তুই আমাদের সন্তান। আমরা তোকে প্রাণ দিয়েছি। আমাদের টিকে থাকতে হবে...
মানুষের মাধ্যমেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। নিজেকে টিকিয়ে থাকার এই লড়াই চলছে সৃষ্টির শুরু থেকে, চলবে শেষ পর্যন্ত। নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সুযোগ নেই। পৃথিবীটা ভালো এবং মন্দের, আলো এবং আঁধারের। এখানে সবাই টিকে থাকতে চায়।
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
রতনের জন্মটা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। জন্ম থেকেই কোমড়ের নিচের অংশ নেই। তারপরও রতন বেঁচে আছে। একে একে পঁচিশটি বছর পার হয়েছে। মা মতিয়ারা বেগমের একমাত্র সম্বল হয়ে টিকে আছে। যাকে জন্মের সময়ই ছেড়ে চলে গিয়েছিল তারই বাবা। তারপর থেকে মায়ের বেঁচে থাকার লড়াই। এই লড়াইয়ে প্রধান অস্ত্র রতন। শরীরের নিম্নাংশ না থাকলেও, এই রতনের উপার্জনেই জীবনযাপন চলে। এছাড়া আর যে উপায় নেই।
কায়সারের খুব ইচ্ছে তারই খালাতো বোনকে বিয়ে করে সংসারি হবে। কেমন যেন টান অনুভব করে মেয়েটার প্রতি। সেভাবেই চলছিল। হঠাৎ একদিন জানতে পারে সেই মেয়েটির বিয়ে। এরপর মন ভাঙা এক গল্পের সাক্ষী হয় কায়সারের জীবন। সেই জীবন রাঙিয়ে দিতেই যেন এসেছে টিনা। তখন কায়সার চাকরি করে। প্রমোশন হয়েছে। এখন তাকে চলে যেতে হবে অজপাড়াগাঁয়ে। হেমনগর নামের সেই গ্রামে কী করে থাকবে শহুরে টিনা? তবুও সে কায়সারকে ছাড়া থাকতে পারবে না। গ্রামীণ এক পরিবেশে শুরু হলো তাদের সেই সংসার জীবন। কিন্তু সে জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়। কিছু একটা ভীত করে তুলছে টিনাকে। সত্য, না কি নিছক কল্পনা? টিনার ভয়ের উৎস কোথায়?
মতিয়ারা বেগমের এমন এক অতীতের সাক্ষী, যেই অতীত বারবার যেন ফিরে আসতে চায়। মতিয়ারা বুঝছে, আবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সব মিলেমিশে একাকার। সাথে এক অপার্থিব শক্তি। সে শক্তির সাথে লড়াই করে সাধ্য কার?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
একজন লেখক যখন নিজের লেখার একটি মানদণ্ড তৈরি করেন, তখন বারেবারে তুলনা চলে আসে। লেখক মনোয়ারুল ইসলামের "বকুল ফুল", "বাঁশি" কিংবা "অতঃপর কবি মঞ্চে উঠিলেন" যেভাবে রচনা করেছেন; সেই মনোয়ারুল ইসলাম স্বাদ "অদ্ভুত আঁধার এক" বইটিতে পাইনি। মনে হয়েছে কোথায় যেন কমতি রয়েছে।
গল্পের শুরুটা সাদামাটা। এই গল্পে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে। আছে স্বার্থপরতার গল্প। আবার নিজেকে সর্বেসর্বা দেখানোর প্রয়াস। আমরা যা চোখের সামনে দেখি, মাঝেমাঝে তা সত্য নাও হতে পারে। এর গভীরে থাকে অন্য কোনো উদ্দেশ্য। যা আমরা দেখি না। যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।
"অদ্ভুত আঁধার এক" বইটি লেখক লিখেছেন সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে। যেন কেবল গল্প বলে গিয়েছেন। লেখকের লেখনশৈলি নিয়ে অভিযোগ করার জায়গা নেই। এমন লেখনশৈলিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম হেমনগর নামের গ্রামটিতে। মনে হয়েছে, কিছু সময় আমিও যেন সেই গ্রামের বাসিন্দা।
শুরুর আর মাঝামাঝিতে গল্পটা সাদামাটা এক ভৌতিক, গা ছমছমে অবয়ব থাকলেও পূর্ণতা দিতে পারেনি। তবে শেষটা বেশ ভালো লেগেছে। যদিও মনে হয়েছে খুব দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটছে। আরো কিছু পৃষ্ঠা থাকলে বোধহয় মন্দ হতো না। বিশেষ করে শেষ সময়ে বেঁচে থাকার যে আকুতি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন, তা দারুণ।
চরিত্রগুলোও একদম খাপেখাপ। আমদের চারপাশের মানুষগুলোর সাথেই যেন পরিচয় করিয়ে দেয়। এছাড়া গল্পের গতিও ছিল বেশ। দ্রুততার সাথেই শেষ করে ফেলার মতো একটি বই।
▪️যা ভালো লাগেনি :
এই বিষয় নিয়ে আমার অনেক অভিযোগ আছে। আজকালকার অনেক লেখককেই দেখি যৌ ন তা নিয়ে রগরগে কিছু বর্ণনার আশ্রয় নেন, যার হয়তো অনেক বিষয়ের দরকারও থাকে না। তারপরও কেন বইয়ে এ জাতীয় লেখা আনতে হবে? অন্যদের বিষয় জানি না, আমার ঠিক পছন্দ হয় না। এগুলোতে বারবার হোচট খেতে হয়। মনোসংযোগ ব্যাহত হয়। গল্পের তাগিদে আনলে ঠিক আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
একটা প্রশ্নের উত্তর বইটিতে পাইনি। যে বিশাল বড়ো মাছ কাটার পর যে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার কারণ কী? তবে কি সেটা মাছ নয়, অন্য কিছু? এছাড়া নীল রঙের বিষয়টাও খোলাসা করা হয়নি।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য : "অদ্ভুত আঁধার এক" বইটির সম্পাদনা ছিল দুর্দান্ত। বানান ভুল তেমন একটা দেখা যায়নি। দুয়েকটা ছাপার ভুল ছিল। দুয়েক জায়গায় নামের অদল বদল হয়ে গিয়েছিল। যেমন, কায়সার হয়ে গিয়েছিল রতন।
নালন্দা প্রকাশনীর প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে অভিযোগ থাকার উপায় নেই। বরাবরই সেরা কাজটিই তারা করে। তবে দামের দিক দিয়ে একটু আক্ষেপ থাকে। বর্তমান বাজারে যেখানে সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে কাগজের মান কমিয়ে এনে দাম পাঠকের নাগালে রাখতেই পারে। ১৫০ পৃষ্ঠার বই আমার ৪০০ টাকা অতিরিক্তই মনে হয়েছে। সেই কারণে ইচ্ছে থাকার পরও প্রকাশনীর অধিকাংশ বই-ই কেনা হয় না।
▪️পরিশেষে, "অদ্ভুত আঁধার এক" প্রাপ্তমনষ্কদের জন্য উপযোগী। তাই সেই চিন্তা মাথায় নিয়েই বইটি পড়া উচিত। এক বসায় পড়ার ক্ষেত্রে উপভোগ্য। তবে অতিরিক্ত প্রত্যাশা হতাশার সৃষ্টি করতে পারে।
▪️বই : অদ্ভুত আঁধার এক
▪️লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম
▪️প্রকাশনী : নালন্দা
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৫০
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৪০০টাকা
▪️ব্যাক্তিগত রেটিং : ৩.৮/৫