ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশান, এই ক্লিশে বাক্যটা বারবার মনে পড়ছিল কোওতারোও ইসাকা-এর ২০০৭ সালে প্রকাশিত থ্রিলার 'রিমোট কন্ট্রোল' পড়ার সময়। মনে পড়ার কারণ যে দেশে যে সময়ে আছি সেটাই। কিছুদিন আগেই, খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে, এবং ততোধিক অবিশ্বাস্যরকম সহজ উপায়ে বিনা বাধায় আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, এটা সবারই জানা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, জাপান সম্পর্কে গত কয়েক দশকে বিশ্ববাসীর, এবং যারা জাপানে কিছুদিন থেকেছেন, তাদের সে ধারণা একটা বড় ধাক্কা খেয়েছে এই ঘটনায়। আততায়ীর হাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিহত হবার চেয়েও বিস্ময়কর হলো যেরকম বিনা কষ্টেই তাকে মারতে পেরেছে আততায়ী। জাপানের রাজনীতিবিদরা সাধারণত কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝে থাকেন না। বলা ভাল, বেশিরভাগেরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই নেই। যে শহরে থাকি সেখানে নির্বাচনের সময়ে দেখেছি প্রার্থীরা মাঝে মাঝে বড় কোন রাস্তার মোড়ে বা শহর চত্বরে দাঁড়িয়ে লোকজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন, মাঝে মাঝে একটা পিকআপ ট্রাক জাতীয় কিছু ভাড়া নিয়ে সেটার উপর দাঁড়িয়েও কথা বলেন কেউ কেউ। অল্প কিছু লোকজন শোনে, বেশিরভাগই শোনে না। শিনজো আবে-ও নারা শহরে এরকম খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলে তাঁর অবশ্য নিরাপত্তারক্ষী ছিল। এখানে বলে রাখা ভাল, শিনজো আবে সাধারণ কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; পারিবারিকভাবেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। তাঁর নানা ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী, বাবা ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কিন্তু সবচেয়ে মনোযোগ দাবী করেন আবে'র মা, যিনি পর্দার আড়ালে নিজের বাবার পার্টির রাজনীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়লেও অনেকেই অনুমান করেন যে, তিনি তাঁর মায়ের মতই 'কিংমেকার'-এর ভূমিকা পালন করছিলেন। এহেন গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিকে একটা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ঘরে বানানো পিস্তল দিয়ে (বাংলাদেশে একসময় ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের কাছে 'পাইপগান' নামে একরকম হাতে বানানো বন্দুক পাওয়া যেত, যার নিশানা তেমন সুবিধার ছিল না, এটাও সেরকম কিছুই) মাত্র কয়েক ফিট দূরে দাঁড়িয়ে গুলি করা হলো, এবং প্রথম গুলি মিস হবার পর যে কোন দেহরক্ষী আগে যেখানে 'সাবজেক্ট'-কে রক্ষা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে আড়াল করার কথা সেখানে আবে'র নিরাপত্তা রক্ষীরা এদিক-ওদিক বেকুবের মত তাকাতে তাকাতে তাঁকে আবারও গুলি করা হলো (যে গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে), তাতে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব গজালে অবাক হবার কিছু নেই। আরো অবাক ব্যাপার হলো আততায়ীর বলা কাহিনী। এই লোকের মা নাকি নিজের সব সম্পদ তাকে না দিয়ে এক ধর্মীয় গোষ্ঠীকে দান করেছে, যে গোষ্ঠীর মিটিংয়ে আবে-কে দেখা গিয়েছিল, আর সেই ক্ষোভ থেকেই নাকি এই হত্যাকাণ্ড। এমন আষাঢ়ে গপ্পো হাইকোর্ট এলাকার পাঁড় গাঁজাখোরও বিশ্বাস করবে কিনা সন্দেহ, কিন্তু দেখা গেল, জাপানিরা এই গল্পকে প্রতিষ্ঠিত করে ঝটপট আবে সাহেবের শেষকৃত্য করে নিজের কাজে ফেরত গিয়েছে।
'রিমোট কনট্রোল' বইটা দেখেছি এই ঘটনার কিছুদিন পরে, পাবলিক লাইব্রেরিতে। এমনিই নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু পড়তে পড়তে চোখ কপালে উঠে গেল। এ যেন ১৫ বছর আগেই কোন ঘটনার স্ক্রিপ্ট লেখা হয়ে যাচ্ছে। গল্প শুরু হয় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর হত্যাকাণ্ড দিয়ে। সদ্য নির্বাচিত তরুণ প্রধানমন্ত্রী খুন হয়ে যান তাঁর নিজের শহর সেন্দাই-এ, শোভাযাত্রার সময়। একটা রিমোট কন্ট্রোলড খেলনা হেলিকপ্টারে বোমা বেঁধে তাঁর গাড়ির উপর ফাটিয়ে দেয়া হয়। সেই অতি শিথিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেই অতি সহজেই একজন ভিভিআইপি খতম। এই হত্যাকাণ্ডের পুরো দায় ফেলা হয় সেন্দাই শহরের এক অতি নিরীহ ডেলিভারি ট্রাক ড্রাইভার মাসাহারু আয়োইয়াগি'র উপর। বেচারা কিছুই জানে না, হঠাৎই দেখে তাকে পুলিশ ধাওয়া করছে বন্দুক নিয়ে। এখানে বলে রাখা ভাল, জাপানের পুলিশ বন্দুক-পিস্তল বহন করে না, জনসমক্ষে গোলাগুলি করা তো দূরের কথা। অথচ আয়োইয়াগিকে দেখামাত্র পুলিশ গুলি ছুঁড়ছে, জনগণের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে। পুলিশের ধাওয়া খেতে খেতেই আয়োইয়াগি বুঝতে পারে, গত কয়েক মাস ধরেই তাঁর জীবনে কোন অদৃশ্য শক্তি হস্তক্ষেপ করছিল। হুমকি দিয়ে তার চাকরি খাওয়া হয়েছে, তার নাম��� মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে, মোট কথা, জনসাধারণ যেন সহজেই বিশ্বাস করে যে, এই লোকের পক্ষে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যে কাউকেই খুন করা সম্ভব। একসময় আয়োইয়াগি বুঝতে পারে, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা যারা করেছে, এরা এতই উপর মহলের লোক যে, তার পক্ষে এদের ধরাছোঁয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে কি নিজের প্রাণটা খোয়াতেই হবে? জানার জন্য শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়তে হবে।
এই বইতে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে ভাল লেগেছে, সেটা অবশ্য জাপানি প্রায় সব থ্রিলার লেখকের বৈশিষ্ট্য--অহেতুক মূল চরিত্রকে অতিমানব বানানোর কোন প্রচেষ্টা নেই। কোনমতে জীবন বাঁচাতে পারলেও ক্ষমতার শীর্ষে থাকা শক্তিকে ধরা বা তাদের মুখোশ উন্মোচন করা যে কোন ছাপোষা লোকের কাজ নয়, এই বাস্তবতা বইটাকে আলাদা করে দিয়েছে। ঠিক সে কারণেই বইটা পড়তে পড়তে মনে হবেই, শিনজো আবে-কে মারলো কে? এক অতি সাধারণ মানসিক রোগি, নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরের কোন শক্তিশালী গোষ্ঠী? ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের শান্তিপূর্ণ চেহারা দেখে যদি কেউ ভুলে না যান যে, জাপানের অতীত রক্তাক্ত এবং সহিংস, তাহলে এ প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। বইটা ধীরগতির, কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কারণে আমার রেটিং ৫। গুডরিডসের রেটিংও যথেষ্ট বেশি, ৪.১১। কাজেই থ্রিলারপ্রেমীরা পড়লে সময়টা কাজে লাগবে বলেই মনে হয়।