আকস্মিক দুর্ঘটনায় অন্ধ হয়ে যাওয়া একজন মানুষের গল্প। যে হঠাৎ অন্ধকারের গুহায় হারিয়ে গিয়ে পৃথিবীর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ পৃথক সত্তায় পরিণত হয়; যার অতীত পৃথিবী ছিল আলোময়।
সেই অন্ধ মানুষটা সমস্ত স্মৃতির বুকে কালো পর্দা টেনে, ক্রুশ এঁকে দিয়ে, স্মৃতির ধুলোবালিকে পরিষ্কার করে স্পৃহণীয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে চায় স্মৃতির কাটাকুটি নামক একধরনের খেলার মধ্য দিয়ে; যেখানে তার স্মৃতি ও বিস্মৃতির মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকবে, যা তার বয়সকে থামিয়ে দিতে পারবে।
অন্ধত্ব যে মানুষকে কেবল অন্ধই নয়, একসঙ্গে বোবা, কালা ও চলনশক্তিহীনও করে দেয়। এমন অন্ধ মানুষেরা আমাদের আশেপাশে আছে তবে তারা পরিচিত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী তাদের নিজস্ব অন্ধকার নিরবতার জগতে বাস করছে। এমন মানুষের গল্প বলেছে লেখক হাসনাত শোয়েব তার ‘সন্ধ্যায় ভুল পথে আহির ভৈরব’ নভেলায়।
হাসনাত শোয়েবের লেখায় স্বকীয়তা এবং অভিনবত্ব আছে। যা একজন পাঠককে লেখকের অন্যান্য বইয়ের প্রতি উৎসাহিত করে।
আমার পড়া লেখকের প্রথম বই ‘শেফালি কি জানে’। ‘শেফালি কি জানে’ পড়ার পর লেখকের অন্যান্য বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে এই বইটা পড়ে ফেলি। লেখকের পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।।
হাসনাত শোয়েবকে প্রথম পড়া হল। প্রথম অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ভালো। পরবর্তীতে আরো পড়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে, এটা পাঠক হিসেবে আমার জন্য আনন্দের। সবসময়ই নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে ভালো লাগে, পাঠের দিগন্ত বিস্তৃত করতে ভালো লাগে।
কদিন আগে আকাশ খুব মেঘলা ছিল কয়েকদিন। সারাদিন মেঘলা। কেমন যেন অন্ধকারটা চেপে বসত মনের মধ্যেও। এমন দিন বর্ষাতেও আসে, কিন্তু শীতের শেষে মাঘে আর মেঘে দেখা হওয়ার মধ্যে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা রয়েছে। সেই বিষণ্ণ অনুভবটাই সন্ধ্যায় ভুল পথে আহির ভৈরবের পুরোটা জুড়ে। বই পড়ে বিষণ্ণ হতে ভালোবাসেন কেউ কেউ, তাদের জন্য চমৎকার হতে পারে এই বইটা।
এই আমি মাঝে মাঝেই অন্ধত্বের ভয় পাই। অনেক বেশি মায়োপিয়া নিয়ে অতিরিক্ত বই পড়া একটা বোবা অন্ধত্বের ভয়কে আমার মধ্যে চারিয়ে রাখে। অসম্ভব ভালোবাসি যে কাজটা, বই পড়া, অন্ধ হয়ে গেলে সেটা পারব না ভাবতেই হাত পা শিঁটিয়ে আসে ভয়ে। ঝেড়ে ফেলি অল্প সময়ের মধ্যেই চিন্তাটা কারণ ওই দমবন্ধকরা ভাবটা খুব বেশি সময় সহ্য করা যায় না।
আমারই বয়েসী লুসাই যখন অন্ধ হয়ে যায় ৩০-৩২ বছর পৃথিবীকে দেখে, তার রং-রূপ-রস যখন কেবল অনুভবের বস্তু হয়ে যায় তার কাছে, তখন তার অনুভূতি কেমন হয়? কেমন হতে পারে একজন মানুষের গাঢ় অন্ধকারের অনুভূতি? অনন্ত অসীম অন্ধকার যেখানে স্মৃতি ছাড়া কাছের মানুষকে মনে রাখার আর কোন পদ্ধতি নেই?
দীর্ঘদিনের অদর্শনে মানুষের চেহারার স্মৃতিও হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় অসংখ্য পুরনো গল্প, না পড়া-পড়া বই, কাছের মানুষের কোথায় তিল ছিল সেই স্মৃতিটুকু। অন্ধ মানুষটি জ্যোৎস্না দেখে না আর, মস্তিষ্কে চাঁদের আলো ফিকে হয়ে আসে স্মৃতিতে। সেইসব স্মৃতিকে ধরে রাখতে গেলে আরো বেশি কষ্ট। বরং এক এক করে মুছে দেয়া যাক সব। যে আহির ভৈরব রাগটি ভোরে বাজার কথা, সেই রাগ দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে৷ লুসাইয়ের জীবনের মতো।
ছোট্ট বইটি লেখক দ্বিতীয় পুরুষে লিখেছেন। বেশ অন্যরকম এই ভাবনাটা। অল্প পরিসরেই নিজের লেখকসত্তার ভালো পরিচয় তুলে ধরা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। হাসনাত শোয়েব পারেন সেটা, বেশ অবলীলায়।
আকস্মিক অন্ধ হয়ে যাওয়া একজন স্মৃতি হত্যা করা করে চলে ক্রমাগত। বাঁচার জন্যে তাকে এটা করতেই হয়। তবে তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, ঠাণ্ডা মাথায় ধীরেসুস্থে শেষবারের মতো ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখে সে স্মৃতিগুলোকে হত্যা করতে থাকে। এদিকে অতীতের পাশাপাশি মৃত্যু ঘটে তার বর্তমানেরও। ছোট এ উপন্যাসে দেখা মেলে অনেকগুলো চরিত্র এবং প্রচুর টুকরো টুকরো ঘটনা বা স্মৃতির। বই জুড়ে এমন এক আবহ বিরাজমান ছিল যেটিকে তুলনা করা যায় সারাদিন সূর্য না উঠা বা ঝিরিঝিরি বৃষ্টিদিনের বিষন্নতার সঙ্গে। হাসনাত শোয়েবের পরিমিতিবোধ অসাধারণ। কোথায় কতটুকু বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে এবং কোথায় থামতে হবে, তা তিনি জানেন ভালো। ‘শেফালি কি জানে’র তাৎক্ষণিক পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় বইয়ের শীর্ণতা নিয়ে অভিযোগ ছিল আমার। তবে পরে ঠিকই মনে হয়েছিল, অল্পতেই কাজ হলে, বেশির তো কোনো প্রয়োজন নেই। এ কথাটির অকাট্য প্রমাণ হিসেবে এবার দাঁড় করানো যায় ‘শেফালি...’র চেয়েও ছোট, মাত্র ৪৮ পৃষ্ঠার ‘সন্ধ্যায় ভুল পথে আহির ভৈরব’কে। আর হ্যাঁ, লুসাইয়ের মতো নিজের কিছু অতীতস্মৃতিকে খুন করতে পারলে কিন্তু বেশ হতো!
হাসনাত শোয়েবের সাহিত্যিক খ্যাতি মূলত ' শেফালি কি জানে'র জন্য। এবং সেটাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে! কারন হাসনাত শোয়েব যা ই লিখেন না কেন পাঠক তা ' শেফালি কি জানে'র সাথে মিলিয়ে দেখে। অথচ একজন সত্যিকার লেখক ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চাইবেন, নিজেরই সৃষ্টির ফাঁদে আটকে থাকতে চাইবেন না।
হাসনাত শোয়েবের ' সন্ধ্যায় ভুল পথে আহির ভৈরব' উপন্যাস তাঁর ম্যাগনাম ওপাস থেকে রচনাশৈলী ও ভাষায় বেশ ভিন্নতর। হাসনাতের গদ্য বেশ ঝরঝরে কিন্তু বেশ অনুভবনীয়। উপন্যাসের কথক একজন অন্ধ ব্যক্তি। কথকের জীবনের নানা টানাপোড়ন, নিজস্ব দার্শনিক ভাবনা, প্রেম অথবা প্রেম সম্পর্কিত গভীর অনুভব ইত্যাদি উপন্যাসের বিষয়বস্তু। পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। তবে এটা কে আরো বড় পরিসরে লেখা উচিত ছিলো লেখকের। উপন্যাসের স্বল্প বিস্তৃতি এর পাঠের আনন্দের রেশ দীর্ঘায়ত হতে দেয় না। এত চটজলদি কিসের! আশা করি হাসনাত শোয়েব পরবর্তী উপন্যাসে ছোট হবার তাড়া থাকবেনা। লেখক তার গল্প বলতে যদি হাজার পৃষ্ঠা লিখতে লাগান তা ই সই। তবু তিনি যেন নির্ভার হয়ে লিখেন।
'সন্ধ্যায় ভুল পথে আহির ভৈরব' লেখক হাসনাত শোয়েবের তিন ফর্মার একটি ফিকশন। এখানে একজন অন্ধ ব্যক্তির স্মৃতি ভুলে যাওয়াকে ঘিরে ফিকশনটির মূল উপজীব্য। বইটার সবথেকে ইন্টারেস্টিং দিক ছিলো এর দ্বিতীয় পুরুষ স্টাইলের ন্যারেটিভ। লেখনশৈলীর কয়েক জায়গাতেও বেশ গভীরতা ছিল, যা পাঠককে কিছু ব্যাপারে ভাবতে চেষ্টা করে। তবে মাত্র ৪৮ পেইজের বই হিসেবে দামটা একটু বেশিই লেগেছে। যাদের বইয়ের দামসংক্রান্ত সমস্যা নেই এবং দ্বিতীয় পুরুষ স্টাইলের ছোট গল্প পড়ে আনন্দ পান তারা এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন।