যারা কবিতাকে পুব থেকে, পশ্চিম থেকে, ছন্দ থেকে, মন্দ থেকে, বন্ধ থেকে, এই থেকে, সেই থেকে ইত্যাদি হিজিবিজি থেকে মুক্তি দিতে চান প্রকারান্তে তারাও কবিতাকে শেকল পরাচ্ছেন।
কবিতাকে স্বায়ত্বশাসন দেন। কবিতাকে খানিকটা মাথায় রেখে হৃদয়ের হাতে ছেড়ে দিন, দেখবেন কবিতা আপনিই উদ্ভিদের মতো করে উদ্গত হবে।
"কবিতার জন্ম স্বতঃস্ফূর্ততায়। কবিতা সাজানো বাগান নয়, কবিতা মূলত অরণ্যের বিন্যাস।" -পৃষ্ঠা ৭
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা একজন ব্যক্তি। কবি, চিত্রশিল্পী, গল্পকার, প্রচ্ছদকার এরকম বিভিন্ন রূপে তাকে পাওয়া যায়। মূলত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবিতা শিখাতে "কবিতালেখকের জার্নাল" তিনি লিখেন নাই। বইটি আসলে একজন কবির জার্নাল-ই।
উল্লেখিত গ্রন্থে তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতা, শুদ্ধতম শিল্প হিসেবে কবিতা, বিভিন্ন দশকের কবির শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা, নির্ঝরের লেখালেখির পিছনের স্পিরিচুয়ালিটি এবং একজন পাঠক নির্ঝর নৈঃশব্দকেও পাওয়া যায়।
শিল্প নিয়ে তাঁর দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন কবিতালেখক।
"পরিকল্পনা, প্রতিক্রিয়া কিংবা দায় থেকে আর যা-ই সৃষ্টি হোক, শিল্প সৃষ্টি হয় না।" -পৃষ্ঠা ৮
নির্ঝরের মতে, "কবিতা শুদ্ধতম শিল্প। আর শিল্প কারো কাছে দায়বদ্ধ নয়।" -পৃষ্ঠা ৮
এরকম আরো সারকথা সমৃদ্ধ ১১৪ অনুচ্ছেদ আছে উক্ত বইয়ে। আমি তো শুধুমাত্র অনুচ্ছেদের অংশমাত্র দিচ্ছি এই রিভিউতে।
ভাবালুতা, শুধুমাত্র আবেগ থেকে কথা বলতে মনে হয় নির্ঝর চান না। এই জার্নালে তাকে বেশ কিছু বিষয়ে বেশ অব্জেক্টিভ কথাবার্তা বলতে দেখা গেছে।
" 'সোনার তরী' কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেছিলেন, তিনি এইখানে বর্ষাকালের বর্ণনা ছাড়া আর কিছুই বর্ণনা করেননি। অথচ সাহিত্যের অধ্যাপকরা এই কবিতা নিয়ে ইহকাল আর পরকাল একাকার করে ছেড়েছেন।" পৃষ্ঠা - ১১
কবিতালেখকের জার্নালে এরকম ইনসাইটফুল বেশ কিছু চিন্তা নির্ঝর থেকে পেতে পারেন একজন সচেতন পাঠক। কবিতা কিভাবে লিখা উচিৎ, বা কিভাবে না সেটি লেখক ঠিক করে দেন নি। আবার প্রকারন্তরে দিয়েছেন মনে হয়। তাঁর লেখক হিসেবে মৌলিকত্ব এবং পাঠক হিসেবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে উৎসারিত হয়েছে অনেক দিকনির্দেশনা। তাঁর প্রিয় কবিরা কিরকম শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং কিভাবে ঐসব শব্দের মালিক হয়ে গেছেন তা নির্ঝর সুন্দরভাবে লিখেছেন। আলোচনা করেছেন সমসাময়িক এবং বহু আগের কবিতার জগতের রাজনীতি, প্ল্যাজিয়ারিজম, বিভিন্ন ভ্রান্তি নিয়ে।
"কবিতার ক্ষেত্রে আমার কাছে ছন্দ, ব্যাকরণ এইসব কখনোই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে একজন চিত্রকলার ছাত্র হিশেবেই বলি, আমরা ততোদিন পর্যন্ত বিমূর্ত বা ডিসটর্ট ফর্মের কোনো ছবি আঁকিনি যতোদিন না ওই ফর্মটাকে নিখুঁতভাবে আঁকতে শিখেছি।" - পৃষ্ঠা ১৪
কবিতাকে রাজনীতি, যেকোন মতবাদ, ধর্ম, আদর্শ থেকে মুক্তি দিয়ে প্রকৃত কবিতা হিসেবে দেখতে চান নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। ৮ বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করা এই মানুষটির বিভিন্ন ন্যারেটিভে কথাবার্তা বলার সময় মনে হয়েছে তিনি কবিতাকে একধরণের সাধনা হিসেবেই দেখেন। আবার সেই সাধনা ইমপ্র্যাক্টিক্যাল কিছু না।
"অনেকেই কবিতাকে ওহি বা প্রত্যাদেশটাইপ কিছু মনে করেন যেন কবিতা ধ্যান করে পাওয়ার বিষয়। কিন্তু আমি মনে করি কবিতা ভাত খাওয়া, প্যান্ট পরা, জুতা পরা, দাঁত ঝাড়ু দেয়ার মতোই দৈনন্দিন বিষয়।" - পৃষ্ঠা ২১
অনেক সমসাময়িক কবির একটি কমন প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেছেন কবিতালেখক। অনুচ্ছেদ ৩৬ এ তিনি বলছেন,
"শক্তিমান অগ্রজদের অস্বীকার করে, বা নানাভাবে ছোট করার চেষ্টাচরিত্র চালিয়ে মিডিওকার অনুজরা একটু আলোচিত, সমালোচিত হন, জীবদ্দশায় এটাই তাদের সবচেয়ে বড়ো অর্জন। বেঁচে থাকার জন্য কিছু তো অন্তত লাগবে।"
নির্ঝরের মতে, "ফর্ম ভাঙার আগে ফর্ম বানানোর কৌশল অপরিহার্য।" -পৃষ্ঠা ৪৯
একই পৃষ্ঠায় তিনি বলছেন, "ছবি আঁকা আর কবিতা লেখা প্রায় কাছাকাছি।"
বইয়ের ছত্রে ছত্রে একজন সচেতন পাঠক পাবেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্যকে আরেকজন অধিকতর সচেতন কবিতার পাঠক হিসেবে। আবার তাঁর আর্টিস্টিক টেম্পারমেন্টের দেখাও পেয়ে যাবেন একজন রিডার। কবিতা লিখে কবি যেন একটা ডাইমেনশন পোর্টাল খুলে দেন মার্ভেল কমিক্সের ডক্টর স্ট্রেইঞ্জের মত। যে মাত্রায় প্রবেশ করে এক একজন পাঠকের দেখা মিলবে হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন জগতের। কবিতা থেকে কবিকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তাও আছে আমাদের কবিতালেখকের। সেটি কবিতার শুদ্ধতম শিল্পে পরিণত হওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেই বলেন নির্ঝর।
কবিতাকে অবশ্য নির্ঝর একটা ম্যাটাফিজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখেন মনে হয়। যেভাবে চিন্তা করলে হয়তো কবিতা লেখাটাই হবে না। অবশ্য কথাটা প্রতীকী হতে পারে।
"ছন্দ, ব্যাকরণ এইসব হলো টেকনিক, মানে মিস্ত্রিবিদ্যা। এইসব ইশকুলে শেখা সম্ভব। এবং অতি অল্প সময়েই সম্ভব। কিন্তু কবিতা শেখার কোন ইশকুল নাই। কেউ কাউকে শেখাতে পারেন না। কবি হতে হলে সম্ভব-পৃথিবীর সকল পৃষ্ঠা পড়ে তারপরে একটি শুদ্ধ পৃষ্ঠা লিখতে হয়, যেই পৃষ্ঠা আগে পৃথিবীতে ছিলো না।" -পৃষ্ঠা ৭০
উল্লেখিত অনুচ্ছেদের শেষ তিন লাইন পড়ে কথাটি মনে হলো। নির্ঝর নৈঃশব্দ্য তার ভাষায় 'অচেতনে' আর আমার ভাষায় 'অবচেতনে' তো এই বইয়ে একধরণের মেন্টরের ভূমিকা-ই পালন করে গেছেন। মেন্টরের কাজ তো ধরে ধরে শিখানো নয়। পথ দেখিয়ে দেয়া। যে পথ কবিতালেখক তাঁর জায়গা থেকে বেশ খানিকটা দেখিয়েছেন। মজার বিষয় হল উক্ত বইটি পড়লে শুধুমাত্র কবিতা নয়, গদ্য লিখার গাইডেন্সও খানিকটা পাওয়া যায়।
অবশ্য কবি তাঁর সব কথা মানতেই হবে এরকম কিছু বলেননি। শিল্প নিয়ে আলোচনার সময় তা বলা যায় না। তবে দিকনির্দেশনামূলক এবং গুরুত্বপূর্ণ সারকথায় ভর্তি দারুন এই বইটি আমি বারবার পড়বো। কবিতা যারা পড়েন, লিখেন, ঐ জগতে হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন বা কবিতা লিখতে ভিতর থেকে ক্রমাগত ধাক্কা খান, তাদের অনেকেরই "কবিতালেখকের জার্নাল" বেশ কাজে লাগতে পারে। শেষ করছি অনুচ্ছেদ ৯৫ দিয়ে,
"যারা কবিতাকে পুব থেকে, পশ্চিম থেকে, ছন্দ থেকে, মন্দ থেকে, বন্ধ থেকে, সেই থেকে ইত্যাদি হিজিবিজি থেকে মুক্তি দিতে চান প্রকারান্তে তারাও কবিতাকে শেকল পরাচ্ছেন।
কবিতাকে স্বায়ত্তশাসন দেন। দেখবেন কবিতা নিজেই হয়ে উঠছে। কবিতাকে খানিকটা মাথায় রেখে হৃদয়ের হাতে ছেড়ে দিন, দেখবেন কবিতা আপনিই উদ্ভিদের মতো করে উদ্গত হবে।"
বই রিভিউ
বই : কবিতালেখকের জার্নাল লেখক : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০ দ্বিতীয় সংস্করণ : এপ্রিল ২০২২ প্রকাশনা : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও বিন্যাস : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য জঁরা : কবিতা বিষয়ক মুক্তগদ্যের বই রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
"স্বতঃস্ফূর্ত" শব্দটা একজন কবি এবং একটি কবিতার জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা এই বইটি পড়লে বোঝা যাবে। নতুন লেখক কিংবা তরুণ কবিদের জন্য এইটা একটা দারুণ বই "নির্ঝর নৈঃশব্দ্য" ভাইয়ার। সবারই এই বইটা পড়া উচিত। আর কিছু না হোক কবিতাকে অন্তত গভীরভাবে উপলব্ধি করা যাবে। অন্তত কৈশোরের তাড়াহুড়োয় যারা বই এবং কবিতা প্রকাশের দিকে পা বাড়াচ্ছেন তাদের তো মাস্ট পড়তেই হবে এই বইটি। কবিতা জানার আগেই লিখতে বসলে পরের বাঁধাটাকেও জানতে তো হবেই। লেখক বেশ ঝাঁঝ আবার মাঝে মাঝে খোঁচাও দিয়েছেন এবং আপনি যদি নিজের কবিতার কাছে পরিষ্কার থাকেন সেসব গাঁয়ে লাগবে না। তবে আমরা নিজের কাছেই বা কতটুকুন পরিষ্কার। এটাই ভাবনার বিষয়।
আর লেখকের প্রত্যেকটা উপলব্ধি আমার কাছে অন্তত দারুণ লেগেছে। আমার আপন কিছু ভাবনাও লেখক খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন বইটিতে।
আরো একটা ভালো লাগার বিষয় লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর রবিনাথ আর জীবনদাশকে।