আমাকে বলা হয়েছে এই বইটার একটা সার-সংক্ষেপ লিখে দিতে। উপন্যাস হলে ব্যাপারটা খুব সহজ হতো। কিন্তু এটা একটা গল্পসংকলন। অনেকগুলো আলাদা গল্পের সার-সংক্ষেপ অল্প কথার মাঝে লেখা কঠিন। তারচেয়ে বলা যায়, আমি কেমন গল্প লিখি এই বিষয়ে। আপনারা যারা ফেসবুকে আমার গল্প পড়েন তারা তো জানেনই। যারা প্রথম এই বই পড়বেন, তারাও জেনে ফেলবেন। আমার একটা সীমাবদ্ধতা হলো, আমি সহজ-স্বাভাবিক কিছু ভাবতে পারি না। আমার কল্পনা বাস্তব ছাড়িয়ে অদ্ভুত, আজগুবি, আশ্চর্যজনক রাস্তায় চলে যায়। যেখানে মানুষ নিজেই নিজের বাড়ি ভাঙচুর করার দায়ে নিজের নামে মামলা করে, বিয়ের পর বউ-বাচ্চা না প্রসব করে ডিম পাড়ে, একটা মেয়ে অনেকগুলো প্রেমিকের সাথে একসাথে গ্রুপ খুলে প্রেম করে, কেউ ভার্জিন শব্দের অর্থ ভাবে সৎ, এক মেসের বড়োভাই আর তার প্রেমিকা প্রতিদিন রাতে বিশেষ কয়েকটা গান শোনে স্পিকারে, এরকম আরও উদ্ভট জিনিসপত্র। বলছিলাম, আমার ফেসবুকে লেখা গল্পগুলোর কথা। এরকম নতুন আরও বেশকিছু গল্প নিয়েই এই “গ্রিন কফি” বইটি। যদি আপনি কল্পনার জগতের সীমা ছাড়িয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে চান, সবকিছু ভুলে গিয়ে কিছু সময় আনন্দ পেতে চান, রম্য গল্পের অন্যরকম কিছু সৃষ্টি উপভোগ করতে চান, তাহলে এই বইটি আপনি কিনতে পারেন। আর যদি আপনি খুব সিরিয়াস, গুরুগম্ভীর কেউ হন, তাহলে এই বইটি আপনার না কেনাই ভালো হবে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো মিটিংয়ের মাঝে উদ্ভট কিছু মাথায় এসে হুট করে হেসে ফেললে ব্যাপারটা আপনার ইমেজের জন্য অবশ্যই ভালো হবে না।
::::::::::সূচিপত্র::::::::::
০১. ভিটামিন ডি ০২. অদ্ভুত মন ০৩. অনুভূতি সমগ্র ০৪. মুহূর্ত ০৫. একটি ভ্রমণ কাহিনি ০৬. হিরো ০৭. বউয়ের বিয়ে ০৮. ভূত হওয়ার সহজ উপায় ০৯. বারো এপ্রিল ১০. একটা চিরায়ত প্রেমের গল্প ১১. পাশাপাশি দুইজন ১২. দাবাড়ু ১৩. শখের গোয়েন্দা ১৪. ম্যাসেজ
বটে! এইগুলিও গল্প? হ্যাঁ, গল্পই বটে। ফেসবুকে প্রকাশিত। এই গল্পগুলি ফেসবুকে প্রকাশিত হিসাবেই ঠিক আছে। তবে আজকাল ফেসবুক সেলিব্রেটিরাই বই বের করছে, আর এই বই মেলায় পোলাপান সেগুলি কিনছেও।
প্রায় সব গল্পই প্রেমের। কোনটায় আনন্দ, কোনটাহ দু:খ, কোনটায় সাইফাই। তবে সব গল্পের একই স্টাইল। বোঝা যায়, এইগুলি ফেসবুকে প্রকাশের জন্যই লেখা হইছে। সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হলে তাও কিছুটা মান থাকত।
উপরেই লেখা, এই বইতে শিক্ষণীয় কিছু নেই। তা ভালো কথা। তবে বহুত লঘু লেখা। কারেকশন: লঘু শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। একই ভালোবাসা এমন না তেমন, তেমন না অমন, অমন না সেমন। এগুলি এযুগের ইয়ো ডুডের খেলো প্রেম, তাতে গভীরতা নেই। ভালোবাসা মরে যায়না, না পাওয়াই ভালোবাসার সার্থকতা, রম্য ভালোবাসা, এসব উপদেশবাণী বহুব্যাবহারে ক্লিশে হয়ে গেছে, ওসব এখন আর মুখে রোচে না।এগুলি ফেসবুকে পড়ে টাইমপাস করা যায়, বই হিসাবে মানতে কষ্ট হয়, কেউ কিনলে হাসিও পায়, কষ্টও লাগে।
বলবেন, আমি এলিট পাঠক। হতে পারি, রিভিউটাও আমার ব্যক্তিগত। টাকা খরচ করে এই বই কিনে পড়তে আমি রাজি না, ফেসবুক জেনারেশনের জন্য এই গল্প ঠিক আছে।
I really wanted to like this one. But such a let down. Wanted some good laugh, nothing much. Just some sparks here and there. He is such a talented writer, hope the next book will be fulfilling.
“তাজমহল প্যারিসের একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। সবে সূর্য উঠেছে। এখনই গরম শুরু হয়ে গেছে। ইস্তাম্বুলে যেমন ঠাণ্ডা, ফ্রান্সে তেমন গরম। প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল। মাত্র আঠারো কিলোমিটার জায়গা পার হলেই বদলে গেছে আবহাওয়া। সকালে পরে আসা ভারী শীতের পোশাক খুলে ফেলা লাগল সবার। সূর্যের আলোয় চকচক করছে তাজমহলের চূড়া। মরক্কোর সম্রাট শাহজাহানের অপূর্ব এক স্থাপত্যের নিদর্শন এই তাজমহল। শোনা যার সম্রাট উনার স্ত্রীদের ঝামেলা থেকে শান্তি পাওয়ার জন্য তাজমহল নির্মাণ করেন। এখানকার প্রত্যেকটা ঘর সাউন্ড প্রুফ। আরেক ঘর থেকে সম্রাটের স্ত্রী যতই বকবক করুক, কিছুই সম্রাটের কানে আসবে না। আহা! কী দুর্দান্ত নির্মাণ।”
সামান্য এই কয়েকটা লাইন পড়েই যারা কপাল কুঁচকে, চোখ উল্টে, ঠোঁট বাকিয়ে ভাবা শুরু করেছেন- ‘আরে ভাই এসব কী? পাগল টাগল হলেন না-কি? অদ্ভুত তো!’ তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ‘রুকো জারা! সবুর করো। পিকচার আভি বাকি হ্যায়।’ এটা তো কেবলই একটি গল্পের অংশ ছিল। বইয়ের নাম বললে আরেকবার অস্ফুটস্বরে বলতে হবে- অদ্ভুত তো!
জি হ্যাঁ, খানিক অদ্ভুতই বটে। কারণ বইয়ের নাম ‘গ্রিন কফি’। গ্রিনটি কিংবা ব্ল্যাক কফি নয়। এমনকি টি-কফির সঙ্গে বইটির শত আলোকবর্ষ দূরত্বের কোনো সম্পর্কও নেই। তাহলে বইয়ের এমন অদ্ভুত নাম কেন? খুব সিম্পল জবাব। বইয়ের গল্পগুলো অদ্ভুত, তাই। অন্তত লেখকের সেটাই দাবি। লেখক কেন এমন দাবি করেছেন, সে প্রসঙ্গে যাবার পূর্বে চলুন গল্পগুলো সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাক। তারপর নাহয় আপনারাও বিচার করবেন, গল্পগুলো কতটা অদ্ভুত!
(স্পয়লার ফ্রি বর্ণনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করব। সেইসাথে নিজের অভিমত জানাব। তবুও যদি ঈষৎ পরিমাণে স্পয়লার হয়ে যায়, এলাকার ছোটভাই ভেবে ক্ষমা করে দেবেন; আর হাতে তুলে দিবেন দুই টাকা দামের চকোচকো)
০১। ভিটামিন ডি: অনিক-নীতুর মিষ্টি প্রেমের গল্প। খালুর খামখেয়ালী আর খালার হেয়ালীপনার মাঝখান দিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো অনিকের প্রেম গজিয়ে ওঠে। চাওয়া পাওয়া এবং আশা প্রত্যাশার জট বাঁধলেও শেষপর্যন্ত সবকিছুর সমাধান মিলে যায়। রম্য রোমান্টিক টোনে লেখা। পড়ার পর পাঠকও ভিটামিন-ডি এর অভাব অনুভব করবে। তবে গল্পটা একটু বেশিই প্রেডিক্টেবল।
০২। অদ্ভুত মন: আবার প্রেমের গল্প। এবার তামিম-ফারিয়া। এটা ঠিক রম্য নয়। খুব সিম্পল, স্বাভাবিক একটি গল্প। লেখকের ভাষায়- কারো জীবনের সঙ্গে মিলে গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না টাইপ গল্প। চরিত্রের মাঝে যেমন মুড সুইং দেখতে পাওয়া যায়, পড়ার সময় পাঠকের মাঝেও মুড সুইং দেখা যেতে পারে। গল্পের শেষদিকে হালকা মোড় থাকলেও তা সঠিক রাস্তায় নিয়ে যায় না। এভারেজ টাইপ।
০৩। অনুভূতি সমগ্র: আবারও প্রেমের গল্প। এবার আসিফ ও তৃণা। তবে প্লট একটু ব্যতিক্রম। বইয়ের সবচাইতে বড় গল্পও এটি। হতদরিদ্র, হতভাগা আসিফের স্ট্রাগলের শেষ নেই। পরিবার ও প্রিয় মানুষদের আগলে রাখার জন্য একটা চাকরি তার বিশেষ দরকার। কিন্তু চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে অদ্ভুত মানুষের খপ্পরে পড়ে। ছোট্ট এক শর্তে কোটিপতি হবার সুযোগ পায়। যার ফলাফল আসিফের সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়। গল্পের শুরুটা সাদামাটা মনে হলেও শীঘ্রই তা ভিন্নদিকে মোড় নিতে শুরু করে। পুরোপুরি রম্য হয়নি। তবে ফিল-গুড টাইপ গল্প।
০৪। মুহূর্ত: ওয়ান্স এগেইন, প্রেমের গল্প। এবার অনিক-তিথি। বইয়ের গল্পগুলো উদ্ভট আর রম্য দাবি করা হলেও এই গল্পটি তার কোনো কাতারেই পড়ে না। এটি রোমান্টিক ধরনের, খানিকটা বিষাদময়। তবে বেশ সুন্দর। লেখক ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, গল্পটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বপ্ন লজ্জাহীন’ উপন্যাস হতে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা।
০৫। একটি ভ্রমণ কাহিনি: বইয়ের সবচাইতে উদ্ভট গল্প। আবার ঠিক গল্পও নয়, ভ্রমণ কাহিনি আরকি! লেখক তার মনের মাধুরী মিশিয়ে দেশ-বিদেশ, বিভিন্ন স্থাপনা, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ইতিহাস সংস্কৃতির সাড়ে সর্বনাশ করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি তো ভীষণ মজা পেয়েছি। হাসতে হাসতে মূর্ছা যাচ্ছিলাম বারবার। কিন্তু যারা ভ্রমণপিপাসু, টুকটাক ভূগোল ও ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন; তারা এটি পড়ার পর সপ্তাহখানেক অজ্ঞান থাকলে অবাক হবো না। পড়ুন এবং নিজের চুল ছিঁড়ুন।
০৬। হিরো: ভাইরে, আবারও প্রেমের গল্প। এবার হাসান ও মহুয়া। অবশ্য এই গল্পে প্রেম জমে ক্ষীর হয়নি। ছ্যাকা খেয়ে ব্যাকা হবার পরেও জীবনে একজন সত্যিকারের হিরো হওয়ার সাধ কম-বেশি সবারই থাকে। আর তাইতো সাড়ে ছয় বছর পর প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা হলে হাসান নিজেকে হিরো হিসেবেই তুলে ধরে। আসলে বাস্তবতা যেমনই হোক, ভাবনা কিংবা কল্পনার রাজ্যে আপনি-আমি সবাই হিরো। না-কি হিরোইন, কে জানে!
০৭। বউয়ের বিয়ে: বর্তমান সময়ের আলোচিত ইস্যু- ডিভোর্স। আর এ নিয়ে লেখক যেন বহুকাল আগে থেকেই ভাবনাচিন্তা করছেন। যার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে গল্পটিতে। ডিভোর্স সংক্রান্ত জটিলতা এবং তার সমাধান খুঁজে গল্পে রীতিমতো প্রয়োগও করেছেন। যেখানে দেখা যায়, শ খানেক বছর পর নিয়ম তৈরি করা হয়েছে প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় পৃথক বিয়েতে অংশ নেবে। একবার চিন্তা করেন অবস্থা। চিন্তা করতে না চাইলে গল্পটা অন্তত পড়ে দেখুন। ভেরি ইন্টারেস্টিং।
০৮। ভূত হওয়ার সহজ উপায়: ট্রেন জার্নিতে আজহার সাহেব এক অদ্ভুত লোকের পাল্লায় পড়েছেন। যে কিনা গায়েপড়ে এসে ভূত হবার উপায় বাতলে দিচ্ছে। শুধু কি তাই? ভূত হবার কতরকম সুযোগ-সুবিধা, একের পর এক তার বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এটি হতে পারতো আদর্শ ভুতুড়ে গল্প। কিন্তু আফসোসের বিষয়, গল্পটা জমেনি। হুট করেই শুরু, হুট করেই শেষ। বইটা শেষ করার পর মনে হয়েছে, এটা যেন জোর করে ঢোকানো। যা বাদ দিলেও বইয়ের বিশেষ কোনো ক্ষতি ছিল না।
০৯। বারো এপ্রিল: আমরা অনেকেই কুসংস্কার, সুপারন্যাচারাল ঘটনা কিংবা অন্ধ বিশ্বাস পুষে রাখি। বিশেষ কোনো ব্যাপারে এমন বিশ্বাস তেরি করি, যা কেউ খণ্ডন করতে পারে না। অনেকটা রাশিফলের মতো, যারা নিউমারলজি অনুসরণ করেন; তারা বিশেষ সংখ্যায় বিশ্বাসী। এই গল্পের প্রধান চরিত্রও তেমন। তার কাছে সংখ্যাটা ১২, এপ্রিল মাসের বারো তারিখ। যার সঙ্গে জীবনের সাফল্য, প্রেম, সংসার, পেশা, জরুরি সবকিছু জড়িত। আপনি যদি কো-ইন্সিডেন্স ব্যাপারটাতে সামান্য হলেও বিশ্বাস রাখেন, তাহলে সেটাকে মগবাজার টু মঙ্গলগ্রহে নিয়ে যাবে গল্পটা।
১০। একটি চিরায়ত প্রেমের গল্প: বাংলা সাহিত্যে প্রেম-ভালোবাসা যেন গদবাঁধা নিয়মে আটকা। ঘুরেফিরে একই কাহিনি, একই বর্ণনা। যেখানে নায়ক ভরদুপুরে অসম্ভব রূপসী, দেখতে অপ্সরীর মতো নায়িকার প্রেমে পড়ে। শুরু হয় আদিখ্যেতা, সংগ্রাম, ভালোবাসার লড়াই। শুধু কি সাহিত্য? গল্প, উপন্যাস থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা, সিরিজ সবখানে একই ক্যাচাল। কিন্তু এই গল্পের আবির চরিত্রটা একদম ভিন্ন। সেকেলে প্রেম-ভালোবাসায় সে বিশ্বাসী নয়। তার পরিবর্তন দরকার, নতুন কাহিনি দরকার। কিন্তু গল্পের মারপ্যাঁচে পড়ে সে এতটুকু স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারে, কাল্পনিক জগৎ আর বাস্তব জগতে বিস্তর ফারাক আছে। এরপর কী হয়? জানতে হলে পড়তে হবে। ইউনিক আছে গল্পটা। শেষের দিকে ব্রেকিং দ্য ফোর্থ ওয়ালের যে টুইস্টটা, এক কথায় অসাধারণ।
১১। পাশাপাশি দুইজন: মাসুম ও জায়েদ দুই বন্ধু। তাদের একসাথেই বেড়ে ওঠা, একসাথে লেখাপড়া, একসাথে ফেল করা... মানে সবকিছুই একসাথে। যেন দুটি দেহে একটি প্রাণ। আর সেই প্রাণ নিয়েই টানাটানি লেগে যায় যখন তারা ‘কৌন বানেগা আলসেমির রাজা’ টাইপ কার্যক্রম শুরু করে। গল্প বাঁকবদল করলে আরও চরিত্র যুক্ত হয়। তখন গিয়ে পরিষ্কার হয় মূল কনসেপ্ট। তুলনাহীন এই গল্পই শেখাবে ‘তুলনা করতে নেই’।
১২। দাবাড়ু: স্যোশাল সাইটে এখন হরহামেশাই আইওয়াশ, ডাবল মিনিং, মাইন্ড চেক টাইপের ছবি বা পোস্ট দেখতে পাওয়া যায়। তা দিয়ে আপনার চিন্তাধারা স্বাভাবিক না-কি নোংরা, সেটার পরীক্ষা চলে। যেমন খুব কমন একটা ভাইরাল টেম্পলেট হলো- ‘লিজেন্ডরা বুঝবে, বাকিরা খুঁজবে’। এতকিছু বলছি কারণ, গল্পে শারমিন ও মনির অফিস কলিগ। যারা নিজেদের পৃথক পরিবার থাকা সত্বেও হোটেল ভাড়া করে একসাথে সময় কাটায়। নাহ, যা ভাবছেন তা নয়। তারা মূলত খেলে! ভাইরে, বোনরে; প্লিজ গা*লি দিয়েন না। তারা কী খেলে, সেটা গল্প পড়লেই বুঝতে পারবেন। আর গল্পের যেমন বর্ণনা, পড়ার পর নিজের মন ও ভাবনাকে ইচ্ছেমতো তুলোধুনো করতে ইচ্ছে করবে। মারাত্মক এক্সিকিউশন।
১৩। শখের গোয়েন্দা: মারুফ আহমেদ ছোটবেলা থেকেই গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস পড়ে। ব্যাটা নিজেও গোয়েন্দা হবার জন্য একপায়ে খাড়া। সুযোগ বুঝে ‘নো মোর সিক্রেট ডিটেকটিভ হাউজ’ নামে একটা সংস্থাও খুলে বসে। কথায় আছে- শখের তোলা আশি টাকা। তাই শখের পেছনে ছুটতে গিয়ে হুজুগে ঝাঁপিয়ে পড়ে এলাকার এক খুনের তদন্তে। তারপর যা ঘটে, জানার পর হাসবেন না কাঁদবেন ঠিক বুঝেই উঠতে পারবেন না। অস্ফুটস্বরে মুখ থেকে হয়তো বেরিয়ে আসবে- ‘বিশ্বাস করবেন না রাসেল ভাই, একেবারে যা-তা অবস্থা!’
১৪। ম্যাসেজ: শেষ গল্পটা মোটামুটি ধরনের। তমাল নামের একটি ছেলে সবকিছুতেই শিক্ষণীয় কিছু খোঁজে। ম্যাসেজ বা বার্তা, শিক্ষা পাওয়া যাবে এমন আশায় নাটক-সিনেমা দেখে, গল্প-উপন্যাস পড়ে, গেমস খেলে, ফেসবুক চালায়। সবই করে, শুধুমাত্র স্কুল-কলেজে যায় না। এরপর ঘটনাক্রমে রম্যলেখক সোহাইল রহমানের পাল্লায় পড়ে এবং তাকে আলোর পথে আনার চেষ্টা-তদবির চালায়। বইয়ে শিক্ষণীয় কিছু না থাকলেও এই গল্পের শেষ কয়েকটি লাইনে শিক্ষণীয় কিছু দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করা হয়েছে।
এই ছিল বইয়ের ১৪টি গল্প। অল্পবিস্তর জানলেন তো। এবার পুরো বই নিয়ে কিছু বলার পূর্বে ভিন্ন একটি প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে চাই।
বইটি প্রকাশের পর থেকে গুডরিডস, রকমারি সাইটসহ বিভিন্ন গ্রুপে এটির রিভিউ পড়ে যা বুঝতে পেরেছিলাম, পাঠকদের বৃহৎ একটি অংশ কিঞ্চিত হতাশ হয়েছেন। এবার যখন আমিও পড়লাম, হতাশার কারণসমূহ অনুসন্ধানের চেষ্টা করলাম। সবচাইতে বড় যে লুপহোলটি নজরে এসেছে, তা হলো- রকমারিতে বইটির জনরা দেওয়া আছে ‘রম্য গল্প’। প্রকাশনী এবং লেখকও রম্য গল্পের বই হিসেবে ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং করেছেন। আর লেখক যখন সোহাইল রহমান, নিঃসন্দেহে পাঠকের এক্সপেক্টেশন ছিল তারা আগাগোড়া রম্য গল্পের বই পেতে যাচ্ছে। কেননা বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় রম্যলেখক বলতে সবার প্রথমে সোহাইল রহমানের নামই আসে।
অথচ বইটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, এটি পুরোপুরি রম্য গল্পের বই নয়। আবার এটাকে সমকালীন গল্পগ্রন্থও বলা যায় না। কেননা সমকালীন গল্প এরকম অদ্ভুত বা উদ্ভট হয় না। আমার ধারণা, লেখক এখানে যৎকিঞ্চিত এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। নিজের চিরাচরিত গল্প বলার ঢং থেকে বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু লিখতে চেয়েছেন। তাই রম্যের চাইতে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে প্রেম-ভালোবাসা, জীবনের অতি সাধারন ঘটনার ভিন্ন উপস্থাপন। জনরাও তাই রম্য থেকে কখনো স্যোশাল, রোমান্টিক, ফ্যান্টাসি, সাইফাই, থ্রিলারে শিফট হয়েছে।
হ্যাঁ, প্রতিটি গল্পেই লেখকের সিগনেচার লিখনশৈলী ও সেন্স অব হিউমারের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু তারপরও প্রতিটি গল্প রম্য ছিল না। এমনকি বেশকিছু গল্পে যত্নের অভাবও ছিল। সেইসাথে ছিল এক্সিকিউশনের তাড়াহুড়ো। পাঠকের হতাশ হবার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। তাই অনেকেরই হয়তো রম্য গল্প পড়ার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
কিন্তু তাই বলে কি বইটি বাজে হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে বই নিয়ে আমার অনুভূতি জুড়ে দিচ্ছি। প্রতিটি লেখকেরই নিজের পছন্দ অনুযায়ী লেখার স্বাধীনতা রয়েছে। নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু লেখার অধিকার রয়েছে। সোহাইল রহমান ‘গ্রিন কফি’তে ঠিক সেটাই করেছেন এবং ব্যাপারটিকে সাধুবাদ জানাই। এই প্রথম তার চিরাচরিত রম্যের বাইরেও ব্যতিক্রম কিছু পড়ার সুযোগ হলো।
তবে এখানে বড় দুটি প্রশ্নও তৈরি হয়। রম্য লেখক হিসেবে সোহাইল রহমান কেমন? উত্তর- অনবদ্য। কিন্তু গল্পকার হিসেবে? এই বই বিবেচনায় তিনি খুব সহজেই পাশ নম্বর পাবেন। কিন্তু ভালো নম্বর দেওয়া মুশকিল। গল্পগুলো নিয়ে লেখকের আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত ছিল। আরেকটু যত্ন ও সময় দিলে বইটি অসাধারণ হতে পারতো।
অভার-অল কেমন ছিল পাঠ অভিজ্ঞতা? আমার তো বেশ ভালোই লেগেছে। সুন্দর সময় কাটিয়েছি বইয়ের সঙ্গে। বানানে বেশকিছু ভুল ছিল। তবে সেটা নজর আন্দাজ করাই যায়। এই জমানায় লেখকেরা যেখানে থ্রিলারের পেছনে ছুটছেন, বাকিদের কেউ কেউ বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষণীয় বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, আর কেউ-বা সুযোগ পেলেই জ্ঞান কপচে যাচ্ছেন; সেখানে ব্যতিক্রম এই লেখক বইয়ের প্রচ্ছদেই উল্লেখ করে দিয়েছেন- ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: এই বইয়ে শিক্ষণীয় কিছু নেই।’ কথা সত্য। তবে বইতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনোদন রয়েছে। এই ব্যস্ত শহরে, শত ঝুট-ঝামেলার মাঝে খানিক হাসিখুশি সময় কাটাতে চাইলে গ্রিন কফি নিয়ে বসে পড়তে পারেন।
চমৎকার প্রোডাকশনে বইটি প্রকাশ করেছে ভূমিপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন পরাগ ওয়াহিদ। খুব সহজেই ঘরে বসে বইটি রকমারি সাইট থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন। .
ফেসবুকে উনার লিখাগুলো পড়ে যতোখানি ভালো লেগেছে সেই প্রত্যাশা থেকে বইয়ের গল্পগুলো পড়তে গিয়েছি বলে কিছুটা হতাশ হয়েছি। হতাশার কারণ গল্পগুলো নয়, বরং সোহাইল রহমান আরও চমৎকার কিছু লিখতে পারেন এবং পারবেন বলেই আমার মনে হয়েছে।
বই পড়া জীবনে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম পল্লি কবি জসীম উদদীনের বিখ্যাত , ' বাঙালীর হাসির গল্প-১' রম্যরচনা বইটি পড়ার মাধ্যমে। জীবনে এত বই টই পড়ব এমন আশা করে আমি বই পড়ার জীবনে জন্ম নেই নি। স্কুলে সপ্তাহের একটা দিন 'কালচারাল প্রোগ্রাম' হত আমি সেখানে 'বাঙালীর হাসির গল্প ' বই থেকে রম্য গল্প শুনিয়ে সারা স্কুলের পোলাপানদের হাসাতাম যদিও উদ্দেশ্য ছিল একজনকে হাসানোর। একটি মেয়ে ছিল, সিনিয়র । 'কালচারাল ক্লাসে ' বেঞ্চের মাঝখানের দিকে বসে আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকত। তার পরিষ্কার ঝকঝকে দাঁতের হাসি দেখার জন্য আমি 'বাঙালীর হাসির গল্প' বইটি দুদিনে মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। যদিও 'কালচারাল ক্লাস' মাস ছয়েক 'কন্টিনিউ' হলেও মেয়েটির প্রতি মুগ্ধতা আমার মাস দুয়েকের মধ্যে কেটে যায়।
যাই হোক, এবার সৃষ্টি 'গ্রিন কফি' ও সৃষ্টির কর্তা সোহাইল রহমানকে নিয়ে কিছু বলা যাক-
সোহাইল রহমানের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায় তার লেখা বই 'স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ' বইটি পড়ার পর। তারপর তার ফেসবুকের নিয়মিত একজন পাঠক আমি। বলা বাহুল্য, বইটি আমার কাছের ও তার প্রিয় একজন মানুষ আমাকে পড়তে দিছিল। তাকে ধন্যবাদ।
বেশ কয়েকবছর পর সোহাইল রহমান ভাই বই বের করলেন। আমি দারুণ খুশি হয়েছি। ভেবেছিলাম প্রি-অর্ডার করব কিন্তু মন সায় দিল না। ভাবলাম, একদিন আগে পরে বইটি নিলে কোনো সমস্যা নাই । তা বাদে, মানুষটিকে দেখা হবে, কথা হবে।
এবার বই মেলায় প্রথম বইটিই আমি কিনলাম, 'গ্রিন কফি।' বইটিতে চৌদ্দটি গল্প রয়েছে এবং প্রত্যেকটি গল্প ই 'যথাযথ সুন্দর ।' সাধারণত ছোটগল্প লেখা উপন্যাস লেখার থেকে ঝামেলা ও জটিল বলেই আমার কাছে মনে হয়। কেননা, ছোট গল্পের একটা 'বিশেষ শুরু' এবং 'শেষ হয়েও হইল না শেষ' এর মত একটা শেষ থাকাটা প্রয়োজনীয়। চৌদ্দটি গল্পই সেজন্য আমার কাছে 'যথাযথ সুন্দর' মনে হয়েছে। বেশ 'এনজয়' করে পড়েছি।
প্রথম গল্প 'ভিটামিন ডি' প্রথম প্যারাটা পড়তে গিয়ে মনে হলো 'হিমু ও তার মাজেদা খালা' কথা বলছে। আলাদা একটা নস্টালজিয়া!
সোহাইল ভাই বইয়ের প্রচ্ছদে একটা ডাহা মিথ্যা বলেছে, 'এই বইয়ে শিক্ষণীয় কিছু নেই' অথচ প্রত্যেক গল্পই বাস্তবতার দারুণ শিক্ষা আছে হাসিরচ্ছলে। স্পয়ল করব না কিন্তু বইয়ের তিন নম্বরটা গল্প 'অনুভূতি সমগ্র ' গল্পের নায়ক আসিফ যখন আবিষ্কার করে, " ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।কাউকে দিয়ে দিলেও না।বুকের এক কোনে থেকেই যায়।বেরিয়ে আসে সুযোগ বুঝে।ভালোবাসার অনেক ক্ষমতা। পৃথিবীতে ভালোবাসার থেকে ক্ষমতাশালী কিছু নেই।সে কি এত সহজে নিঃশেষ হতে পারে?"
এই যে বাস্তব দার্শন,চোখে আঙুল দিয়ে বড় শিক্ষা দেওয়া, এই বইয়ের অন্যতম একটা চম্বুক লাইন এটি।
যাক সমগ্র বইয়ে আমি দুটি বানান ভুল (প্রিন্ট মিসটেকও হতে পারে।আমার বিশ্বাস প্রিন্ট মিসটেসই) চোখে পড়ল। প্রথমটা 'একটি ভ্রমণ কাহিনি' তে ' শোনা যায়' এর জায়গায় 'শোনা যার' ও দ্বিতীয়টি হলো, 'খোঁজ' টা হয়ে গেছে 'খোজ' অর্থাৎ চন্দ্রবিন্দু গায়ের। এই লেখার শুরুর দিকেও আমার মনে ছিল দ্বিতীয় মিসটেকটা কোন গল্পের কোন জায়গার কিন্তু প্রথমটা মনে করতে পারছিলাম না। কিন্তু লিখতে বসে সঠিক জায়গায় এসে প্রথম মিসটেক মনে পড়লেও ভুলে গেলাম দ্বিতীয়টা।মজার না ব্যাপারটা,,,হিহিহিহি।
বইয়ের প্রচ্ছদটা দেখে মনে হয়েছে এই বইয়ের এর থেকে বেশ বেএএএএএএশ ভালো হতে পারত।
বইটি বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে, ভূমিপ্রকাশ প্রকাশনীতে।
ফেসবুকে পড়া সোহাইল রহমানের কিছু গল্প মাথায় গেঁথে আছে। হঠাৎ মনে হলেই নিজের অজান্তে হাসি। এ বইটার ক্ষেত্রেও আমার আশা ছিল, এমন কিছু গল্প পাব যেগুলো ফেসবুক থেকে পড়া গল্পগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। গল্প পড়ব আর হাসবো। কিন্তু এরকমটা হইনি। হতাশ হয়েছি। যদিও গুরুগম্ভীর কয়েকটা গল্প আছে।
লেখক বলে দিয়েছে, শিক্ষণীয় কিছু নাই বইয়ে৷ তবে হাসিরখোরাক হবে সেটা আশা করেছিলাম। কিন্তু আশানুরূপ হইনি।
বইয়ে মোট গল্প ১৪ টি __
গ্রিন কফি সোহাইল রহমান ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ভূমিপ্রকাশ পেজ ১২৮
খুব সুন্দর সুন্দর কয়েকটি গল্প রয়েছে এতে।কিছু গল্প পড়ে মনে হবে এ কেমন গল্প! যাদের ভালো হিউমার রয়েছে,তারা গল্প গুলো নিয়ে ভাবতে পারবে,আর যারা এজ ইউজুয়াল সিম্পল সরল গতিতে গল্প পড়া পছন্দ করেন,তাদের জন্য বোরিং মনে হবে। কয়েকটি এক দুইটা গল্প ভালো লাগেনি,তাই ৫ স্টার দিতে পারলাম না। সোহাইল রহমান মানেই বেস্ট রম্য লেখক হিসেবে চিনি,বাট এখানে সব গুলো রম্য গল্পের না,দুয়েকটা রম্য,আর বাকী সব অদ্ভুদ সব গল্প,যেগুলো পড়ে সত্যি অবাক হবেন।
যে এক্সপেকটেশন নিয়ে বইটা কিনেছি সেটা ফুলফিল হয়নি তবে আশা ছাড়ছি না।বইয়ের গল্প গুলি শিক্ষনীয় নয় তবে হাসি ঠাট্টা আরেকটু কড়া হলে ভাল হতো আর একেকটা একেক রকম হওয়ায় সবকিছুই জগা খিচুড়ি হয়ে গেসে।আশা করি ভবিষ্যতে ভালো কিছু বই পাবো।
সোহাইল রহমানের ফেসবুকে লেখা গল্পগুলোর মতো এই বইয়ের গল্পগুলো জমেনি। কয়েকটি মোটামুটি ভালো লেগেছে। কিন্তু অধিকাংশই ভালো লাগেনি। 'গ্রিন কফি' নিয়ে যতটুকু আশা ছিল, তার সিকিভাগও পূরণ হল না।