এই কাহিনি কোনো এক পৃথিবীর কোনো এক দেশের অন্ধকার, নিষ্প্রদীপ সময়ের করতলে বন্দি মানুষদের ভয়ের সংস্কৃতি জ্বলজ্বল করছে সেখানে। ব্যক্তি এই পরিস্থিতিতে কতটা অসহায়, নিঃসঙ্গ ও কাতর হয়ে উঠতে পারে সেটিই বলেছেন ইমতিয়ার শামীম এই গল্পে। অন্ধপ্রদীপ শূন্য-পানে নভেলায় আমরা মুখোমুখি হই এমন এক সময়ের—যা আমাদের হয়তো চেনা, হয়তো অচেনা, হয়তো-বা চেনার পরও না-চেনার ভানে ভরা। সে রকমই সময়ের একটি দিন। এক স্থপতি হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেলেন। একই দিন আগুন লাগল এক ভবনে, যেখানে তার অফিস ছিল। তাকে শনাক্ত করার জন্যে ডিএনএ টেস্ট হলো। তাতে সৃষ্টি হলো আরেক ধূম্রজাল। কেননা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভদ্রলোকের ডিএনএ মিললেও মিলল না বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কন্যার সঙ্গে! ভয়ঙ্কর এক সময় নেমে এলো সেই মেয়ে আর তার মায়ের সাদামাটা জীবনে। বাসা থেকে উচ্ছেদ হতে হলো। স্থপতির স্ত্রীকে চাকরি থেকে যেতে হলো বাধ্যতামূলক ছুটিতে। তাতেও রেহাই নেই—কালো কাচ-ঘেরা মাইক্রোতে কারা যেন তাকে তুলে নিয়ে ঘুরপাক খেল সারাদিন। পরিসর ছোট, কিন্তু এর অন্তর্লীন বিচ্ছুরণ ভীষণ গভীর নিতল। ভয়াবহ, রক্ত হিম করা এ গল্প যেন এই বিশ্বের কর্তৃত্ববাদে ঘেরা প্রতিটি দেশের। তাই বলে নেওয়া ভালো, এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনাই কাল্পনিক; কোনো দেশের কোনো মানুষের বা বাস্তব কোনো ঘটনার সঙ্গে যদি এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়, সেটা নিতান্তই কাকতালীয়।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
প্লটের কথা ধরলে, এই বইটা টপনচ একটা বই। ৫ এ ১০ পাওয়ার মত। এরকম সাহসী প্লট, সোজাসাপটা কথা খুব একটা দেখা যায় না, তাও আবার এরকম মেইনস্ট্রিম ফিকশনের মধ্যে। ইমতিয়ার শামীমের বইগুলোতে আমি লক্ষ্য করেছি যে, উনি তার লেখায় কাহিনী ফাঁকে ফাঁকে রিসেন্ট কিছু সমস্যা, অ্যাফেয়ার ঢুকিয়ে দেয়। তবে এই বইটা পুরোটাই দাঁড়িয়ে ছিলো সমস্যা নিয়েই। পুরো বইতেই বিচারব্যবস্থার সমস্যা, ভিক্টিমের অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলছে।
বইটাকে নর্মাল সামাজিক সমস্যা মূলক বইয়ের চেয়ে থ্রিলার থ্রিলারই লাগছে বেশী tbh. জাফর আহসান নামে এক স্থপতি হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেলেন। একই সময়ে আগুন লাগলো চন্দ্রিমা ভবনে, যেখানে তার অফিস ছিল। তাকে শনাক্ত করার জন্যে ডিএনএ টেস্ট হলো। তাতে সৃষ্টি হলো আরেক সমস্যা। কেননা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভদ্রলোকের ডিএনএ মিললেও মিললো না বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কন্যার সঙ্গে! ভয়ঙ্কর এক সময় নেমে এলো সেই মেয়ে আর তার মায়ের সাদামাটা জীবনে। বাসা থেকে উচ্ছেদ হতে হলো। স্থপতির স্ত্রীকে চাকরি থেকে যেতে হলো বাধ্যতামূলক ছুটিতে। তাতেও রেহাই নেই—কালো কাচ-ঘেরা মাইক্রোতে কারা যেন তাকে তুলে নিয়ে ঘুরপাক খেল সারাদিন। পরিসর ছোট, কিন্তু এর অন্তর্লীন বিচ্ছুরণ ভীষণ গভীর নিতল।
বইটা আমার কাছে কয়েকটা কারণে স্পেশাল লেগেছে। প্রথমত, ইমতিয়ার শামীমে চিরায়ত সহজ লেখা। সহজেই গল্পে ঢুকে যেতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, এরকম সাহসী গল্প। বইটার মোড়ে মোড়ে রাইটার বিচারব্যবস্থার গলদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভিক্টিম হিসেবে পুর্বা আর তার মায়ের অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছে।
তবে বইটা নিয়ে হতাশও খানিকটা। যে কারণে পাঁচ তারা দিতে গিয়েও চার তারা দিলাম, তিন তারা দেওয়ার কথাও মাথায় আসছিলো। এরকম সুন্দর আর বিস্তৃত সম্ভাবনাময় প্লট এত তাড়াতাড়ি, তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দেওয়ায় খানিকটা হতাশই বলা চলে। আমি এই বইটা আরও বড় আশা করেছিলাম। পরিণত ফিনিশিং আশা করেছিলাম। পূর্বা, তার মায়ের আল্টিমেট পরিনতি, গল্পের মূল প্রশ্নবোধক চিহ্নটার গতি দেখতে চেয়েছিলাম। এরকম ছোট গল্পের মত 'শেষ হইয়াও হইলো না শেষ' টাইপের ক্লাইমেক্স আশা করিনি একেবারেই।
আজকাল বেশ আগুন লাগছে চারদিকে। ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই দফারফা! অর্থাৎ নাজেহাল অবস্থা। পরপর কয়েকটি আগুনের ঘটনায় নাশকতা হচ্ছে কিনা, সেই সন্দেহ তৈরি হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক পরামর্শ দিয়েছেন। এরপর আসলে তদন্তে কী ফলাফল আসে না আসে, তা আসলে অতি সাধারণ পাব্লিক হওয়ার কারণে আমার কানে আসে না কিংবা চোখের সামনে ভাসে না। চোখে ভাসে শুধু অনেক গাঢ় কমলা রঙ আর মানুষের আহাজারি। যাকগে...
আগুন লাগে ইমতিয়ার শামীমের উপন্যাসেও, উত্তরার চন্দ্রিলা টাওয়ারে। ভস্ম হয়ে যায় ৭৬ জন মানুষ। ভস্ম হওয়া ৭৬ জনের একজন নিজ উদ্যোগে ভস্ম করে দিয়ে যান তার পরিবারকে, আক্ষরিক অর্থেই ভস্ম! পাঠকমাত্রই জানেন যে, পরিবারের উপার্জনক্ষম লোকটা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলে এমনিতেই তার পরিবারকে পথে বসতে হয় কিন্তু আমরা এই ৬৩ পৃষ্ঠার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ৩১ তম পৃষ্ঠায় এসে তার ভার্সিটির ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের অফিসকক্ষে বসে থাকতে দেখি; এরসাথে প্রথমবারের মতো আমরা তার নাম জানতে পারি- পূর্বা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাটা কন্টিনিউ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে একটি ছোটখাট মিটিং। কারণ, তার বাবা স্থপতি জাফর আহসান ভস্ম হওয়ার সাথে সাথে ভস্ম করে দিয়ে গেছেন তার মেয়ের বাবা ডাকার অধিকার- লাশ শনাক্তকরণের জন্য করা ডিএনএ টেস্টে স্থপতি জাফর আহসানের স্যাম্পল তার মা-বাবার সাথে মিললেও একমাত্র কন্যা পূর্বার স্যাম্পলের সাথে কোনোভাবেই ম্যাচ হয় না। ফলস্বরূপ, যা ঘটার তাইই ঘটে, তার মায়ের নামে বদনাম রটে। মা আর মেয়েকে তাদের নিজ এপার্টমেন্ট ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পূর্বাদের আশ্রয় হয় পূর্বার এক বান্ধবীর এপার্টমেন্টে। বলে রাখা ভালো, মহানগর ঢাকাতে চলছে স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্য গুঁড়িয়ে দেয়ার সূক্ষ্ণ পরিকল্পনা। স্থপতি জাফর আহসান ছিলেন এটার বিরোধী এক্টিভিস্ট।
যাইহোক....বান্ধবীর আশ্রয় তেমন একটা শান্তি দেয় না পূর্বাকে, কারা যেন বেড়ি পড়িয়েছে মা মেয়ের পায়ে, নিস্তার নেই যেন। তাইতো সাদা পোষাকের মানুষের আনাগোনা দেখা যায় আশেপাশে, কালো-কাচে ঢাকা মাইক্রো এসে ওর মা'কে তুলে নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়ায়! বুঝিয়ে দেয়- এ জীবন বড় ঠুনকো! এরপর কোথাকার জল কোথায় গড়ায় তা বুঝে উঠার আগেই দেখা যায় লোহার দন্ডের সমান্তরাল বেড়ায় আটকা পড়ে যায় অসহায়ত্ব।
ফ্ল্যাপে বলা আছে- "পরিসর ছোট, কিন্তু এর অন্তর্লীন বিচ্ছুরণ ভীষণ গভীর নিতল। ভয়াবহ, রক্ত হিম করা এ গল্প যেন এই বিশ্বের কর্তৃত্ববাদে ঘেরা প্রতিটি দেশের। তাই বলে নেওয়া ভালো, এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনাই কাল্পনিক; কোনো দেশের কোনো মানুষের বা বাস্তব কোনো ঘটনার সঙ্গে যদি এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়, সেটা নিতান্তই কাকতালীয়।" আর তাই প্রতিটি চরিত্রই কাল্পনিক বলে কিনা উপন্যাসের এমন সমাপ্তি হয়, যার কোনো শেষ নেই শুধু আছে অবশেষ যা নিতান্তই কাকতালীয়। And this is the "ENDING!"
"Injustice anywhere is a threat to justice everywhere."(M.Luther K)
অনিশ্চয়তা আমাদের জীবনের সমান্তরালে চলা আরেকটি রেখা। এই রেখার বক্রতা আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয় অনায়াসে। তেমনই এক বাঁকে পূর্বা নামের মেয়েটির বিদিশা হয়ে পড়ে। আজন্ম যে মানুষটাকে সে বাবা বলে জেনে এসেছে একটি দূর্ঘটনা জানান দেয় সে মানুষটি আদপে তার বাবা নয়। একটি মানুষের উপর এর প্রভাব কী পড়তে পারে তা প্রথম বারো থেকে চৌদ্দ পৃষ্ঠা পড়ার পরে বোঝা যায় স্পষ্টত। আর লেখকের স্বার্থকতা এইখানেই যে তিনি আমাকে একটি মানসিক চাপের সম্মুখীন করেছেন। পূর্বা গল্প কথকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সে জানান দেয় ক্ষমতাবানদের বাড়ি মারবার ফল কেমন হতে পারে। একটি পরিবারকে বিনষ্ট করার জন্য যা যথেষ্ট। অন্যের হাতের পুতুল হয়ে থেকে থেকে যখন সেই পুতুল অবাধ্যতা শুরু করে তখন তাকে চুপ করানোর জন্য পুতুলের মালিককে ছলেবলে সব কিছুর আশ্রয় নিতে হয়। সবকিছু ধোঁয়াটে, কিন্তু আদপে তা চোখের সামনেই। এ যেন বর্তমান সমাজকেই প্রতিনিধি করছে। ছোট্ট একটি উপন্যাসিকা কিন্তু এর গভীরতা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করাবে। কারণ আপনি যে পরিবেশে বেড়ে উঠছেন সে পরিবেশই দেখবেন বইয়ের পাতায় পাতায়। এ যেন বাস্তব থেকে নিয়ে মলাট বদ্ধ করা হরেকরকমের মানুষের গল্প। যা একই সুতোয় বাঁধা। অন্তেও যার শান্তি নেই। একজন লেখকের মধ্যে মনে হয় নিজের সীমানা ছড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবল আকাঙ্খা কাজ করে। লেখকও তাই এইখানে রহস্যাবৃত হয়ে নতুন করে কিছু বলতে চেয়েছেন পাঠককে, তবে তা নীরবে।
"আমাদের চিঠি যুগ কু ঝিকঝিক" দিয়ে ইমতিয়ার শামীমের সাথে আমার পরিচয়। সেই থেকে আমাকে মুগ্ধ করে চলেছেন লেখক, কখনো সেটা বেশি,কখনো খুব বেশি। কোন লেখকের লেখনী যদি একবার আমার ভেতরটাকে ছুঁয়ে যায়,আমি চেষ্টা করি ঐ লেখকের সব কটি লেখা একবার পড়ে দেখতে। সেই সুবাদে ইমতিয়ার শামীমের বেশ কয়েকটি বই পড়া হয়েছে। এবার দৃষ্টি দেয়ার পালা বইমেলায়,সেখানে দেখলাম "কথাপ্রকাশ" লেখকের দুইটি বই প্রকাশ করছে,সাথে সাথেই দুইটা লুফে নিলাম,বাকি গুলোও নিব,কিন্তু কোনটা কোন প্রকাশনীর না জানার ফলে নেয়া হয় নি।
এবারের বই মেলার নতুন বই "অন্ধ প্রদীপ শূন্য পানে"। আমার মতোই ক্ষীণ তনুর বইটা কিনেছিলাম,সম্ভবত বইমেলা তৃতীয়/চতুর্থ দিন। পড়লাম গতকাল।
বর্তমানের বিভীষিকাময় সময়ের গল্প। যেখানে বাবাকে হারিয়ে পূর্বা আর তার মা একের পর এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়। বিরোধিতা শুরু করে আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে পরিবারের প্রত্যকটি লোক। এর মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষায় পূর্বার সাথে মিলে না তার বাবার ডিএনএ। একে তো বিপদ, তার উপর শুরু হয় আরেক প্রলয়ঙ্কারী ঝড়। কিন্তু এই যে বাবাকে হারানো,একের পর এক বিপদে পড়া এসব কি শুধুই সময়ের কারণে? নাকি এর পেছনে রয়েছে তৃতীয় কোন পক্ষ! সেই রহস্যের জাল ভেদ করতে হলে,বইটা একবার পড়ে দেখতে হবে...
এই বইটা আমার আমার ভালো লেগেছে, তবে বেশি না। আমার প্রত্যাশা লেখকের কাছে অনেক বেশি,সেই অনুপাতে এই লেখায় কি যেন নেই মত লেগেছে আমার।
ভার্সিটি পড়ুয়া পূর্বার বাবা আগুনে পুড়ে মারা গেলেন। ডেডবডি শনাক্ত করতে পূর্বা আর তার দাদা-দাদীর ডিএনএ টেস্ট করা হলো। দাদা-দাদীর সাথে ডিএনএ মিললেও, মিললো না পূর্বার সাথে। হঠাৎ করেই সবার আদরের পূর্বা হয়ে গেল অপাংক্তেয়।
চাচারা বাসা থেকে বের করে দিলো, তার বাবার যা কিছু ছিল সব তারা দখলে নিয়ে নিল। শূণ্য থেকে পূর্বা ও তার মাকে জীবন শুরু করতে হচ্ছে। সেখানেও বাদ সাধে চাচারা। এদেরকে যেন একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার পণ করেছে তারা। এই ‘তারা’ আসলে কারা? সহজ করে বলা যায় ’জোর যার মুলুক তার নামের সিস্টেম’। আর আপনি, আমি, আমরা যারা আমজনতা তারাই হচ্ছি পূর্বা। খালি হাতে মহা শক্তিধর সিস্টেমের সাথে কি ফাইট দেওয়া যায় আসলে? নাকি এর কল্পনা করাও বাতুলতা? অল্প কথায় চিকন-চাকন এই বইটা বহু না বলা কথা বলে দিয়েছে। চমৎকার ও সাহসী লেখনী।
একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে গেল ইমতিয়ার শামীমের এই নভেলা। গল্পের শুরু একজন প্রতিযশা স্থপতির মৃত্যুর(?) মধ্য দিয়ে। ঠিক মৃত্যু না অপহরণ? স্থপতির অফিসে আগুন লেগে সব সহ পুড়ে যায়, কিন্তু তিনি কি সে সময় অফিসে ছিলেন? - তার একমাত্র মেয়ে সে হিসাব মিলাতে পারে না। আবার, একমাস পরের ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টে বাবার সাথে মেয়ের ডিএনএ ম্যাচ করে না। তখন যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে মেয়েটির উপর, সম্পত্তির লোভে মা-মেয়েকে ঘরছাড়া করেন তার চাচারা। সব দিক থেকেই বিপত্তি আসে- কোনো এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী মা-মেয়েকে শান্তিতে থাকতে দেয় না-ছায়ার মতো তাড়া করে ফিরে, মেয়েটি ক্রমাগত ষড়যন্ত্রের শিকার হতে থাকে- সাদা কালো বাহিনী বারবার হানা দেয়।
আসলে কেন এরকম হলো? উত্তর লেখক ঠিক করে দেন নি বইয়ের পাতায়। মেয়েটির বাবা হয়ত এমন কিছু জানতেন তার জন্য এমন পরিণতি! যাই হোক, লেখক খুব সম্ভবত আমাদের দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখাতে চেয়েছেন ৬৩ পৃষ্ঠার এই নভেলায়। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গেলে কেউ-ই ছাড় পাবে না। সাথে আছে নিরাপত্তাহীনতা- আছে ভিক্টিমের পরিবারের চাপা আর্তনাদ। পুরো গল্পটাই যেন আমাদের মুখোমুখি করে অন্যরকম এক বাস্তবতার সাথে। হয়তঃ এমন পরিস্থিতি আমাদের যে কারো সাথেই ঘটতে পারে, হঠাৎ করেই বদলে যেতে পারে জীবন।
কিছু খটকা: লেখক কি কোনো বাস্তব ঘটনার সংকেত দিয়েছেন? লুই আই কানের নকশা ও কবর রাজনীতি নিয়ে? যদিও এই বিষয়ে ঘাটাঘাটি করে তেমন কিছু পেলাম না।
ইমতিয়ার শামীমের বই পড়ার সময় ঘোরের ভেতর থাকি। তার বই কখন পড়তে শুরু করেছি তা বুঝতে পারলেও কখন যে শেষ হয়ে যায় তা বুঝতে পারি না। আর যখন টের পাই যে শেষ পাতায় চলে এসেছি তখন কেন যানি মন খারাপ হয়ে যায়।
পাঠককে জাদু করে তার প্রতিটা শব্দ। তার প্রতিটা শব্দ কিছু বলতে চায় আমাদের। প্রতিটা শব্দের মাঝে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা কথা। প্রতিটা শব্দ আর্তনাদ করে, প্রতিটা শব্দ অশ্রু হয়ে ঝড়ে৷ প্রতিটা শব্দ নিরবে একটা নির্দিষ্ট সময়, সমস্যা, বেদনাকে জাগিয়ে তোলে।
ইমতিয়ার শামীম বলে শুধু গল্প। তবে গল্পের ভেতর আকস্মিক আমরা একটা কিছু ধরতে পারি, বুঝতে পারি গল্পের মিথ্যের মাধ্যমে লেখক আমাদের কাছে কোন সত্যটা, কোন সময়টা তুলে ধরেছেন।
'অন্ধ প্রদীপ শূন্য পানে' বইতে লেখক একটা সমস্যার কথা বলেছেন গল্পের মিথ্যের মাধ্যমে। যে সমস্যাটা প্রকট আমাদের দেশে। যে সমস্যার কবলে পড়ে হাজার হাজার পরিবার শ্মশান হয়েছে। এখনও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
এই লেখকের যেকোনো বই আমি চোখ বন্ধ করে পড়তে রাজি আছি। লেখকের যেকোনো বই আমি রেকমেন্ড করতে পারি নিঃসংকোচে। আশা করি প্রতি বছর লেখক আমাদের সময়ের সেরা বই উপহার দিয়ে যাবে আর আমরা তার লেখা পড়ব মন্ত্রমুগ্ধের মতো।
বিচারহীনতা আর নিরাপত্তা বিষয়ক উপন্যাস । থ্রিলাররের টাচ পাচ্ছিলাম। যদিও থ্রিলার না। ছোটবই আর একগাদা প্রশ্ন রেখে গেছেন লেখক। চরিত্রগুলোর পদেপদে আশংকায় থাকার কথা ঘোরগ্রস্ত ভাবে লেখক বলে গেছেন এই বইয়ে। ৩.৫/৫
বিষাদ দিয়ে শুরু। পুরো গল্পেই সেই বিষাদেরা ডালপালা ছড়িয়ে তাদের নানান রূপের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। এই বইয়ের সবচেয়ে আক্ষেপের জায়গাটা হলো এর হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া। আরেকটু টানা যেত গল্পটা। আরও কিছুক্ষণ নাহয় বিষাদের গল্পেই ডুবে থাকতাম।
একটা ছোট্ট উপন্যাস যে কি লেভেলের ডিপ্রেসিং হতে পারে, তা 'অন্ধপ্রদীপ শূন্য-পানে' না পড়লে বুঝতে পারবেন না।
দেশের একজন স্থপতি, যার ফার্ম ছিলো রাজধানীর কলাবাগানে। সেই ফার্মে হঠাৎ একদিন আগুন লেগে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় সব। ঘটনাক্রমে সেই স্থপতিকে আর ���ুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ টেস্ট হলো। যা সৃষ্টি দিলো আরো জটিলতার। কেননা, বাবা মায়ের সাথে সেই স্থপতির ডিএনএ মিললেও মিললো না তার মেয়ের সাথে। ভয়ানক এক সময় নেমে আসলো সেই মেয়ে আর তার মায়ের জীবনে। বাসা থেকে উচ্ছেদ হতে হলো। স্থপতির স্ত্রীকে চাকরি থেকে জোরপূর্বক বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হলো। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হলো। কারা এসব করছে? কেনো করছে? রহস্য কি?
পরিসর ছোট, কিন্তু এর অন্তর্লীন বিচ্ছুরণ ভীষণ গভীর নিতল। ট্র্যাজেডিতে ভরা একটা ছোট্ট উপন্যাস।
সবমিলিয়ে, বইটা শেষ করে আমি বাকরুদ্ধ। চরিত্র ছিলো একদম সীমিত। কিন্তু প্রত্যেকটা চরিত্র নিয়েই লেখক দারুণ কাজ করেছেন। আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। মনে হচ্ছিলো চোখের সামনে সবকিছু ঘটছে। ডিপ্রেসিং! চরম মাত্রার ডিপ্রেসিং একটা বই। এর রেশ থাকবে অনেকদিন।
এত সাবলীল লেখার জন্য এটা পড়তে বেশ লেগেছে। ছোট্ট একটা বই অথচ কী নিদারুণ এক কাহিনী!
অফিসে আগুন লাগায় পুড়ে ক্ষান্ত হলো কিংবা হলোনা পূর্বার বাবা। সে শোক কাটাতে না কাটাতে জানা গেলো তার সাথে তার বাবার ডিএনএ মিলেনা অর্থাৎ সে তার বাবার সন্তান ই নয়। এই ঘটনায় সদ্য বিধবা মায়ের সাথে ঘরছাড়া হয়ে পূর্বার ঠায় হলো বান্ধবীর বাসায়। এদিকে বান্ধবী থাকে তিনজনের শেয়ারে তিনকামরার এক ফ্ল্যাটে। কোনো এক অজানা শত্রুর চাপে ইউনিভার্সিটির পাঠ চুকাতে হলো তার, সাথে তার মায়ের অফিস থেকে অনির্দিষ্টকালের অবসর। কিন্ত কেই বা তাদের এত ঝামেলায় ফেলছে, কেন তুলে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরও বিনা ক্ষতি করে জিজ্ঞেস করছে সেই একই প্রশ্ন? ডকুমেন্ট কোথায়?
এক বসাতেই শেষ করে দেয়ার মত বই এবং বইটি পড়ার পর আপনি ভাববেন হলোটা কী? এভাবেই কী বিনাদোষে মানুষের সব হারাতে হয়?
বাবার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পূর্বার জীবনে নেমে আসা ঝড়ের সাথে আমরা পূর্বপরিচিত। ইতিহাস অজস্রবার জানিয়েছে সেই কথা। আমরা জেনেছি স্বৈরশাসক নামের ক্ষমতাসীন নেকড়েরা তাদের পূর্বসুরী পিতাদের মতো একই নরক বিনির্মাণ করে চলে।সত্য-সুবোধ মাথা তুলবে কি ক্রমেই আরো জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতা-রাজনীতির জটিল সব মারপ্যাঁচে। এক লহমায় মুছে যায় কারো সত্যিকারের নাম-পরিচয়। উপর্যুপরি ধর্ষিত হয় সমুদয় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।
আক্রান্তরাও অত্যাচার-নিপীড়ন সয়ে সয়ে একসময় একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করে তাদের উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যাকে।
নতুন প্রকাশিত বই তেমন একটা কেনা হয় না। কিছুদিন পাঠকের কাছে সমাদৃত হলে তবেই ভরসা পাওয়া যায়। ইমতিয়ার শামীমের লেখা আগেও কিছু পড়েছি। তাই এই বইমেলায় প্রকাশিত বইটা নির্দ্বিধায় নিয়েছি। লেখকের বিষয়বস্তু নির্বাচন দারুণ। সিস্টেমের ভেতর-বাহিরকে খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন নাতিদীর্ঘ বইটিতে।
গল্পকথক পূর্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তার বাবা জাফর আহসান একজন প্রকৌশলী। সম্প্রতি পূর্বার বাবার অফিস বিল্ডিং এ আগুন লাগে এবং সেখানেই আগুনে পুড়ে মারা যান তিনি। লাশ শনাক্ত করার জন্য পূর্বা ও পূর্বার দাদা-দাদীর ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়া হয়। দাদা-দাদীর সাথে ডিএনএ স্যাম্পল ম্যাচ করলেও পূর্বার সাথে মিলে না। তখনই পূর্বাকে জাফর আহসানের মেয়ের পরিচয় থেকে বাতিল করে দেয় সবাই। সংসারজীবনের এত বছর পর এসে পূর্বার মা জানতে পারেন তার সন্তানের পিতৃ-পরিচয় নেই। যেহেতু জাফর আহসানের সাথে পূর্বার সম্পর্ক নেই তাই তাদের সেই বাড়িটিও ছাড়তে হয় এবং পূর্বার দাদার পরিবারও তাদের মেনে নিতে পারেনা।
নিজেদের ফ্ল্যাট ছেড়ে পূর্বার বান্ধবী স্বাতীর ফ্ল্যাটে উঠতে বাধ্য হয় তারা। স্বাতী আরো কয়েকজনের সাথে ফ্ল্যাটে থাকে। সকলের সাথে রুম শেয়ার করে থাকতে পূর্বা ও তার মায়ের মনে কেমন একটা হীনতা কাজ করে। তবুও কোনো আশ্রয় না পাওয়ার চাইতে এটা ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়েও পূর্বাকে ঝামেলায় পড়তে হয়। যেহেতু প্রমাণিত হয়েছে পূর্বা জাফর আহসানের মেয়ে নয়, তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চায় পূর্বা যেন বিষয়টা ভেবে দেখে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বাবার নামটা ব্যবহার করতে দিতে চায় না। এদিকে পূর্বার মা যেখানে চাকরি করতো সেখানেও চাকরি থেকে এক প্রকার ছাঁটাই করা হয়। সাদাপোশাকের লোকেরা পূর্বার মাকে তুলে নিয়ে যায় এবং সারাদিন শহরজুড়ে ঘুরিয়ে আবার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। এতসব ঘটনাকে এক সুতোয় গাঁথতে গিয়ে তাদের মনে পড়ে কিছুদিন আগে জাফর আহসান বলেছিলেন সংসদ ভবন এলাকার নকশা সংশোধন নিয়ে উপরমহলের সাথে দ্বন্দ্বের কথা। তাহলে কি সমস্যা শুরু সেখানেই? বইটির সমাপ্তি পাঠককে দুই পথের মাঝখানে এনে দাঁড় করাবে!
'সিস্টেমের ভূত' বলে একটা কথা আছে। অনেকে সেই ভূতের সাথে মানিয়ে নিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করেন; আবার কেউ কেউ সেই ভূতের সাথে লড়াই করতে গিয়ে ভুতুড়ে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সর্বশেষে সেই ভূতটাই টিকে থাকে; বাকি সব কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। ব্যক্তি বনাম সিস্টেমের এই আখ্যানেই প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করা পূর্বাকে দেখতে পাই আমরা। স্বার্থ কিংবা পরিস্থিতির চাপে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের মানুষগুলোও কীভাবে পরিবর্তন হয়ে যায় তার প্রমাণ পাওয়া যায় বইটিতে। জীবন যেখানে অনিশ্চিত, যেখানে সবসময় ক্ষমতা ও দুর্নীতির লেলিহান শিখায় পুড়তে হয় সেই জগৎ-এর গল্প সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন লেখক। লেখক এই লেখাটাকে আরো বড় করতে পারতেন। সেই জায়গাটা লেখকের ছিল। তবুও ছোট এই বইটি আপনাকে একটি অস্থির সময়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। হ্যাপি রিডিং।
মৃত্যু আসে হুট করেই। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ইতি হয় জীবনের। আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করে জ্বলে, যেন আকাশ ছুঁতে চায়। জানান দিতে চায়, আজ ধ্বংস হোক সব। আমার উত্তপ্ত ক্রোধে সব ছারখার হয়ে যাবে। জীবনের শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিবো। আর জীবন? সে তো আমার কাছে নস্যি।
ছাইভস্ম হয়ে যাওয়া জীবন কেবল একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় কত স্বপ্ন, আশা- ভরসা। চোখের সামনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় বেঁচে থাকার জীবন। আগুনের গল্প আজকাল বেশ ভালোই শোনা যায়। আজ এখানে আগুন জ্বলছে, তো কাল সেখানে। পুড়ছে মানুষ, মানুষের স্বপ্নগুলোর ছাই বাতাসে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু এই ছাই ওড়ানোতে কোনো অমুল্য রতন পাওয়া যায় না। হারিয়ে যায় অনেক কিছু।
কলাবাগানের এক বহুতল ভবনে আগুন লেগেছিল। যেখানে নিজস্ব এক ফার্ম করে তুলেছিলেন এক স্থপতি। যেদিন সেখানে আগুন লাগে, সেদিন থেকে খুঁজে পাওয়া যায় না সেই কেউকেটা গোছের কিংবা সাধারণ কোনো এক স্থপতিকে। তাহলে কোথায় হারালো সে? সেই আগুনের তপ্ত ক্রোধে নিজেও জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়েছে সে? কিন্তু লাশের দেখা যে পাওয়া যায় না। পরিবারের দৌড়ঝাঁপ চলে। স্বামীকে পেতে স্ত্রী, বাবাকে পেতে সন্তান কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। কিন্তু তারপরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। কোথায় হারালো তবে?
মানুষ খুব আশাবাদী প্রাণী। জীবনের শেষ মুহূর্তেও আশায় ভর করে বেঁচে থাকতে চায়। তাই মনে ক্ষীণ এক আশা নিয়ে বসে আছে, হারিয়ে ��াওয়া সেই মানুষকে পাওয়া যাবে। একদিন হুট করে সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু মানুষ যা আশা করে, সবসময় তা যে পূরণ হয় না। একদিন ঠিকই ঝলসানো লাশের দেখা মেলে। ডিএনএ পরীক্ষা হয়, প্রমাণ মেলে বাবা-মায়ের সাথে। কিন্তু সন্তানের সাথে সেই পরীক্ষার ফলাফলে মিল আসে না।
মানুষ সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত হয়। বাবার সাথে যেই মেয়ের ডিএনএ মিলে না, সেই মেয়ে কখনই বাবার সন্তান হতে পারে না। মা অন��য কোথাও নিজের চারিত্রিক স্বচ্ছতা বিসর্জন দিয়েছে, যার ফসল এই মেয়ে। বাবার সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার নেই এই মেয়ের। বাবার ঘরে থাকার অধিকার নেই। যেই না এমন অপকর্ম করতে পারে তাকেও দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে হবে।
মাথার উপর ছাদ হারিয়ে দুই নারীর তখন দিশেহারা অবস্থা। মেয়ে তাও আশ্রয় খুঁজে পায়। মাকে নিয়ে বান্ধবীর মেসে জায়গা করে নেয়। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। কিন্তু এই সংগ্রামে ঠিক যেন লড়াই করা যায় না। পদে পদে বাঁধা আসে। আড়ালে নজর রাখা হয়। কোনো এক গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কীসের কারণে?
কারা এসব করছে? কেন মেয়েকে ভার্সিটি থেকে বিতাড়িত করা হয়? কেন মাকে চাকরিচ্যুত করা হয়? কারা এসব কলকাঠি নাড়ছে? কেন? কোন ডকুমেন্টের কথা বলা হচ্ছে? বাবা কি এমন কোনো কাজে নিয়োজিত ছিল, যা সাধারণ কিছু ছিল না। সত্যিই কি সেদিন আগুনে দগ্ধ হয়ে ছাইভস্ম হয়ে গিয়েছিল বাবা? নাকি কোনো রহস্য আছে? কী সেই রহস্য? সমাধান হবে কী?
“আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক” ছাড়া ইমতিয়ার শামীমের কোন বই পড়া হয়নি। যে বইয়ে মুগ্ধতার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। সেই বইয়ের তুলনায় “অন্ধপ্রদীপ শূন্য- পানে” বেশ ফিকে মনে হলো। প্লটের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বইটি এক রত্ন। দারুণ এক প্লট নির্বাচন করেছেন লেখক। বেশ সাহসী লেখা। কিন্তু পৃষ্ঠা সংখ্যা সত্তর না পেরোনো বইটিতে অনেক কিছুই যেন ফুটে ওঠেনি।
“অন্ধপ্রদীপ শূন্য- পানে” বইটিকে কোন জনরায় ফেলা যায়? বইটির মধ্যে থ্রিলারের ছোঁয়া রয়েছে, আছে মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত খেল। সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ করার মতো। বাবা হারানো এক সন্তানের জবানিতে আমরা মূল কাহিনি জানতে পারি। বর্তমান সময়ে আগুনে ভস্ম হওয়া যেন নিয়ম নীতিতে পরিণত হয়েছে। কোনটা দুর্ঘটনা জনিত আগুন, আর কোনটা পরিকল্পিত কেইবা বলতে পারে।
একজন সন্তান তার বাবা হারিয়েছে। হুট করে সে জানতে পারে যাকে সে বাবা বলে জানত, সে আসলে তার বাবা নয়। বাবার সাথে তার ডিএনএ মিলেনি। এমনিতেই বাবা হারানো ভীষণ বেদনাদায়কঝ তার মধ্যে এমন এক পরিস্থিতি যে কোন সন্তানকে অকুল পাথরে ছুঁড়ে ফেলবে। এখানে মূলত দুই নারীর লড়াইয়ের গল্প উঠে এসেছে। যার একজনকে দুশ্চরিত্রের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে, আরেকজনের মাথায় নামাঙ্কিত হয়েছে জারজ সন্তানের নাম। সমাজ তাদের মেনে নেবে কেন?
সমাজ যারা চালায়, তারা মানতে চাইলেও মানতে পারে না। তাদের বাধ্য করা হয় এমন কাউকে দূরে ঠেলে দিতে। সিস্টেম বলে একটা বিষয় থাকে। এই জংয়ে ধরা সমাজের সিস্টেম আসলে কাউকে ভালো থাকতে দেয় না। আর যদি কোনো কেউকেটা গোছের কেউ থাকে, তাহলে তাদের প্রভাবের বিস্তৃতি অনেক দূর ছড়িয়ে থাকে। এতসব খারাপের মাঝে কেউ কেউ ভালো থাকে। তবে সীমিত সংখ্যক সেই ভালোরা হারিয়ে যায় সিস্টেমের অতল তলে।
বইটিতে চরিত্রের সংখ্যা ছিল সীমিত। এই সীমিত চরিত্র নিয়ে লেখক খুব ভালো কাজ করেছেন। মূল যেসব চরিত্র গল্প স্থান পেয়েছিল, সেসব চরিত্র প্রতিটি ফুটে উঠেছে। তবে যেহেতু লেখক একজনের জবানিতে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেছেন, কিছু চরিত্রকে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে মেয়েটির বাবার বাড়ির লোকেদের। এছাড়া অশেষ নামের একজন হুট করে এসেছিল। ভাবছিলাম তার হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। কিন্তু একবার এসে আবার হারিয়ে গেল। তাকে সময় দেওয়া যেত।
শেষটা কেমন তাড়াহুড়ো করে শেষ হলো যেন! অনেক কিছুই ধোঁয়াশায় থেকে গেল। মূল যে ঘটনা নিয়ে এতকিছু সেটার সমাধান আদৌ হলো কি না! লেখক শেষটা ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের ভাবনার উপর। চাইলে থ্রিলার জনরায় খুব ভালো কিছু হয়ে উঠতে পারত বইটা। এর জন্য একটু বিস্তৃতির প্রয়োজন ছিল। তবে খুব যে খারাপ লেগেছে এমন না। লেখকের লেখনশৈলী এতটাই মনোমুগ্ধকর যে ৭০ পৃষ্ঠা না পেরোনো বইটি কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। ঘোর লাগা এরূপ লেখা পড়তে ভাল্লাগে। আর ভাল্লাগে বলে ছোট উপন্যাসিকা হিসেবে নয়, বড় উপন্যাস হিসেবে পড়তে ইচ্ছে হয়।
ইমতিয়ার শামীমের লেখা প্রথম পড়ি গতবছর। আমরা হেঁটেছি যারা। মুক্তিযুদ্ধের পরের সময় নিয়ে রচিত এক বিষন্ন উপন্যাস। এরপর, এই বছর পড়লাম ‘আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক’। অনবদ্য রচনায় আমরা নিজের জীবনের সাথে কিছু জায়গায় এর মিল খুঁজে পাই বৃহত্তর দৃষ্টিতে, যদিও আপাত চোখে আমাদের সাথে এর কোনো যোগসাজশ নেই।
অন্ধপ্রদীপ শূন্য-পানে ছোট আকারের। যার প্রথম পৃষ্ঠাতেই লেখক আমাদের হতবাক করে দেন। পড়তে পড়তে বাস্তবের সাথে মিল খুঁজে পেতে আমরা শুরু করি। চোখ-কান খোলা রেখে যখন আমরা পড়তে যাই, তখন অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, ২০২৩ সালের বইমেলার মাসে প্রকাশিত হওয়া এবং এরও ৪ বছর আগে লিখে রাখা এই উপন্যাসিকার সাথে, সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি যখন বেইলী রোডে আগুন লেগে বহু মানুষের মৃত্যুর সাথে।
শুধু মৃত্যুই নয়। বরং, সেই বেইলী রোডের অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন ফেলে দেওয়া এক ঘটনার সাথে এই বইয়ের একটি ঘটনার হুবহু মিল। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির টাইম মেশিন বাস্তবে এখনো বানিয়ে ফেলা না গেলেও, ইমতিয়ার শামীমের কলমের জাদুতে পাঠক লেখককে ভেবে বসে এক সময় পরিভ্রমণকারীরূপে।
চার ফর্মার এই উপন্যাসিকা আমরা শেষ করি এক হতাশা নিয়ে, আক্ষেপ নিয়ে। আমাদের জীবনের ছোট্ট চাহিদার মতো করে, এই বইয়ে পূর্বাও আশা নিয়ে বসে থাকে।
এই উপন্যাসিকা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে হাজির হয় জীবনের মতো করে। যে জীবন শুধু আশার খেলা। এমিলি ডিকিনসনের কবিতা থেকে ধার নিয়ে বলতে হয়,
“Hope” is the thing with feathers - That perches in the soul - And sings the tune without the words - And never stops - at all.
আচ্ছা কখনো যদি হুট করেই জীবনটা ওলট পালট হয়ে যায়? যদি কখনো জীবনের সব অবলম্বন একে একে সরে যেতে থাকে? যদি মাথার উপর ছাদটুকু চলে যায়, যেখানে ছোট থেকে আপনি বড় হয়েছেন? এক কাপড়ে বের হয়ে যেতে হয় যদি নিজের হাতে গড়ে তোলা নিজের সংসার থেকে?
শুরুতেই এতগুলো প্রশ্ন করলাম বলে ঘাবড়ে গেলেন তো। আচ্ছা আরো বড় একটা প্রশ্ন করি, আপনি একদিন হঠাৎ করেই জানলেন বহু বছর আগেই আপনার সাথে আপনার স্বামীর ডিভোর্স হয়ে গেছে। আপনি আর তাঁর স্ত্রী নন। কিংবা আপনি একজন মেয়ে হয়ে জানতে পারলেন আপনার মৃত বাবার সাথে আপনার ডিএনএ ম্যাচ করছে না, কিন্তু আপনার আত্মীয় স্বজনের ম্যাচ হয়ে গেছে। তাহলে তো আপনার জন্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে! সামলাতে পারবেন এত বড় সব ধাক্কা? মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হতে আপনার অবস্থা ঠিক কেমন হতে পারে?
দেশের একজন স্থপতি, যার ফার্ম ছিল রাজধানীর কলাবাগানে। সেখানে হঠাৎ করেই আগুনের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিলো সব। ঘটনাক্রমে সেই স্থপতিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় আছেন তিনি? তিনি কী তবে ওই আগুনেই শেষ হয়ে গেলেন? কিন্তু লা শের দেখা যে পাওয়া যায় না। পরিবারের দৌড়ঝাঁপ চলে। স্বামীকে পেতে স্ত্রী, বাবাকে পেতে সন্তান কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। কিন্তু তারপরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। কোথায় হারালেন সেই স্থপতি তবে?
আশায় আশায় দিন কাটছে মেয়ে পূর্বার। বাবা এভাবে হারিয়ে গেল কীভাবে! পূর্বার মনে আশা বাবা একদিন ঠিকই ফিরে আসবে। কত জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করে বাবাকে খুঁজে ফিরছে সে। মায়ের চোখে উদ্বেগ সে দেখে, দুজনের মনেই আশা হয়তো ফিরে আসবে সে। হুম এরপর তিনি ফিরে এলেন ঠিকই কিন্তু ছাইভস্মে শুধু কিছু হাড়গোড় নিয়ে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে লা শের ডিএনএর সঙ্গে পূর্বার ডিএনএ ম্যাচ করছে না! পর পর দুইবার পরীক্ষা করা হলো কিন্তু ফলাফল সেই একই!
মানুষ সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত হয়। বাবার সাথে যেই মেয়ের ডিএনএ মিলে না, সেই মেয়ে কখনই বাবার সন্তান হতে পারে না। মা অন্য কোথাও নিজের চারিত্রিক স্বচ্ছতা বিসর্জন দিয়েছে, যার ফসল এই মেয়ে। বাবার সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার নেই এই মেয়ের। বাবার ঘরে থাকার অধিকার নেই। যেই না এমন অপকর্ম করতে পারে তাঁকেও বরং সাথে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে হবে।
পূর্বা মাকে নিয়ে বান্ধবী স্বাতীর মেসে ওঠে। স্বাতী বেশ সহজ ভাবেই পূর্বাদের থাকতে দেয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, এখানে সাথে আরো দুইজন মেয়ে থাকে। পূর্বাকে অবশ্য সবাই চেনে তবুও এভাবে স্বাতীর উপর বোঝা সৃষ্টি করতে পূর্বা বেশ সংকোচ বোধ করে। হতভাগ্য দুই নারী যখন স্বামী এবং বাবা হারিয়ে অসহায়, তখনও বিপদ তাঁদের পিছু ছাড়ছে না। পূর্বা সমস্যায় পড়ে ভার্সিটিতে, তাঁর মা সমস্যায় পড়ে অফিসে করতে গিয়ে, স্বাতীকে কারা যেন মাইক্রোবাসে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে আবার নামিয়ে দেয়। আবার বাবাও মৃত্যুর আগে পূর্বাকে বলেছিল কোনো কারণে যদি তাঁর খোঁজ পাওয়া না যায় তাঁর ইমেইল এড্রেস ডিলিট করে দিতে চিরতরে। সেখানে কী কোনো ডকুমেন্ট ছিল? পূর্বা শুধুমাত্র বাবার আদেশ পালন করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কারা এসব করছে? কারা এসব কলকাঠি নাড়ছে? কেন? কোন ডকুমেন্টের কথা বলা হচ্ছে? বাবাকে কী কিডন্যাপ করা হয়েছে? উনি কী আদৌ মারা যাননি? সবকিছুর পেছন কী আরো রহস্য আছে?
▪️ পাঠ প্রতিক্রিয়া ▪️
“অন্ধপ্রদীপ শূন্য- পানে” ছোট একটা বই। এখানে চরিত্র কম হলেও লেখক বেশ দারুন একটা প্লট তৈরি করেছিলেন গল্প বলার। এবং শেষ পর্যন্ত কী হয় জানতে আমি নিজেও বেশ উৎসুক হয়ে ছিলাম। কিন্তু এত দ্রুত শেষ হয়ে যেন পরিপূর্ণ হলো না গল্পটা। মাঝপথে থেমে গেলে যেমন সামনে চলার একটা আকাঙ্ক্ষা থাকে। গল্পটা ঠিক এভাবেই শেষ করা হয়েছে।
এই বইটিতে অবশ্য সাইকোলজিক্যাল দিকগুলো বেশ দারুন ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখক। ওনার লেখা "আমাদের চিঠিযুগ কু ঝিক ঝিক" বইটা সংগ্ৰহ করেছিলাম কিন্তু সবার আগে পড়া হয়েছে এই ছোট্ট উপন্যাসিকা। এবং আমি আসলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এটাকে কোন জনরায় ফেলা উচিত। কিছু সামাজিক অবক্ষয়, কিছু সুক্ষ্ম থ্রিল, সাইকোলজিক্যাল দিকগুলো নিয়ে বেশ ইন্টারেস্টিং ভাবে এগিয়েছে গল্প। কিন্তু মনে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার আগে বই শেষ।
পাঠক নিজের মতো ভেবে নেবে লেখক হয়তো এটা ধারণা করে লিখেছেন। তবে উনি গল্পটা যে গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তা বেশ ভালোই লেগেছে। লেখকের বাকি বইগুলো এরপর পড়ার ইচ্ছা রয়েছে। বেশ ভালো লেখেন।
শেষটা কেমন তাড়াহুড়ো করে শেষ হলো যেন! অনেক কিছুই ধোঁয়াশায় থেকে গেল। মূল যে ঘটনা নিয়ে এতকিছু সেটার সমাধান আদৌ হলো কি না! লেখক শেষটা ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের ভাবনার উপর। চাইলে থ্রিলার জনরায় খুব ভালো কিছু হয়ে উঠতে পারত বইটা। এর জন্য একটু বিস্তৃতির প্রয়োজন ছিল। তবে খুব যে খারাপ লেগেছে এমন না। লেখকের লেখনশৈলী এতটাই মনোমুগ্ধকর যে ৭০ পৃষ্ঠা না পেরোনো বইটি কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। পড়া শেষে একটা আক্ষেপ রয়ে গেল যেন আরেকটু বড় হলে কী দারুণ উপভোগ করা যেত গল্পটা।
ছোট্ট একটা বই, পৃষ্ঠার হিসেবে ৭০ ও ছোঁয়নি। কিন্তু গল্পের আড়ালে যে সত্যটা লেখক বলেছেন সেটার পরিসর বিশাল।
এবং এত সহজ, স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এটাকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেবে নেয়া ছাড়া আসলে উপায় আর নেই। সাধারণ মানুষের সম্বল শুধু ওই আশার আফিম, পূর্বা যেমন শেষে রূপকথার জাল বোনে, " কঠিন পাথরের ফাঁক দিয়ে কী অনায়াসে গুল্মফুল লতিয়ে ওঠে, নি: সঙ্গ পাথুরে খটখটে দেয়ালের ফাঁকে কেমন অকাতরে অত বড় বটের মূল আর কান্ড জাগে, আর এ রকম সামান্য ঘটনা ঘটতে পারে না? "
আমরা হেঁটেছি যারা, চিঠিযুগ, অন্ধ মেয়েটি জোছনা দেখার পর, গ্রমায়ণের ইতিকথা; ইমতিয়ার শামীমের অন্যান্য লেখার মতই এটাও মূল ঘটনার আড়ালে নিজেকে খোঁজার, নিজের এক্সিটেন্স বোঝার জার্নি। সেই জার্নি লেখক নিজের ভাষার মাধ্যমে করে তুলেছেন বিষাদময়, যেমনটা তিনি করে থাকেন সচরাচর। ইমতিয়ার শামীমের লেখনীর মধ্যেই কী একটা ব্যাপার আছে! ভারী, নীল বিষন্নতা তার সবগুলো বই জুড়ে পাথরের মত বসে থাকে। মুরকামির বইতেও বিষন্নতা থাকে, মেলানকলি থাকে কিন্তু সেটা এমন ঘাড়ের উপর চেপে বসে না সাধারণত। বিষাদ ও এতো ভিন্নতার সাথে প্রকাশ করা যায় কে জানতো!
ছোট্ট বই। কিন্তু ঘটনার মোড় সহ বিবরণ, বিশ্লেষণ, গদ্যশৈলী আর স্টেপ বাই স্টেপ পাঠকের মনে আগ্রহ জমিয়ে রেখে গল্পের সঙ্গে গল্পে জুড়ে দিয়ে এবং পরিশেষে গল্পের বা উপন্যাসের একটি বিশেষ কাঠামো দান করার যে স্পৃহা লেখক সারাক্ষণ অর্থাৎ পুরো গ্রন্থজুড়ে বয়ে বেরিয়েছেন তা সত্যিই ভীষণ প্রশংসিত ও বাহ্বার যোগ্য।
একটা রাশান প্রবচন আছে - "রাত্রি শেষে যার গ্লাসের তলানিতে যতোটুকু পানীয় অবশিষ্ট থাকবে, তার মনের মধ্যেও অনন্তকালের জন্য ঠাঁই করে নেবে ততটুকু বেদনা।''
📘 বই: অন্ধ প্রদীপ শূন্য-পানে
লেখক: ইমতিয়ার শামীম
প্রকাশনী: কথা প্রকাশ
জনরা: থ্রিলার
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৬৩
মূল্য: ১৫০ টাকা
ব্যক্তিগত রেটিং: ⭐️⭐️⭐️⭐️ (৪/৫)
📖 প্লট সংক্ষেপ:
কিছুদিন আগে মূলধারার এক সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম গ্রাজুয়েট একটা ছেলের চাকুরি হচ্ছেনা পিতৃ ও মাতৃপরিচয় না থাকার কারণে। এক বিশেষ কারণে বাবা-মা কেউই তার পরিচয় দিতে চায়না। যাইহোক বইয়ের প্লটে ফেরা যাক।
গল্পকথক পূর্বা ইউনিভার্সিটি পডুয়া মেয়ে। বাবা জাফর আহসান একজন প্রথিতযশা স্থপতি আর মা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে। হঠাৎ করে স্থপতি বাবার অফিসে আগুন লাগে। পুড়ে ভস্ম হয়ে যায় তার বাবা সহ অনেকেই। যখন স্থপতির ডিএনএ টেস্ট করা হলো দেখা গেলো তার বাবা মার সাথে ডিএনএ ম্যাচ করলেও, ম্যাচ করছেনা মেয়ে পূর্বার সাথে। আবার পূর্বার মায়ের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো ডিভোর্স লেটার, তার বাবা নাকি তার মাকে ডিভোর্স দিয়েছেন তিন বছর আগেই। ঝামেলার সূত্রপাত এখান থেকেই, চাচার মিলে পূর্বা আর তার মা-কে বাড়ি থেকে অনেকটা শূন্য হাতে বিদায় করে দিলো। পূর্বা তার মাকে নিয়ে উঠলো তার এক বান্ধবীর ফ্লাটে। এদিকে বদনাম রটে যাওয়ার কারণে পূর্বার মাকে চাকুরি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বরখাস্ত করা হলো। পূর্বারও ডাক পড়লো ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যানের কাছ থেকে, সে ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারবে কিনা এই প্রসঙ্গে। এদিকে তার বান্ধবীর ফ্লাটেও চলছে নিয়মিত গোয়েন্দাগিরি। কিন্তু কেনো এইসব চক্রান্ত? কি উদ্দেশ্য?
📰 প্রেক্ষাপট সংযুক্তি:
লেখক এই উপন্যাসে কয়েকবার লুই কানের স্থাপত্য ভাঙার চক্রান্তের উল্লেখ করেছেন। গল্পের স্থপতি জাফর আহসান ছিলেন ল্যুই আই কানের স্থাপত্য ভাঙার ঘোর বিরোধী।
এ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রথম আলোর ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি সংবাদের তথ্য আমার চোখে পড়ে। সংবাদের সারসংক্ষেপ এমন —
“লুই কানের নকশায় ১৯৬৪ সালে শুরু হওয়া সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের নির্মাণ শেষ হয় ১৯৮২ সালে। মূল নকশায় কবরস্থানের স্থান না থাকায় শেরেবাংলা নগরে থাকা কবর স্থানান্তরের পক্ষে মত দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত ম��্ত্রণালয়। বর্তমানে সেখানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ আটজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কবর রয়েছে। এছাড়া রয়েছে লুই কানের নকশাবহির্ভূত সাতটি স্থাপনা, যার মধ্যে রয়েছে বিআইসিসি ও স্পিকারের বাসভবন। মূল নকশা সংগ্রহে সরকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ৪ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। সরকার নকশার মৌলিকতা রক্ষায় নকশাবহির্ভূত কবর ও স্থাপনা অপসারণে উদ্যোগ নিচ্ছে।”
এই তথ্য জানার পর বুঝলাম, ইমতিয়ার শামীম নিছক থ্রিলার লেখেননি—তিনি সাহসী যথেষ্ট প্লট নিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে স্থাপত্য-কবর রাজনীতি এবং বাংলাদেশ নোংরা রাজনৈতিক চক্রান্তকে তিনি নিপুণভাবে গল্পে বুনেছেন।
🖋️ ভাষা ও নির্মাণশৈলী:
লেখকের গদ্যশৈলী নিয়ে বলার কিছু নাই, বরাবরের মতোই অসাধারণ । কিছু সংলাপ মনে গেঁথে থাকার মতো, বিশেষত আইডিয়োলজি নিয়ে বলা দৃঢ় কথাগুলো।
গল্পের ক্লাইম্যাক্সটি যেন শেষ হয়েও হইলোনা শেষ টাইপের। শেষ লাইনে যদিও একটি আশাব্যঞ্জক লাইন টেনেছেন লেখক:
“আচ্ছা, এই ক্লেদাক্ত, যন্ত্রণাকর, কষ্টকর, কর্কশ পৃথিবীতে কত কিছুই তো ঘটে—ফাঁক দিয়ে কি অনায়াসে গুল্মফুল লতিয়ে ওঠে, খটখটে দেয়ালের ফাঁকে কেমন অকাতরে বড় বটের মূল আর কাণ্ড জাগে, আর এরকম সামান্য ঘটনা ঘটতে পারে না?”
গল্প যখন বাস্তবতাকে ধারণ করে তখন গল্পটা বেশ রোমাঞ্চকর হয়ে উঠে।নিত্যনতুন ঘটনা যা ঘটে যাচ্ছে কিছু আমরা জানি যা মেকি সব লোক দেখানো আর কিছু আমাদের অগোচরে প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে।বইটাকে থ্রিলার একটি এফেক্ট দিয়ে লেখক তুলে ধরেছেন ক্ষমতার অপব্যবহার।জাফর আহসান নামক একজন স্থপতি হটাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল এবং আগুন লাগল চন্দ্রিমা ভবনে বলা হলো তার মৃত্যু হয়েছে ঐ ভবনে আগুনে পুড়ে।শনাক্ত পরীক্ষায় বের হলো নতুন তথ্য যা জাফর আহসান এর বউ এবং মেয়ের জীবন উল্টে পাল্টে রেখে দিল।নাম না জানা কিছু মানুষ তাদের আসে পাশে ঘোরা-ফেরা করতে থাকল।ক্রমাগত কিছু একটা খুজে চলেছে তারা।যে আগুন দিয়ে গল্প শুরু হলো তা শেষে সব ছাই করে দিয়ে গেলো। লেখক চাইলে গল্প আরও বড় ও বেশ ভালো করে থ্রিলারে রুপান্তর করতে পারতেন।এন্ডিং এর কারণে হালকা হতাশ হলাম।গল্প ছোট হলেও খুব নির্মম বাস্তবতা দেখানো হয়েছে।
জাস্ট ইমাজিন আপনার বাবা আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছেন।লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে আপনার ডিএনএ'র সাথে বাবার ডিএনএ মিলেনি।আপনার মানষিক অবস্থা তখন কেমন হবে? এরকমই এক অস্তিত্বের সংকটে আছেন গল্পের কথক পূর্বা।
বাবার সবকিছু পূর্বার চাচারা দখল করে নিয়ে মা মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।বাড়ি ছাড়া হয়েও তাদের সমস্যা থামছিলো না।পূর্বাকে ইউনিভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করা হয় আর এদিকে তার মা কে অফিস থেকে দিলো অনির্দিষ্টকালের জন্য অবসর।কোন এক অজানা শক্র তাদের মা মেয়েকে যেন একদম মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলার পণ করেছে।কিন্তু এরা কারা যারা একজন মানুষকে মেরে ফেলেও তার পরিবারের সদস্যদের শান্তি বিনষ্ট করে চলেছে! আর কেনই বা করছে এসব? এমন অনেক প্রশ্ন পাঠকের মনের খচখচানি বাড়িয়ে তুলবে যার উত্তর নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।
ইমতিয়ার শামীম এর লেখা বই গুলোর বিষয়বস্তুতে অবাক না হয়ে পারি না।ভিন্ন ধাচের গল্প গুলো তিনি তার আরাম আরাম লেখায় এত চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন যে একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে শান্তি পাই না।এ বইটি এক বসায় পড়ে শেষ করে ফেলার মতো।শেষ হওয়ার পর এক গভীর ভাবনা আপনাকে ঘিরে ধরবে।নিখোঁজ হওয়া মানুষদের পরিবার গুলো কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায় তার একটা সূক্ষ্ম ধারণা পাওয়া যায় এখানে।নিঃসন্দেহে একটি সাহসী লেখনী।