বাঁ-হাতের কবজির উপর ছুরিটা বসালো তানিয়া। ঘুম আসছে খুব। এতো ঘুম তার চোখে ছিল! কোথায় ছিল? ডান হাত দিয়ে ছুরিটা ধরে আছে। সেটা ধীরে ধীরে টেনে দিচ্ছে কবজির উপরের নরম চামড়ার উপর। সরু রেখার মতো একটা দাগ হয়েছে। সেই দাগ বেয়ে লাল রক্তের রেখা দেখা যাচ্ছে।
Shariful Hasan hails from Mymensingh, Bangladesh. He has spent his childhood by the banks of Brahmaputra river. He completed his Masters in Sociology from University of Dhaka and is currently working in a renowned private organization.
Shariful's first novel was published on 2012 titled Sambhala. With two other books, this captivating fantasy trilogy has received widespread acclimation both within and beyond the borders of Bangladesh. The Sambhala Trilogy was translated in English and published from India.
Although his inception consisted of fantasy and thriller, he has later worked on a variety of other genres. These works have been received fondly by the Bangladeshi reader community. Lot of his works have also been published from different publications in West Bengal.
Award- Kali O Kalam Puroshkar 2016 for 'অদ্ভুতুড়ে বইঘর'
এই বই পড়া মানেই নিজেকে সেঁধে বিষন্নতার সাগরে নিমজ্জিত করা। লেখক মশাই গল্পের প্রথম থেকেই আপনাকে বিষন্নতায় ডুবিয়ে রাখবে।আর তা একদম শেষ পর্যন্ত। প্রতিনিয়ত গল্পের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়েছিলাম আর থম মেরে বসে ছিলাম। এক ধরনের মুগ্ধতায় আর বিষন্নতায়। 'বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ' র পর আবারো লেখক হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আর ঠিক এ কারণেই এতো ছোট্ট একটা বই এতো চড়া দাম দিয়ে কিনতেও কার্পণ্যবোধ করি না। গল্প নিয়ে যাই বলি না কেন সবকিছুই স্পয়লার হয়ে যাবে। তাই এদিক থেকে বিরতি নিলাম।
দুইটা ব্যাপারে একটু অসঙ্গতি দেখেছি। প্রথমতঃ ৪১ পৃষ্ঠায় জানানো হয়, রোকসানা তানিয়ার ল্যাপটপ ও ফেসবুকের পাসওয়ার্ড জানে না । কিন্তু পরবর্তীতে ৮১ পৃষ্ঠায় দেখা যায়, রোকসানা পাসওয়ার্ড জানে। দ্বিতীয়ত, ১২৬ ও ১৩৭ পৃষ্ঠাতে রোকসানা তানিয়া হয়ে গেছে। এছাড়া দু একটা বানান ভুল ছাড়া কোন কিছু চোখে পড়েনি। আর পড়লেও এগুলো আমার জন্য এফেক্ট পড়ে না। আমি শরিফুলে আর গল্পে রীতিমত মুগ্ধ ছিলাম। ভবিষ্যতেও আরো এরকম উপহারে মুগ্ধ হবো সে বিশ্বাসও রাখি।
❝ গল্পের এক প্রধান চরিত্রের অন্তর্ধানে গল্পটাই পালটে গেছে। এখনকার গল্পটা ধূসর, লক্ষ্য আর উদ্দেশ্যহীণ।❞
মাঝে মাঝে কোন বই পড়ে বিষন্নতা এসে ভর করে, শরীফুল হাসানের ❝অচিন পাখি❞ ঠিক এরকমই একটা বই।গল্পের শুরু এক সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুনী, তানিয়ার, আত্মহত্যার মাধ্যমে - দরজা বন্ধ করে এক রাতে সে আত্মহত্যা করে। সমাজের চোখে তথাকথিত ব্রোকেন ফ্যামিলি-র মেয়ে সে, সবাই ভাবে হয়তঃ এরকারনেই বিষন্নতায় পড়ে সে আত্মহত্যা করে, অথবা প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপার আছে। পুরো ঘটনাটি ছিল ক্লু-লেস, না ছিল কোন মোটিভ, না কোন সুইসাইড নোট। বাড়ির একমাত্র মেয়ের মৃত্যু শুধু কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল আপনজনদের। সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল, মৃতের মোবাইল ফোন মিসিং।
ধীরে ধীরে রহস্যের জাল খুলতে শুরু করে, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ঘুমের ওষুধ খেয়ে হাত কেটে আত্মহত্যার মতো খুব সাধারণ কেস- কেন তা খোচা দেয় ইন্সপেক্টর ফিরোজকে? কেনই বা মেয়ের কললিস্টে অনেকবার করে থাকে তার হবু সৎবাবার নাম্বার? মেয়েটির কি কারো সাথে গোপন সম্পর্ক ছিল, নাকি সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু? ঠিক কি কারনে আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ একটা মেয়ে আত্মহত্যা করে ফেলল? - সব বুঝতে হলে একটানে পড়ে ফেলতে হবে এই ১৬০ পাতার ছোট্ট ক্রাইম থ্রিলার- অচীন পাখির সন্ধান কি খুঁজে পাওয়া যাবে?
পুরো বইয়ের প্লট- টুইস্টগুলো অসাধারণ। বইটি শেষ করার পর মনে হবে- এইরকম ঘটনা যেকারো সাথেই ঘটতে পারে এই বিষন্ন যান্ত্রিক শহরে! যদিও গতানুগতিক ক্রাইম থ্রিলারের মতো না, লেখক নিজে থেকে বলে গিয়েছেন পুরো গল্পটা। শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বোঝা যাবে না আসলে কি হবে! বইটির রেশ মনে থেকে যাবে দীর্ঘসময় পর্যন্ত।
তবে ইন্সপেক্টর ফিরোজ ও আয়ান চরিত্র দুইটিকে একটু দুর্বল মনে হয়েছে, তাদের আরেকটু সময় নিয়ে তৈরি করলে আরো ভালো লাগত,কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে পড়ার সময়। আর দুই-একটি জায়গায় তানিয়া-রোকসানা নাম নিয়ে একটু প্যাঁচ লেগেছে। সব মিলিয়ে দশে নয় দেয়ার মতো। লেখকের জন্য শুভকামনা।
অন্যধারা থেকে প্রকাশিত শরীফুল হাসান ভাইয়ার এবারের বই অচিন পাখি। ভাইয়ার আগের বইগুলোর তুলনায় এটায় ভিন্নতা অনেক। কিছুটা নতুন ধাঁচে এবারে গল্প বলার চেষ্টা করেছেন ভাইয়া এবং সফলও হয়েছেন। লিটারেরি ফিকশন ধাঁচের সাথে কিছুটা রহস্যোপন্যাসের স্বাদও পাওয়া যাবে। তানিয়ার নামের এক উনিশ বছর বয়সী তরুণীর আত্মহত্যা দিয়ে বইয়ের শুরু৷ এরপর পটভূমিতে আসতে থাকে এক এক করে গল্পের অন্য কুশীলবরা। প্রতিটা অধ্যায় ভিন্ন একজনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্ণনা করায় পাঠের আনন্দ বেড়ে গেছে বহুগুণে। শরীফ ভাই আমাদের এরকম আরো উপন্যাস উপহার দিয়ে যাবেন, সেই কামনা থাকছে।
কদিন আগে ইনস্টাগ্রামের কোনো একটি কবিতার পেজে একটি লাইন পড়েছিলাম, "পাখিদেরও কি মন খারাপ হয়?" আসলেই তো, পাখিদের কি কখনো মন খারাপ বা মন ভালো থাকে? অচিনপাখি বইটি পড়ার পর কেনো যেনো এই লাইনটি আবার মনে পড়ে গেলো, পাখিদেরও কি মন খারাপ হয়!? জানি না, জানার হয়তো উপায়ও নেই।
বর্তমানে যে কজন লেখকদের বই নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধায় থাকি না, তাদের মধ্যে একজন হলেন শরীফুল হাসান। তার লেখনশৈলী এবং গল্পের দারুন ভক্ত আমি। বইটির রিভিউ কি লিখবো সেটি নিয়ে অনেকক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার পর শেষে এই সিদ্ধান্তে এলাম যে, বইটি পড়ে নিজের অনুভূতিটিই নাহয় শুধু ব্যক্ত করি! কেনো যেনো রিভিউ লিখবো বলে কলম হাতে তুলে নিলে শব্দ ঠিকঠাক খুঁজে পাচ্ছি না।
বইটি বিষন্ন এবং মন খারাপ করে দেওয়া। কয়েকটি পেজ পড়ি আর থম মেরে কিছুক্ষন বসে থাকি, চিন্তা করি এটা কেনো হলো? অদ্ভুত বিষন্নতায় ভর্তি প্রতিটি পাতা, প্রতিটি শব্দ। তবে এই বিষন্নতার গল্প মেকি নয়, কিংবা বানোয়াট কিছু নয়। তথাকথিত এই যান্ত্রিক শহরে হয়তো হরহামেশা ঘটে থাকে এমন সব মন খারাপ করে দেওয়া ঘটনা।
তানিয়া, ব্রোকেন ফ্যামিলির এক কিশোরী যার জীবন বিষন্ন হবে এটাই হয়তো স্বাভাবিক। বাবা মাকে একত্রিত করার চিন্তা ছোটবেলায় মাথায় এলেও বড় হতে হতে কখন যেনো বুঝে নিল, এটা সম্ভব না। তার জীবনে আরো আছে আয়ান নামে চমৎকার এক যুবক। যার আগমনে যেনো রং ফিরে পেলো তার ফ্যাকাশে হয়ে আসা জীবন। কিন্তু একদিন হুট করে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। তার বাবা মায়ের জীবনে নেমে আসে গভীর বিষাদ। কেনো এমন একটি পদক্ষেপ নিল তাদের মেয়ে? এরপর থানা পুলিশ হলো, রহস্যের জট খুলতে লাগলো। লেখক তার ভাষায় গল্প এগিয়ে নিতে থাকলেন।
বইটিতে আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে দারুন লেগেছে, তা হলো বইয়ের চরিত্রগুলোকে লেখক যেভাবে তুলে ধরেছেন। একেকজন চরিত্রের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাখ্যা, অঙ্গভঙ্গি, শারীরিক অবয়বের বৈশিষ্ট্য, মনোভাব এসবকিছু চরিত্রগুলোকে আরো বেশি জীবন্ত করে তুলে। যদিও শেষ টুইস্টটা বইয়ের অর্ধেক পড়েই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম, কিন্তু তাতে বইটি উপভোগে ভাটা পড়েনি একটুকুও।
বইটিতে বেশ কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। আর কয়েক জায়গায় তানিয়া-রোখসানা একটু ওলোট পালোট হয়ে গেছে। এই ভুলগুলো পরের মুদ্রণে ঠিক করে নেয়া হবে বলে আশা করছি।
চল্লিশার্ধো রোকসানা। বিবাহবিচ্ছেদের পর মেয়ে তানিয়াকে নিয়েই তার জগৎ। বইয়ের শুরুটা আঠারো বছর বয়সী তানিয়ার আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। বাবা মায়ের বিচ্ছেদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে বছর দশ��ক হতে চললো। তবু কোন অজানা কষ্ট জমিয়ে রেখে শান্ত প্রকৃতির মেয়েটা নিজের জীবনটা শেষ করে দিলো সেই রহস্য নিয়েই এই বই। দৃশ্যপটে একে একে হাজির হয় তানিয়ার মা, বাবা, তাদের ইতিহাস ও বর্তমান, তানিয়ার জীবনের অদেখা কিছু সত্য।
জীবনটা কতো অল্পতেই এলোমেলো হয়ে যায়। কতো ছোট ছোট কারণে, সামান্য ভুল সিদ্ধান্তে তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যায় সাজানো গোছানো ভবিষ্যতের হাতছানি, কত অল্পতেই দুঃসহ হয়ে ওঠে বর্তমানটা। ভালো থাকার অভিনয় করে আশেপাশের সবার থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখাটা স্বাভাবিক হয়ে যায় ধীরে ধীরে। কিন্তু সমস্যা শেষ তাতেও হয় না। সবকিছুর গুরুত্ব শেষ হয়ে আসে এক পর্যায়ে, শুধু বাকি থাকে একটাই মাত্র কাজ। অচিন পাখিতে মানুষের এই অসহায়ত্বটাই ফুটে উঠেছে নির্মমভাবে।
শরীফুল হাসান চমৎকার একজন লেখক। লেখনী দিয়ে পাঠককে ধরে রাখতে পারেন শেষ পর্যন্ত। আবার সুন্দর চরিত্রায়ন দিয়ে বইয়ের রেশটাও রেখে দিতে পারেন লম্বা সময় ধরে। অচিন পাখি যতটা না সামাজিক, ঠিক ততটাই ছিলো থ্রিলার। তানিয়ার মৃত্যুরহস্য উন্মোচনের যতটা অপেক্ষা করছিলাম, ঠিক ততটাই উপভোগ করছিলাম চরিত্রগুলোকে একটু একটু করে চিনতে। উপভোগ শব্দটা হয়তো এখানে পুরোপুরি সঠিক না। যতটাই গল্পের ভেতরে ঢুকছিলাম অসহায়ত্বের অনুভূতিটা গ্রাস করছিলো ততটাই। বইটা শেষ করতে বেশি সময় লাগেনি, তবে এর রেশ থাকবে বহুদিন।
বইটা শেষ,কিন্তু বইটা থেকে বেরোতে পারবো কীনা জানা নেই। কেনো, সেটার উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে না।
১৭.০২.২০২৩ গতকাল বইটা শেষ করে এতোটাই আচ্ছন্ন ছিলাম যে, অনুভূতিগুলো যে লিখবো সেটারও উপায় ছিলোনা। ভোঁতা অনুভুতি লেখা যায়না। বইটা এমনভাবেই মনে জায়গা করে নিয়েছে যে, রাতে আরেকটা বই নিয়েও আমি তাতে মনোযোগ বসাতে পারিনি। বারবার আমাকে তানিয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। । গল্পটা কিন্তু খুব সাধারণ। একটা আত্মহত্যা। নাকি হত্যা? এটা নিয়েই শুরু। আমি একসময় খুব আগ্রহ নিয়ে ট্রু ক্রাইম স্টোরি দেখতাম। কিন্তু এটা সেসব থেকে শেখার বদলে প্যারানয়েড হয়ে যেতাম বলে দেখা বন্ধ করে দেই। অনেকদিন পর সেই অনুভূতিগুলো ফিরে এসেছে। কেনো সেটা বললে গল্পের বড়সড় স্পয়লার হয়ে যায়। তাই ওটা থাক। লেখা নিয়ে বলি। রহস্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে লেখকের জুড়ি নেই।এই জন্যই লেখকের বইগুলো আমি এক বসাতেই পড়ার ইচ্ছে রাখি। এটার বেলাতে সেটা সম্ভবও হলে। তবে শেষটাই যেনো কী নেই। আঙুল বসানো যায়না, শুধু মনে হয় কিছু একটা নেই। হয়তো শেষটা একটু নাটকীয় হয়ে গিয়েছিলো একারণেই। কিংবা আমি সুখসুখ কিছু চাচ্ছিলাম। তবে একদিক থেকে সুখেরই ধরে নেই। অন্যজগতে তারা সবাই সুখে আছে।
বই পড়ে আপনার একটা কথাই মনে হবে,এ যুগে এটা সম্ভব। তাই এটাকে সমসাময়িক উপন্যাস বলা যাক।
এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো বই। শেষ পরিণতিটা ভালো ছিল, অপরাধীর শাস্তি না হলে খুব খারাপ লাগতো। শরীফুল হাসানের গল্প বলার স্টাইল বরাবরই আকর্ষণীয়। তবে কয়েক জায়গায় গল্পের অসংগতি আছে, তানিয়া রোকসানা গুলিয়ে গেছে, টাকার পরিমাণ উলোটপালোট আছে। আয়ান এবং ফিরোজ হাসান চরিত্র দুইটি একদম ই দূর্বল লেগেছে। যে পুলিশের প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল, সে এতো বড় ক্লু মিস করেছে, একটু অস্বাভাবিক।
তারপরও, পড়ে ভালো লাগার মতো একটা বই। পড়া শেষে মন বিষন্ন হয়ে পরে। কিছু কিছু জায়গায় চোখের জল ধরে রাখতে পারি নি। আসিফ হকের জন্যও ভীষণ কস্ট পেয়েছি। ছেলে মেয়েদের আরও কতটা সাবধানে রাখা উচিত, সেই বিষয়েও মনে ভয় তৈরি হয়। তানিয়ার মতো বাচ্চাদের জন্য মন টা হু হু করে ওঠে।
আমাদের চারপাশের মানুষের জীবনে কত কিছু ঘটছে। ভেতরে ভেতরে কত যুদ্ধ করছে তারা। আমরা কিছুই জানি না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে কারো মুখ দেখে হয়তো খানিকটা আন্দাজ করতে পারি যে, মানুষটা হয়তো ভালো নেই। কিন্তু ভয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করি না। কে জানে, হয়তো এখনই নিজের দুঃখের পেটরা খুলে বসবে। কারো দুঃখ গাঁথা শোনার এতো সময় কই! এর চেয়ে ভালো সবাই নিজের মতো থাকুক। তারপর হুট করে একদিন খবর পাওয়া যায় যে, একটা পরিচিত মুখ চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিজেকে সে কালের গর্ভে ভাসিয়ে দিয়েছে। আমরা আহা উহু করি, বুঝতে পারি না কোন দুঃখে সে এমন করেছে। তার দুঃখ গাঁথা শোনার জন্য আমরা তখন মরিয়া হয়ে উঠি। কিন্তু কেউ ফিরে এসে বলে না, "আমার না খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি মরে যাচ্ছি। আমাকে একটু বাঁচাতে পারবে?"
"অচিন পাখি" বইটা শেষ করার পর মাথার মধ্যে এই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিলো। বইটার প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত মন খারাপ নিয়ে পড়েছি। তানিয়ার জন্য খুব কষ্ট লাগছিলো। আমাদের চারপাশে এতো এতো হাসিমুখের কোনটা আসল আর কোনটা নকল আমরা বুঝতে পারি না। হয়তোবা বোঝার চেষ্টাও করি না। অনেকে আপন মানুষগুলোর কাছেও তীব্র কষ্টে ভেতরটা প্রকাশ করার মতো বিশ্বস্ততা পায় না। কেউ কারো ভেতরের কথা না শোনা পর্যন্ত বুঝতে পারে না। হয়তো খানিকটা আন্দাজ করতে পারে যে কিছু ঠিক নেই। কিন্তু কেউ এসে আমাকে নির্ভয়ে যেন বলতে পারে "আমি ঠিক নেই" এই জায়গাটুকু তো আমরা রাখতে পারি।
গল্পটা কিন্তু খুব সাধারণ। একটা আত্নহত্যা দিয়ে শুরু। তানিয়া ও তার আশেপাশে মানুষের আঙ্গিক থেকে গল্পটা বলা হয়েছে। রহস্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে লেখকের জুড়ি নেই। এর আগে লেখকের যে বইগুলো পড়েছি তার থেকে কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের এই লেখাটা। কিন্তু তিনি বেশ ভালোভাবেই লিখেছেন। এক বসায় বইটা শেষ করি। তবে শেষটা একটু নাটকীয়ভাবে করা হয়। কেনো যেন শেষটায় কি নেই এমন একটা ভাব আসছিলো। এটাকে আমি সমসাময়িক উপন্যাস বলবো। আপনি পড়ার সময়ই বলবেন যে, "আরে এইসব ঘটনা তো সমাজ প্রায়ই ঘটে"।
এই বই পড়ার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত ভোঁতা একটা অনুভূতি হচ্ছিলো। বারবার তানিয়ার কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাই হয়তো লেখাটাও বেশ অগোছালো হয়েছে। আসলে যেসব বই পড়ে মন বিষাদগ্রস্ত হয়ে যায় তা নিয়ে আমি খুব গুছিয়ে কিছু লিখতে পারি না।
কিছু বইয়ে আউল্ফাউল কিছু আচরণ দেখা যায়। কারণ বা যুক্তি ছাড়া চরিত্রগুলো উল্টাপাল্টা আচরণ শুরু করে। কাহিনির ভিতরে চলে আসে আধ্যাত্মিকতা। কাহিনী বাস্তবের সাথে মিলে না। এই বইটা এইসব ফাউল জিনিসের বাইরে।
┃এই বইয়ের আসলে কোন গল্পই নেই। সাধারণ সাদামাটা একটা গল্প। এই গল্পটাকে এতটা মাধুর্য দেওয়া হয়েছে যে গল্পটা মন ছুঁয়ে গেছে┃
⬛এই বইয়ের মূল শিক্ষা হলো, একটা ছোট ঘটনার বিস্তৃতি কতদূর পর্যন্ত এগোতে পারে তা পর্যবেক্ষণ করা। আমরা বুঝতে না পারলেও জীবন যে কোন সময় যেকোনো দিক দিয়ে বদলে যেতে পারে। একটা ছোট্টো সিদ্ধান্ত-ই বদলে দিতে পারে জীবনকে। ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয়ভাবেই বদলাতে পারে।
🟥বইয়ের একটা নেগেটিভ দিকের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, বইয���ের দাম অনেক বেশি। একজন সাধারন স্টুডেন্টের পক্ষে এতো দাম দিয়ে বইগুলো কেনা প্রায় অসম্ভব।
গল্পটা আত্মহত্যার নাকি বিষন্নতার? গল্প শুরু হয় একটি আত্মহত্যা দিয়ে। এরপর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্প বিষন্নতার সাগরে ডুব দিয়েছে। বই শেষ করে এই বিষন্নতার মাঝ থেকে উঠে আসা বেশ কষ্টের।
'অচিন পাখি' বইয়ের গল্প খুবই বাস্তবিক। এমন গল্পের নমুনা বাংলাদেশে খুব একটা অবাস্তব কিছু না। একদম সরাসরি না হলেও, এমন ঘটনা এদেশে একসময় ঘটেছে এবং ঘটছেও। হালকা রহস্যোপন্যাস ধাঁচের বইটির সবথেকে দুর্দান্ত বিষয় বর্ণনা। লেখক এই বর্ণনা দিয়েছেন বইয়ের বিভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশে সাধারণত এভাবে গল্প বলার রীতি খুবই কম পরিচিত। লেখক হয়ত এদিকে কিছুটা ভিন্নতা আনতে চেয়েছেন। এবং আমার মতে তিনি শতভাগ সফল। কারণ বিভিন্ন চরিত্রের নিজস্ব বয়ানের জন্য, গল্প পড়ার আনন্দও বেড়ে গেছে। বইয়ের কয়েক জায়গা ছোটখাটো প্লটহোল থেকে গেছে। কয়েক জায়গাতে বানান ভুল ছিল। তবে এসব ভুল বই পড়ার গতিকে কমিয়ে দেয়নি।
'অচিন পাখি' দিয়ে শরিফুল হাসান আবার মুগ্ধ করলেন। আশা করি মুগ্ধতার যাত্রা চলবে। লেখকের জন্য শুভকামনা।
গল্প কিছুটা ক্লিশে। কিন্তু বর্ণনারীতি শরীফুল হাসানের বরাবরের মতোই সুন্দর। ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা। কিন্তু প্রায় প্রতিটা অধ্যায়ই একই ধাঁচে শুরু, একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে বারবার। একটু বিরক্তি ধরে আসে তখন। শরীফুল হাসান স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ি below par লেগেছে।
Rating: 7/10.
৩ তারকা দিতে গিয়ে মনে হলো, এই বই আর যাইহোক আমার রিডার ব্লক কাটাতে সাহায্য করেছে। বইটা দ্রুত পড়ে শেষ করতে পেরেছি, তাই ৪ তারকা।
কখনো কি ইচ্ছে করে হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে? ইচ্ছে করে বিশাল এই আকাশ জুড়ে রাজত্ব করতে? নতুন দিগন্তে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার ইচ্ছে করতেই পারে। যেখানে মানুষ স্বাধীন। পরাধীনতার নামগন্ধ নেই। শিকলে বাঁধা থাকতে কেউ চায় না। মুক্ত হওয়ার এই নেশায় মানুষ হতে চায় পাখির মতো। কিন্তু একটাই অভাব.... মেলে ধরার মতো ডানা যে নেই।
স্বাধীনতা হয়তো ভালো। কিন্তু কখনো কখনো তার চেয়েও ক্ষতির কারণ হতে পারে। তানিয়া মেয়েটা জীবনে অনেক উত্থান পতন দেখেছে। দেখেছে বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া। যদিও মায়ের সাথে বসবাস, তবুও বাবার সাথে ঠিকই যোগাযোগ আছে। কলেজ পড়ুয়া একটা মেয়ের জন্য বাবা-মায়ের আলাদা হয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। মুখ বুজে সব সহ্য করা মেয়েটার হাসিখুশি মুখ দেখলে বোঝার উপায় নেই, তার ভেতরের অভ্যন্তরে কী চলছে। তবুও একদিন ভোর এলো অন্ধকার নিয়ে। থেমে গেল সব আয়োজন। ছুরির ধারালো ফলা গেঁথে বসছে হাতের শিরা উপশিরায়। র ক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আর, দু'চোখে নেমে আসছে রাজ্যের অন্ধকার। কী দুঃখে এমন পরিণতি তানিয়ার? প্রেমঘটিত সমস্যা? বাবা-মায়ের এমন পরিণতি মেনে নিতে না পেরে? না কি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে?
রোকসানা তানিয়ার মা। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর থেকে একাই জীবনযাপন করছে। সঙ্গে মেয়ে তানিয়া। এত বছর পরও মাঝেমাঝে মনে হয়, প্রাক্তন স্বামীকে এখনো প্রচণ্ড ভালোবাসে সে। সেদিন আসলে ভুল কার ছিল? অন্য মেয়েদের মতো মেনে নিলে হয়তো এই দিন দেখতে হতো না। তার পুরো পৃথিবী জুড়ে আছে তানিয়া। তারপরও কিছুটা স্বার্থপর, নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা রোকসানা সত্যিই মেয়েকে ভালোবাসে? কতটা? মেয়ের জীবনের সবটুকু আলো এভাবে নিভে যাওয়ার জন্য কতটুকু দায়ী সে? মেয়েকে ছাড়া কীভাবে থাকবে এখন?
তানিয়ার বাবা আসিফ হকের একা থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে। চাইলেও সেখানে আর কাউকে জায়গা দিয়ে নারাজ সে। মানুষ একবার স্বাধীন হয়ে উঠলে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হতে ভয় পায়। তাই তো সে একা থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। রোকসানার সাথে বিচ্ছেদ হয়েছিল নিজের ভুলে। কাগজে কলমে বিচ্ছেদ তো আর মনের বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে না। তাই এখনো সাবেক হয়ে যাওয়া স্ত্রীকে মন থেকে ভালবাসে। ভালোবাসে মেয়েকেও। মাসে একবার মেয়ের সাথে সারাদিন কাটানো তার চাই। এমন ফুটফুটে মেয়ে পাশে থাকলে আর কীই বা চাওয়ার আছে। সেই মেয়ে যখন চলে যায়, তখন জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। শ্বাস থেমে যায়। ডাক্তার জানায়, স্ট্রোক হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তাই মেয়েকে স্মরণ করে আসিফ। ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা শুনবে সৃষ্টিকর্তা?
আয়ান প্রচণ্ড ভালোবাসে তানিয়াকে। তা প্রকাশের জন্যই হয়তো নিজেকে পসেসিভ হিসেবে তুলে ধরেছে। খবরদারি, সবকিছু জানতে চাওয়ার প্রবণতা, দিনে একবার হলেও দেখতে হবে... এ জাতীয় লুতুপুতু ধরনের প্রেম পছন্দ না তানিয়ার। তারপর সে আয়ানকে ভালোবাসে। তানিয়ার মৃত্যু আয়ানের জন্য বড়ো ধাক্কা। আয়ান কী করবে? না কি এর দায় আয়ানের উপরও আছে? তানিয়াকে পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। এই আঁধারের রাতে আয়ান একা, নিঃস্ব।
তানিয়ার মৃ ত্যু কি আ ত্ম হ ত্যা? কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ের কতটা দুঃখ থাকলে এমন কান্ড ঘটাতে পারে? ফিরোজ হোসেন তদন্তে নেমেছে। শুরুতে আ ত্ম হ ত্যা অনুমান করেই তদন্ত এগিয়ে যাচ্ছে। তবুও ফিরোজের মনে খচখচ করছে। কিছু একটা ঠিক নেই। মানুষের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কখন যে নিজের পরিবারে সমস্যা সৃষ্টি হলো খেয়ালই করেনি। স্ত্রী আকলিমার নানান কর্মকাণ্ডে সন্দেহ হয়। পেছনে ছুটতে গিয়েও কোনো সুরাহা হয় না। একদিকে পারিবারিক সমস্যা অন্যদিকে তানিয়ার মৃ ত্যু রহস্য। কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না ফিরোজ হোসেন।
রোকসানার একাকীত্বের সুযোগে কাছে এসেছে রাশেদ খান। রোকসানার অফিসের বস। তাদের সম্পর্ক নিয়ে কানাঘুষা চলে। তানিয়ার ভবিষ্যতের কথা ভেবে এগোতে পারে না রোকসানা। তবে রাশেদ খান অপেক্ষা করছে। এই অপেক্ষা শেষ হবে কবে? ধৈর্যের বাঁধ তো একদিন ভেঙে যায়।
বাড়ির কেয়ারটেকার রমিজও এই গল্পে প্রধান। অশিক্ষিত, গরীব এই ব্যক্তির চোখ যেন শান দেওয়া তলোয়ার। যেই তলোয়ারের ধারে ছিন্নবিচ্ছন্ন হয় উঠতি বয়সী তরুণীদের শরীর। এমন মানুষকে দেখলে গা ঘিনঘিন করে। পাত্তা না দিতে চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পেছনে লেগে থাকা দুশ্চরিত্রের হাত থেকে কী করে বাঁচবে তানিয়া?
সমস্যা অনেক... এই সমস্যাতেই নিভে গেছে প্রাণোচ্ছল এক তরুণীর জীবন প্রদীপ। সাধারণ কোনো মৃ ত্যু নয়। এর পেছনের রহস্য উদঘাটন হবে এবার। সাথে অনেক জীবনের সূত্রের এক হয়ে যাওয়া বা সুতো কেটে যাওয়া.... অচিন কোনো এক পাখির আকাশে উড়ে বেড়ানো গল্প।
▪️বই পর্যালোচনা ও পাঠ প্রতিক্রিয়া :
লেখক শরীফুল হাসানের আরও একটি দারুণ সামাজিক উপন্যাস "অচিন পাখি"। সামাজিক উপন্যাস না সামাজিক থ্রিলার বলা বোধহয় শ্রেয়। যে উপন্যাসে ভেঙে যাওয়া এক পরিবারের কথা উঠে এসেছে।
বাবা-মায়ের মধ্যে বন্ধন না থাকলে উঠতি বয়সের যেকোনো তরুণীর জীবন অন্যরকম গিয়ে ওঠে। স্বাধীনতা সবসময় ভালো হয় না। তানিয়া যেন সেই তরুণীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বাবা-মা আলাদা থাকে। কোনো শাসন নেই। বিশ্বাসের উপর ছেড়ে দিয়েছে তাকে। ফলাফল একটি ভুল। আর সেই ভুলের মাসুল দিতে হয়েছে জীবন দিয়ে।
আমি লেখকের বর্ণনার অনেক বিশাল ভক্ত। "অচিন পাখি" পড়ে মনে হয়েছে লেখকের লেখনীতে পরিবর্তন এসেছে। ব্যতিক্রম ধারায় রচনা করেছেন উপন্যাসটি। কিছু জায়গায় বর্ণনা দারুণ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে বেশ কিছু আবেগের জায়গাটা ফুটে ওঠেনি বলে মনে হয়েছে।
"অচিন পাখি" উপন্যাসে লেখক শুধু গল্প বলে গিয়েছেন। এর মাঝে সংলাপের সদ্ব্যবহার করেছেন। সংলাপগুলো মনে ধরেছে। সেই সাথে জীবনের গল্প, সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানুষের চারিত্রিক ও মানবিক দিক ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে।
পারিবারিক বন্ধন না থাকলে কোনো সম্পর্কই ঠিক থাকে না। জীবন তখন অন্যখানে সুখ খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যিকারের সুখ পায় কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য করা যায়। কিন্তু মানুষ মেকি সুখের খোঁজে ছুটতে গিয়ে প্রকৃত সুখ হারিয়ে ফেলে। যখন সব বুঝে পেছন ফিরে যেতে চায়, তখন আর উপায় থাকে না।
▪️চরিত্রায়ন :
"অচিন পাখি" উপন্যাসের সবচেয়ে ভালো লেগেছে চরিত্রের নামে অধ্যায় শুরু। শুরুতে��� অধ্যায়ের মুখ্য চরিত্র নিয়ে আলোকপাত করা বেশ লেগেছে। এতে করে চরিত্রগুলো আরও জীবন হয়ে ওঠেছে। রোকসানা, আসিফ যেমন নিজেদের দিকটা খুঁজে নিয়েছে। তারপরও পুরনো ভালোবাসার টান অনুভব করে। ভালোবাসা যে পুরনো হয় না।
তানিয়া বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরও হাসিমুখে থাকে। তারপরও সে একা। এই একাকীত্ব হয়তো বড়ো ধরনের ভুল করতে বাধ্য করেছে। মানুষ একা থাকলে এমন কাউকে খুঁজে, যাকে আপন করে পাওয়া যায়। তবে চাইলেই কি সবাই আপন হতে পারে?
রাশেদ খান চরিত্র এই গল্পে অবান্তর। তবুও কোথায় যেন খুব বেশি প্রয়োজন। যার অপেক্ষা ফুরোয় না। তাই একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। অন্যদিকে রমিজ কিংবা মজনু মিয়া সমাজের সেই নিকৃষ্ট অংশের প্রতিনিধি, যাদের জন্য কোনো তরুণী আজ নিরাপদ নয়।
"অচিন পাখি" উপন্যাসে ফিরোজ হোসেন আর আয়ানের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আরো একটুখানি ভূমিকা তাদের থাকলে ক্ষতি হতো না। ফিরোজের ভূমিকা আরও বেশি থাকা প্রয়োজন ছিল।
▪️অসঙ্গতি :
টুকটাক কিছু ভুলত্রুটি বইয়ের মান কমিয়ে দিয়েছে।
০ উপন্যাসের এক অংশে বলা হয়েছে ফিরোজ হোসেন জানেন আয়ান তানিয়ার প্রেমিক। ছেলেটার পুরো ইতিহাস তার কাছে আছে। পরে আবার বলা হয়, আয়ানের বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে। তানিয়ার সাথে সম্পর্ক জানতে হবে। বিষয়টা মিলল না।
০ একজনের মৃত্যু ঘটলে তার ফোনের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি তথ্য দিতে পারে। বইয়ে ফোন নিয়ে কথা বলা হলেও, তা খোঁজার তৎপরতা পুলিশের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি।
০ বইয়ের শুরুর অংশে বলা হয়, তানিয়ার ল্যাপটপ, ফেসবুকের পাসওয়ার্ড তার মা জানেন না। আবার পরে বলা হয়, মেয়ের সবকিছুর পাসওয়ার্ড জানা মায়ের। জানলেও কখনো খবরদারি করেনি।
০ প্রথমে বলা হয়েছিল, রাশেদকে পছন্দ না তানিয়ার। পরবর্তীতে বইয়ের পুরোটা জুড়ে বলা হয়েছিস তানিয়া রাশেদকে পছন্দ করে। এমনকি মাঝেমাঝে কথাও হয় দুজনের।
▪️সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন :
বানানের ক্ষেত্রে বইয়ে কিছু ভুল ছিল। অন্যধারার অনেক বইয়ে এই বিষয় লক্ষ্য করি। সম্পাদনার ঘাটতি প্রায় সময় থাকে। নামের অদলবদল ছিল দুয়েক জায়গায়।
যদিও পুরো প্রোডাকশন কোয়ালিটি ছিল দারুণ। তারপরও ১৬০ পৃষ্ঠার বইয়ের মূল্য চারশত টাকা অতিরিক্ত লেগেছে।
এই প্রচ্ছদ আমার ভীষন পছন্দ গিয়েছে। সাদামাটা, তবুও অসাধারণ।
▪️পরিশেষে, শরীফুল ভাইয়ের লেখনীর সাথে পরিচিত থাকার সুবাদে তার লেখার ধার সম্পর্কে জানা আছে। "অচিন পাখি" গল্প হিসেবে দারুণ। কিন্তু অতীতে তিনি এর চেয়েও দারুণ কাজ উপহার দিয়েছেন, আশা করব ভবিষ্যতে লেখকের কাছ থেকে আরো দারুণ কিছু উপহার পাব সেসব পুরনো লেখার মতো।
তানিয়া আর এই পৃথিবীতে নেই তা বিশ্বাস করতে পারছে না মা রোকসানা ও বাবা আসিফ। কোনো এক সময়ে তাদের সুখের সংসার ছিল কিন্তু তা টিকেনি। তারপর আলাদা মায়ের সাথে জীবন চলছিল তানিয়ার, বাবার সাথে সপ্তাহে বা মাসে দেখা সাক্ষাৎ হতো। রোকসানার মতে তানিয়ার বয়স অনুযায়ী তার মধ্যে কোনো খারাপ অভ্যাস ছিল না , না ছিল কোনো প্রেম ভালোবাসা। কলেজ পড়ুয়া তানিয়ার যদিও আয়ান নামের প্রেমিক ছিল।
তবে কি এমন ঘটে যায় তানিয়ার সাথে যে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। পুলিশ অফিসার ফিরোজ হোসেন তদন্তে জড়িয়ে পড়ে যদিও পারিবারিক তদন্তে তার ব্যস্ততা বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
গল্পটা স্বাভাবিক ভাবেই এগোচ্ছিল কিন্তু শেষের অংশটুকু পড়ে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে যাই। লেখকের এর আগের সামাজিক উপন্যাসগুলোতেও লক্ষ্য করেছি , কাহিনী স্বাভাবিক ভাবে এগোতে থাকলেও শেষে এমন কিছু ঘটে যাবে যে কি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবো তা নিয়ে নিজেই দ্বিধায় থাকি। বিষণ্ণ সুন্দর এই বইটি। তবে নামের বানানের ভুল খুব বেশি চোখে পড়ছিলো।
১৯ বছর বয়সী তানিয়া প্রায় দশ বছর আগে বাবা - মায়ের ডিভোর্সের পর থেকে তার মা রোখসানার সাথেই থাকে। বাবা আসিফ হকের সাথেও অবশ্য সম্পর্কে কোন ফাটল নেই। নিয়ম করে বাবার সাথে কথা বার্তা, বাইরে ঘুরতে যাওয়া সব ই হয়। আগে, তার বাবা মার আবার একসাথে হয়ে যাবার আশা মনের মধ্যে লালন করলেও এখন বাস্তবতা কে মেনে নিয়েই ভালো থাকতে শিখেছিল। কিন্তু হঠাৎ কি হয় যে তানিয়া আত্মহত্যা করে বসলো! তানিয়ার এই মৃত্যু কে কেন্দ্র করেই ঘুরতে থাকে তানিয়ার আশে পাশের মানুষ গুলোর জীবন। তারা কি নিজের অগোচরে এমন কিছু করে ফেলেছিল যার জন্য মেয়েটা এই দুনিয়ার মায়া অগ্রাহ্য করে পাখির মত আকাশে ডানা মেলে দিলো!
📖 পর্যালোচনা : সম্পূর্ণ বইটা সাজানো হয়েছে ছোট ছোট অধ্যায়ে, প্রতিটি অধ্যায় আবার ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি তে বর্ণনা করা। প্রতিটি চরিত্রই যেন এক একটা গল্প। শুরুতেই তানিয়ার মৃত্যুতে যে বিষণ্নতার জন্ম নেই, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথে ক্রমেই তা ঘনীভূত হয়ে মন কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে। পুরো বইটা জুড়েই ছিল বিষণ্নতার বসবাস। টিন এজ একটা মেয়ে যার বাবা - মা আবার ডিভোর্সড , তার মানসিক অবস্থার যে বর্ণনা এসেছে বইতে তা এত বাস্তব যে মনেই হয়না এটা কোন কাল্পনিক চরিত্র। রোখসানা আর আসিফ হকের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চমৎকার ভাবে উঠে এসেছে বইতে । আসলে সম্পর্কের বন্ধন কি শুধু এক টুকরো কাগজের মধ্যেই নির্ধারিত থাকে যে কলমের আঁচড়েই শেষ হয়ে যাবে! হৃদয়ের মনস্তাত্ত্বিক এই আবেগ অনুভূতির দারুন প্রতিফলন হয়েছে রোখসানার অধ্যায় গুলোতে। আয়ান, অল্পবয়সী প্রেমিক । তানিয়ার প্রতি তার ভালোবাসায় কোন ঘাটতি নেই কিন্তু ভালোবাসার কিছু পোজেসিভ আচরণ যেন কণ্টকাকীর্ণ দেয়াল তুলে দেই দুজনের মধ্যে। তবুও তানিয়া তাকে ভালবাসে। খুব সাধারণ সাদামাটা ভালোবাসার বন্ধন। এই বইটার বিশেষ দিক এর এই সাদা মাটা বাস্তবতা। কোন বাহুল্যতা নেই, কোন কৃত্রিমতা নেই। চেনা পরিচিত জগৎ কেই তুলে এনে বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। বইটার মূল সৌন্দর্য্য টা এখানেই। পাঠক পড়বে আর হৃদয় দিয়ে অনুভব করবে সবকিছু। 🌐অসঙ্গতি : • শুরুতে বলা হয় রোখসানা কখনো তানিয়ার প্রাইভেসি তে নাক গলায় নি। তিনি তার মেয়ের ল্যাপটপ এর পাসওয়ার্ড, ফেসবুক আইডির পাসয়ার্ড এমনকি আইডির ইমেইল ও জানেন না। কিন্তু পরে গিয়ে দেখানো হয় রোখসানা মেয়ের থেকে কিছুটা জোর করেই এগুলো নিয়ে রেখেছিলেন। এত বড় বিষয় টা কিভাবে সম্পাদনার সময় চোখ এড়াই যায়! • শুরুতে দেখা যায় তানিয়া রাশেদ কে তেমন একটা পছন্দ করে না। কিন্তু বাকি কাহিনী তে বলা হয় তানিয়া রাশেদ কে বেশ পছন্দ করে, তাদের মধ্যে নিয়মিত phn এ কথাও হতো। সে চাইতো রাশেদ যেন তার মাকে দ্রুত বিয়ে করে। মানে কি! •এছাড়াও দুই তিন জায়গায় রোখসানা কে তানিয়া বলে সম্বোধন করা হয়েছে। প্রথমে ইকবার স্ট্রোক করেছে বললেও দ��ই পেজ পরেই বলে হার্ট এ্যাটাক।
মূল কাহিনীর উপর এই অসঙ্গতি গুলো অনেক বড় প্রভাব না ফেললেও এগুলো বই পড়ার তৃপ্তি কমিয়ে দিয়ে বিরক্তির জন্ম দেই। বিশেষ করে প্রথম অসঙ্গতি টা কাহিনীর অনেক কিছুই নষ্ট করে দিয়েছে। অসঙ্গতি গুলো দেখার পর আমার কাছে অদ্ভুত লাগছিলো - লেখা শেষ করে কি লেখক সম্পূর্ণ বইটা একবারও পড়েন নি ! বা সম্পাদনার সময় ও কি এই বিষয় গুলো নজরে আসেনি!
📖 পাঠ প্রতিক্রিয়া :
বইটা শেষ করার পরে অদ্ভুত রকমের একটা চাপ ধরা, ভোঁতা অনুভূতি আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমাকে অনেক ক্ষণ। কোন ভাবেই সেই দমবন্ধ চিনচিনে ব্যথার অনুভূতি থেকে বের হতে পারছিলাম না। বইয়ের সাসপেন্স এর তুলনায় বাস্তবিক , মনস্তাত্ত্বিক বিষয় গুলো আমাকে বেশি আলোড়িত করেছে। এভাবেও একটা থ্রিলার এর রূপে সমাজ এর বাস্তব চিত্র কে তুলে ধরা যায় ! ত্রুটি - বিচ্যুতি গুলো না থাকলে আরো বেশি উপভোগ্য হতো অবশ্য। [ বইয়ের প্রচ্ছদ নজর কাড়া হলেও দাম পকেট কাটা। আমার কাছে প্রোডাকশন অনুযায়ী দাম বেশি মনে হয়েছে। ]
শরিফুল হাসানের লেখা এটাই আমার প্রথম পড়া বই। গল্পের গঠন, লেখার ধরন আর ধীরে ধীরে জমে ওঠা সাসপেন্স-সবকিছু মিলিয়ে বইটি আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।
বইটি নিয়ে রিভিউ দিতে বসে বুঝতে পারছিলাম না কোথা থেকে শুরু করব। কারণ পুরো কাহিনি জুড়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা আছে-প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি ঘটনা যেন কিছু লুকিয়ে রেখেছে। প্রতি পৃষ্ঠা উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে পাঠক বারবার চমকে উঠবে, আবার ভাবতেও বাধ্য হবে।
এই গল্প হতে পারে মা–বাবার সঙ্গে সন্তানের তৈরি হওয়া অদৃশ্য দূরত্বের গল্প। আবার হতে পারে কিশোরী জীবনের সেই ভয়ংকর একাকিত্বের গল্প,যে মানসিক সময়টার সঙ্গে লড়াই করতে না পেরে কেউ কেউ জীবনের কাছেই হার মানে।
বয়সটাই বা কত ছিল? ১৬/১৭! তানিয়া রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করে। কিন্তু কেন? কোনো চিঠি নেই। এমনকি তার ফোনটাও পাওয়া যায়নি।
এটা কি সত্যিই আত্মহত্যা?
যে সময়ে মা–বাবা হওয়ার কথা সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেই সময়েই যদি তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়,তাহলে সেই মানসিক যন্ত্রণাটা কতজন সন্তানই বা সামলাতে পারে? তার ওপর যদি কিছু পশু-নামক পুরুষ মানুষের কুরুচিপূর্ণ চিন্তা ও কাজের শিকার হতে হয়, তাহলে একটি কিশোরী মেয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
ঠিক এই পরিস্থিতির সঙ্গেই পেরে ওঠেনি তানিয়া। ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়া একটি মেয়ে-নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দিল? কেন? কে দায়ী ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই গল্প এগিয়ে যায়, আর পাঠক ঢুকে পড়ে এক অস্বস্তিকর কিন্তু ভীষণ বাস্তব মানসিক লড়াইয়ের ভেতর।
যদি সময় থাকে, অবশ্যই একবার পড়ার রিকমেন্ডেশন রইল। হতাশ হবেন না। গল্পের প্রতিটি চরিত্রের ভেতরের যে মানসিক যুদ্ধ-তা আপনাকে বইয়ের ভেতরে ঢুকে ভাবতে বাধ্য করবে।
পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল— ইশ, যদি তানিয়াকে একবার জড়িয়ে ধরতে পারতাম। শুনতে পারতাম ওর ভেতরে জমে থাকা না বলা কথাগুলো, যন্ত্রণাগুলো।
এই বই হাতে নিলে শেষ না করে ওঠা কঠিন। শেষ পৃষ্ঠা না পড়া পর্যন্ত আপনার মন শান্তি পাবে না—এটা নিশ্চিত।
রেটিং: ⭐️⭐️⭐️⭐️/৫
(বইয়ের কিছু জায়গায় টাইপিং মিস্টেক রয়েছে। আশা করি পরবর্তী সংকলনে লেখক বিষয়টি ঠিক করবেন।)
লেখকের বই গুলো পড়লে বিষাদে মন ভারী হয়ে থাকে। পড়ন্ত বিকেলে শেষ আলোর মতো মন বিষাদগ্রস্থ হয়। কেনো এমন হয়, কি হতো এমন না হয়ে। অচিন পাখি এবারের প্রকাশিত নতুন বই। এখন আমাদের লাইফ স্টাইল এতো বেশি ওপেন হয়ে গেছে যে কখন, ক, কিভাবে বিপদে পরে, তানিয়ার মতো পরিণত হবে আমরা কেউ তা জানি না। খুব চমৎকার একটা প্রেক্ষাপটে নিয়ে লেখা সময়উপযোগী এই বই । বইটি পড়তে যেয়ে আপনি রোকসানার কষ্ট অনুভব করতে পারবেন, আয়ানের কষ্ট, ভালোবাসা অনুভব করতে পারবেন। তানিয়ার মনটাকে পড়তে পারবেন। রাশেদ হাসানের মতো মানুষ গুলোও যে আমাদের আশেপাশে ঘুরেবেড়ায় সেটাও আপনি আরো শক্ত ভাবে বুঝবেন। আজকাল সম্পর্ক গুলো এতো ঠুনকো হয়ে গেছে, তারউপর একটু যত্ন না নিলেই নিমেষেই সব শেষ। বই টি পড়ে আপনি ভাববেন.... এই ভাবনাটাই আমাদের প্রত্যেকেরই দরকার। লেখকের লেখা এখানেই সার্থক।
আমাদের চোখের সামনে যা ঘটে তাই শেষ নয়। গল্পের পিছনেও গল্প থাকে। কি সেই গল্প জানতে হলে পড়ে নিন। বই না শেষ করে উঠতে পারবেন না।
লেখককে ধন্যবাদ। আপনি বারবার বিষাদগ্রস্থ করে দেন তবুও আপনার লেখা না পড়ে থাকতে পারি না। মাঝে মাঝে বিষাদগ্রস্থ হোওয়ায় আমাদের জরুরী। ভালো থাকবেন। অনুস্বর কে ধন্যবাদ সুন্দর ভাবে নতুন প্রকাশিত বই গুলোকে আমার কাছে এনে দেওয়ার জন্য।
📍ব্যাক্তিগত মতামত: সাধারণত কোনো বই শুরু করার আগে কমবেশি সবারই প্রত্যাশা থাকে গল্পটা একটু ভিন্নধর্মী হোক, গল্পের চরিত্রগুলো অসাধারণ হোক। এই বইটাও এরকম প্রত্যাশা নিয়েই শুরু করেছি। খুবই সাধারণ একটা গল্প। সাধারণভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। গল্পকে অসাধারণ করে তোলার কোনো প্রয়াস চোখে পড়েনি। চরিত্রগুলোও খুব সাধারণ। লেখক অবশ্য শেষদিকে কোনো টুইস্ট দিতে চেয়েছেন হয়তো। যার কোনো পূর্ব সংযোগ বা সংকেত দেয়া হয়নি আগের ঘটনাগুলোতে। সেজন্য শেষটা একদমই বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে।বিশেষভাবে ভালো লাগার মতো কোনো স্ট্রং চরিত্র ছিল না। আমার মনে হয়, উপন্যাসের মূল উপজীব্য হলো একটা স্ট্রং চরিত্র।সেদিক বিবেচনায় "অচিন পাখি " পড়ে আমি আশাহত। 📍ব্যাক্তিগত রেটিং:৪/১০ কাহিনী সংক্ষেপ: ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝির কারণে সম্পর্কের ইতি টেনে দেয় রোখসানা আর আসিফ। দুজনই আলাদা জীবনে অভ্যস্ত হয়। কিন্ত একেবারেই যে তাদের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটেছে তা নয়। একমাত্র মেয়ে তানিয়ার জন্যই তারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি। হুট করে তানিয়ার অপমৃত্যু অস্বাভাবিক করে তোলে আরো কয়েকটা জীবন।প্রাথমিকভাবে এটাকে অপমৃত্যু হিসেবে ধরে নিলেও ময়নাতদন্তের পর এটাকে আত্ম হ ত্যা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।সত্যিই কি আ ত্মহ ত্যা?নাকি তানিয়াকে সরিয়ে নিজের জীবনকে নতুন করে গোছানোর চেষ্টা ছিল কারো?
অচিন পাখির দেশে হারিয়ে যেতে কেই বা না চায়, কিন্তু এই বইয়ের অচিন পাখি যে সবাইকে অচিন করে নিজ দেশে হারিয়ে যায়!
শরীফুল হাসান ভাইয়ার লেখা এই বইটি একটু অন্যরকম, তিনি তুলে ধরেন একটি বিচ্ছিন্ন পরিবারে একটি ঘটনার পর অচিন পাখি হয়ে মিলে যাওয়ার কাহিনী।
তানিয়া নামের ১৭/১৮ বছরের একটি যুবতী মেয়ে, ডিভোর্সড মা বাবার একমাত্র সন্তান। তার বিচ্ছিন্ন পরিবার হলেও তার ��ীবনের ���ন্য সবই ঠিক ছিল,কিন্তু কেনো তাহলে সে আত্মহত্যা করলো? তানিয়ার আত্মহনন দিয়েই শুরু হয় এবং বইয়ের কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে।তার মা রোকসানা একজন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা, নিজেকে স্বার্থপর হিসেবেই মনে করেন তিনি।এই স্বার্থপরতার ব্যতিতেই তার সংসারের ইতি ঘটে। এরপরও তিনি একা যথেষ্ট চেষ্টা দিয়েই বড় করেন, তানিয়ার বাবা একা থাকলেও কোনোদিন মেয়ের জন্য কম করেননি। মা বাবা আলাদা হলেও সেই ঝক্কি তানিয়া সামলে নিয়ে ছিল সেই ছোট থাকতেই, কিন্তু কেনো তাহলে তানিয়ার আত্মহত্যা, কেনইবা এক একে তার মা বাবার জীবন উল্টিয়ে পাল্টিয়ে ফেলা, এই রহস্যের উত্তর পাওয়া যাবে একমাত্র বইটি পড়লে।
আমার কাছে লেখক যেভাবে অতিপরিচিত গল্পকে এই বইটিতে তুলে ধরতে পেরেছেন তা সত্যিই অসাধারণ। এই গল্পটি নাটক,সিনেমাতে খুবই পরিচিত তাই এটাকে অনন্য মনে না হলেও লেখার ধরন ঠিকই আপনার মনে ধরার মতন। শরীফুল ভাইয়ার লেখা আমার পছন্দের তাই এইটাও ব্যতিক্রম নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া আমি থামাতে পারিনি, যতই দুঃখময় কাহিনী হোক না কেনো।একদিনেই শেষ করে ফেলেছি।আপনারা যদি মনকে একটু দুঃখী করতে চান তাহলে এই বইটি পড়তে পারেন।
একদমই এক বসায় শেষ করার মতোন একটা গল্প। কলেজ পড়ুয়া এক তরুণীর আত্মহত্যা থেকে শুরু হয় গল্পের। আত্মহত্যা নাকি খুন?- আত্মহত্যা হলেও সেটার কারণ কী আর কে ই বা দায়ী তানিয়ার মৃত্যুর জন্য- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই পাঠক পরিচিত হবেন রোকসানা, আসিফ, রাশেদ, আয়ান, রমিজ, মফিজদের সাথে, আর ফ্ল্যাশব্যাকে তানিয়ার সাথেও। মনে উঁকি দিবে নানা সন্দেহ আর সম্ভাবনা। শেষ অব্দি হয়তো আপনার কোনো সন্দেহই মিলে যাবে- তবে তাতে কিন্তু গল্পটাকে প্রেডিক্টেবল এর কাতারে ফেলে দেওয়া যাবেনা। কারণ এই গল্পটা শুধুই একটা রহস্য গল্প না। এই গল্পটা অনেকগুলো মানুষের মানসিক টানাপোড়েনের গল্প, ব্রোকেন ফ্যামিলির একটা বাচ্চা মেয়ের হাসিমুখ অভিনয়ের গল্প, আবার খুব কুৎসিত কিছু মানুষের গল্পও। যে গল্পকে লেখকের বর্ণনার ভঙ্গি আরো জ্যান্ত করে তুলেছে।
বি:দ্র: একটা ব্যাপার এ গড়মিল চোখে পড়লো- এক জায়গায় বলা হয়েছে রোকসানা তানিয়ার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড জানেনা, একবার জন্মতারিখ দিয়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে রেখে দেয়। আবার একটু পরে বলা হলো যে, ল্যাপটপ আর ফেসবুকের পাসওয়ার্ড রোকসানা আগে থেকেই জানতেন।
অচিন পাখি বইটা শেষ করেছি মাত্রই। এই নামে আমাকে ঢাকা হতো স্কুল লাইফে, কেন ডাকা হতো সেটা আপাতত বলছি না। এইটুকু বলি ভালো অর্থে না। যাই হোক, বইটা শেষ করে ভালো লেগেছে। শরীফ ভাইয়ের এই টাইপের লেখা আমার ভালো লাগে। সামাজিক আবহে গল্প সুতো ছেড়েছে, এর সাথে মিশে গেছে তানিয়ার মৃত্যু রহস্য। এই রহস্য আমাদের এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি করে দেয়। সেই পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই ভয়াবহ। উপন্যাসটা পড়ার সময় আমার বারবার মনে হচ্ছিল এটা কী সামাজিক উপন্যাস নাকি মার্ডার মিস্ট্রি! যদিও আমি জনরা সম্পর্কে জানিও কম, মানিও কম। তাই অত কিছু না ভেবে পড়ে গেছি। এক একটা নাম ধরে এক একটা অধ্যায় লেখা হয়েছে। এই ধারাটা আমার ভালো লাগে। চরিত্রগুলোর অবস্থানও ভালোভাবে পরিষ্কার হয়। সর্বোপরি বইটি ভালো লেগেছে।
এই বইমেলায় বের হওয়া শরীফুল হাসান ভাইয়ের লেখা অচিন পাখি বইটি পড়লাম।
কেমন যেন বিষন্নতা দীর্ঘশ্বাস আর একাকীত্বের গল্প!
ব্রোকেন ফ্যামিলিতে বড় হওয়া কিশোরী তানিয়ার আত্মহত্যা গল্পের শুরুতেই ধাক্কা দেবে। সম্মুখ করবে অনেক গুলো প্রশ্নের!
"সব আত্মহত্যার একজন খুনি থাকে " গল্পের সেই কথিত খুনিকে খুজে বেড়াবেন শেষ পাতা পর্যন্ত।
শরীফুল হাসান এর লেখনীতে উঠে আসবে একের পর এক গল্পের মোড়। শেষে এক বুক কস্ট নিয়েই শেষ করবেন। আর ভাববেন, একটু স্যাক্রিফাইস, একটু মানিয়ে চলা অনেক বড় সমস্যা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়।
অতি ঠান্ডা মাথার একটি গল্প। শুরুতেই একটা আত্মহত্যা। যাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে চলতে থাকে একটি ছোট্ট পরিবারের ঘটনা চক্র। বিষণ্ণতার চরম শিখরে পৌঁছে দেয়া এ গল্প বারবার আপনাকে ভাবাবে। বারবার চরিত্রগুলোর ভিন্নরূপ কল্পনা করাবে। বেরিয়ে আসবো আত্মহত্যার পেছনের প্রভাবক। পাঠকও হয়তো খুব করে চাইবে অন্যায়কারীর সর্বোচ্চ নৃশংস শাস্তি হোক। এবং শেষে পাঠক হৃদয় কিছুটা শান্তিও পায় তবে চূড়ান্ত বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে গল্পের শেষ দৃশ্যে।
মনস্ত্বাত্তিক ভাবে দারুণ আঘাত করতে সক্ষম 'অচিন পাখি'।
খুবই বাজে প্লট। তার ওপরে কাহিনী শুধু শুধু লম্বা করা হয়েছে।একই কথা বারবার বলার কি মানে বুঝলাম না।যেটা তার অন্যান্য বইয়েও ঘটেছে। পাঠক এর স্মৃতিশক্তি তো আর গোল্ডফিশের নাহ। তার সাথে ছিলো তথ্যের ধারাবাহিকতার অভাব। শেষের দিকে প্রতিটা লাইন আর পড়াও লাগে নি। কয়েকটা লাইন বেছে নিলেই পড়া শেষ। যেখানে রোদেরা ঘুমায়,বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ লেখকের নিকট এহেন লেখা একেবারেই আশা করা যায় না।
মানুষ বিষণ্নতা থেকে পালাতে চায় বাকি বিষণ্নতায় ভর করে জীবন অতিবাহিত করে তা বলা সত্যিই মুশকিল।কিছু বই থাকে যেগুলো মানুষের যাপিত জীবনের বিষণ্নতাকে আরো প্রগাড় করে তুলে।ওরহান পামুকের ❝ইস্তাম্বুল স্মৃতি ও শহর❞ বইটাতে লেখক বিষণ্নতার নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।বিষণ্নতাকে বলেছিলেন ❝হুজুন❞। কোনো কিছু বিষণ্নতায় ছেয়ে থাকলে তাতে যে সৌন্দর্য ফুটে উঠে তাই হুজুন।শরীফুল হাসানের লেখায় আমি সেই অমোঘ হুজুন কে খুঁজে পাই বারংবার যেন হুজুন বা বিষণ্নতার সৌন্দর্য ছাড়া উনার উপন্যাস অসমাপ্ত। আপনাকে থম মেরে থাকতে বাধ্য করবে, সিনারিও গুলো কল্পনা করে চোখের কোণে জল জমে আসবে কিন্তু আপনি সেই ফিকশনীয় হুজুন ���েকে বের হতে পারবেন না।যেখানে রোদেরা ঘুমায় এর পর বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ পড়ার পর আমি লেখকের অলিখিত ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম।তাই হয়তো আমার রিভিউ গুলো তে কিছুটা একপেশে ভাব থাকবে তবে আমি যে হুজুন বা বিষণ্নতার সৌন্দর্য খুঁজে পাই উনার বইয়ে সেই বিষণ্নতা উনার উপন্যাস পড়ে এমন সবাই-ই একবাক্যে স্বীকার করবে।অচিন পাখি তেও লেখক সেই বিষণ্নতা ধরে রেখেছেন।খুবই সাদামাটা গল্প কিন্তু তানিয়ার তার মাকে মুখ ফুটে বলতে না পারা সেই ঘটনাগুলো আপনার মধ্যে হাহাকার তৈরি করবে।তানিয়ার হয়ে বলে দিতে ইচ্ছে করবে সবাইকে যে তানিয়া কিসের মধ্য দিয়ে তার দিনাতিপাত করছে।
উপন্যাসের মূল চরিত্র তানিয়া।কোনো গল্পের একক প্রোটাগনিস্ট যার লক্ড রুম মৃত্যুর রহস্য গল্পের সবগুলো চরিত্রের জীবনকে প্রভাবিত করেছে দারুণভাবে।স্বামীর সাথে বিচ্ছদ হয়ে যাওয়া রোকসানা যার অফিসের বসের সাথে তার পরকীয়ার সম্পর্ক।আসিফ হক যে কিনা ডিভোর্সের পর থেকে মাসে একবার মেয়ের সাথে সারাদিন ঘোরে আর বাকি সময় টুকু একা থাকে তার নিজ বাসায়।সে একা থাকতে ভালোবাসে নাকি অতীতে করা নিজের ভুলের জন্য একা থাকাটাকেই তার নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে।আয়ান,তানিয়ার জন্য যার রয়েছে অকৃত্রিম ভালোবাসা।সেই ভালেবাসা থেকে ওভার পসেসিবনেস, নজরদারি বেড়ে তানিয়ার উপর।কিন্তু তানিয়ার শরীরের সব কিছু জানা হয়ে গেলেও তার কষ্টের সময়গুলোতে সে কিছুই টের পায় না।আজকাল কার ভালোবাসা গুলো অতিরিক্ত শারীরিক হয়ে যায় বিধায় এর ফলাফল ওতোটা ভালো হয় না। উপন্যাসে তানিয়া সেই নিকৃষ্ট ফলাফলের প্রতিনিধিত্ব করেছে একাই।কেউ ছিল না তার পাশে।পারিবারিক বন্ধন ঢিলেঢালা হওয়ায় একি বাসায় থাকা সত্বেও রোকসানা বুঝতে পারে না কতটা বিপর্যস্ত তানিয়ার জীবন।মৃত্যুর আগে ভিডিও কলে বাবার সাথে তানিয়া কথা বলার পরও আসিফ হক সকালে ঠাওর করতে পারে না কেন তার মেয়ে এভাবে চলে যাবে।
অচিন পাখি যতটা সামাজিক তার চেয়ে কিঞ্চিৎ থ্রিলারধর্মী উপন্যাস।হ্যা টানটান মারমুখো এরকম টুইস্ট হয়তো পাঠক পাবে না কিন্তু পুরো উপন্যাসটাতেই লেখক তানিয়ার মৃত্যুরহস্য দিয়েই বিভিন্ন চরিত্রের অতীত-বর্তমানের মিশেলে গল্প বলেছেন।সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য এক উপন্যাস।১৬০ পৃষ্ঠা পড়তে পাঠকের ২৪ ঘন্টাও লাগার কথা না আর বইয়ের বাইন্ডিং নিয়ে আলাদা ভাবে বলার কিছু নাই।তবে লেখক বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণে একটা ল্যান্ডমার্ক তৈরি করে দিয়েছেন আমার জন্য।অচিন পাখি অবশ্যই বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি।
২৬ মার্চ ২০২৪ প্রথম পাঠের পর রিভিউ: "কেয়ারটেকার আছে, দাড়োঁয়ান আছে, পুরো এপার্টমেন্ট সিসিটিভি ক্যামেরায় ঘেরা।নিরাপত্তা ১০০%
কিছু মানুষ আজীবন সত্যিকারের ভালোবাসা চিনেনা।
কিছু মানুষ বুকে অজস্র ভালোবাসা নিয়েই মরে যায়, যা কেউ বুঝেনা।"
২ অক্টোবর ২০২৫ দ্বিতীয় পাঠের পর রিভিউ: "আমি রেগুলার বই পড়ি, প্রতিদিন অন্তত দশ-বিশ পৃষ্ঠা হলেও পড়ার মধ্যে থাকি। খুব কমই এমন হয়েছে আমি একটা বই পড়ে বিষন্ন হয়েছি আর তারপর আরেকটা বই শুরু করতে পারিনি। এই বক্টা এরকম একটা বই যেটা আমি ভেবেছিলাম আর কোনোদিন আমার পড়া হবে না। শুধুমাত্র আমার বই বিক্রি করে দেয়ার বদ অভ্যাসটা নেই বলে, বইটা আমার কাছে রয়েগেছে। এটা এমন একট বই যেটার সবকিছুই আমার মাথায় ছিলো, আর দ্বিতীয়বার পড়ার কোনো ইচ্ছা ছিলো না তবু পড়লাম। আগে থেকে পড়া বই যদি সব ভুলে গিয়ে থাকি তাহলে পড়া সহজ কিন্ত সবকিছু মনে থাকলে সেটা একটু কঠিনই। প্রথমবার আমি শেষটা না জেনে বইটা পড়েছিলাম আর এইবার সবটা জেনেই। বইটা বাংলাদেশে খুবই সম্ভব একটা ঘটনা। ভাবতেই গা শিউরে উঠে আমার। বইয়ের প্রতিটা চরিত্রই ভাবার মতো। বিষণ্ণ রাত্রি।
স্পয়লার**
**মফিজের শেষ পরিনতিটা আমি ক্লিয়ার না। আরও বিস্তারিত থাক দরকার ছিলো। **এক জায়গায় বলা হয়েছে তানিয়ার মা তানিয়ার ফোন/সোশাল মিডিয়ার পাসওয়ার্ড জানেনা আরেক জায়গায় বলা হয়েছে খুব কষ্ট করে একবার নিয়েছিলো।"
This entire review has been hidden because of spoilers.