তিনটি উপন্যাসিকা নিয়ে এই বই, অথবা বলা চলে একটিই উপন্যাস এটি। তিন উপন্যাসিকার কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে তিন মেয়ে, অথবা শেষমেশ একজনই তারা। রূঢ় এই কালের নারী তারা কিংবা সে; সাক্ষী ও ভুক্তভোগী এই সময়ের নির্দয় নিপীড়ন আর গভীর যন্ত্রণার। বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ তারা; আবার ওই বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতাই যেন তাদের করে তুলেছে এক ও অভিন্ন, অবিচ্ছিন্ন এবং নিবিড় সখ্যের অংশী। কথকতার এই বিন্যাসে দেখা মেলে বটে আলাদা তিনটি কাহিনির, কিন্তু কী করে যেন সেগুলো হয়ে ওঠে পরস্পর সম্পর্কিত, যেন তা স্পর্শ করে সমসময়ের বৃহৎ কোনও উপন্যাসের প্রেক্ষাপটকেই। এ সময়ের বিকাশমান মধ্যবিত্ত মেয়েদের মনোজগৎ আর যুগযন্ত্রণার আখ্যান এইসব কথকতা। কথকতা আমাদের সংগুপ্ত ক্ষরণের। খুবই সাদামাটা কাহিনি এই ত্রয়ী উপন্যাসিকার। কিন্তু পড়ার পর চোখ তুলে তাকাতেই তা আর সাদামাটা থাকে না। মনে হয়, কী যেন পালটে গেছে। হয়তো দেখবার চোখ। হয়তো অনুভ‚তির জগৎ। হয়তো চাওয়া-পাওয়ার সীমা। মনে হয় নতুন কোনও বোধ, নতুন কোনও ক্রোধ ঘুরপাক খাচ্ছে; জেগে উঠছে নতুন এক ক্রন্দন; ডানা মেলছে নতুন কোনও হৃদয়।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
ইমতিয়ার শামীম বহুদিন পর প্রত্যক্ষ সমকালীনতাতপ্ত গল্প লিখে মুগ্ধ করলেন। "তিনটি মেয়ে একা" আমাদের সংগুপ্ত ক্ষরণের গল্প। বইতে উপন্যাসিকা আছে তিনটি (পাথরপ্রপাত, অপার গ্রীষ্মকাল ও পরম্পরা)। কাহিনি তিনটা হলেও আসলে তারা একই বেদনা, একই যন্ত্রণার সন্তান।
"পাথরপ্রপাত" এ মৌলি একটা অর্থহীন স্বপ্ন বারবার দেখে ডাক্তার আশুতোষের কাছে যায়। কিন্তু মৌলির অর্থহীন স্বপ্নের সমাধান হয় না।তার সাথে একই ফ্ল্যাটে থাকা শায়লা,রিক্তার সমস্যারও যেমন সমাধান হয় না। মৌলি পতন ঠেকাতে চায় কিন্তু পতন এগিয়ে আসেই।
"অপার গ্রীষ্মকাল" অন্বেষা আর কেয়ার গল্প।তাদেরকে "পাকা কাঁঠাল" বা "ছুলানো কলা" ভাবা "নীল মাছি"দের আনাগোনা চারপাশে। সেইসাথে গল্পটা হিমেল অথবা অভির অথবা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যেখানে গ্রীষ্মকালই সদা বিরাজমান।
"পরম্পরা" আনুশকা আর ওর মা মিতার গল্প। হা করে গিলতে থাকা দুর্নীতি আর শান্ত সন্ত্রাস যেখানে আশ্রয়হীন করে মানুষকে।
উপন্যাসিকা তিনটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি নয়, বরং সেসব ঘটনা চরিত্রগুলোকে কোথায় ঠেলে দিচ্ছে সেটাই মুখ্য। তাদের অনুভূতি ও তাড়না লেখক অনুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের শুরু আছে,শেষ নেই। এসব গল্প শেষ হয় না আসলে। (যারা প্রথাগত অর্থে নিটোল উপাখ্যান খোঁজেন বইটা তাদের জন্য নয়।)
তিন নারীর চোখ দিয়ে আমাদের চেনা শহর, চেনা পৃথিবীটাও কেমন অচেনা ঠেকে। "তিনটি মেয়ে একা"র নারীরা যেমন তাদের শ্রেণির প্রতিভূ; তেমনি তারা প্রতিনিধিত্ব করে আমাদের যাপিত জীবনের, অসহায়ত্বের, গ্লানির, আমাদের চেতনার।
তিনটি উপন্যাসিকা নিয়ে বইখান। তিনটি উপন্যাসিকারই বিষয়বস্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। প্রথমটা বেশ ভাল লেগেছে। কিন্তু, দ্বিতীয়টা কিঞ্চিৎ অগোছালো। তৃতীয়টা সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে। ইমতিয়ার শামীমের চিরাচরিত লেখনী থেকে সহজাত ভঙ্গিমায় লেখা। সুন্দর বই৷
ইমতিয়ার শামীম একজন গুণী শিল্পী। তিনি কাগজে হাত বুলিয়ে দিলেই মনে হয় এক একটা শিল্পকর্ম তৈরি হয়ে যায়। আর উপন্যাসের নামকরণ! এটা নিয়ে কথা না বললেই নয়। উনার উপন্যাসের নামগুলো আমাকে সব সময় আকৃষ্ট করে। হয়তো এই বইয়ের নাম হতে পারতো ইমতিয়ার শামীমের "তিনটি উপন্যাসিকা" বা এই টাইপ কিছু কিন্তু না তিনটি আলাদা নাম নিয়ে উপন্যাসিকা হওয়া সত্ত্বেও পুরো বইটি স্বতন্ত্র একটি নাম নিয়ে উপন্যাসিকা তিনটিকে কানেক্ট করেছে অবলীলায়! একা শব্দটিই একলা একলাই এই তিনটি গল্পের নারীদের জড়ো করেছে এক চাদরের নিচে।
পাথরপ্রপাত এর মৌলি, মৌলির ফ্ল্যাটমেটরা কিংবা ডাক্তার আশুতোষ; অপার গ্রীষ্মকাল এর কেয়া, অন্বেষা, হিমেল কিংবা অভি আর পরম্পরার দুই মা-মেয়ে মিতা ও আনুশকা আমাদের এই সময়ের সমাজের প্রতিনিধি, ওদের গল্পগুলো বড্ড সমকালীন। আমরা জানি এসব গল্পের শুরু থাকে, কখনও এসবের সমাপ্তি খুঁজে পাওয়া যায় না কিংবা আসলে এসবের শুরু থাকলেও শেষের কোনো অস্তিত্বই কোনোদিন ছিল না। তাই গল্পগুলো শুরু হতে না হতেই ঝড়ের রাতে বড্ড আশা করে জ্বালানো মোমবাতির মতো আচমকা বাতাসে দুম করে নিভে যায়। তাই আমাদেরও ঐ অন্ধকারকে একটু ভয় হয়, কেমন যেন তীব্র এক হাহাকার বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চায় মেয়েদের এই একাকিত্ব দেখে..
i don't know how to feel about these sorts of books. cause i don't agree with many things, but ones that i agree with, makes me want to make everyone read them📖