জহির রায়হানের জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ। তাঁর ছোটগল্পের বড় অংশ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর পর। এখনো নানা অনুসন্ধানে তাঁর অগ্রন্থিত ছোটগল্পের খোঁজ মিলছে। এই সংকলন তেমনই একটা অনুসন্ধানের ফল। জহির রায়হানের মোট ৭টি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে এই বই। গল্পগুলো ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে লেখা ও বিভিন্ন পত্রিকায় মুদ্রিত। গল্পগুলোর প্রধান উপজীব্য ভাষা আন্দোলন, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সমাজে নারীর ভঙ্গুর অবস্থান ও নর-নারীর প্রেম। এখানে জহির রায়হানের নিখুঁত সমাজবীক্ষণ ও সচেতন শিল্পীসত্তার পরিচয় পাওয়া যাবে সহজে। একইভাবে পাঠককে একটি বিশেষ কালপর্বের সমাজ, সেই সমাজের মানুষ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করবে।
Zahir Raihan (Bangla: জহির রায়হান) was a Bangladeshi novelist, writer and filmmaker. He is perhaps best known for his documentary Stop Genocide made during the Bangladesh Liberation War.
He was an active worker of the Language Movement of 1952. The effect of Language Movement was so high on him that he made his legendary film Jibon Theke Neya based on it. In 1971 he joined in the Liberation War of Bangladesh and created documentary films on this great event.
He disappeared on January 30, 1972 while trying to locate his brother, the famous writer Shahidullah Kaiser, who was captured and killed by the Pakistan army. Evidences have been found that he was killed by some armed Bihari collaborators and disguised soldiers of Pakistan Army.
ভেবেছিলাম, অগ্রন্থিত গল্প কতো আর ভালো হবে? আমাকে ভুল প্রমাণ করে "যখন যন্ত্রণা " খাঁটি জহির রায়হানীয় গল্পগ্রন্থ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেই শ্লেষ, সেই সমাজচেতনা, সেই কুসংস্কার এর প্রতি কুঠারাঘাত, সেই অকপট সারল্য! নারী চরিত্রগুলো বিশেষভাবে শক্তিশালী। বইটা আবারও মনে করিয়ে দ্যায়, আমাদের আরো কতো কিছু পাওয়ার ছিলো এই মহান সাহিত্যিকের কাছ থেকে।
যাঁদের লেখা আমি গোগ্রাসে গিলি,যাঁদের লেখা পড়ে আমার বই পড়ার শুরুর সময়টা বর্ণিল হয়েছিল;আমার সেই প্রিয় লেখকগুলো একে একে প্রায় সব্বাই আকাশের তারা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এত খারাপ লাগে,যখন ভাবি আমার প্রিয় লেখকের কোন অটোগ্রাফ আমি কখনো আমার স্বাদের বইটা তে নিতে পারবো না।
আমার সেই গুটিকয়েক প্রিয় লেখকদের একজন "জহির রায়হান"। আমার মনে হয় না,উনার কোন লেখা(ছোট গল্প,উপন্যাস) আমার অপঠিত আছে। সব পড়া শেষ, এবার আর কিছু নেই,তবে পড়া বইগুলো পুনরায় পড়ব,এরকম একটা বাসনা নিয়ে এত দিন ছিলাম।
আমার বাসনায় ছেদ ঘটালো ২০২৩ বইমেলা,প্রথমাতে পেলাম জহির রায়হানের অগ্রন্থিত গল্প,পেয়ে দেরি করিনি,নিয়ে ফেললাম। যদিও প্রথমার আগুন ঝরানো দাম,তাও না নিয়ে থাকতে পারিনি।
বইটা নেয়া আর পড়ার মাঝে বিশেষ ব্যবধান ছিল না। প্রথম গল্পটা অবশ্য আমি আগে পড়েছি। তাও,সেই চিরচেনা স্বাদে আমি ডুবে গেছি। একটানা বসে শেষ করেছি,অল্প কয়টা গল্প মাত্র। আশ মেটে নি,কিন্তু বই শেষ। প্রিয় গল্প " মনের মতো বউ"।
বইটা শেষ করে ভাবতেছি,এটাই বোধ হয় শেষ। আর পাব না জহির রায়হানের কোন বই। ভাবতেই কেমন জানি বিষাদে ডুবে যাচ্ছি...
স্কুলের পাঠ্যবইতে 'সময়ের প্রয়োজনে' পড়ার পর বাসায় এসে জহির রায়হান সমগ্র থেকে লেখা গিলেছিলাম গোগ্রাসে। ঐ বয়সে অনেক কিছু না বুঝেই পড়ে গিয়েছিলাম কিন্তু ভালোলাগার অনুভূতিটা স্পষ্ট মনে আছে। এত বছর পর সেই পছন্দের লেখকের লেখা আবার পড়তে পারবো ভাবিনি। তাই খোঁজ পেয়েই নিয়ে নিয়েছিলাম জহির রায়হানের সদ্য প্রকাশিত অগ্রন্থিত গল্পগুচ্ছ 'যখন যন্ত্রণা'।
এতো বছর পরে এসেও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে শেষ করলাম সাতটা গল্প। বরাবরের মতোই সহজ স্বাভাবিকভাবে বলে যাওয়া গল্প, নির্লিপ্ত লেখনী। অথচ শেষ প্যারায়, এমনকি শেষ লাইনে এসে সেই সারল্য চুরমার করে দেওয়া বাস্তবতা। জহির রায়হানের লেখনী, বিশেষ করে ছোটগল্প পছন্দ হলে বইটা অবশ্যই রেকমেন্ডেড।
জহির রায়হানের ছোট গল্পগুলো পড়লে মনে হয় এতো ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়েও গল্প লিখে ফেলা যায়? কি তাজ্জব ব্যাপার! কখনও ভাবি নাই এই ২০২৩ এ এসে ১৯৭২ সালে হারিয়ে যাওয়া জহির রায়হানের নতুন গল্পের খোঁজ পাব। এটাও তো কি তাজ্জব ব্যাপার, তাই না?
গল্প হোক বা উপন্যাস, লেখকের লেখার নিজস্বতা স্পষ্ট সবখানে। লেখার প্রতিটি ধারায় আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা সহজেই চোখে পড়ে।
জহির রায়হানের একমাত্র গল্পগ্রন্থ "সূর্যগ্রহণ" জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়। পরে তাঁর মৃত্যুর পর ছোট গল্পের বড় একটা অংশ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
সাতটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে এই সংকলন "যখন যন্ত্রণা "। গল্প গুলো স্বতন্ত্র হলেও প্রেক্ষাপট ভাষা আন্দোলন, সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সমাজে নারীর অবস্থান ও নর- নারীর প্রেম ভালোবাসা। লেখক সেই সময় টাকে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখকসত্তা দিয়ে, যার স্পষ্ট প্রকাশ প্রতিটি গল্প, ছোট্ট দুই পাতার গল্প কেমন ভারী হয়ে চেপে বসে থাকে মনের মধ্যে ।
এই বইয়ের গল্প গুলো আগে কখনও দুই মলাটে স্থান পায়নি তবে বিভিন্ন সময়ে ঈদ সংখ্যা বা সাহিত্য সাময়িকী তে স্থান পেয়েছিল, অবশেষে সুন্দর এই গল্পগুলো দুই মলাটে আবদ্ধ হলো।
আবার কখনো জহির রায়হানের নতুন কোন লেখা পড়ার সুযোগ পাব, এই ভাবনা মেলার শুরুতেও মাথায় উঁকি দেয়নি। কিন্তু যখন শুনলাম প্রথমা থেকে অগ্রন্থিত গল্পগুলো প্রকাশ পাবে, তখন থেকেই দিন গুণছিলাম, কবে হাতে পাব। সেই হাতে পেলাম, কিন্তু কয়েক ঘন্টাতেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এবারেও চমকালাম লেখকের সেই সদা নির্বিকার, কাল-স্থান-মাত্রা বিহীন লেখনীর ছন্দে। সাতটা গল্প, মনে থাকবে বহুদিন।
মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে সময়ের প্রয়োজনে কিংবা একুশের গল্প পড়ে জহির রায়হানকে লালন করি আমি। এই দুটো গল্পই আমাকে লেখালেখিতে সবথেকে বেশি উবুদ্ধ করেছিল। এরপর থেকে জহির রায়হান গোগ্রাসে গিলি। যখনই শুনলাম উনার অগ্রন্থিত গল্প প্রকাশ পাবে এবার খুশি হয়েছিলাম। অবশেষে পড়ে ফেললাম। গল্পগুলোর বিষয়বস্তু সেই আগের মতোই। ভাষা আন্দোলন, বিপ্লবী চেতনা, প্রেম, মধ্যবিত্ত জীবন, টানাপোড়ন। সব গল্পই অসাধারণ। গল্পগুলোর শেষে পাঠককে একধরণের ধাক্কা দেন লেখক। তবে আমার সবথেকে ভালো লেগেছে অমিত্রাক্ষর ও অকালসন্ধ্যা গল্প দুটো। যখন যন্ত্রণাতে হালকা পরাবাস্তবতা আর বেড়ি গল্পটা যেন এখনো প্রাসঙ্গিকতা। প্রত্যেকটা গল্পই প্রমাণ করে জহির রায়হান নিজের সময়ের থেকে শত ক্রোশ এগিয়ে ছিলেন।
জহির রায়হানের গল্প বেশ সরল মনে হলেও অন্তর্নিহিতভাবে দীপ্তিময়। খুব প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা দৈনন্দিন বাস্তবিকতা নিয়ে গুছানো সব গল্প যদিও খানিকটা আবেগময় । জহির রায়হানের নারী চরিত্রায়ন খুব শক্তিশালী হয়। আফসোস, জহির রায়হান কে আমরা বেশিদিন পেলাম না।
আমার কাছে সবসময়ই পুরুষের পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে নারীদের পুরুষতান্ত্রিকতা বেশি ভয়ংকর লাগে। নারীরা যারা এমন মানসিকতা বহন করে চলেন, তাদের পরিবারে নারী-পুরুষ বৈষম্যের যে চাষ হয় সেইটার ফলন সমাজে ভয়ংকরভাবে চোখে পড়ে। বেড়ি- যা এই সংকলনটির শেষ গল্প, সেখানে এই নিয়েই লিখেছেন জহির রায়হান৷ তার সেই সহজ-সাবলীল গদ্যে৷ প্রতিটা গল্প শেষ করে বারবার একটা চিনচিনে অনুভূতি হয়েছে বুকের ভেতর। বারবারই মনে হয়েছে যে মাত্র ৩৭ বছর বয়সেই আমরা একেবারেই আমাদের নিজস্ব একজন কথাসাহিত্যিক এবং বিশ্বমানের চলচ্চিত্রকারকে হারিয়েছি। অকালসন্ধ্যা গল্পটিতে যেমন আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর টানাপোড়েন এসেছে চমৎকারভাবে। অকালসন্ধ্যা মানে যৌবনে অকাল বার্ধক্য। যেখানে সাংসারিক নানা ঝুটঝামেলায় পড়ে রোমান্টিকতার ছিঁটেফোঁটাটুকুও হারিয়ে যায়, সেটা বেলিফুলের মালার মাধ্যমে হুট করে ফিরিয়ে আনা যায় না আর। যখন যন্ত্রণা গল্পটি আমাদের মানসিক বিশেষ সময়ের একটা পরিস্থিতি যেন। প্রবল আকাঙ্ক্ষার ধনকে পাওয়া, অবহেলা, আবার হারানো- আর সেই শূন্যতার অনুভূতি। এমন অনুভূতির সাথে পরিচিত নন-এমন বোধহয় নেই কেউ। অনমিতা গল্পটিতে রাজনৈতিক মতবাদ আর এর সাথে মেশানো ব্যক্তিত্ব, তার বদলে যাওয়া, বদলে যাওয়া কদর্য রূপ দেখে ভালোবাসার পালানো এই সমস্ত বিষয় বড় চমৎকার এসেছে। নারী অধিকার এর বিষয়টি অত্যন্ত সুক্ষ্ণভাবে এসেছে মনের মতো বউ গল্পে৷ এর শেষ চূড়াটি মজার এবং প্রয়োজনীয়। অমর একুশের সন্তান জহির রায়হানের কলমে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কিছু থাকবে না, এটা ভাবা যায় না। প্রথম গল্প ঢেউ তারই সাক্ষী। আর অমিত্রাক্ষর গল্পটি চমৎকার ন্যারেটিভে সাজানো একটা গল্পের মধ্যে গল্প। রোমান্টিক-ট্র্যাজেডি গল্পের একটা সুন্দর উদাহরণ৷ জহির রায়হানের এই অগ্রন্থিত গল্পগুচ্ছটি বেশ ভালো একটা কাজ প্রথমার। তবে ৭২ পৃষ্ঠার বইটির মুদ্রিত মূল্য ২৪০- একটু পীড়াদায়কই বটে।
ছোটোখাটো একটা বই। এক বসাতেই পড়ে শেষ করা যায়। কিন্তু পড়ার পর যে রেশ রেখে যায় তা কাটাতে বহুদিন লেগে যায়। আবারও আক্ষেপ লাগলো বইটা পড়ে। আরও কটা দিন যদি জহির রায়হানকে পাওয়া যেতো!
মাত্র ৭টা ছোট গল্প।কিন্তু গভীরতা অনেক।আমরা ভাগ্যবান যে অগ্রন্থিত এই গল্পগুলো এত বছর পরে পড়ার সুযোগ পেলাম।আবার আমরা হতভাগা এই কারনে যে জহির রায়হানকে অকালে হারালাম।
মৃদুমন্দ হাওয়া, হারিকেনের হলুদ রঙের আভা আর শেষ বিকেলের রোদের মত মোলায়েম জহির রায়হানের লেখা। ততকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক ব্যাধি, মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, নর-নারীর প্রেম এ সমস্ত বিষয়কে ঘিরে তার অগ্রনহিত গল্পগুচ্ছ "যখন যন্ত্রণা"।
জহির রায়হানের লিখনশৈলীর বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়-তিনি খুব একটা দীর্ঘ বাক্য তৈরিতে অভ্যস্ত না, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাক্যের লেজে ঝুলতে থাকা শব্দদেরকে নতুন বাক্যে আশ্রয় দেয়। যেমনঃ দেওয়াল ঘড়িটা চলছে। টিক, টিক, টিক। ছন্দে ছন্দে গল্প বলেন তিনি। যেন সরল গদ্যে বিষন্ন কবিতার ছোঁয়া। লেখকের কিছু বই পড়েছি আগে। বেশিরভাগ চরিত্রগুলোর ডায়লগ ডেলিভারি কিছুটা নাটকীয়। কিন্তু মেকি নয়। স্পষ্টতা আছে, গভীরতা আছে তাতে।
আগেকার দিনে বিটিভিতে কিছু নাটক হত। তানপুরার লম্বা টানগুলোর সাথে চরিত্রদের সমস্ত অপ্রাপ্তি মিশে যেত যেন! সহজ-সাবলীল সংলাপ আর করুণ আবহের খাতিরেই তার গল্পগুলোকেও সে কাতারে ফেললে খুব একটা ভুল হবে না।
“ওদের জানিয়ে দাও ওরা আমার ভাইবোনকে কুকুর বিড়ালের মতো মেরেছে। ............................................. ওদের জানিয়ে দাও, মরা মানুষগুলোতে কেমন জীবন আছে।”
আমাদের জীবন খুব কম সময়ের, কিন্তু আমরা চাইলে সেই জীবন কে অনেক বড় করে তুলতে পারি। অথবা আমরা ছোট জীবনেই অনেক বড় কিছু করে যাবার মত করে কিছু করে যেতে পারি। এটাই বা কতজন করতে পেরেছেন। তারপরও সবাই চেষ্টা করে যায় নিজের ছাপ রেখে যেতে। নিজেকেই ছাড়িয়ে যেতে চায় অনেকেই। বাংলা সাহিত্যে খুব কম মানুষ রয়েছেন যারা নিজেদের ছাপিয়ে গিয়েছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে নিজের সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে অমর করে গিয়েছেন নিজেকে।
বাংলা সাহিত্যকে যারা ছোট গল্পের দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন “জহির রায়হান”। তিনি একাধারে কি ছিলেন সেটা বলা মুশকিল। কারণ একই সাথে পরিচালক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, পরিচালক, রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা সহ অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন। বলা যায়, একের ভেতর অনেক, যা খুব কম মানুষের ভেতর পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
জহির রায়হানের লেখালিখির শুরুটা হয়েছে স্কুল জীবন থেকেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জহির রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহচর শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী তার এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘জহির তখন লিখছেন। প্রচুর। ছোটগল্প অনেক জমেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গল্প। কৃষক, শ্রমিক, মজুরের গল্প। মেহনতি মানুষের গল্প। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প।
প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে জহির একটি নির্বাচিত গল্প সংকলন প্রকাশের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি চলে যান কলকাতায়। তৈরি করেন বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘‘Stop Genocide’’। এ সময় তিনি ‘‘Bangladesh Liberation Council of Intelligensia’’ - এর সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন।
১৯৮০ সালে ডঃ আশরাফ সিদ্দিকীর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি দুই খণ্ডে প্রকাশ করে জহির রায়হান রচনাবলী। এরপরে তার আর কোন গল্প গ্রন্থ প্রকাশ পায়নি। “যখন যন্ত্রণাঃ অগ্রন্থিত গল্পগুচ্ছ” বইটি সম্পাদনা করেছেন কাজী জাহিদুল হক। তিনি বাংলা একাডেমিতে চাকরির সুবাদে পুরাতন অনেক লেখা খুজে পান জহির রায়হানের। সেখান থেকেই কয়েকটি লেখা এই বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে। হয়ত আরও লেখা রয়েছে আনাচে কানাচে। সেসব একটি খুজে ��াওয়া যাবে। এই বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।
এই বইয়ে মোট সাতটি গল্প রয়েছে। তবে এখানে বলে রাখার বিষয় হচ্ছে যে গল্প গুলোর শেষ আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে। মনে হবে এভাবে কেন শেষ হয়েছে। আরও কিছু বাকি আছে। তবে কি বাকি আছে সেটা আপনাকেই খুজে নিতে হবে। প্রথম গল্পের নাম হচ্ছে “ঢেউ”। এটি মুলত রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। যেখানে একজন বিদেশীর ভাষা আন্দোলন নিয়ে উ���্ছাস এবং অনুভূতি বর্ণনা করে লেখা হয়েছে। এমনকি তার নিজের ভাষা বা মাতৃভাষা নিয়েও কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে।
আবার দ্বিতীয় গল্পটি কিন্তু একেবারে ভিন্ন, এই গল্পের নাম “মনের মতো বউ”। নাম শুনেই বিয়ে বিয়ে একটা অনুভূতি হতে পারে। তবে এটি একেবারে ভিন্ন ধারার একটি গল্প। আমাদের চিরায়তি নিয়মে যেভাবে পাত্রী নির্বাচন করা থেকে শুরু করে ঘটকের কর্মকান্ড সব কিছু এই গল্পে দেখানো হয়েছে।
আমাদের ছেলেদের মন বা মানসিকতার একটি দারূণ দিক আমরা এখানে দেখতে পাই। যেমন এই গল্পের প্রধান চরিত্র মাহের ঘটকে বলে, ‘আচ্ছা তুমিই বলো, দুনিয়াতে এসেছি, একটা ভালো ঘরে আসতে পারিনি। একটা ভালো চাকরি পাইনি। চেহারাটাও কত কুৎসিত। একটু ভালো খাব, ভালো করে থাকব, সে সম্বলও নেই। ধন বলো, টাকাপয়সা বলো, সে তো ঠনঠন। এ অবস্থায় যদি একটা মনের মতো বউও না পাই, তবে কী নিয়ে বেঁচে থাকব এ পৃথিবীতে।”
তবে এই গল্পের শেষে পাঠক অবাক হবেন শুধু নয়। নতুন দিনের ভাবনাও আপনার ভেতর কাজ করবে। কারণ লেখক এখানে বড় ধরনের একটি মোড় দিয়ে রেখেছেন, যা আপনাকে হাসাবে সেই সাথে বাস্তবতাও দেখাবে।
আবার তৃতীয় গল্পটি হচ্ছে “অমিত্রাক্ষর”। এই গল্পে আমরা দেখতে পাই এক মেয়ের প্রেম দুজন ছেলে। তবে পার্থক্য হচ্ছে একজনের ভাবনায় সে বসবাস করে আর অপরজন বাস্তবতা শেখায়। আমরা দেখি জরিণা অনেক কষ্ট করে সংসার চালায়। চারটা টিউশন করে, কারণ বাবা অসুস্থ। এই গল্পের শেষটা বেশ বেদনাদায়ক বা ট্র্যাজিক বলা যায়।
এবার আসি চতুর্থ গল্পের ব্যাপারে, এই গল্পটির নাম হচ্ছে “অনমিতা”। এটি চিরায়ত প্রেমের গল্প হতে পারত। তবে তা হয়নি। এটিও পাঠকের ভাবনাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। পাঠক শেষটায় গিয়ে চমকে যাবেন। এই গল্পের প্রধান চরিত্র নিলুফার ওরফে নীলু ভালোবেসে বিয়ে করেছিল চালচুলোহীন এক যুবক লতু'কে।
গল্পের কথকের মায়ের ভাষায়, ‘আমি তো আজও ভেবে পাইনে। ওই লতু ছোঁড়াটার কিসে মুগ্ধ হয়ে নীলা ওর সঙ্গে বেরিয়ে গেল। কী আছে ছেলেটার। না রূপ, না অর্থ, কী আছে? তবুও নীলু ভাল ছিল। কারণ লতু জেলে ছিল। অন্যায় অবিচার মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু শেষের দিকে লতুর কি হল? প্রশ্নটি থেকেই যায়।
এই বইয়ের পঞ্চম গল্পের নাম হচ্ছে “যখন যন্ত্রণা”, এই গল্পের নাম অনুসারেই বইটির নামকরণ করা হয়েছে। তাই আমি এই গল্পটি নিয়ে শেষে আলোচনা করব।
ষষ্ঠ যেই গল্পটি রয়েছে তার নাম হচ্ছে “অকালসন্ধ্যা”। এখন এই অকালসন্ধ্যা নামের সার্থকতা কোথায়। দিনের শুরু হয় সকাল, তারপর দুপুর, তারপর সন্ধ্যা এভাবে। কিন্তু কারো কারো জীবনে এই সন্ধ্যা হয় যেন দ্রুত। এর কারণ অবশ্য এক জনের কাছে এক এক রকম। কেউ কেউ আর্থিক ও সামাজিক ভাবে স্বচ্ছলতা থাকলে সেখানে সন্ধ্যা আসে দেরিতে। আবার যেখানে নেই সেখানে যেন সব কিছু দ্রুত চলে আসে।
এই বইয়ের সপ্তম ও শেষ গল্প হচ্ছে “বেড়ি”। এটি আমাদের চিরায়ত বাংলাদেশের মেয়েদের প্রতিচ্ছবি। আমরা যেভাবে মেয়েদের দেখে এসেছি, বা রাখতে চেয়েছি সেটার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এই গল্পে।
লেখক এখানে বেশ দারূণ একটি ব্যাপার ঘঠিয়েছেন সেটা হচ্ছে নাম। গল্পের চরিত্রে নাম হচ্ছে রাজু। সাধারণ মেয়েদের নাম রাজু হয় না। তবে এই নামের মাধ্যমে দেখিয়েছন ছেলেমেয়ে কোন ভেদাভেদ করা যাবে না। অপর দিকে আমরা গল্পে রাজুর দাদিকে বলতে শুনি, ‘রাজু খোদাকে কি একটুও ভয় নেই তোদের। মরতে কি হবে না কোন দিন? এই যে বেপর্দা হচ্ছিস, পরপুরুষের চোখে পড়ছিস। এর শাস্তি কি ভোগ করতে হবে না কোন কালে?’।
এবার আমি পঞ্চম গল্পটি মানে বইটি যেই নামে নামকরণ করা হয়েছে, “যখন যন্ত্রণা” গল্পটি কিছুটা বিশ্লেষণ করতে যাচ্ছি। এই গল্পটি মুলত প্রেম, ভালবাসা ও প্রেমিকার অনুভূতির কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে। প্রেমিকার ভালবাসা, আদর আর প্রশয় আমাদের মনকে আন্দোলিত করে তোলে। তার একটু স্পর্শ আমাদের মন ও শরীরকে শিহরিত করে তোলে। আবার সে যদি আমাদের প্রত্যাখ্যান করে বা একটু অভিমান করে তবে আমাদের হৃদয় খন্ড বিখন্ড হয়, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটতে থাকে। আমাদের যখন কারো প্রতি তীব্র ভালোবাসা তৈরি হয় তখন কিন্তু আমাদের তার সব কিছুই ভাল লাগে। তার অসুন্দরের মাঝেও আমরা সৌন্দর্যকে আবিস্কার করে থাকি।
তখন আমরা আমাদের আবেগের কাছে নিজেকে সমর্পিত করে দেই। আমাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তখন সেই মানুষটাই আমাদের ধ্যান ও জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়।
যখন আমরা প্রত্যাখ্যাত হই, আমাদের হৃদয় ভেঙ্গে যায়, সমুদ্রের জলোচ্ছাসের মতো করে আমাদের বুকে ঢেউ বইতে থাকে। আমরা অনুভব করি কেউ আমাদের হৃদয় কে ছিন্ন বিচ্ছিন করে ফেলেছে। এটাই তখন যন্ত্রণা হয়ে যায়। বহুমাত্রিক প্রতিভাধর না হলে মানুষের ভাবনা আর অনুভূতিকে নাড়িয়ে দেয়ার মত শক্তি খুব কম মানুষের রয়েছে। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভাধারী মানুষটি সত্যি আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে গিয়েছেন। যে আলোয় আজ আমরা আলোকিত হচ্ছি। এই বইটি তার একটি উদাহরণ মাত্র।
জহির রায়হানের গল্পের গভীরতা অনেক। মনের ভিতর হাহাকার অনুভব করি৷ প্রতিটি শব্দ বুকে বাঁধে। প্রতি গল্পেরই যেনো একটি করে প্রাণ আছে। বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত৷
জহির রায়হানের লেখা আমার ভীষণ প্রিয়, এতো চমৎকার ভাবে খুব কম লেখকই লিখেছেন বলে আমার মনে হয়। তাঁর লেখাতে কি যেন একটা আছে যা অন্য কোনো লেখকের লেখাতে আমি খুঁজে পাই না। এতো তেজ,এতো বিদ্রোহ নিয়ে কয়জন লিখেছে আমার জানা নেই!
আজকে পড়ে শেষ করেছি জহির রায়হানের লেখা কিছু ছোট গল্প। যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। যা গ্রন্থ আকারে প্রকাশ পায়নি কখনো। জহির রায়হানের এই ছোট গল্প গুলো সংগ্রহ করে একসাথে প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশনী। বইটির নাম করণ করা হয়েছে বইটিতে থাকা একটি গল্পের নাম অনুসারে। প্রথমা প্রকাশনীকে অনেক ধন্যবাদ প্রিয় লেখকের আরো কিছু লেখা পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
জহির রায়হানের জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্প���্রন্থ সূর্যগ্রহণ। তাঁর ছোটগল্পের বড় অংশ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর পর। এখনো নানা অনুসন্ধানে তাঁর অগ্রন্থিত ছোটগল্পের খোঁজ মিলছে। এই সংকলন তেমনই একটা অনুসন্ধানের ফল। জহির রায়হানের মোট ৭টি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে এই বই। গল্পগুলো ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে লেখা ও বিভিন্ন পত্রিকায় মুদ্রিত। গল্পগুলোর প্রধান উপজীব্য ভাষা আন্দোলন, তত্কালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সমাজে নারীর ভঙ্গুর অবস্থান ও নর-নারীর প্রেম। এখানে জহির রায়হানের নিখুঁত সমাজবীক্ষণ ও সচেতন শিল্পীসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
সুন্দর সব কিছুই মনে হয় ক্ষণস্থায়ী! প্রিয় লেখকের বইটা শুরু করতে না করতেই শেষ হয়ে গেল। সুন্দর সবকিছু নিমিষেই ফুরিয়ে যায়।সেই চেনা লেখার ঢং, অদেখা সময়কে ভিন্ন ফ্রেমে আটকে ফেলা গল্প, জহির রায়হানের কলমের জাদু। হারিয়ে যাওয়া জাদুকরের নতুন জাদুকৌশল দেখতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম যেন বর্তমান সময়ের অস্তিত্ব। আর যখন জাদুর বাক্সটার ঢাকনা বন্ধ হলো, তখন টের পেলাম বুকের ভেতর কোথায় যেন কিছু একটা নেই, যা ছিল কিন্তু এখন হারিয়ে গিয়েছে। জহির রায়হানের চমৎকার কয়েকটি ছোট গল্প পড়ে শেষ করলাম। জহির রায়হান ভক্তদের জন্য চমৎকার কিছু গল্প রয়েছে বইটিতে। আশা করি ভক্তদের উজ্জীবিত করবে গল্পগুলো। প্রিয় লেখকের আরও অনেক বেশি লেখা পড়তে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে শেষ করলাম " যখন যন্ত্রণা "!
মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে জহির রায়হান আলোকিত করে গেছেন আমাদের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গন। নিবিড় অনুসন্ধানে পাওয়া তাঁর ৭টি ছোটগল্প নিয়ে এই বই। গল্পগুলো বই আকারে প্রকাশিত হলো এই প্রথম। সবার কাছে ভালো লাগবে আশা করি।
"এখানে এই দেবদারুবনের পাশে ঢেউতোলা সরু পথ মিহি হয়ে নেবে গেছে নিচে, যেখানে বিকেলের হ্রদে হরিণশিশুর ছায়াজল কেঁপে কেঁপে মায়াবী আকাশের কোলে মিশে যায়। তারপর সন্ধ্যা নাবে। দূর উপত্যকা চুমে ভেসে আসা হিমেল বাতাস মর্মর তোলে দেবদারুডালে। পাতা কাঁপে। মন কাঁপে। কী যন্ত্রণায় ভরে আসে তার সমস্ত হৃদয়। মনে হয়, কী যেন ছিল তার, এখন আর নেই।"
৩৭ বছরের জীবনে- সাংবাদিক, সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক, চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, চিত্রগ্রাহক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্য রচয়িতা, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী, ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা- এসব পরিচয়েই জহির রায়হানের কর্মক্ষেত্রের পরিধি স্পষ্ট। জহির রায়হানের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়া একটি ছোটগল্প 'বাঁধ' দিয়ে। এই গল্প আমার কিশোর মনে দারুন প্রভাব ফেলে। গল্পের চরিত্র, তাদের আঞ্চলিক কথোপকথন, কাহিনি ইত্যাদি সবকিছুতে আমি দারুন মুগ্ধ হই। তারপর আর কোনো ছোটগল্প পড়া হয়নি।
আস্তে আস্তে জহির রায়হানের প্রকাশিত সবগুলো উপন্যাস/উপন্যাসিকা পড়ে শেষ করে ফেলার পর, হাতে আসে 'যখন যন্ত্রনা' বইটি। সেই স্কুলের পাঠ্যবইয়ে যে ছোটগল্প পড়েছিলাম, এরপর এতগুলো বছরে আর কোনো ছোটগল্প পড়া হয়নি জহির রায়হানের। তাই যখন এই বইয়ে জহির রায়হানের অগ্রন্থিত গল্পগুলো পড়ছিলাম আবার যেন সেই স্কুলজীবনের মুগ্ধতা ফিরে ফিরে আসছিলো। এই বইয়ে জহির রায়হানের লেখা ১০টি ছোটগল্প রয়েছে, যা ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সালে লেখা।
গল্পগুলোর প্রধান উপজীব্য ভাষা আন্দোলন, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সমাজে নারীর ভঙ্গুর অবস্থান ও নর-নারীর প্রেম। এসব গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের প্রতিটি গল্পের শেষে গল্পের উৎস ও সময়কাল উল্লেখ করা হয়েছে। জহির রায়হানের অনেক ছোটগল্পই হারিয়ে গেছে বিভিন্ন পত্রিকার দুষ্প্রাপ্যতার দরুন। আর যা কিছু সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, তা-ই নিয়ে 'যখন যন্ত্রনা'।
আশি নব্বই এর দশকে বিটিভিতে কিছু নাটক দেখাতো। নাটকের গদ্যধারা ছিল ভীষণ সরল। অভিনেতা অভিনেত্রীরা প্রাঞ্জল সংলাপ দিতেন। সরল গল্পগুলোতে দেখা যেত প্রচন্ড মায়া। অপ্রাপ্তির গল্পটা মনের সাথে মিশে যেত। কঠিন কঠিন অর্থ থাকতো গল্পের ভেতরে, কিন্তু কি সহজে বুঝতাম। অন্যায়ের প্রতিবাদ থেকে আধুনিক শহুরে গল্প...অনেক বছর বিটিভি দেখেছিতো, এইসব পুরানো নাটকগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টিভিতে দিতো, তাই বহুবার দেখা হয়েছে। কন্টেন্ট ছিল সংখ্যায় কম। কিন্তু নিপুণ নির্মাণে বেশি।
৭২-এ জহির রায়হান উধাও হলেন, অথচ তাঁর সব সাহিত্যকর্ম কি চির-আধুনিকই রয়ে গেল, না? নিজের সময় থেকে চিন্তাভাবনায় এগিয়ে ছিলেন বহু যোজন। কয়েক যুগ পর প্রিয় লেখকের অগ্রন্থিত সাতটি গল্প পড়ে সেকালের নাটকগুলোর কথা বিশেষ মনে পড়ছে। ছোট ছোট গল্পেশ জীবনের এতসব বাঁক আর বিষয় তুলে এনেছেন অকপটে, গভীর আনন্দে পড়লাম। কিন্তু পড়া শেষে বারবার মনে যন্ত্রণা হচ্ছে, কি যেন ছিল আমার, এখন আর নেই।
'বিন্তিয়া রে-এ, ওরে ও বিন্তিয়া, খিড়কি সাব বন্ধ কার দো...'
'যখন যন্ত্রণা' জহির রায়হানের অগ্রন্থিত গল্পগুচ্ছের সংকলন। এতে সাতটি গল্প রয়েছে। গল্পগুলো ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সালের ভেতরে লেখা ও বিভিন্ন পত্রিকায় মুদ্রিত।
একজন জহির রায়হান ভক্ত হিসেবে এই বইটা একটা যন্ত্রণার মতোই। বইটা যখন দেখি তখন বেশ আনন্দ হয়েছিল, আবারও জহির রায়হানের লেখার সাথে সাক্ষাৎ ঘটতে যাচ্ছে এই ভেবে। অথচ এই যে পড়া শেষ করে কেমন শূন্যতা অনুভব করছি।
গল্পগুলোতে তৎকালীন ব্যক্তি, সমাজ, রাজনীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। ছোট ছোট বাক্যের মধ্য দিয়ে লেখকের শক্তিশালী চিন্তাভাবনা প্রস্ফুটিত হয়েছে, যা সমাজের জন্য সংস্কারমূলক। সমাজ চিত্রের সূক্ষ্ম দিকগুলোই গল্পের বিষয়বস্তু।
দুই-একটা বাদে গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে। আবার যদি অগ্রন্থিত লেখার সন্ধান মেলে... এই অপেক্ষায় রইলাম। গল্পগুলো পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রথমা প্রকাশনকে অনেক ধন্যবাদ।
জহির রায়হানের অগ্রন্থিত গল্পগুচ্ছ, গল্প গুলো সেই সময়ের বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে৷ বইটাতে রয়েছে মোট ৭ টা গল্প। গল্প গুলো সাধারণ, প্রথম দুইটা তেমন মনে ধরে নি, বাকীগুলো ভালো লেগেছে৷ সবগুলো গুলোর একটা কমন বিষয় আছে সেটা হচ্ছে 'কষ্ট'! কোনো গল্পে বোন মারা গেছে, কোনো গল্পে বিয়ে হচ্ছে না, কোনো গল্পে অভাব, কোনো গল্পে স্ত্রী-শ্বাশুড়ীর প্রতিদিনের ঝগড়া! লেখক হয়তো গল্পের কষ্ট সবার মাঝে ছড়িতে দিতে চেষ্টা করেছেন তাই প্রতিটা গল্প কষ্টের মাঝে ভরপুর রেখেছেন। গল্প পড়ে মন খারাপ করতে চাইলে এই বইটা পড়তে পারেন।
শীতের রোদের মতো, বইটা শুরু করতে না করতেই শেষ হয়ে গেল। সেই চেনা লেখার ঢং, অদেখা সময়কে ভিন্ন ফ্রেমে আটকে ফেলা গল্প, জহির রায়হানের কলমের জাদু। হারিয়ে যাওয়া জাদুকরের নতুন জাদুকৌশল দেখতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম যেন বর্তমান সময়ের অস্তিত্ব। আর যখন জাদুর বাক্সটার ঢাকনা বন্ধ হলো, তখন টের পেলাম বুকের ভেতর কোথায় যেন কিছু একটা নেই, যা ছিল কিন্তু এখন হারিয়ে গিয়েছে। 'যখন যন্ত্রণা!'