কর্ণ মহাভারতের সর্বাধিক অবহেলিত অথচ অপরিহার্য চরিত্র। জন্মমাত্র মা কুন্তী সমাজভয়ে তাকে নদীতে বিসর্জন দেন। ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও বর্ণাধম সূতপুত্রের অপমান সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে কর্ণকে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যখন বাধে, এই রাধেয় কৰ্ণ সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সহোদরদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে নামতে হয় তাকে। জননী কুন্তী স্বার্থপর এক নারীরূপে কর্ণের সামনে উপস্থিত হয়। মায়ের আত্মপরতা বুঝেও মাকে খালি হাতে ফেরায় না কর্ণ। কর্ণের জীবনে গভীর এক উদাসীনতা নেমে আসে। দানশীলতায় মগ্ন হয়ে পড়ে। দেবরাজ ইন্দ্রকে চিনতে পেরেও রক্ষাকবচ তাঁর হাতে তুলে দেয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আরেকজনের হাতে তুলে দেবে বলে প্রাণটা রক্ষা করে চলে। কার হাতে তুলে দেবে প্রাণটি? কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবার জন্য প্রাণবিসর্জনকে তোয়াক্কা করে না কর্ণ? পঞ্চপাণ্ডব কারা? তারা কি প্রকৃতই পাণ্ডুপুত্র? কুন্তী কি স্বামীনিষ্ঠ? কৃষ্ণ কি দেবতা? না দেবতার আড়ালে দুর্দান্ত এক বর্ণবাদী কূটকৌশলী? কর্ণের কাছে মাতৃত্ব বড়, বন্ধুত্ব শ্রেয়? এসব প্রশ্নের অনুপুঙ্খ উত্তর আছে ‘কর্ণ’ নামের এই উপন্যাসে। হরিশংকর জলদাসের ভাষা এখানে তীব্রভাবে আকর্ষণীয়।
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
কর্ণ চরিত্র সম্বন্ধে লেখা বই ভেবে পড়া শুরু করেছিলাম। তারপরে বইটা পড়ে দেখলাম লেখক পুরো মহাভারতের সংক্ষিপ্তসার করে ফেলেছেন। কর্ণ চরিত্রের থেকে লেখক মহাভারতের অন্যান্য চরিত্রের আলোচনা যেন বেশি পরিমাণে করেছেন। আবার এক জায়গায় তথ্যের ভুলও খুব বাজে ভাবে আছে। লেখক লিখে দিয়েছেন যে ভীষ্ম নাকি মৎস্যগন্ধা ও পরাশর মুনির ধর্ষণের সন্তান। এতখানি তথ্যগত ভুল কিভাবে হলো সেটা বুঝলাম না। এছাড়া মুদ্রণ প্রমাদ ও বানান ভুল বইয়ের যত্রতত্র আছে। হয়তো বাংলাদেশ বইমেলার তাড়াহুড়ো করে প্রকাশ করার ফল এই বই যা পাঠকের সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট করে। লেখকের লেখনীর জন্য খালি এক তারা দিলাম নাহলে এই ভুলে ভরা বইয়ের প্রাপ্য এক তারাও নয়।
বইটার নাম কর্ণ দেখে মনে করার কোনো কারণ নাই উপন্যাসটা কর্ণকে নিয়ে লেখা৷ এই বিভ্রান্তি শিকার আমিও হয়েছিলাম। তবে পড়তে পড়তেই বুঝলাম লেখক যা লিখেছে তা হলো অতি দুর্বল ভাষায় লেখা মহাভারতের সারসংক্ষেপ। (এবং সেইটাও বেশ ভুল-ত্রুটিযুক্ত৷ যেমন এক জায়গায় ভীষ্মের বাবা-মা হিসেবে পরাশর আর সত্যবতীর নাম বলা)
এছাড়া মহাভারতের এই বিশাল ঘটনা আড়াইশো পাতার মলাটের মধ্যে আনতে যেয়ে অনেক ঘটনা তিনি এমন সংক্ষেপে লিখে গেছেন যে মহাভারতের কাহিনী খুব ভালোভাবে জানা না থাকলে কাহিনী ধরতেও খেই হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে। তাছাড়া মহাভারতের উপর ভিত্তি করে কম উপন্যাস লেখা হয় নাই। অন্যান্য লেখকরা সাধারণত চেষ্টা করেন সেই চিরপরিচিত কাহিনীর মধ্যেও নিজের ইন্টারপ্রিটেশন এনে কাহিনীতে কিছুটা নতুনত্ব আনার। এইটায় তেমন চেষ্টাও নাই বলতে গেলেই চলে। শুরুতে শুধু দেখিয়েছেন কর্ণর জন্ম ঋষি দুর্বাসার কুন্তিকে ধর্ষণের মধ্য দিয়ে।
বইটা যে আসলেই কর্ণকে নিয়ে লেখা তা বোঝার উপায় কর্ণ মারা যেতে না যেতেই উপন্যাসও শেষ৷ মহাভারতের চরিত্রের নামে উপন্যাস লেখার অভ্যাস অবশ্য লেখকের পুরনো। এর আগেও একলব্য আর দুর্যোধন নামে উপন্যাস লিখেছেন। সেগুলোও এমনই কিনা কে জানে! এমনই হয়ে থাকলে লেখকের আবিষ্কার করা ফর্মুলার প্রশংসা করতেই হয়৷ প্রত্যেক বইজুড়ে একই কাহিনীই বারবার বলে যাবেন, শুধু বই শেষ হবে যে চরিত্রের নামে বই মহাভারতে সে যখন মারা যায় তখন। এইভাবে প্রতি বছর নতুন নতুন বইও বের করা গেল কম পরিশ্রমে, বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে দুষ্টু দুষ্টু পত্রিকার বিরুদ্ধে বিবৃতিও দেওয়া গেল।
চম্পটনগরীর পার্শ্ববর্তী তটিনীর নাম গঙ্গা। স্ত্রী রাধার অনুরোধে প্রায়ই সেখানে গঙ্গাস্নানে আসেন অধিরথ। যৌবনে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের রথ চালিয়েছেন, কালক্রমে সম্পর্কটা গড়িয়েছে বন্ধুত্বে। রথ চালানোয় ইস্তফা দিলেও বন্ধুত্বটা রয়ে গেছে এখনো অটল। এবারও গঙ্গাস্নানে এসে অধিরথ স্ত্রী রাধা গঙ্গাস্নানে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠেন, গঙ্গায় ভেসে যাওয়া এক পেটিকাকে দেখে। অধিরথ পেটিকাটা নদী থেকে কাছে আনতেই দেখেন রূপ-লাবণ্যে হেমবর্ণধারী কুন্ডলযুগল বিভূষিত মখলম জড়ানো এক শিশু শোয়ানো।
এ কী অপার লীলা ইশ্বরের! দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের তাঁর। বিবাহিত জীবনে সন্তানকে বুকে জড়ানোর সুযোগ পাননি রাধা। সারাটা জীবন সন্তানের হাহাকারে কেটেছে। কিন্তু আজ কী হলো! ইশ্বরের এত কৃপা এই সৌম্যকান্ত রূপ-লাবণ্য জড়ানো পুত্রটি পাঠালেন, ভাবতে ভাবতেই কোলে তুলে নিলেন শিশুকে।
সোনার বর্ম কুন্ডল নিয়ে জন্মগ্রহণ করায় তার নাম রাখা হলো বসুষেণ, পরে অবশ্য সেই নাম আর রইলো না। কেউ কেউ তাকে বৃষও ডাকা শুরু করে। সমাজের বর্ণবাদী চেতনার মানুষগুলো একে সূতপুত্র সম্বোধন করে স্বস্তিবোধ করতে লাগলো। আরও পরে বসুষেণের নাম হয়ে গেলো 'কর্ণ'
'কর্ণ' মহাভারতের সর্বাধিক অবহেলিত অথচ অপরিহার্যও এক চরিত্র। হরিশংকর জলদাসের 'কর্ণ' উপন্যাসের পাতায় পাতায় বর্ণিত হয়েছে এই কর্ণের গল্প। জন্মমাত্র মা সমাজভয়ে নদীতে বিসর্জন দিয়েছিলো। ক্ষত্রিয়কূলে জন্মগ্রহণ করেও বর্ণাধমে সূতপুত্রের অপমান সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে কর্ণকে। শৈশব কৈশোরে রাজ আচার্য দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে সূতপুত্রের খোঁটায় পঞ্চপাণ্ডবদের উপহাস আর গুরুর তাচ্ছিল্য কর্ণকে যুদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে এক অন্যরকম ভূমিকা রেখেছে। আর তাই তার দৃঢ়মনোবল আর পরিশ্রমে অস্ত্র শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছে স্বয়ং পরশুরামের কাছ থেকে।
শৈশব-কৈশোরের গুরু দ্রোণাচার্য আর পঞ্চপাণ্ডবের উপহাস তাকে যেমন তাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, মনের গহিনে তাদের প্রতি জমে উঠে প্রবল ঘৃণা, সেই সাথে বন্ধুত্বের এক অমুক বন্ধন গড়ে উঠে কৌরবকূলের সন্তান দূর্যোধন ও তার ভ্রাতাদের সাথে। আর বয়স যত পেরিয়েছে ততই কর্ণ হয়ে উঠেছে পঞ্চপাণ্ডব বিরোধী। বইয়ের পাতায় পাতায় সেই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, সেই ঘৃণার আগুন আরো প্রজ্জ্বলিত হয়েছে দ্রৌপদীর সূতপুত্র কর্ণকে অপমানের জন্য।
জীবন থেমে থাকে না। স্রোতস্বিনীর মতো ছোটোবড়ো বাধাকে অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কুরু সাম্রাজ্যের নানান কূটকৌশল, পঞ্চপান্ডব বিরোধী, স্বার্থপর কর্ণের জীবনেও একসময় নেমে আসে গভীর উদাসীনতা। দানশীলতায় মগ্ন হয়ে পড়ে সে। একসময় গর্ভধারিণী জননী এক স্বার্থপর নারীরূপে কর্ণের সামনে উপস্থিত হন, মায়ের আত্মপরতা বুঝেও মাকে সেদিন খালি হাতে ফেরায় না কর্ণ। এবং কী দেবরাজ ইন্দ্রকে চিনতে পেরেও রক্ষাকবচ তাঁর হাতে তুলে দেয়।
কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ যখন বাধে, এই রাধেয় কর্ণ সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। সহোদরদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে নামতে হয় তাকে। আজীবন জাতপাতের উপহাস, অবহেলা আর জন্ম নিয়ে কটাক্ষ সহ্য করে যাওয়া কর্ণও অজেয় হয়ে উঠে যুদ্ধে। কিন্তু যে যুদ্ধের পরতে পরতে বিশ্বাসঘাতকতা, পক্ষপাতিত্ব রোপিত আছে সেখানে কী পারবে কর্ণ বিজয় চিনিয়ে আনতে! নাকি এক বর্ণবাদী কূটকৌশলী কৃষ্ণই তাকে রুখে দিবে অস্ত্র হাতে না তুলেও। একদিকে বন্ধুত্ব অন্যদিকে মাতৃত্ব কাকে বেছে নেবে কর্ণ।
বইটির প্রথমাংশে বর্ণিত হয়েছে কুন্তিভোজের কন্যা কুন্তির, পঞ্চপান্ডবের এই মাতার পরই কর্ণসহ পঞ্চপাণ্ডব আর কৌরবকূলের অস্ত্রশস্ত্রে বেড়ে উঠার গল্প বর্ণিত হয়েছে। এখান থেকেই কর্ণ চরিত্রটি ভবিষ্যতে কেন এতো কূটকৌশলি, পাঞ্চববিরোধী হয়ে উঠছিলো তা ক্ষণে ক্ষণে পরিস্কার হয়ে উঠে। সমাজের কটাক্ষ, আর পদে পদে লাঞ্ছিত হতে থাকা এই কর্ণ চরিত্রকে আপনি বইয়ের পাতায় না ভাবতে পারবেন নায়ক হিসেবে, ন��� কল্পনা করতে পারবেন খলনায়ক হিসেবে। কখনো তার প্রতি ঘৃণা জন্মাবে মনে হবে তার একরোখা মনোভাবই ভয়াল পরিণতির কারণ আবার একই সাথে জীবনভর এক অজেয় বীরযোদ্ধা হওয়ার পরও তাকে যে পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে তার জন্য করুণা হবে।
বইটির অধিকাংশ জুড়েই কর্ণকে আমি পছন্দ করতে পারিনি। তার কূটকৌশল, ঘৃণার প্রতি প্রচন্ড বিতৃষ্ণা জন্মেছিলো কিন্তু বই শেষ করার পর মনে হয়েছে কর্ণ সম্পূর্ণ বই জুড়েই ছিলো এক রহস্যময় চরিত্র। যে জীবনভর জীবনের সকল করাঘাত এক মানসিক দৃঢ়তা, একাগ্রতার বর্ম আবরণে ডেকে রেখেছিলো। হরিশংকর জলদাসের এই বইটি যখন শুরু করেছিলাম তখন প্রত্যাশা তেমন ছিলো না, কিন্তু এখন শেষ করে এক তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছি। লেখকরে ভাষাশৈলিতে কর্ণ দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। কর্ণকে তুলে আনতে গিয়ে লেখক মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের পরিণতির গল্প কৌরবকূলের দৃষ্টিতে তুলে এনেছেন। আর এখানে কর্ণকে ঘীরে যে গল্পের অবতারণা হয়েছে সেই গল্পই স্থান পেয়েছে। মহাভারতের গল্প কিছুদিন আগেই ব্যাধবেসের দৃষ্টিতে পড়েছিলাম, এবার কর্ণের দৃষ্টিতে একই গল্প পড়ে একদিকে যেমন রোমাঞ্চকর অনূভুতি হয়েছে আবার শেষ করে এই কর্ণের জন্যই বই শেষ করে মনের আকাশে জমেছে বিষণ্ণতার মেঘ।
হরিশংকর জলদাসের এই 'কর্ণ' বইটি আমার হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে। বইটির প্রোডাকশন আর প্রচ্ছদও একেবারে মনোমুগ্ধকর। রয়াল সাইজের মাত্র ২৫৬ পৃষ্ঠার বইটি হাতে নিলেই এক অন্যরকম অনূভুতি হয়। সব্যসাচীর একবারে সাদামাটা লাল রঙের প্রচ্ছদ আমার চোখে দারুণ এক প্রচ্ছদ মনে হয়েছে। মহাভারত নিয়ে যদি আগ্রহ থাকে তাহলে এই কর্ণ বইটি নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নিতে পারেন, আশাকরি বইয়ের পাতায় পাতায় যে একেক সময় একেক রকম অনূভুতি এনে দিবে আর শেষ করে কর্ণের প্রতি যে মনেভাব নিয়ে আসবে তাতে বইটি পড়ে স্বার্থক মনে হবে।
"মহাভারত" উপাখ্যান এ যে চরিত্র গুলো মানুষের হৃদয়ের অন্তস্থলে জায়গা করে নিয়েছে তাদের অন্যতম একজন হলেন "মহাবীর কর্ণ"।।
তিনি ছিলেন প্রবল পরাক্রমী এবং মহাধনুর্ধর,যার তুলনা একমাত্র অর্জুন ছাড়া আর কারো সাথে হওয়া অসম্ভব।।কিন্তু প্রকৃতির ইচ্ছায়,ভাগ্যের নির্মম বাস্তবতায় তারা প্রকৃতপক্ষে দুজনে ছিলেন সহোদর ভাই।।এই সত্যিটা, কর্ণ যুদ্ধ শুরুর আগে জানলেও অর্জুন জানতে পারেননি,জেনেছিলেন তাঁর হাতে কর্ণের করুণ মৃত্যু হওয়ার পর।।কতই না অদ্ভুত!!
সমাজ ও লোক লজ্জার ভয়ে কুন্তী তাঁর প্রথম সন্তান কর্ণের পরিচয় কারো কাছে প্রকাশ করতে পারেননি অথচ সেই সমাজের অনিয়ম আর অধর্মের কারণে তাঁর নিজ সন্তানের হাতে অন্য সন্তানকে নিহত হতে হলো!! ভাবতে অবাক লাগে,লোক লজ্জা আর সামাজিক অবস্থান কি নিজের আত্মার সম্পর্কগুলো থেকেও বড়??যেখানে একজন মা তার নিজ সন্তানের পরিচয় দিতেও অপারগ!!
কর্ণের প্রতি সমাজ যে অন্যায় আর অবিচার করেছে সেটা কখনোই ক্ষমাযোগ্য নই।।মাঝেসাঝে ভাবি,মানুষের জন্যই কি সমাজ,নাকি সমাজের জন্যই মানুষ??আমাদের সমাজ কেন এতো নির্মম আর নিষ্টুর??যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবর্তে জন্মগত বংশপরিচয়~ই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।।জাতপাতের এই হীন মানসিকতার কারনে এক মানুষ অন্য মানুষকে অসম্মান ও ছুঁরে ফেলতেও পিছপা হয় না।।
কর্ণের উচিত ছিল,নিজ জীবনের সংঘর্ষ আর সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে সত্যের পথে নিয়ে যাওয়া,ধর্মের পথে থেকে নিজেকে উত্তম মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।। তাহলে হয়তো আজকের এই কর্ণ থেকে সেই কর্ণ অনেক বেশি সম্মানিত আর শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকতো।।কিন্তু কর্ণ সেই পথ বেছে নিতে পারেননি।।
কেউ যদি কর্ণের এই করূণ পরিণতির জন্য শুধু কর্ণকেই দায়ী করে তাহলে তা অনুচিত বলে আমার মনে হয়।।আমরা কি চিন্তা করেছি, সমাজ তাকে সত্যের পথ বেছে নেওয়ার আদৌ বাস্তবসম্মত সুযোগটা দিয়েছিল??যতক্ষণে সে তার নিজের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে ততক্ষণে তো অনেক দেরি হয়ে যায়।।কিভাবে সে দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতো??এই গোটা পৃথিবী একটা নীতির উপরেই দাঁড়িয়ে,সেটা হলো একে অপরের প্রতি বিশ্বাস।।দুর্যোধন কর্ণের প্রতি সেই নিখাদ বিশ্বাসটাই রেখেছিল,যার মূল্য কর্ণ তার জীবন দিয়ে শোধ করেছে।।
"হরিশংকর জলদাস" তার লেখা" কর্ণে " নিজের অভিব্যক্তি ও চিন্তা তুলে ধরেছেন।।এটা যদি কেউ ধর্মের সাথে মিলিয়ে পড়েন তবে ধাক্কা খাবেন।। অসাধারণ একটা উপন্যাস।।❣️❣️
মহাভারতে সবচেয়ে উপেক্ষিত চরিত্র সম্ভবত কর্ণ। জন্মলগ্ন থেকেই লজ্জা আর উপেক্ষা তার সঙ্গী। রাজকুলের চিহ্ন আর ভাগ্য নিয়ে জন্মালেও তার পরিচয় সুতপুত্র রূপে। দুর্যোধন তাকে নিজের ভাইয়ের এর বেশি ভালোবেসেছে, মর্যাদা, স্নেহ, মান, যশ, রাজার পরিচয় দিয়েছে। তাই শত দোষ সত্ত্বেও বন্ধুর প্রতি তার কর্তব্য আর আনুগত্য কখনো থেমে থাকেনি। কৃষ্ণের কূটনৈতিক চাল, কৌরবদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, দাতা-কর্ণ হিসেবে তার ভালোমানুষির সুযোগ, দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে তার নিজের পরিণাম, সর্বোপরি নিজের আসল পরিচয় জেনেও দুর্যোধনের সঙ্গ সে ছাড়েনি।
বিতর্কিত চালু কথায় তাই বলে ভাই হবে রাবনের মতো, আর বন্ধু হবে কর্ণের মত।
এবার আসি এই বইটির কথায়। কর্ণ নামধারী বইটি থেকে আমার প্রত্যাশা ছিল অন্যরকম। আমি চেয়েছিলাম কর্ণের জীবনী পড়তে। তার জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জানার কৌতূহল। কিন্তু এই বইটি সেইদিক থেকে কিছুতা ব্যর্থ।
বইটি শুরু করার পর বইটির প্রথম এক তৃতীয়ংশ পাতা জুড়ে কর্ণের উল্লেখ ২-৩ বার। এরপরেও কর্ণের যা উল্লেখ তা শুধু চিরাচরিত মহাভারতের কাহিনী। আলাদা করে কিছু পেলাম না। এই বইটিতে এমন কিছু শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে, যেটা মহাভারতের সাথে ঠিক মেলে না, এটা সম্পূর্ণ আমার মত। তবে প্রতিবারের মতো এই বারেও এই বইটি পড়ে মহাভারত বিষয়ে নতুন কিছু জানলাম।
কুন্তী বলপূর্বক অনিচ্ছাকৃত ভাবে দুর্বাসা মুনির কামক্রোধে মধ্যে পড়ে আর ফলস্বরূপ কর্ণের জন্ম হয়। এই বইটিতে এরকম উল্লেখ আছে যে প্রথম ৩ কৌন্তেয় বিদুরের ঔরসজাত। এই দুটো তথ্য পড়ে গুগল সার্চ করে করলাম, স্বপক্ষে কোনো তত্ত্বের সন্ধান পেলাম না। এটি লেখকের মস্তিস্কপ্রসূত না এরকম কোনো উল্লেখ মহাভারতে আছে, এই ব্যাপারটা ধোঁয়াশা রইলো।
মহাভারত পড়েছিলাম রাজশেখর বসুর অনুবাদ।কিন্ত এতো বিস্তৃত ঘটনাপ্রবাহ মনে রাখা দায়। তাই ইচ্ছে ছিল খন্ড খন্ড করে সব পড়ব যাতে পরে একটার সাথে আরেকটা কে লিঙ্ক করে মনে রাখতে পারি।তাই দ্রৌপদী উপাখ্যান, শকুন্তলা এরকম কয়েকটা বই পড়েছিলাম। এটাও সেই পরিকল্পনার ই অংশ। মৎসগন্ধ্যা পড়ার পর এটা পড়ে বুঝতে পারলাম কিভাবে দুটো সম্পর্কিত। মহারাজ শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিয়ে থেকে শুরু করে কুরুক্ষেত্রে কর্ণের মৃত্যুতে শেষ হয়েছে ঘটনাপ্রবাহ।হরিশংকরের লেখা বেশ ঝরঝরে। তাই পড়তে ভালো লাগে।
মহাভারত, রামায়ণ এসব পৌরাণিক চরিত্রদের একটা বৈশিষ্ট্য আমার খুব মনে ধরে। সেটা হলো কোনো চরিত্র নায়ক না খলনায়ক এটা পাঠক যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে তার উপর নির্ভরশীল। আমি যখন প্রথম রামায়ণ পড়েছিলাম বিভীষণ কে ধার্মিক এবং সঠিক মনে হয়েছিল। কিন্ত মেঘনাদ বধ কাব্য পড়ার পর মনে হলো "আরেএএএ,এভাবেও তো ব্যাপার টাকে দেখা যায়।" যখন রাজশেখরের মহাভারত পড়েছিলাম সেখানে উচ্চবর্গীয় মানুষদের চরিত্রে নেতিবাচক দিক টা কম।কিন্ত হরিশংকর নিচু বর্ণের হওয়ায় উনি উচ্চবর্ণের মানুষের নিষ্ঠুর আর অনৈতিক আচরণগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। কর্ণ আর মৎস্যগন্ধ্যার ছেলে দুজনেই ঋষির ধর্ষণের ফসল। তাই সবমিলিয়ে বেশ। ভালো খারাপ মিলিয়েই তো মানুষ। আর এর সেরা উদাহরণ মহাভারতের চরিত্রগুলো।
মহাভারতের সার সংক্ষেপ লিখে রেখেছেন দেখছি! মাত্র দুটো অধ্যায়ে কর্ণকে ভালো করে পেয়েছি। আশাহত হয়েছি। লেখক যা লিখেছেন তা মহাভারত পড়া প্রতিটি নিরপেক্ষ পাঠকের আত্মোপলব্ধি।
এই বইটাকে কর্ণের নাম বেঁচে খাওয়া ছাড়া কিছু ভাবতে পারছিনা।
অনেক আশা নিয়ে পড়া শুরু করে চরম হতাশ হয়ে গেলাম। অভাজনের মহাভারত পড়লেই বোঝা যাচ্ছিল লেখক ঠিক কতটা গভীরভাবে মহাভারত নিয়ে চিন্তা আর গবেষণা করেছেন। সেই তুলনায় এই বই চরমতম অগভীর।