আরব্য রজনী অনেকেই পড়েছেন। ‘বেদুইনের দেশে’ বইখানা হল আরব্য দিবা। রাত এবং দিনে অনেক প্রভেদ ‘বেদুইনের দেশে’ পাঠ করলে সেরুপ প্রভেদ দেখতে পাবেন। আরব দেশের রাত আরামের এবং দিন মহাকষ্টের। ‘বেদুইনের দেশে’ সেই কঠোর সত্যের প্রতিচ্ছবি দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
রামনাথ বিশ্বাস একজন ভারতীয় বিপ্লবী, সৈনিক, ভূপর্যটক ও ভ্রমণকাহিনী লেখক। তিনি ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সালে সাইকেলে চড়ে বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন। রামনাথ ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি অসমের সিলেট জেলার বানিয়াচং গ্রামের বিদ্যাভূষণপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন; যা বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। হবিগঞ্জের জাতীয় ভান্ডার সমিতির ম্যানেজার পদ যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। জাতীয় ভান্ডার সমিতির মোটর কারখানা থাকার সুবাদে মোটর চালনা শিক্ষা করেন। এখানে থাকাকালীন তিনি সাইকেল চালনারও সুযোগ পান এবং তাতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরপর জাতীয় ভান্ডার সমিতির কাজ ছেড়ে অন্য একটি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়েই গোপনে অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন। কিন্তু তাঁর বিপ্লবী যোগ প্রকাশ হয়ে গেলে তিনি চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হন। ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে যুদ্ধে যোগ দেন। বাঙালি পল্টনের সঙ্গে মেসোপটেমিয়ায় যান। ১৯২৪ সালে মালয়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি চাকরিতে যোগ দেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে অসমের সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। রামনাথ বানিয়াচঙ্গেই থেকে যান। কিন্তু তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করতে চাইলে কোন প্রকাশক এগিয়ে আসেনি। অগত্যা নিজেই পর্যটক প্রকাশনা ভবন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে যান।
কলকাতায় বসবাসকালে রামনাথের ভ্রমণকাহিনী আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। পরে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের উপর।
ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস ত্রিশের দশকে আরবদেশ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। দেখেছেন বিস্তর , লিখেছেন কম। যা লিখেছেন তাতে স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও লেবাননের তখনকার সমাজব্যবস্থা ও জনতার মনস্তত্ত্ব। অত্যন্ত সুখপাঠ্য বই।
ফারসি ভাষাভাষী অঞ্চল ইরান পেরিয়ে প্রবেশ করেন আরব্য রজনীর দেশ ইরাকে। তখন সমগ্র আরব অঞ্চল জুড়ে জাতীয়তাবাদের বাতাস বইছে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে অনেক ভারতীয় ইরাকে এসেছিল। আরও আগে কেউ কেউ আসে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাদে। আরববাসীর চোখে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভারতীয়দের সর্বজনীন পরিচয় তারা হিন্দি।
এই হিন্দিদের আরবরা একদম পছন্দ করে না। হীন দৃষ্টিতে দেখে। কোনো কোনো মুসলমান হিন্দি এখানে ধর্মের কারণে সুবিধা পাবে ভেবে ব্যবসা নেমেছিল। রামনাথ বিশ্বাস তাদের করুণ অবস্থা দেখে দুঃখ পেয়েছেন।
রামনাথ বিশ্বাসের পর্যবেক্ষণ শক্তি অত্যন্ত ভালো এবং তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান। তাই যেখানেই গেছেন দু'চোখ ভরে দেখেছেন। প্রায়শই স্থানীয় আরবরাই তাকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করেছে। অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও উদার আরবদের সাথে ভারতবাসীর তুলনা করে তিনি দুই জাতের পার্থক্য কোথায় তা বুঝাতে চেয়েছেন।
রামনাথ বিশ্বাস দেখেছেন আরবে ধর্ম নিয়ে গায়ে পড়ে আলাপ লোকে পছন্দ করে না। বেশির ভাগ আরব মুসলমান সম্প্রদায়ের হলেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের কোনো বিবাদ নেই।
আরব আড্ডাবাজ জাতি। তবে কাফেতে বসে তাদের আড্ডা পরচর্চায় মোড় নেয় না। বরং রাজনীতি, অর্থনীতি ও দেশ-বিদেশের খবর জানতে জানতে ভীষণ উৎসাহ।
পুরো আরবজুড়ে পর্দাপ্রথার বাড়াবাড়ি রামনাথ দেখেননি। তার মতে, তখনকার আরব মেয়েরা ভারতীয় মেয়েদের চাইতে অনেকটাই বেশি স্বাধীনতা পেতো। বোরখা পড়ে যে-কোনো জায়গায় তারা যেতে পারত। এ-ও দেখেছেন গ্রামদেশের মেয়েরা পর্দার ধার ধারে না। নিজের কাজে সবাই ব্যস্ত।
রামনাথ বিশ্বাসের ধর্ম অবিশ্বাস। তিনি এই কথা একাধিকবার লিখেছেন। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বদলে আরবে শোষিতের জাতীয়তাবাদের বিকাশ দেখে তিনি খুব খুশি। তুর্কিদের প্রতি আরবদের ঘৃণাবোধের সুযোগ ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদকে পুরোপুরি নিতে দেখেছেন।
ইহুদিদের নিয়ে তার মূল্যায়ন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। আবার, নিজের হবিগঞ্জের বাঙালি হিন্দু হলেও ট্রেনে উঠে তার সহযাত্রীদের সূরা পড়তে দেখে তিনি লিখলেন, ওরা মন্ত্র পড়ছে! মুসলমান মন্ত্র পড়ে, না সূরা পড়ে একথা রামনাথ বিশ্বাসের মতো লোকের অজানা থাকার কথা নয়। থাকলে তা দুঃখজনক অজ্ঞতা৷ বাঙালি হিন্দুদের অনেক মহাজন নিজের প্রতিবেশী বাঙালি মুসলমানের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আশ্চর্য উদাসীনতা দেখান। হয়তো রামনাথ তাদের গোষ্ঠীভুক্ত।
এর আগে লেখকের 'অন্ধকারের আফ্রিকা' পড়ে খুব একটা ভালো লাগেনি। কিন্তু 'বেদুইনের দেশে' পড়ে বেশ আনন্দ পেয়েছি। প্রায় শত বছর আগে আরবের সমাজব্যবস্থা নিয়ে বেশ স্পষ্ট একটা চিত্র তুলে ধরেছেন, দুই-একটি বিষয় বাদ দিলে তাঁর পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা অসাধারণ ছিল স্বীকার করতেই হয়!
রামনাথ বিশ্বাসের ”বেদুইনের দেশে” প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আরবে ভ্রমণ নিয়ে লেখা। অটোমান সাম্রাজ্য যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি অর্থাৎ জার্মান সাম্রাজ্য এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের সাথে যোগ দেয় তখন আরবরা সিদ্ধান্ত নেয় অটোমান সাম্রাজ্যের বিরোধিতা করে তুর্কি শাসন হতে নিজেদের মুক্ত করবে। আরবরা স্বাধীনতার লোভে ব্রিটিশদের সহায়তা করে এবং পুরস্কার হিসেবে তুর্কি শাসন হতে মুক্তি পায়। কিন্তু স্বাধীনতার পরিবর্তে পায় নতুন শাসক। যুদ্ধপরবর্তী অটোমান সাম্রাজ্যকে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স নিজেদের মাঝে ভাগাভাগি করে নেয়। ভাগাভাগি হয় আরব অঞ্চলও। স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে কপালে জোটে অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ শাসন। এই পরাধীন আরবের লোকজনদের জীবনযাপন, তাদের মতামতের ভিন্নতা সত্ত্বেও তাদের ভিতর মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি, আসিরীয়, আর্মেনীয় নির্বিশেষে সবার স্বাধীন আরবের স্বপ্ন, ব্রিটিশ আর ফ্রেঞ্চ শাসনের ভিন্নতাসহ তৎকালীন আরবের বহুমাত্রিক চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে ”বেদুইনের দেশ”-তে।
এর আগে লেখকের 'অন্ধকারের আফ্রিকা' পড়ে খুব একটা ভালো লাগেনি। কিন্তু 'বেদুইনের দেশে' পড়ে বেশ আনন্দ পেয়েছি। প্রায় শত বছর আগে আরবের সমাজব্যবস্থা নিয়ে বেশ স্পষ্ট একটা চিত্র তুলে ধরেছেন, দুই-একটি বিষয় বাদ দিলে তাঁর পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা অসাধারণ ছিল স্বীকার করতেই হয়!