সমবয়সী কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে পাঠকের ঘোরা হবে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া ও সিয়েরা লেওনের হানাবাড়িতে। ঘটবে ভুতুড়ে ঘটনা, অনুভব করা যাবে অনেক বছর আগে মৃত মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। একটি রহস্যময় ফিটনগাড়ির ঘোড়াগুলোর চোখ ঝলসে উঠবে স্বর্ণমুদ্রার মতো। সুড়ঙ্গের অন্ধকারে হায়েনারা হাত থেকে তুলে নেবে মাংস। আর ব্রিটিশ-আমলের হিলস্টেশনে মৃত সাহেব-মেমরা ফিরে আসবেন স্টিমইঞ্জিনে টানা রেলগাড়িতে। একটা গল্প যে ঘোর তৈরি করে তা-ই পাঠককে নিয়ে যাবে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
ছোটদের জন্য লেখা, তাই বইয়ের ভাষা একেবারে জলবৎ তরলং। মঈনুস সুলতান যে এতো সহজ ভাষায় লিখতে পারেন তা বিশ্বাস হতে চায় না। নামে ভ্রমণগল্প।আদতে অর্ধেক ভ্রমণ, অর্ধেক গল্প। গল্পের চরিত্ররা কাল্পনিক কিন্তু জায়গাগুলো আসল (ইউএসএ, ইথিওপিয়া, সিয়েরা লিওন আর দক্ষিণ আফ্রিকা।) চারদেশের হানাবাড়ি আর ভূতুড়ে ঘোড়ারগাড়ির কিংবদন্তী ভ্রমণগুলোর প্রধান উপজীব্য। মূলগল্পের পাশাপাশি চারটি দেশের ভাষা, সংস্কৃতি আর মানুষ নিয়েও আছে মনোজ্ঞ বিবরণ। ভ্রমণকাহিনি হিসেবে না নিয়ে শুধু গল্প ভেবে পড়লেও ক্ষতি নেই। আনন্দ পেয়েছি পড়ে। তবে গল্পগুলোর শেষ পরিণতি অনেকটা একইরকম হওয়ায় কিঞ্চিৎ হতাশ। লক্ষ্যভুক্ত পাঠক পাঠিকাদের কাছে বইটি বেশ ভালো লাগার কথা।
ভ্রমণ আর গল্পের মিলমিশ। শিশু-কিশোররা টার্গেট পাঠক। সমস্যা যেটা, প্রকৃত শিশু-কিশোর সাহিত্যগুলো বড় বয়সে পড়লেও বেশ একটা তাজা অনুভূতির জন্ম দেয়। এই বইটা তেমন না। জানি না, টার্গেট পাঠকদের কেমন লাগবে। তবে জায়গাগুলো দারুণ। আদ্দিস আবাবা, সিয়েরা লিওন, ওয়াশিংটন ডিসির অক্টাগন হাউজের গা ছমছমে হানাবাড়ি আর জায়গাগুলোর কৃষ্টির সাথে পরিচয় হওয়াটা নেহাত মন্দ অভিজ্ঞতা নয়। শীতের অলস কোন বিকেলে হট চকোলেট হাতে পড়তে বসলে ভালোই কাটবে সময়।
"নানাদেশের হানাবাড়ি ও রহস্যময় ঘোড়ারগাড়ি" - কিশোর উপযোগী এই সংকলনে স্থান পেয়েছে চারটি ভ্রমণগল্প। মঈনুস সুলতান এবার ভ্রমণকাহিনীর বর্ণণায় বেছে নিয়েছেন গল্পের আদল। সুধা, কৌশিক, কোকো এবং সারা- চারজন কাল্পনিক কিশোর-কিশোরীর দৃষ্টিভঙ্গিতে ওয়াশিংটন ডিসি, প্রিটোরিয়া, ইথিওপিয়া এবং সিয়েরা লিওনের বাস্তবিক চারটি হন্টেড হাউজ (হানাবাড়ি) এবং সংলগ্ন এলাকার কথা বর্ণিত হয়েছে। এতে করে ভ্রমণের সাথে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের খুঁটিনাটি বিবরণ, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস আর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কথা জানা যায়। আবার নিছক ভূতের গল্প হিসেবে পড়তে গেলেও একেবারে খারাপ লাগে না। খুব সম্ভবত 'কিশোর উপযোগীতা' মাথায় রেখেই মঈনুস সুলতান নিজের চিরাচরিত ন্যারেটিভ থেকে সরে এসেছেন। আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ না ঘটিয়ে গল্প বলেছেন সহজ ভঙ্গিতে।
বইয়ের শুরুতেই সুধার সাথে ওয়াশিংটন ডিসির পাতালরেল থেকে বেরিয়ে পাঠক প্রবেশ করবে অষ্টভুজাকৃতির একটি ভিলায়; শতবর্ষ আগে যেখানে বাস করতেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডি। তাদের সম্মানে যে বিশাল হলে আয়োজিত হতো বলনাচের, ওখানে ভৌতিকভাবে বেজে উঠবে ঘণ্টা ও জ্বলে উঠবে মোমবাতি। কখনো সখনো ফার্স্টলেডির চলাফেরার শব্দও শোনা যাবে স্পষ্টভাবে।
তারপর কৌশিকের সাথে পাড়ি জমাবে প্রিটোরিয়া নগরীর কেল্লার মতো একটি ম্যানশনে। মিউজিক-রুমে স্যুট-গাউন পরে বসে আছে কয়েকটি কঙ্কাল। অনেক বছর আগে মৃত এক গায়িকা এসে বসবেন গ্র্যান্ডপিয়ানোতে, স্বর্ণমুদ্রার মতো ঝলমলে চোখে ঝিলিক তুলে ধরবেন অপেরা-গান, আহা, গাইতে গাইতে তাঁর ঠোঁট ও মুখ ভরে উঠবে তাজা রক্তে।
কোকোর সাথে অভিযান হবে ইথিওপিয়ার এক নগরীর সুড়ঙ্গে; সেখানে একসাথে ডেকে উঠবে শত শত তক্ষক। মাঝরাতে হি-হি-হি হাসিতে ঘুম ভেঙে যাবে, চাঁদের আলোয় জানালায় এসে দাঁড়াবে ভুতুড়ে হায়েনা, তার চোখ থেকে বেরোবে আগুনের সবুজ ফুলকি।
গাড়ি-অ্যাক্সিডেন্টে মৃত কিশোরী ফিরে আসবে সিয়েরা লিওনের হিলস্টেশনে তার শৈশবের বসতবাড়িতে। সারার সাথে বাদুড়ঝোলা গাছটির তলায় দাঁড়ালে দেখা যাবে, রক্তাক্ত জামা-কাপড় পরে সিঁড়িতে বসে আছে ওর মৃত বান্ধবী।
বইটা 'ছোটো'দের জন্য লেখা। কিন্তু সেই ছোটদের কল্পনাকে উস্কে দেবে যা, মনে হয়েছে মইনুস সুলতান ভুলে গেছেন সে জগৎটা কিভাবে তৈরি হয়। প্রতিটা গল্প প্রায় একই গড়নে, একই চালে লেখা।