হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের শেষটা থাকে কেমন যেন ধোঁয়াশা ঘেরা। এই শেষ হয়েও যেন শেষ হয় না। পরে কী হলো জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। কিন্তু লেখক যে শেষ করেন না। তিনি গল্পের সমাপ্তি পাঠকের কল্পনার উপর ছেড়ে দেন। পাঠক বুঝে নিবে, শেষটা কেমন হতে পারে। নিজের মতো করে সাজিয়ে নিবে পরবর্তী অধ্যায়।
আজ হুমায়ূন আহমেদের গল্প কেন? কারণটা আশরাফ সাহেব। তিনি এমন একটি বই খুঁজে পেয়েছেন যার শেষটা নেই। না, হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখক বইটার সমাপ্তি পাঠকের কল্পনায় ছেড়ে দেননি। "Cloud Flower & Rain" বইটার শেষ কয়েক পৃষ্ঠা হারিয়ে গিয়েছে। পুরানা পল্টন পুরনো বইয়ের দোকানে বইটা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন না থাকা পৃষ্ঠাগুলোর লেখনী তিনি নিজেই কল্পনা করে নিবেন। এখন আর তা পারছেন না। হাসফাঁস করছেন। শেষ পরিণতি জানার জন্য ব্যাকুলতা পেয়ে বসেছে। এত পুরনো বই, পাওয়া যাবে কোথায়?
এই গল্পে অনেকগুলো মানুষ আছে। পুলক, রিমি, পারুল, মাহিন কিংবা সজল। প্রত্যেকে নিজেদের জীবনে আলাদা হলেও কোথায় যেন এক সুতোয় বাঁধা। এক সুতোর টানে একে অন্যের জীবনে ঝড় ওঠে। টানাপোড়েনে গল্প লেখে নতুন কিছু।
এই যেমন, রিমির জন্য পুলকের ভালবাসায় কোনো কমতি নেই। কিন্তু রিমি কি ভালোবাসে পুলককে? বড়োলোক ব্যবসায়ীর আদরের দুলালী রিমি। কেন সে পুলকের মতো একজনকে ভালোবাসবে? ছেলেদের দ্রুত ভালোবাসতে নেই। সব সহজে পেয়ে গেলে যে এর মূল্য থাকে না।
ওদিকে রিমির জন্য ভালোবাসা জমিয়েছে মাহিনও। কোনো এক বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখেই ভালো লেগেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যেখানে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করার কথা, সেখানে সাত সকালে বাইক নিয়ে রিমিকে খুঁজতে যায়। খুঁজতে যায় নিজের ভালোবাসাকে। কিন্তু রিমির মনে যে অন্য কিছু খেলে। রিমি কার ডাকে ইশারা দিবে? পুলক, না মাহিন?
পুলক রিমিকে চাইলেও পারুলের সবকিছু জুড়েই যেন পুলক। বেস্ট ফ্রেন্ড থেকে সম্পর্ক কখন যে অন্য পথে হাঁটা ধরেছে বুঝতেও পারেনি পারুল। পুলকও যে বোঝে না। সে এখনো রিমির স্বপ্নে বিভোর। তাই পারুলের অনুভূতি বোঝার কোনো চেষ্টাই নেই তার কাছে। পারুলের নিজেকে অসহায় লাগে। কী করবে ও? কীভাবে বোঝাবে পুলককে নিজের মনের কথা? পুলক কি বুঝবে?
সজল পারুলের খালাত ভাই। অনেক বছর পর দেশে ফিরছে। সেই ভাইয়ের সাথে পারুলের বিয়ের কথা চলছে। পারুলের মা চান, বিয়ে করে সুখে থাকুক মেয়ে। কিন্তু পারুল যে চায় অন্য কিছু। না কি সে কী চায় সেটাই জানে না। বিয়ের জন্য মতও দিতে পারছে না। আবার পুলককে বলতে পারছে না মনের কথা। কী যে দোটানায় এ জীবন!
শিউলি আশরাফ সাহেবের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। কোনো কারণ ছাড়াই যখন প্রথম স্ত্রী চলে গেলেন, তখন একাকীত্বের জীবন ঘোচাতে বিয়ে করেন শিউলিকে। মেয়ে রিমি এখনো বিষয়টা মেনে নিতে পারেনি। তাই শিউলির সাথে পারতপক্ষে কথা বলে না। এই শিউলিও চলে যাবে না তো? আশরাফ সাহেবের যে একাকীত্বকে দারুণ ভয়!
বাবার সেই অসম্পূর্ণ বইয়ের খোঁজে পুরো নীলক্ষেত চষে বেড়িয়েও খুঁজে পায়নি রিমি। লেখক মনে হয় এই একটি মাত্র কপি লিখেছিলেন। আর সেটিই তার বাবার হাতে। আর বোধহয় পাওয়া যাবে না। কিন্তু কী করা যায়? বইটি খুঁজে না পেলে যে বাবার অস্থিরতা কাটবে না।
এই প্রেম, ভালোবাসার গল্প... বহুমুখী প্রেমের উপাখ্যান। কেউ জানে, কেউ জানে না। কেউ নীরবে চোখে হারায় প্রিয় মানুষকে। মানব মনের অনুভূতির এক অদ্ভুত গল্প। এখানে কে যে কার হবে? আদৌ কেউ কারো জীবনে বাঁধা পড়বে? কে জানে?
▪️বই পর্যালোচনা ও পাঠ প্রতিক্রিয়া :
লেখক মনোয়ারুল ইসলামের "মেঘ ফুল বৃষ্টি" যতটা না সামাজিক উপন্যাস, তার চেয়েও বেশি রোমান্টিক উপন্যাস হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। পাঠক হিসেবে আমি এই একটি জনরাকে অপছন্দ করি। ঠিক যেন হজম হয় না। তবুও "মেঘ ফুল বৃষ্টি" কোথায় যেন ভালো লেগেছে। তা লেখকের লেখনশৈলী এর গল্প বলার ধরন। লেখক যেভাবে মায়া দিয়ে লিখেছেন, সেই মায়াতেই বইটি একটানে শেষ করে ফেলা সম্ভব।
"মেঘ ফুল বৃষ্টি" মোটা দাগে প্রেমের উপন্যাস। এক দুইজনের প্রেম নয়। বহুমুখী প্রেমের গল্প। না পাওয়ার হাহাকার জমে ওঠেছে কিছু মানুষের জীবনে। আবার কেউ পেয়েও হয়তো সুখে নেই। কারণ, মন থেকে চাওয়া জিনিসটি তো আর পাওয়া হলো না।
মনোয়ারুল ইসলাম ভাইয়ের "মেঘ ফুল বৃষ্টি" উপন্যাসের অনেকক্ষেত্রেই চরকির সাথে সাদৃশ্য পেয়েছি। যেমন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ব্যাচের মধ্যে প্রেম, ভালো লাগা। আবার একজনকে দুইজন পছন্দ করে, তাদের রাস্তায় হুটহাট দেখা হয়ে যাওয়া। চরকিতেও রমনা পার্কের গল্প ছিল, এখানেও আছে। আবার সমাপ্তিও অনেকক্ষেত্রে মিল রেখে যাচ্ছে। তারপরও যদি তুলনা করা যায়, চরকির থেকে তুলনামূলক ভালো ছিল "মেঘ ফুল বৃষ্টি"। আরও পরিপক্ক হয়েছে লেখনশৈলী
মনোয়ারুল ইসলাম ভাইয়ের লেখায় বিত্তশালী মানুষের গল্প বেশি আসে। প্রচুর অর্থ আছে, সমাজে প্রভাব আছে এমন কিছু মানুষের গল্প লিখতেই বোধহয় তিনি পছন্দ করেন। আর গল্পে যে মধ্যবিত্ত মানুষের বিচরণ ঘটে, সে শেষবেলায় হারিয়ে যায়।
উপন্যাসের শেষটা বলা প্রয়োজন। শেষাংশের গল্পে কী হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। অনেকগুলো কাহিনি, কোনোটাই যেন পূর্ণতা পায়নি। যেন আশরাফ সাহেবের সেই পৃষ্ঠা হারানো বইয়ের মতো। আশরাফ সাহেব জানেন তিনি বইটি পেলে গল্পের শেষটা জানতে পারবেন। কিন্তু "মেঘ ফুল বৃষ্টি"র পাঠকের সে সুযোগ নেই। সেখানে কল্পনা-ই ভরসা।
▪️চরিত্রায়ন :
চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে লেখকের মুন্সিয়ানার তারিফ করতে হয়। খুব বেশি চরিত্রের বহর "মেঘ ফুল বৃষ্টি"তে ছিল না। যতটুকু ছিল, তার পূর্ণ ব্যবহার করেছেন লেখক। সবগুলো চরিত্র ছিল স্বমহিমায় উজ্জ্বল। চরিত্রের মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে গিয়েছে।
গল্পের সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র আশরাফ সাহেব। প্রচুর বই পড়া এই মানুষটিকে পছন্দ না করে আসলে উপায় নেই। বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা নাই বলে অস্থিরতা গ্রাস করে তাকে। মানুষ হিসেবেও অমায়িকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই মেয়ের সাথে সম্পর্ক বন্ধুর মতো। বাবা-মেয়ের এই মধুর সম্পর্ক বেশ মনে ধরেছে।
উপন্যাসে রিমি চরিত্রকে লেখক বারবার দেমাগী, অহংকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ আমার তা একবারও মনে হয়নি। রিমি স্পষ্টবাদী। কেবল নিজের মনের কথাই শুনে। এই অল্প বয়সে অনেক কিছুর সাক্ষী হওয়ার কারণে তার মধ্যে কাঠিন্য এক ভাব চলে এসেছে। এমন মানুষ আর যাই হোক অহংকারী হতে পারে না।
"মেঘ ফুল বৃষ্টি" বন্ধুত্বের গল্পও। এখানে লেখক পাওয়া, না পাওয়ার আক্ষেপ লিখেছেন। আমরা তো অনেককেই চাই। কিন্তু পাই কয়জন? আমরা যাদের আপন করে পেতে চাই, তাদের চাওয়া হয়তো অন্য কেউ। কেবল প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে নয়, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে।
বইয়ের সবগুলো চরিত্রকে আপন মনে হয়েছে। বিশেষ করে রিমি, পুলক কিংবা পারুলের যে গল্প লেখক বলেছেন; মনে হয়েছে বাস্তবতার মিশেলে তৈরি করা।
▪️কিছু খটকা :
"মেঘ ফুল বৃষ্টি" উপন্যাসে কিছু বিষয় অসামঞ্জস্য মনে হয়েছে। যেমন,
০ শিউলিকে রিমির অপছন্দ করার কারণ আমার কাছে শক্ত মনে হয়নি। বইয়ের শুরুতে বলা হয়েছে, রিমি তার মায়ের চলে যাওয়ার জন্য শিউলিকে দায়ী করে। অথচ তার মা যাওয়ার আগে শিউলির অস্তিত্ব আশরাফ সাহেবের জীবনে ছিল না। আবার বলা হয়েছে, রিমি আগে থেকেই মায়ের সব ঘটনা জানত। দুটি বিষয় আমার কাছে সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে। হিসেব মিলে না।
০ মাহিন যখন আড়তে বসতে চায়, তার কিছুক্ষণ আগে লেখা বাবা অসুস্থ হয়ে বাসায় আসে। মাহিন আড়াল থেকে শুনে মাকে বলে আড়তে বসবে। তখন মা খুশি হয়ে বাবাকে কল দিতে চায়। কিন্তু কল না দিয়ে বাসায় ফিরলে জানাবে। গল্প অনুসারে বাবা তো তখন বাসায় ছিল।
০ আড়তে বসা নিয়ে বাবা-মা কথা বলছিল। তখন বাবা বলে, স্কলারশিপ পেয়ে গেলে চলে যাবে। অথচ মাহিন যখন স্কলারশিপ পায়, তখন লেখা সে বাবা-মাকে না জানিয়ে আবেদন করেছিল। জানালে খুশি হবে কি না, এই সংশয় মাহিনের মনে।
▪️বানান, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ :
বানান নিয়ে কিছু বলা প্রয়োজন। বেশ কিছু বানান ভুল লক্ষ্য করেছি। যেমন 'জমজমাট'কে লেখা হয়েছে 'ঝমঝমাট', 'ঝমঝম বৃষ্টি'কে 'জমজম বৃষ্টি', 'কোণ আইসক্রিম'কে 'কোন আইসক্রিম'।
এছাড়া 'কী' এর ভুল ব্যবহার ছিল বইয়ের সবটা জুড়ে। যেখানে 'কি' হওয়া প্রয়োজন, সেখানে 'কী' লেখা ছিল। তাছাড়া দুয়েকটা ছাপার ভুল ছিল। যা বেশ চোখে লেগেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে যাওয়ার কিছু অংশে ফাঁকা জায়গা না রাখা। তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। দাগ দেওয়া গেলে হয়তো অসুবিধে হতো না।
লেখকের শব্দচয়ন চমৎকার। সবসময় মুগ্ধ করে। তারপরও সংলাপ অংশ ছাড়া কেন 'আর্লি', 'রেডি'র মতো শব্দ বারবার এসেছে জানি না। যেখানে প্রচলিত পারিভাষিক শব্দ ছিল।
এই বইয়ের প্রচ্ছদ দারুণ নজরকাড়া। বেশ মনে ধরেছে। যেন রংতুলিতে আঁকা। প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ। এখানে অভিযোগের কিছু নেই।
▪️পরিশেষে, মনোয়ারুল ইসলাম ভাইয়ের লেখনীর ভক্ত আমি। তিনি খুব সহজভাবে গল্প বলতে পারেন বলেই তার লেখা মুগ্ধভাব নিয়ে পড়ি। আমার প্রত্যাশা, তিনি তার এই সাবলীল লেখনীতে বিশাল কলেবরের কিছু সামনে নিয়ে আসবেন। যেখানে থাকবে জীবনের গল্প। সব ধরনের মানুষের গল্প। প্রেম থাকবে। তারপরও সমাজের প্রতিটি দৃষ্টিকোণ ফুটে উঠবে। তার শক্তিশালী লেখনীতে এমন কিছু পড়ার অপেক্ষায় আছি। মুগ্ধতার পাল্লা যেখানে আরও ভারী হবে।
▪️বই : মেঘ ফুল বৃষ্টি
▪️লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম
▪️প্রকাশনী : অন্যধারা
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৪৪
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫