বিদ্রোহ ও তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ধূমকেতুর মতই আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। চিরাচরিত পঁচনধরা সমাজকে ভেঙে সুনির্মল এক নব্য সমাজ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। এজন্যই তিনি বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েছেন সকল অন্যায়-অত্যাচার, অসত্য, শোষণ-বঞ্চনা আর দুঃখ-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। ভিনদেশীদের শোষণ ও পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে তিনি হাতে তুলে নেন কলম। শুধু কাব্যের ঝংকার দিয়েই তিনি আপামর জনসাধারণের হৃদয়কে উন্মাদিত করতে সক্ষম হন। এ কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। তবুও এই বিদ্রোহী কবিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি কেউ। অন্ধকার কারাগারের অভ্যন্তরে বসেও তিনি গেয়েছেন সাম্যের গান। ঠিক এভাবে, অধ্যবসায়ী ও স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত এক যুগ প্রতিনিধি নজরুল, সাধারণ মানুষের হৃদয় কুঠরিতে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে নিতে সক্ষম হন।
তাঁর লেখা "সাম্যবাদী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা থেকে আমরা তাঁর সাম্যবাদী চিন্তাধারার ধারণা লাভ করতে পারি। সাম্য অর্থ সমতা। সাম্যবাদী অর্থ হল সকলে সমান, এমন ধারণা। মোট ১১ টি কবিতা নিয়ে রচিত হয়েছে কবি নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি নারী, চোর-ডাকাত, রাজা-প্রজা সহ সবাই যে সমান, সবাই যে মানুষ, এই ধারণার প্রবর্তন করেছেন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে।
এই বইয়ের প্রথম কবিতা "সাম্যবাদী"-র প্রথম লাইনে রয়েছে,
গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।
এখানে তিনি বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়, আদিবাসী, উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও বিভিন্ন দর্শনের অনুসারীদেরকে একত্রিত হওয়ার কথা বলেছেন। এগুলো বোঝাতে নির্দিষ্ট করে কবি যেসব নাম উল্লেখ করেছেন কবিতায়, তাহলো হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, ক্রীশ্চান, পার্সী, জৈন, ইহুদী, সাঁওতাল, ভীল, গারো, কনফুসিয়াস ও চার্বাক চেলা। এসব সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করার পর কবিতায় কবি মোট ৮টি ধর্মীয় গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন। যেগুলো হল যথাক্রমে কোরান, পুরাণ, বেদ, বেদান্ত, বাইবেল, ত্রিপিটক, জেন্দাবেস্তা ও গ্রন্থসাহেব। এরপর এসেছে এসব ধর্মের কিছু পথপ্রদর্শকদের নামও।
ধর্ম ও ধর্মীয় গোষ্ঠীদের প্রতি সাম্যের গান গাওয়ার পর কবি তাঁর ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করেছেন এই গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা "ঈশ্বর" কবিতায়। এই কবিতায় কবি ঈশ্বরের প্রকৃত তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন সব ধর্মের চেয়ে বরং মানুষের হৃদয়ের ধর্মটাই বড়। নিজের হৃদয়ে ঈশ্বর বিরাজমান বোঝাতে তিনি এই কবিতায় বলেছেন:-
কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
হায় ঋষি দরবেশ,
বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
সাম্যবাদী কাব্য সিরিজে সাম্য ও মানবতা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে "সাম্যবাদী" কাব্যগ্রন্থের তৃতীয় কবিতা "মানুষ" কবিতায়। কবি নজরুলের সাহিত্যে মানুষ ও মানবতা সবার ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেছে, তবুও তাঁর "মানুষ" কবি নজরুলের সে আদর্শ চরমভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি এই কবিতায় বলেছেন-
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি!
এ রকম আহ্বান কেবল কবি নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। ধর্মকে কেন্দ্র করে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি এভাবেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে কবি এই কবিতাটিতে মন্দির-মসজিদে তালা লাগানোর যে দুটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাতে পূজারী ও মোল্লাকে সমানভাবে অভিযুক্ত করেছেন।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের চতুর্থ কবিতা "পাপ" কবিতায় একইভাবে সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেলেও এটি একটি ভিন্নধর্মী কবিতা। এই কবিতায় কবি সাম্যের গান গেয়েছেন পাপ-বিদগ্ধ মানুষদের নিয়ে। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
সাম্যের গান গাই!–
যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।
তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল,
দেবতার পাপ-পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল!
বিশ্ব পাপস্থান
অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্!
কবি নজরুল একদিকে লিখেছেন "পাপ" কবিতা, অন্যদিকে এই কবিতার সম্পূরক হিসেবে লিখেছেন "চোর-ডাকাত" কবিতা। এটি এই কাব্যগ্রন্থের পঞ্চম কবিতা। "পাপ" কবিতায় তিনি যেমন পাপীকে ভাই বলে সম্বোধন করেছেন, "চোর-ডাকাত" কবিতায় তারই এক প্রকার অনুসরণ ঘটেছে। এখানে ভাই না হয়ে হয়েছে বন্ধু। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে?
চারিদিকে বাজে ডাকাতি ডঙ্কা, চোরেরই রাজ্য চলে!
চোর-ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ?
জিজ্ঞাসা করো, বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?
এরপর সমাজে যেসব নারী পতিতা বা বেশ্যা, যাদেরকে সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে, কবি নজরুল তাদেরকেও এনেছেন সাম্যের কাতারে। তাদেরকে কবি "মা" বলে সম্বোধন করেছেন। এছাড়া, তারাও যে মানুষ, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য কবি বিভিন্ন ঐতিহাসিক নারী চরিত্রকে উদ্ধৃতি হিসেবে টেনে এনেছেন কবিতায়। কবি সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ষষ্ঠ কবিতা "বারাঙ্গনা" কবিতায় বলেছেন :-
কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?
হয়ত তোমায় স্তন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের সপ্তম কবিতা "মিথ্যাবাদী" কবিতাও একটি ভিন্নধর্মী কবিতা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে কবি নজরুল মিথ্যাবাদীর পক্ষে কলম ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ভিন্নভাবে সত্যেরই জয়গান গেয়েছেন। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
মিথ্যা বলেছ বলিয়া তোমায় কে দিল মনস্তাপ?
সত্যের তরে মিথ্যা যে বলে স্পর্শে না তারে পাপ।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অষ্টম কবিতা "নারী" কবিতাটি বর্তমান সময়ের নারীবাদের প্রধান পাথেয় হয়ে রয়েছে। বর্তমান সময়ের নারী সমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এটা ভেবে বিস্মিত হতে হয় যে, কবি নজরুল তাঁর সময়ের চিন্তাভাবনা থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন। কারণ, নারীদের জন্য যখন ছিল বন্দী যুগ, সে সময় তিনি তাঁর এই "নারী" কবিতায় ঘোষণা করেছিলেন :-
সেদিন সূদূর নয়-
যেদিন ধরণি পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের নবম কবিতা "রাজা-প্রজা" কবিতাটি কবি নজরুলের সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত একটি বিশেষ কবিতা, যেখানে নজরুল জনগণের শক্তি ও রাষ্ট্রের মৌল উৎসকে তুলে ধরেছেন। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
সাম্যের গান গাই
যেখানে আসিয়া সম-বেদনায় সকলে হয়েছি ভাই।
এ প্রশ্ন অতি সোজা,
এক ধরণীর সন্তান, কেন কেউ রাজা, কেউ প্রজা?
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রায় একই অর্থের দুটি কবিতা রয়েছে। একটি "সাম্যবাদী", অন্যটি এই কাব্যগ্রন্থের দশম কবিতা "সাম্য"। একটি বিশেষ্য, অন্যটি বিশেষণ। আর দুটোরই মূল সুর প্রায় একই, বিষয়বস্তুও এক। তবে সাম্যবাদীতে ধর্ম ও দর্শনের বিষয়বস্তুই প্রধান, কিন্তু "সাম্য" কবিতায় বর্ণভেদের বিষয়টিও এসেছে। ফলে বর্ণবাদের অসাম্য ও শােষণের দিকটিও নজরুল কাব্যে স্থান করে নিতে পেরেছে। তিনি এই কবিতায় বলেন:-
সাম্যবাদী-স্থান
নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান।
নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গির্জা-ঘর,
নাইকো পাইক-বরকন্দাজ নাই পুলিশের ডর।
এই সে স্বর্গ, এই সে বেহেশ্ত, এখানে বিভেদ নাই,
যত হাতাহাতি হাতে হাত রেখে মিলিয়াছে ভাই ভাই!
সাম্যবাদী মার্কসীয় দর্শনের দিক থেকে এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা "কুলি-মজুর" কবিতাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 'মজুর' শব্দটি পৃথিবী জুড়ে জনপ্রিয় হলেও 'কুলি' শব্দটি সবদিক থেকেই অবহেলিত সম্প্রদায়। কবি নজরুল তাদের সবাইকে একত্রিত করেই সাম্যের গান গেয়েছেন এই কবিতায়। এই কবিতাটি তিনি শুরুই করেছেন একটি গল্পের ছলে। তিনি বলেছেন:-
দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
পরিশেষে, সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের ভিত্তি যা-ই হােক, তা দুনিয়ার যে-কোনাে সাম্যবাদী আদর্শ থেকে ভিন্ন। কমিউনিজম এবং কমিউনিস্টদের দ্বারা নজরুল নিঃসন্দেহে প্রভাবিত। কিন্তু নজরুলের সাম্যবাদ মার্কসীয়-লেনিনীয় সাম্যবাদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর সাম্যবাদে শ্রেণি আছে, বর্ণ আছে এ কথা ঠিক। কিন্তু ধর্মও আছে, উদার মানবতা আছে, আছে সামান্য চোর-ডাকাত, মিথ্যাবাদী প্রসঙ্গ, এমনকি তৃণমূল বারাঙ্গনা পর্যন্ত। নজরুল কোরানের সাম্যকেও তুলে ধরেছেন। এসব মার্কসীয় দর্শনের বাইরের বিষয়।
নজরুলের সাম্যবাদ সেদিক থেকে দুনিয়ার এ জাতীয় দর্শনের বাইরে কিছু, যেখানে নজরুল একা এবং অনন্য। তাঁর সাম্যদৃষ্টির পরিচয় উদ্ঘাটিত হয় তিনি যা লিখেছেন তাকে অবলম্বন করেই। চরম প্রতিকূল এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেমন তিনি বড়াে হয়ে উঠেছেন, তেমনি উত্তাল এক তরঙ্গের ভেতর দিয়ে পরাধীন ভারতকে তিনি স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল কাব্যজগত দর্শনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল। তাঁর কাব্যচর্চা ও অন্যান্য সৃষ্টিশীল লেখালেখির সময়কাল মাত্র দুটি দশক। আর এর মধ্য দিয়েই অনাগত বাংলা ও বাঙালির সমাজ এবং সাহিত্যকে তিনি দান করেছেন এক চিরায়ত সাম্য-দর্শন, যা যুগপৎ নজরুলের নিজস্ব, বাঙলা ও বাঙালির এবং মানুষের জন্য কল্যাণের। সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কবিতাবলির বিশিষ্টতা এখানেই।
বই : সাম্যবাদী
লেখক : কাজী নজরুল ইসলাম
প্রকাশনী : আগামী প্রকাশনী
মুদ্রিত মূল্য : ৮০ ৳
মোট পৃষ্ঠা : ৭১
প্রকাশ : জুলাই ২০০৭