাম যা ঘটনা ঘটলো আমার সাথে সেটাই লিখি। সাহিত্য সমালোচনা গোছের কোনো লেখা আমার দ্বারা হবে না, যেটা মনে আসে লিখে যাই।
সত্যি বলতে, বাসেম যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দোয়ার থেকে আলাদা হয়ে যায় সাগর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, সেই মুহূর্তে দোয়ার আর্তচিৎকার আসলে পাঠকদের নিজেদেরও আর্তচিৎকার। বাসেম তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না, এর সাথে পাঠকরাও যেন বলে ওঠেন একমনেই। যে বাসেম নিজের সর্বস্ব আগলে দোয়াকে পুরোটা রাস্তা বাঁচিয়ে নিয়ে এলো, সাহস দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে সমুদ্রকে ভয় পাওয়া এই মেয়েটাকে অভয় দিলো, ��েষমেষ সেই বাসেমই যখন এইভাবে চলে গেলো, কোন পাঠকের চোখ শুকনো থেকেছে আমার জানা নেই।
মাসা আর মালাককে ঘিরে দোয়ার বাঁচার আকুতিও বেশ টাচিং। শেষটায় যখন মালাক মারা যায়, তখন দোয়ার সাথে পাঠকদেরও আরেক দফা কাঁদার পালা। আসলে পুরো রিভিউতে দোয়া আর বাসেমের কথাই লিখছি কেন? মাত্র এটা শেষ করলাম তো, একরকম আচ্ছন্ন হয়ে আছি। আর বাকি ঘটনাগুলো পড়া পড়েছিল বেশ আগে। ঈদেরও আগে।
শেষটায় ফাইরুজা লায়লা আপুকে ধন্যবাদ, এই বইটা আমাকে পড়তে দেয়ার জন্য। আর এমন জীবন ঘনিষ্ঠ গল্প আগামীতে আমাদের আরো উপহার দিবেন, তোহা ভাইয়ের কাছে রাখছি এই বিনীত আরজি!
সিরিয়া যুদ্ধে চারটা পরিবারের জীবন বাজি রেখে বেচেঁ থাকার আপ্রান চেস্টার কাহিনী নিয়ে বইটি, লিখেছেন Mozammel Hossain Toha ভাই।
আমি বই পড়তে পছন্দ করি একদম ছোট বেলা থেকেই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময়, প্রথম আলো আর পূর্ব পশ্চিম পড়ে এত ভালো লেগেছিলো যে সেই ভালো লাগা এখনো মনে দাগ কেটে আছে। আজ অনেক বছর পর #গল্পগুলোসিরিয়ার বই টা পড়ে তেমনই ভালো লেগেছে।
রিয়াদ আর বাশার দুই ভাইয়ের পরিবারের রাক্কা থেকে বেচেঁ ফেরার গল্প আপনাকে একদম ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেবে, যুদ্ধের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা আপনার রক্ত হিম করে দেবে...
আর তালালের জন্য তার মেয়ে লুজাইন আর স্ত্রী আওয়াতেফ এর মৃত্যু আমাকে একরাত প্রায় ঘুমাতে দেয় নি। সারাক্ষণ ভেবেছি কি সীমাহীন কষ্ট নিয়ে তালাল তার বাকি জীবন কাটাবে...
অন্ধ বাবা, আইহাম আর তেহানির সচ্ছল সুন্দর জীবন থেকে কিভাবে তারা এক মানবেতর জীবনযাপন করে, নির্ঘাত মৃত্যুপুরি থেকে কিভাবে পালিয়ে বেচেঁ ফেরে তা আপনাকে আপনার জীবনকে এক ভিন্ন উপলব্ধি দেবে তা কল্পনাও করতে পারবেন না....
সবশেষে বাসেম আর দোয়া, বাসেমের জন্য আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পরছিলো, আমি বাসে বসে বইটা পড়ছিলাম, আমার পাশের ছিটে লোকটা হয়তো অবাক হয়ে ভাবতেছিলো বই পড়ে কি ছেলেদের চোখ দিয়ে পানি পড়ে নাকি। কিন্তু আমি অত্যান্ত আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম বাসেমের বিদায়ে...
যুদ্ধ আসলে কত কিছু কেড়ে নেয়, সন্তান, স্বামী, বাবা মা, সাজানো গুছানো সংসার, প্রিয় জন্মস্থানের মাটি-আকাশ খেলার মাঠ, নদী আরো কতকিছু তাই না!!!
ক্ষমতা! আহ ক্ষমতা এর জন্য কত রক্ত যে দুনিয়াতে ঝড়লো!!!
রিসেন্টলি আমার পড়া সেরা বইগুলোর একটা হচ্ছে "গল্পগুলো সিরিয়ার" এই বইটি।
গুডরিডসে বইটার সন্ধান পাই জানুয়ারির শেষে। বইমেলায় বইটা কিনবই বলে ঠিক করলাম। অবশেষে ১৮ দিনে বইটা পড়ে শেষ করলাম। প্রথমেই রাক্কা থেকে পলায়ন অধ্যায়টা পড়লাম। রাক্কার এক সম্মানিত পরিবারের রিফিউজি হওয়ার গল্প মোটামুটি নাড়া দিয়েই গিয়েছিল। যখন আইহামের দুঃসাহসিক যাত্রার কথা পড়লাম তখন রাক্কার আল কাসেম পরিবারের কাহিনী কিছুই মনে হল না। তাই বলে আমি আল কাসেম পরিবারের স্ট্রাগলকে ছোট করে দেখছি না।
আইহামের তুরস্ক বর্ডার পর্যন্ত যাত্রা কোন থ্রিলারের থেকে কম নয় কিন্তু কিছু একটা মিসিং লাগছিল। এরপর দুয়া আল জামেলের কাহিনী যখন পড়লাম তখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম।
আগের কাহিনীগুলোতে দালালদেরকে নিছক ত্রাণকর্তা বলেই মনে হচ্ছিল আর মনে হচ্ছিল যে একবার সিরিয়া বর্ডার পার হতে পারলেই নিরাপদ। কিন্তু দোয়ার কাহিনীতে ধরা পড়ল দালালদের সেই আসল রূপটা যেগুলো প্রায়ই পত্রিকা ও টিভির কল্যাণে দেখি, যাত্রীদের থেকে চড়া দাম নেওয়া, গাদাগাদি করে নৌকায় ওঠানো, তাদের উপর করা নির্যাতন ইত্যাদি।
সাঁতার না জানা দোয়ার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জলদস্যুদের হাতে পড়ে নৌকাডুবি, তার স্বামী বাসেমের মৃত্যু, এরপর ৫ দিনের মত সাগরে ভেসে থাকার কাহিনী টাইটানিকের ঘটনাকেও হার মানায়। এক পরিবারের ২৭ জন নৌকায় উঠেছিল, বেঁচে ছিল মাত্র ২ জন; এক শিশু ও বৃদ্ধ। শিশুটিও শেষ পর্যন্ত মারা যায়।
১৮ মাস বয়সী মাসা ৫ দিন সাগরে ভাসতে ভাসতে শেষে কিডনি ফেইলিওর, হাইপোথার্মিয়া, ডিহাইড্রেশনে আক্রান্ত হয়। দোয়া তাকে শেষদিকে আগলে রেখেছিল। আমার মনে হচ্ছিল যে মানুষ টাইটানিক মুভি দেখে কাঁদে অথচ দোয়া ও মাসার মত রিফিউজিদের গল্প আমরা কত দ্রুত ভুলে যাই।
স্বচ্ছল পরিবারের রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাহায্য নেওয়ার কাহিনী ও নতুন দেশে জীবন গুছিয়ে নেওয়া আল কাসেম পরিবার, পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের ক্ষমা করে দেওয়া তালাল, যুদ্ধের মধ্যে সব হারিয়েও নিজের স্বপ্নকে ভুলে না যাওয়া আইহাম, নৌকাডুবি ও শরণার্থীদের একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ জীবনের কঠোর দিকটা যেমন দেখিয়ে দেয়, তেমনি নিজের বর্তমান অবস্থার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে শেখায় ও জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়।
অর্থনৈতিক সমস্যার কারনে এবছর বই কেনা-কাটার বাজেট কম। কিন্তু কিছু বই "পড়তেই হবে" এ রকম বইয়ের লিষ্টে Mozammel Hossain Toha ভাইয়ের "গল্পগুলো সিরিয়ার" বইটা সবার উপরে ছিলো।
চোখে পানি নিয়ে এরকম একটা বইয়ের রিভিউ লেখা সত্যিই কষ্টকর। বইটা পড়ার সময় মনটা চলে গিয়েছে সিরিয়ার ইয়ারমুক,রাক্কা, লাতাকিয়া প্রত্যন্ত শহরগুলোর নিদারুণ পরিনতি, সেখানের বিপন্ন মানবতা এবং ঘটনাবলীতে।
চারটি গল্প(সত্য ঘটনা) পড়ার সময় বারবার ভেসে উঠেছে আসাদ- রিয়াদ, তালালের পরিবার, আইহামের এবং তার বৃদ্ধ অন্ধ বাবার সংগ্রাম। আর সাঁতার না জানা দোয়ার বেঁচে থাকার আমৃত্যু প্রচেষ্টা।
সিরিয়ার বিচ্ছিন্ন এ চারটি ঘটনা পুরো দেশের মানবিক বিপর্যয়ের দর্পন। এরকম হাজারটা পরিবার, লক্ষাধিক মানুষের প্রতিচ্ছবি যেনো বইটি।
প্রতিটি গল্প পড়ার সময় মনটা এতো খারাপ লেগেছে যে, বারবার পড়া থামিয়ে চোখ স্থির করে সাদা দেয়ালের দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছি। কল্পনায় দেখছিলাম কিভাবে দোয়ার কাছ থেকে তার প্রিয়তমা স্বামীকে হিমশীতল পানি কেড়ে নিচ্ছে।ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর সিরিয়ো শিশুরা মৃত্যুর অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে।
সিরিয়ার জনগন নিষ্পেষিত হচ্ছে তাদের সরকার,বিদ্রোহী গ্রুপ আর ন্যাটোর মিসাইলে। তাদের জীবনটা শুধু রাজনৈতিক ক্রীড়া'র বুলেটে জর্জরিত হবার জন্যই যেনো সৃষ্টি হয়েছে। এতো সুন্দর সাবলিল অনুবাদ খুব কম পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। ত্বোহা ভাই'র লেখা সেই রোর থেকেই পড়ে আসছি। তবে এই বইটা অন্য কিছু, পাঠকের সার্থকতা পুরন করতে পেরেছে শতভাগ।
তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ত্বোহা ভাইয়ের প্রচুর পড়াশোনা এবং বইতে ছবি সংযোজনা বাড়তি পাওনা হিসেবেই রইলো।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে একটা সিরিয়াস বই আপনার কাছে নিশ্চই আশা করতে পারি।
বইটা হাতে পাই ঠিক যেদিন বাশার আল আসাদের পতন হয় সেদিন! একদিকে খবর দেখছি আসাদের পতনের অন্যদিকে পড়া শুরু করি যে দীর্ঘশ্বাস আর কান্নাগুলোর ফল সেই পতন। চারটি গল্প, প্রতিটি আলাদা একেকটি থেকে আবার চারটি গল্পের মধ্যেই কত মিল! আপনজন হারানো, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, শরণার্থী জীবন - এগুলোই সিরিয়ার চার প্রান্তের চারটি গল্পকে এক করে ফেলেছে। প্রতিটি গল্পেই একাধিক মুহূর্ত আছে যখন চোখে পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না।
জুলাই বিপ্লবের পরোক্ষ অভিজ্ঞতা আর আসাদের পতনের দিনই বই পড়া শুরুর জন্য হয়ত প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই অনেক মিল পাচ্ছিলাম। নি:সন্দেহে ২০২৪ সালে পড়া সেরা বই। নতুন সিরিয়ার নতুন গল্পগুলো যেন আনন্দের হয়, সিরিয়ার সেই গল্পগু���োর অপেক্ষায় থাকব!
--------- I received the book on the very day Bashar al-Assad fell! On one side, I was watching the news of Assad's downfall, and on the other, I began reading about the sighs and tears that led to that fall. Four stories, each unique in its own way, yet intertwined with striking similarities—loss of loved ones, an uncertain future, the life of a refugee. These are what unite the four tales from the four corners of Syria. Each story contains moments so powerful that it's impossible to hold back tears.
Perhaps it was because of the indirect experiences of the July Revolution and the coincidence of starting the book on the day of Assad's fall that I found such profound connections with every event. Undoubtedly, the best book I’ve read in 2024. May the new stories of a new Syria bring joy—waiting eagerly for those stories!
ইতিহাসের পাঠকমাত্রই সিরিয়ার সমৃদ্ধ অতীত সম্পর্কে অবগত। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই দেশের যে চিত্র বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখছি, তা যেন আমাদের দূরতম কল্পনাকেও হার মানায়। সেখানে তো আমরা কেবল সর্বস্ব হারানো মানুষদের ছবি দেখি, হয়তো সেসব ছবির কয়েকটার নিচে লাইন দুই-তিনের ক্যাপশন পড়ি। কিন্তু, তাদের জীবনের সংগ্রাম কি মাত্র ঐ কয়েক লাইনেই সীমাবদ্ধ? অবশ্যই না।
বরং এই মানুষগুলোর সংগ্রামের গল্পগুলো শুনলে আপনি অবাক হবেন। ধর্ম-বর্ণ-জাতির উর্ধ্বে উঠে একজন মানুষ হিসেবেই আপনার বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসবে দীর্ঘশ্বাস। চোখের কোণে পানি চলে আসাও মোটেই অস্বাভাবিক না।
একুশে বইমেলা '২৩-এ যদি আপনার নন-ফিকশন মাস্ট রিড বইয়ের কোনো তালিকা করতে হয়, তাহলে নির্দ্বিধায় সেই তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে ত্বোহা ভাইয়ের বইটি। সময় থাকলে বইমেলায় স্বরে অ-র স্টল (১৭২ নম্বর স্টল) থেকেই কিনতে পারেন। হ্যাপি রিডিং!
বইটি পড়ে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সাধারণ মানুষদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরেছি যা কোন অলীক কাহিনী নয়, নির্মম বাস্তবতা। লেখকের সাথে আমি একমত, পত্র-পত্রিকায় কিংবা সংবাদে আমরা শুধু হতাহতের সংখ্যার সম্পর্কে ধারণা পাই যেকারণেই হয়তো তা আমাদের হৃদয়কে সেভাবে নাড়া দেয় না, কিন্তু এই বইয়ে যখন সেই মানুষদের সাথে হওয়া নিষ্ঠুরতার কথা পড়েছি তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। বইটি সত্যিই অসাধারণ লেগেছে! রেটিং ৫ এর কম দেয়াটা অন্যায় হবে 🙂
Gripping stories, how war can destroy a family, a society and a country is fantastically depicted here. Reading this book will make you extremely sad realising what war affected people go through!
আপনি সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে শত শত নিউজ পড়েছেন, কলাম পড়েছেন, ডকুমেন্টারি দেখেছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আপনি তা থেকে সিরিয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতার ছিঁটেফোঁটাও অনুভব করতে পারেননি। আমি নিজেও অনুভব করতে পারিনি। কিন্তু এই বই থেকে জানতে পারলাম সিরিয়া যুদ্ধের ফলাফল আসলে কতটা ভয়াবহ ছিল। মানবিক বিপর্যয় শব্দের সাথে পরিচিত হলেও তা এই বই থেকে অনুভব করলাম।
প্রফেশনাল কারণে এই বইটার পাণ্ডুলিপি পড়ার ব্যাপারটা ঘটে গেছে। ২০-২২ বছর হয়ে গেলে পাঠক-মানুষ সাধারণত নন ফিকশনে মজতে থাকে। আমারও তাই হয়েছে। ইদানীং ফিকশনের চেয়ে নন ফিকশনে আনন্দ বেশি পাই। তুমুল জনপ্রিয় লেখক মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার গল্পগুলো সিরিয়ারও জনপ্রিয় হবে বলেই আশা করি।
আশা করার কারণ বলি: আমরা যে কী ভয়াবহ দুনিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াই সেটা আমরা খুব কমই অনুভব করতে পারি। অনুভব করলেও ছোট সমস্যাকে অনেক বড় সমস্যা জ্ঞান করি। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর মানুষের দুঃখের কাছে যে আমাদের কোনো দুঃখই দুঃখ না সেটা রিয়েলাইজ করতে চাইলে ‘গল্পগুলো সিরিয়ার’ পড়তে হবে।
সিরিয়ার মানুষ যারা জানে না তাদের আগামী দিনের সকালটা দেখার সৌভাগ্য হবে কী না।
মানুষের জীবন যে কী ভয়াবহ সেটা এই বইয়ে স্পষ্ট। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার গল্প যেমন আছে। তেমনি শ্মশানে ফুল ফোটাতে চাওয়ার প্রবল ইচ্ছে নিয়ে বেঁচে থাকার মানুষের গল্পও আছে। এক পিয়ানোবাদকের সারা জীবনের স্ট্রাগলের কাছে পৃথিবীর সব দুঃখ কিছুই না অনুভব হবে আপনার।
আবার দালালের খপ্পরে পরে সুখের সন্ধান করতে গিয়ে কী সব যাতনা আর ভয়াবহ এক জার্নি মনকে অশান্ত করে তুলবে। কঠিন হৃদয়ও কাঁদবে।
গৃহযুদ্ধে নিপতিত সিরিয়ার বেসামরিক জনগণের কষ্টের কথা উঠে এসেছে বইটিতে। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী গল্প ছিলো আইহাম-তেহানী যুগল আর দোয়া-বাসাম যুগলের গল্প। গল্প তো নয় এগুলো সত্যি ঘটনাটা গল্পের মতো করে বর্ণনা করা হয়েছে। যতক্ষন বই পড়ছিলাম ততক্ষণ আমি হারিয়ে গিয়ছিলাম সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আবার কখনো সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে।