মানুষ হয়ে জন্মানোর একটা ফান্ডামেন্টাল যাতনা আছে। এই যাতনার অনেক রূপ। তবে উৎস একটাই। সেটা হলো মানুষের বুদ্ধিমত্তা। মানুষ তার মননে এমন এক ক্ষুধা নিয়ে অস্তিত্বে প্রবেশ করে যে, এখানে জীবনভর সমস্ত উপাদান গিলেও কখনোই সে ক্ষুধা মেটে না। কারণ, রিয়্যালিটির উদাসীন আচরণ আর দুর্বোধ্য রহস্যের মোড়ে মানুষকে প্রতিবারই এক চূড়ান্ত মূর্খতায় পর্যবসিত হতে হয়। এবং এখানে যাতনার উৎপত্তিটা হয় তখনই, যখন আমরা বুঝতে পারি যে, একই সময়ে আমরা মূর্খ এবং বুদ্ধিমান দুটোই। বুদ্ধিমত্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আত্মদর্শন অথবা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে লিপ্ত হওয়ার ক্ষমতা। আর এই কাজে— সবসময় সবাই না হলেও— মনুষ্যমন খুবই পারদর্শী। তবে এই কাজে কে কত গভীরে লিপ্ত হবে— কে কত গভীরে বিকল্পহীন যাতনায় ডুব দেবে সেটা ঠিক করার ফ্রি উইল কারও আছে কি না নিশ্চিতভাবে তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এবং আত্মদর্শনের চর্চায় আমরা আমাদের সকল ভঙ্গুর অঙ্গগুলোকে একেবারে কেটে ফেলে দিতে পারব কি না সে নিশ্চয়তাও দেওয়া সম্ভব নয়। যেটা নিশ্চিত সেটা হলো মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা— যদিও তার বণ্টনে কোন সমতা নেই— এর গভীর তাড়নায় নিজেকে দেখা, অন্যকে দেখা ও জগৎকে দেখার এক আনন্দমিশ্রিত যাতনায় কিংবা যাতনামিশ্রিত আনন্দে মানুষকে মেতে উঠতে হয় মনোদর্শন তথা নিউরোদর্শনে।
কবি, লেখক, অনুবাদক ও দার্শনিক। জন্ম ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের রংপুরে। পিত্রালয় কুমিল্লায়। ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। আগ্রহ সাহিত্য, সিনেমা, মনস্তত্ত্ব ও অস্তিত্ববাদী দর্শনে।
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে বাংলা ভাষায় ভাল বইয়ের অভাব। তবুও আমি অল্পকিছু ভাল বই পড়েছি। তারমধ্যে রুশদিনা খানের 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স' আর ডা. সাঈদুল আশরাফের 'Overcoming Depression' বই দুইটা ভাল লাগলেও সাধারণ মানের অর্থাৎ সাধারণ পাঠকদের জন্য লেখা ছিল; যার সবকিছুই যারা মোটামুটি বই পড়ে তারা সবাই জানে।
তবে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি লেখক শরিফুল ইসলামের 'নিউরোদর্শন' বইটা একটু ব্যতিক্রম। বটার মাঝে একটা ফিকশন আবহ আছে। আমাদের মনের ৩৬টা বিষয় নিয়ে লেখা ২১৮ পৃষ্ঠার এই বইটার প্রতিটা অংশ লেখার পর রেফারেন্স দিয়েছে যা আমার কাছে অনেক ভাল্লাগসে।
তাছাড়া প্রতিটা বিষয় নিয়ে ৩-৫ পৃষ্ঠার ভেতর আলোচনা করার সময় লেখক তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, দুনিয়ার ভাল ভাল বই, মুভি, লেখক আর সাইকোলজিস্টদের কথা বলেছে।
আমার মনে হয় বইটা সবারই ভাল লাগবে। গল্প আকারে লেখার কারণে সাহিত্যপ্রেমীরা পড়ে মজা পাবে। তাছাড়া নতুন অনেক কিছু জানতে পারবে।।
একটা ভালো খবর শুনলে এর বিশ্বস্ততা নিয়ে আমাদের সন্দেহ জাগে কিন্তু খারাপ খবর ঠিকই নির্দ্বিধায় মেনে নেই। পাশাপাশি আমরা সাধারণত খারাপ খবরে বেশি আকৃষ্ট কেন হই?
আমাদের আবেগ, অনুভূতি আর চিন্তাভাবনা গুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজ, পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের মানবীয় স্বভাবজাত আচরণই ঠিক করে দেয় আমরা কেমনভাবে পরিস্থিতির সাথে প্রতিক্রিয়া করব। নিউরোদর্শন বইতে মানবীয় এসব আচরণের ব্যাখ্যা সহজ ভাষায় প্রদান করা হয়েছে। প্রাঞ্জল ভাষাটা এই বইয়ের দুর্দান্ত ব্যাপার। প্রতিটি ব্যাখ্যার সঙ্গে বিভিন্ন গল্প, সিনেমা, সিরিজ এর কথা টেনেছেন। এই গল্পগুলো পড়তে দারুণ লেগেছে। সব মিলিয়ে নিউরোদর্শন বেশ ভালো লাগল।
তবে দুইটা অভিযোগ আছে। বইয়ের দামটা আরেকটু কম হতে পারত। সিক্সথ সেন্স মুভিটা দেখব ভেবেছিলাম কিন্তু গল্প বলতে গিয়ে লেখক পুরো স্পয়লার দিয়ে দিয়েছেন। ৪.৫/৫
"নিউরোদর্শন বইটা সাইজে ছোট, পৃষ্ঠা সংখ্যা ২১৯, কলকাতা তবুও প্রয়াস নামে একটি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে গত বছরের জানুয়ারি মাসে। বইটির অনেকটা অংশ আমি আগেই পড়ে ফেলেছিলাম লেখকের পোষ্ট থেকে, লেখকের কন্ঠ থেকেও আমি অনেক কিছু শুনেছিলাম বইটি সম্পর্কে এতে করে মনে হয়েছিল বইটি হয়তো আমার প্রায় পড়া হয়ে গিয়েছে, আসলে সেই ধারণাটা ভুল ছিল! ফেসবুক পোস্ট, লেখক বইটি সম্পর্কে কি বলল তারচেয়ে বেশি বলে বই স্বয়ং। বই নিজেই একটা কিছু হয়ে উঠে মেজাজে, ঝাঁজে ও চিন্তায়; বই হাতে নিয়ে পড়ার পর থেকে আসলে প্রকৃত পাঠ ও উন্মোচন শুরু হয়। সম্পূর্ণ বইটি ধীরে ধীরে আপনার সাথে কথা বলতে শুরু করে দেহের সাথে, মনের সাথে, আত্মার সাথে। বইটির উৎসর্গ পত্রটি একটা প্রবেশিকার মতোন,লেখক তাঁর মাকে উৎসর্গ করেছেন কিন্তু নিজের জন্মের জন্য অপরাধের দায় তার উপর চাপাতে চেয়েও পারেননি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও সম্ভব হয়ে উঠেনি।
সারা বই জুড়ে এই অস্তিত্ববাদী ক্রাইসিস, কেন জীবন, কোথায় মন, কিভাবে মন কাজ করে সেই তালাশ জারি থাকে। ছোট ছোট অধ্যায় কিন্তু একেকটা সুপ্ত বোমার মতো কখনো বিস্মিত হতে হয়, কখনো হতভম্ব লাগে আবার কখনো মনে হয় আমাদের অস্তিত্ব যেন বিষনুর স্বপ্নের ভেতর আধো আলো আধাঁরীর এক প্রকার রিয়ালিটি, আদতে আমরা আছি এটাও পুরোপুরি সত্যি না, আবার নেই এটাও সত্যি না। আমরা যেটুকু আছি সেটুকু নিজের মতো না, নিজের নিয়ন্ত্রণে না, যেন কোথাও কোন লাগাম নেই, স্বাধীনতা নেই; থুতু ফেলার ইচ্ছার স্বাধীনতা পর্যন্ত নেই! পশ্চিমা দর্শন, প্রাচ্য দর্শনের নিরিখে খোঁজ করা হয়েছে মানুষের মন ও দেহের সম্পর্ক, বিরোধ। দেহের কি নিজস্ব কোন বোধ আছে নাকি মনের জোরে, চিন্তার নিরিখে মানুষ জীবনের রজ্জুতে ঝুলে থাকে! চিন্তা না থাকলে মানুষের কি ঘটতো! অন্যান্য প্রাণীর মতো তাঁর অস্তিত্ব থাকতো কিন্তু চৈতণ্যের বিকাশ এভাবে ঘটতো কি না সন্দেহ!
মানুষ আসলে কি জ্ঞানী, মানুষ যে নিরন্তর জ্ঞানী হওয়ার ভান করে, আসলে অস্তিত্বের কতটুকু সে জানে, কতটুকু জানা সম্ভব, যেটার নিরিখে সে নিজেকে জ্ঞানী বলতে পারে! লেখক বলছেন, মনুষ্যমন মুর্খ। মানুষের মূর্খতার মোহময় এক ক্ষমতা আছে এবং এটা অসীম। এই ক্ষমতার বলেই দাঁড়িয়ে আছে মানবসৃষ্ট সকল কাঠামো, সকল গল্প। এই মূর্খতাই ঠেক দেয় মানুষের অস্তিত্ব -সংকট, সৃষ্টি করে মনুষ্যজীবনের উদ্দেশ্য'। সেই উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার জন্য, সেই হতাশা ধামাচাপা দিতেই আর্টের জন্ম হয়েছে। শিল্পকলার মাধ্যমে, মননের চর্চার মাঝ দিয়ে জীবনে অর্থ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে।
সাইকোলজি ও দর্শনের মিশেলে মনুষ্য মনের বিভিন্ন দিকের উপর টর্চ ফেলেছেন লেখক। যেমন ম্যানুপুলেশন অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, মনুষ্যমনকে কত সহজে ম্যানিপুলেট করা যায় ধর্মের নামে, ভিত্তিহীন মিথ্যা দিয়ে, মতবাদের নামে; মন নিজেকেই নিজে কিভাবে ম্যানুপুলেট করে সেটাও দেখিয়েছেন। মানুষ যখন কোন সিদ্ধান্ত নেয় সেটা সে কতটুকু স্বাধীনভাবে নিতে পারে! মন তখন দুইভাগে ভাগ হয়ে একে অপরের সাথে তর্ক কিরে, এক মন আরেকমনের উপর বিজয়ী হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়; খুব নির্জনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যায় কিন্তু আমরা ধরে নেই 'আমি' সিদ্ধান্ত নিলাম! আমাদের মস্তিষ্কের ভ্রম, ভয় ও স্বাধীনতাকে তিনি শনাক্ত করেন এতে করে মানবীয় অধিকাংশ কার্যকলাপ একধরনের ঠাট্টার মতো লাগে, হাস্যকর লাগে।
মানুষের কগনিটিভ বায়াজনেস নিয়ে দুর্দান্ত আলোচনা আছে। ওখানে লেখক দেখিয়েছেন একজন মানুষ যখনই কোন কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না তখনই সে সেটাতে বিশ্বাস করা শুরু করে, যেটার ব্যাখ্যা অনায়াস সেটাকে সে ব্যাখ্যা ছাড়া মেনে নেয় না। প্রাণের অর্থহীন চক্র, মানুষের আইডেনটিটি ক্রাইসিস নিয়ে এমন ভাষায় উনি লিখেছেন যেটা মর্মমূল ছুঁয়ে যায়। প্রাচীন কালের বাঘা বাঘা দার্শনিকদের সাথে একদম জীবিত দার্শনিকদের দার্শনিক মতবাদ পাশাপাশি রেখে মন ও জীবন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখকের পাঠ সাইকোলজি, দর্শনের সীমানা ছাড়িয়ে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সিনেমা পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়েছে। পাঠকের জন্য এটা ধাক্কার মতো হবে, বিষন্নতা জাগানিয়া হতে পারে একইসাথে নিজের কিছুটা ঝলক দেখতে পাওয়া যাবে বলেই মনে হয়েছে আমার।
বাংলা ভাষায় এটা একটা অভিনব বই, দর্শন-সাইকোলজির মতো জটিল বিষয়কে উনি সহজিয়া, পেলব ও কমনীয় করে তুলেছেন ভাষা প্রয়োগের মুন্সিয়ানায়।"
"বইটির নাম ‘নিউরোদর্শন’। ’২৩-এর বইমেলায় প্রকাশিত। বইটির নাম এবং প্রচ্ছদ দুটিই বেশ চোখে পড়ার মত। তারপর পড়া শুরু। নিউরো এবং দর্শন। কোনটি মূল উদ্দেশ্য? বইটি এবং পাণ্ডূলিপির নেপথ্য পড়ার পরে বোঝা যায় দর্শন রয়েছে কেন্দ্রে। সেই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বিভিন্ন স্নায়ু -মনস্তাত্ত্বিক তথ্যের মাধ্যমে। শুধু তাইই নয়, সংস্কৃতির আনাচেকানাচে চলে বেরিয়েছে লেখনী। সেখানে সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত সব এসে মিশেছে।
মনের বিভিন্ন ক্রিয়া ��িয়ে ছোট ছোট ৩৬টি অধ্যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে লেখকের ভূয়োজ্ঞান , অনুসন্ধিৎসু মন লক্ষণীয়। ভূমিকাতেই বলা হয়েছে দেহ ও মনের দ্বন্দ্ব (দ্বন্দ্ব অর্থে মিলন ও বিচ্ছেদ দুইই) হতে চলেছে মূল চালিকাশক্তি। দেহ থেকেই স্নায়ু এবং মনের অবস্থান নাকি মন থেকে স্নায়বিক দেহ? এক্ষেত্রে লেখক বিভিন্ন তথ্য- পরিসংখ্যান, নিরীক্ষা ও পরীক্ষার প্রসঙ্গ এনেছেন। পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব। আচরণবাদী, অস্তিত্ববাদী, বিশ্লেষণবাদী, উদ্দেশ্যবাদী বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব টুকরো টুকরো ভাবে হাজির করেছেন। এবং ব্যাপারটাকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন একটি দার্শনিক ভিত্তির ওপর। লেখক নিজেকেও কখনো পরীক্ষাগারে নিক্ষেপ করেছেন। আত্মকথন, সর্বজ্ঞকথন, তথ্য পেশ সবই হয়ে উঠেছে প্রকাশমাধ্যম। এবং ভাষাটিকে রেখেছেন একেবারে সাধারণ, যাতে এই বিষয়ে অদীক্ষিত পাঠকও পড়তে গেলে হোঁচট না খান। এটি এমন একটি বিষয় যাতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অধিকার দুইই বর্তমান।
তবে, লেখকের কাছে আশা করব, এই বিষয়ে দীক্ষিত পাঠকদের জন্য কিছু লিখতে। কারণ এই ধরণের বিষয় নিয়ে বাংলাভাষায় কাজ এখনো বেশ কম। দু’একটি জায়গায় একটু পারম্পর্যহীন লেগেছে। তবে এটা বিভিন্ন খণ্ড বিষয় নিয়ে লেখার কারণেও হয়ে থাকতে পারে। আর যদি একটি উল্লেখপঞ্জি বইটির শেষে দিতেন, তবে আরও ভালো হ’ত। যদিও এটি গবেষণামূলক বই ঠিক নয়, তবুও দিলে সুবিধা হ’ত। সর্বোপরি বইটি পড়ে বেশ কিছু প্রশ্ন মনে উত্থিত হয়েছে, এটাও ভালো বইয়ের লক্ষণ। এবার নিজেকেই নিরসনপন্থা খুঁজতে হবে।"
মনোবিজ্ঞান নিয়ে বাংলাভাষায় এক অনবদ্য সংযোজন এই বইখানা। লেখক ইংরেজি সাহিত্যের অনার্স-মাস্টার্স করা সত্ত্বেও নিউরোসায়েন্সের জটিল জটিল অনেক টার্মিনোলজিকে খুব সহজেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।
মনোবিজ্ঞান, নিউরোসায়েন্স ও ফিলোসোফি -র মতো চমকপ্রদ তিনটি বিষয়কে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসতে লেখককে প্রচুর সময় ও শ্রম দিতে হয়েছে এটুকু বলাই যায়।
বইটার পৃষ্ঠা সংখ্যা অল্প হলেও প্রতিটি অধ্যায় গভীর মনোযোগ সহকারে সময় নিয়ে পড়তে হবে। তবেই বইটার রস আস্বাদন করা যাবে।
পাঠকশ্রেণীর মধ্যে সমসাময়িক লেখকদের ব্যাপারে একটা প্রবণতা কাজ করে আর তা হলো লেখক সোস্যাল মিডিয়াতে কেমন জনপ্রিয়। কিন্তু একজন লেখকের স্বার্থকতা যে তার লেখনীতে নিহিত তা আমরা অনেকসময় ভুলে যাই অথবা নতুন লেখকদের লেখার সাহিত্যিক মান কেমন হবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগি। লেখকের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তবুও যখন বাতিঘরের " Science " ক্যাটাগরিতে বইটা দেখতে পেলাম তখনই এর শিরোনাম দেখে বইটা পড়ার আগ্রহ জন্মায়।
আমি একজন আন্ডারগ্র্যাডের স্টুডেন্ট, পড়াশোনা করছি জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি নিয়ে। বায়োলজি ফ্যাকাল্টির একজন শিক্ষার্থী হবার সুবাদে সাইকোলজি ও নিউরোসায়েন্সের প্রতি আলাদা একটা ভালোলাগা কাজ করে। সেই ভালোলাগার কাজ থেকে মনে হলো এই বইটি এককথায় অসাধারণ একটা বই। মনোবিজ্ঞানের নানাবিধ বিষয়কে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন এতে করে সাইকোলজি নিয়ে বেসিক আইডিয়া না থাকলেও পাঠক বিরামহীনভাবে পড়ে শেষ করতে পারবেন বইটা। আর সাইকোলজি নিয়ে যাদের কিছুটা জানাশোনা রয়েছে তারাও বেশ উপভোগ করবেন বইটা।
এতোক্ষণ তো শুধু প্রশংসাই করে গেলাম। এবার নাহয় গঠনমূলক সমালোচনার দিকে একটু নজর দেওয়া যাক: প্রতিটি অধ্যায়ে লেখক ফ্লাফি বিষয়বস্তু যথাসম্ভব এড়িয়ে গেলেও বিভিন্ন জায়গায় যেসব উপসংহার টেনেছেন অথবা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সেক্ষেত্রে আরও অধিক রেফারেন্স যুক্ত করার দরকার ছিল বলে মনে করি।
পরিশেষে বলতে চাই, " নিউরোদর্শন" একটা আন্ডাররেটেড বই। এইটা নিয়ে আলোচনা, পাঠচক্র করা যেতে পারে। মনোবিজ্ঞান নিয়ে যাদের জানার আগ্রহ রয়েছে তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটা বই। এই বই আপনার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম। শুধু মনের বিজ্ঞানই নয়, নিজের মনকে ভালোভাবে চেনার জন্যও বইটি অবশ্যপাঠ্য।
শরিফুল ইসলামের "নিউরোদর্শন" বইটি যেন এক আয়না, যেখানে একে একে প্রতিফলিত হয়েছে মনের গহীনে লুকানো রহস্যগুলো। লেখক কলমের জাদুতে জটিল সব মানসিক প্রক্রিয়া এবং দার্শনিক ধারণাগুলোকে এমনভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন, যেন মনে হয় নিজের মনের অলিগলিতে হেঁটে বেড়াচ্ছি। বইটির প্রতিটি অধ্যায় যেন এক একটি জানালা, যা খুলে দেয় চিন্তার নতুন দিগন্ত। "মন, মূর্খতা ও স্ববিরোধিতা" থেকে শুরু করে "সাবজেক্টিভিটি ও ভাষার সীমাবদ্ধতা" পর্যন্ত, প্রতিটি বিষয় লেখক গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং গবেষণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। "মন তো এক সমুদ্র, যার গভীরে লুকানো রয় কত না অজানা রতন", - এই উক্তিটি যেন বইটির মূল সুর। লেখক আমাদের মনের সেই অজানা রতনগুলোর সন্ধান দিয়েছেন, যা আমাদের জীবনকে আরও সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলতে পারে। বইটিতে লেখক শুধু তত্ত্বের শুষ্ক আলোচনা করেননি, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনার মাধ্যমে সেগুলোর প্রয়োগও দেখিয়েছেন। ফলে, বইটি পড়ার সময় মনে হয়েছে, "জীবন তো এক রঙ্গমঞ্চ, যেখানে মন নিত্যনতুন খেলা খেলে।" লেখকের ভাষা এতটাই সহজ ও সাবলীল, যা কঠিন বিষয়গুলোকেও সহজবোধ্য করে তোলে। বইটির নাম শুনে মনে হতে পারে যে পড়ার সমত হয়তো বাংলা অভিধান সাথে নিয়ে বসতে হবে। কিন্তু লেখকের অসম্ভব সাবলীল লেখনীতে তার আর প্রয়োজন পরেনি। সব মিলিয়ে, "নিউরোদর্শন" বইটি মনোবিজ্ঞান এবং দর্শনের প্রতি আগ্রহী যেকোনো পাঠকের জন্য এক অনন্য উপহার। বইটি পড়ার মাধ্যমে মন এবং চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জীবন আলোকিত করবে এমনকিছু গভীর তথ্য জানতে পেরেছি।
ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তের "আমি চিন্তা করি, তাই আমি অস্তিত্বশীল", এর ওপর তৈরি হয়েছিল পশ্চিমা দর্শনের মূল ভিত্তি। মানুষ চিন্তা করতে পারে এবং সেই সেই চিন্তা কথা বলে, লিখে প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়।
মানুষের মন কীভাবে কাজ করে? বিস্তর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক জ্ঞান উৎপাদন ও বিতর্ক হয়েছে এই একটা বিষয় নিয়েই। আপনার চিন্তা, কল্পনা, স্মৃতি, ইচ্ছা, অনুভূতি—এসব কি মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কিছু আছে? মন আর দেহ কি একসাথে কাজ করে, নাকি আলাদা?
"নিউরোদর্শন" বইতে মন ও মস্তিষ্কের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দর্শন আর মনোবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করা করা হয়েছে।
মানব মনের বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একাডেমিক ভাষায় যা বলে সেগুলো বিভিন্ন রিসার্চ ওয়ার্কের রেফারেন্স টেনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সাইকোলজির বিভিন্ন টার্মের সাথে ফিলোসোফি এবং মানুষের মনোজাগতিক বিচার-বিশ্লেষণও হয়েছে। মানুষের আচরণ দেখে তার সাইকোলজি বুঝা যায়।
মূর্খতা ও স্ববিরোধিতা, ম্যানিপুলেশন, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, ইমপোস্টার সিনড্রোম, হিংস্রতা ও বশ্যতা, নেগেটিভিটি বায়াসনেস, কগনিটিভ ডিসোন্যান্স, তথ্য ও প্রজ্ঞার ভ্রম, সাবজেক্টিভিটি ও ভাষার সীমাবদ্ধতা, মেধাতন্ত্রের ভ্রম, মাই��্ডলেস গ্রোথ, ইগো, আধ্যাত্মিক লোভ ইত্যাদিসহ আরো বিচিত্র বিষয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করস হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের নানা থিওরির আলোকে নিজের দেহ-মনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি। প্রতিটি অধ্যায়ে মনোবিজ্ঞানের নতুন দিক নিয়ে আলোচনা করে, যা আলাদা হলেও এক সুতোয় বাঁধা।
বইটা পড়ে আমি নিজেই উপকৃত হয়েছি। মাঝেমধ্যে নিজের আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না, মানুষের আচরণ দেখে "মানুষ কেন এমন করে" এই প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়ায়। এই আচরণগত বিষয়গুলোই ব্যাখ্যা করা যায় সাইকোলজি ও ফিলোসোফির বিভিন্ন টার্ম দিয়ে।
বই : নিউরোদর্শন লেখক : শরিফুল ইসলাম প্রকাশনী : আদর্শ