|| মাতৃত্বের স্বরূপ
||
[JANANI – Mothers, Daughters, Motherhood; Ed. By Rinki Bhattacharya, Sage classics, ২০০৬, Rs. 295 ]
আট-সকালে আমি কাজে যাই বলে,প্রত্যহ সাত-সকালে মা আমার ভাত ফুটিয়ে রাখে; আর নিত্য দিন আট-সন্ধ্যেয় ঘরে ফিরি জেনেও, মা, সাত-সন্ধ্যে থেকেই ঘর-বার করতে থাকে! সদা-উৎকণ্ঠিত মা কে মুখ ঝামরেই বলি, ‘আঃ জান, আমি এখন ফিরি, তাও যে কেন অযথা ব্যাস্ত হওয়া, বুঝি না!’ কর্মব্যাস্ত সারা হপ্তা তো বটেই, হপ্তা সারা হলেও, রুটিনে বাঁধা অবকাশের দিনও মা কে ছুটি দেই না! হাজারো কাজে, আর শতেক বাহানায়-আব্দারে, এমনকি গোটা দশেক অকাজেও মা কে ডেকে ডেকে সারা হই! মা তাতে বিরক্ত যদিও বা হয়, তবু তার সারা রাগ ওই “জ্বলাস নে আর, পারি না!”, এর বেশী কড়া শব্দে ফোটে না! দুনিয়ার সব মায়েরা কি এমনি হয়!
“মা!” - যে কোন ভাষায়, এই এক অক্ষরের শব্দটিই বোধকরি একইসাথে সবচেয়ে সহজ ও গুরুভার শব্দ! এটি সহজ কারন এটি শিশু-মুখের প্রথম ও অনায়াস শব্দ, আবার এটি বিষম ভারীও, কারন, মা, শব্দটি একই সাথে আবেগ, বিশ্বাস এবং বিশুদ্ধতার অনন্য প্রতীক! মা, এবং মাতৃত্ব শব্দটি আর শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদন সংক্রান্ত জৈবিক ধর্মকে দ্যোতিত করে না, বরং এটি আমাদের সামনে একটি বিশেষ রকমের আদর্শ, নিষ্ঠা, ত্যাগ ও দায়িত্বের ছবি তুলে ধরে। এই একই কারনে, কন্যা ও জায়া অপেক্ষা ‘মা' বিশেষ্য বা বিশেষনটি এক লহমায় নারীকে এক পৃথক পরিচয়ে উন্নীত করে। তাছাড়া, কেবল এই তো নয়! ‘মা’ শব্দটির সাথে যে তীব্র আবেগ জড়িয়ে আছে, তা বহুকাল হল, ব্যাক্তিগত ক্ষুদ্র পরিসরকে ছাপিয়ে, অতিক্রম করে, ব্যাপক ভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে, এবং জাতীয় এবং জাতীয়তাবাদের নামে এক সমষ্টিগত আবেগে পরিনত হয়েছে!
কিন্তু, এখানে বৃহত্তর পরিসর নয়, আমরা বিবেচনা করতে চাই ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র পরিসরটি কে। তবে, সন্দেহ নেই যে বেশ কতকগুলি ক্ষুদ্র পরিসরের সমষ্টিগত বিবরন একটি বৃহৎ পরিসরেরও আভাস তুলে ধরতে সক্ষম! ‘জননী’ - বইটি একটি সংকলন যেখানে উনিশ জন প্রথিতযশা নারীর কেউ স্মরণ করেছেন তাদের আপন মায়েদের, কেউ আলোচনা করেছেন তাদের নিজেদের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে, আর কেউ বলেছেন তাদের সাথে তাদের কন্যেদের সম্পর্কের কথা! তাদের আলোচনা থেকে ‘মা’ এবং ‘মাতৃত্ব’, উভয় শব্দদুটির মানে যেভাবে উঠে আসে, তা বৌদ্ধিক পাঠক কে সাহায্য করে নারীকে তার স্বতন্ত্র রূপে চিনে নিতে।
বইয়ের প্রথম পর্যায়ে ভারতী রয়, মৈত্রেয়ী চ্যাটার্জী, সি এস লক্সমী, নীলা ভাগবত, রোশন সাহানী, উর্মিলা পাওয়ার, টুটুন মুখার্জী এবং মৈথিলী রাও স্মরণ করেছেন তাদের মায়েদের এবং সেই সঙ্গে তাদের ছেলেবেলাটিকেও। ভারতী দেবী এবং মৈত্রেয়ী চ্যাটার্জী যেমন তাদের মায়ের বর্ননা দিয়েছেন, তার সাথে আমরা বেশীর ভাগ বাঙালী পাঠকরাই নিজেদের মায়ের মিল খুঁজে পাব, যেখানে মা সমস্ত সংসার, ছেলে-মেয়ে, শ্বাশুড়ী ও বিধবা ননদ কে সামলেও হাসিমুখে অতিথি সৎকার করছেন! স্বল্প সঙ্গতির মধ্যেও চেষ্টা করছেন সংসার কে সাজিয়ে রাখতে এবং তারা সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন যাতে তাদের সন্তানেরা উপযুক্ত শিক্ষা পায়। এতদ স্বত্বেও কিন্তু লেখিকারা তাদের পরিনত বয়েসে এসে উপলব্ধি করেছেন যে তাদের মায়েরা কোথাও অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছেন কারন তারা নিজেদের জন্য কোন আলাদা পরিসর রাখেননি! তাদের নিশ্চিত ভাবে অনেক গুন ছিল, কিন্তু সংসারের দাবীতে, সন্তানের চাহিদায়, তাদের নিজের দিকে নজর দেওয়ার সময় হয়নি। সি এস লক্সমীর মা সেদিক থেকে সামান্য স্বতন্ত্র, কারন সংসারের সমস্ত ঝক্কি সামলেও তিনি সঙ্গীতের প্রতি তার ভালবাসা কিছু পরিমান টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। মায়েদের উপর সংসার এবং সমাজের এত দাবীর ফলশ্রুতি হিসাবে, দলিত সমাজ থেকে উঠে আসা উর্মিলা পাওয়ারের মা, ব্যথিত মনে বলেছেন যে মাতৃত্ব হল একটা ভারী ক্রুশকাঠের মত! তাকে বয়ে নিয়ে চলতে হয়।
বইয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ে এই গুরুতর প্রশ্নটিই উঠে আসে ধিরুবেন পটেল, কমলা দাস, প্রতিভা রান্ডে, নবনীতা দেব সেন, শশী দেশপান্ডে ও দীপা ঘালটের লেখায়। এর মধ্যে শেষোক্ত তিনজনের লেখা একটা মস্ত বড় প্রাপ্তি। নবনীতা, তার দুই কন্যে অন্তরা ও নন্দনার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে নিজেও সংঘর্ষ করতে থাকেন, তার নিজের পড়াশোনা, সাহিত্য কর্ম নিয়ে। মাতৃত্ব, তার কন্যাদের প্রতি তার অসীম ভালবাসা স্বত্বেও কোথাও তার পেয়ে শৃঙ্খল হয়ে জড়িয়ে যায়। এমনি ভাবেই, শশী দেশপান্ডে নিরন্তর প্রশ্ন করেন মাতৃত্ব নিয়ে আমাদের কল্পনামথিত ধারনা আর তার বাস্তব অভিজ্ঞতা কে! তিনি জিজ্ঞেস করেন যে মাতৃত্ব বোধ কি সত্যি সহজাত? মায়েদের সন্তান স্নেহ কি সত্যিই শর্তবিহীন এবং পক্ষপাত বিহীন? সমাজ যেভাবে নারীর কাছে মাতৃত্বের গৌরবের ছলে, তার নিজেস্ব পরিচয়, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, যৌনতাবোধ ইত্যাদি বিসর্জনের দাবী তোলে, তা কি হাস্যকর এবং ভয়ংকর নয়? দীপা ঘালট আর একটু এগিয়ে একটি মহার্ঘ প্রশ্ন করছেন যে নারীর পূর্নতা মাতৃত্বে, এরকম ধারনার সত্যি কি কোন কারন আছে? নারী কি নিজেতেই স্বতন্ত্র নয়? তার পরিশ্রম, সৃষ্টি, চর্চাই কি যথেষ্ট নয় তাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যে? কেন তাকে সন্তান ধারন করতেই হবে? মানুষ হিসাবে, নারী কি স্বাধীন নয়?
এই প্রশ্নমালা নিয়েই, বইয়ের তৃতীয় অংশে জোৎস্না কামাল, মল্লিকা সারাভাই, রেখা রোধাদিত্য, নিতা রামাইয়া এবং অন্বেষা আরিয়া লিখেছেন তাদের কন্যেদের কথা। এদের মধ্যে অন্বেষা আরিয়ার লেখাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ন কারন তিনি গর্ভপাত ও তৎসংক্রান্ত গোপনীয়তা, এবং অপরাধবোধের কথা আলোচনা করেছেন।
সামগ্রিক ভাবে এই বইয়ে নারীর পরিচয় নিয়ে একটি গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বইয়ের ভুমিকায় ডঃ যশোধারা বাগচী যেমনটা বলেন, নারীর মাতৃত্ব ও তার সন্তান ধরন প্রক্রিয়াটিকে এক মহান, উজ্জ্বল, আদর্শবাদে পরিনত করে তোলা আসলে সত্যি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ভাবনাজাত ফসল। আসলে, নারীর উপর পুরুষের অধিকারকে অধিকতর পোক্ত করতেই কি মাতৃত্বের নামে এত গল্প গাঁথা, চিত্র, উদাহরন পেশ করা হয়নি? কেবল মাতৃত্বই নিজ গুনেই যদি এত অসাধারণ হয়, তবে সমাজ কুমারী ও একক-মায়েদের প্রতি এত নির্মম কেন? কেন মাতৃত্বের কারন হিসেবে একজন স্বামী বা একটি পুরুষের উপস্থিতিকে সমাজ এত গুরুত্ব দেয়? এখানেই কি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের রাজনীতিটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে না? আসলে কি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ একক, স্বাধীনচেতা, অবিবাহিত বা স্বচ্ছায় সন্তান না ধরন করা নারীকে ভয় পায়?
এই উপোরোক্ত প্রশ্ন গুলি থেকে এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে কেন বইটিতে আলোচনাকারীরা সকলেই নারী? কারন, নারীর চোখে মাতৃত্ব আর পুরুষের চোখে মাতৃত্ব এক জিনিষ নয়! এই বইটি নারীদের লেখায় সংপৃক্ত বলেই এত গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। অপরপক্ষে, পুরুষেদের লেখা হলে, মাতৃত্ব কেবলই এক গৌরবময় ত্যাগ, আদর্শ, নিষ্ঠা, স্নেহ ইত্যাদি মহান ভাবনায় আপ্লুত হয়ে পড়ে! পুরুষ তার স্ত্রীর ভেতর, কন্যার ভেতর মা কে খোঁজে, দেশের ও জাতীয়তাবোধের জিগির উঠলেই মা মা বলে হুংকার দেয়, এমন কি, সে দেবতার মধ্যেও মা এর বরাভয়, আশ্বাস চায়, কিন্তু, সে ফিরেও মাতৃত্বের আড়ালে চাপা পড়া নারীর ইচ্ছে-অনিচ্ছের কথা ভাবে না! এজন্যেই নিশ্চিত ভাবে, উন্মুখ নারী-পুরুষ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের উচিত মাতৃত্ব নামক সংজ্ঞাটি নির্ধারন করার আগে, একবার চিন্তাশীল হয়ে আত্মসমালোচনা করা এবং মাতৃত্বের নামে নারীর কাঁধে ত্যাগ, আদর্শ, নিষ্ঠা, স্নেহ ইত্যাদির বিষম জোয়াল না চাপিয়ে দেওয়া। সমাজের উচিত, নারীকে এই আশ্বাস ও আত্মবিশ্বাস যোগান যে, নারীর পূর্নতার জন্য মাতৃত্ব কখনোই আবশ্যিক নয়।
জননী সংকলনটি আসলে একাধারে মনোরম ��্মৃতিচারন এবং আমাদের আত্মসমীক্ষন। পাঠকেরও কাছে এই উনিশজন লেখিকার আত্মস্মৃতি-আলোচনা যেমন এক প্রাপ্তি, তেমনি তাদের তোলা প্রশ্নগুলিও হয়ে ওঠে চলে আসা ভাবনার উপরে এক একটি নির্মম কশাঘাত। এ বই পড়ে, বৌদ্ধিক পাঠক শেষমেশ ভেবে দেখতে বাধ্য হয় যে মায়েরা একেকজন আসলে একজন স্বতন্ত্র নারীও! তার ভাবনা-চিন্তা, চর্চা, অনুশীলনের জন্যে তাকেও একটি স্বতন্ত্র পরিসর দেওয়া সন্তানের ও সমাজের কর্তব্য। নচেৎ, নারী ও মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে আমাদের মস্ত বড় ফাঁকি থেকে যায়।