গদ্যকবিতায় অসামান্য সফলতার পরেও কবিতার জগৎ থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছিলেন সমর সেন (১৯১৬-৮৭)। রুশ-বাঙলা অনুবাদের কাজ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল সোভিয়েট রাশিয়ায়। দেশে ফিরে তাঁর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ধীমান্ সাংবাদিক, শাণিতবাক্ আড্ডাধারী ও আপসহীন সাংবাদিক হিসেবে। বিদ্যা ও বুদ্ধিজীবী সামাজিকদের তিনি যেন লক্ষ করেছেন ঈষৎ অলক্ষ্যে থেকে। ব্যঙ্গে বিদ্যণে আর অবশ্যই এক অলক্ষিত গোপন বেদনায় নিজের জীবন ও সময় নিয়েও যেন এক নকশা এঁকেছেন সমর সেন।
মূল পাঠের সঙ্গে প্রতিটি প্রাসঙ্গিক তথ্যের সম্পূরণ ও বিশ্লেষণ, ভাষ্য ও টাকা, লেখকের বহু বিস্মৃতপ্রায় রচনার সংযোজনে কোষ-সদৃশ হয়ে উঠেছে অধ্যাপক পুলক চন্দ-সম্পাদিত 'বাবুবৃত্তান্তে'র এই রজতজয়ন্তী সংস্করণ। গ্রন্থসম্পাদনার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন এই বই, বাঙালি পাঠকের এক অপরিহার্য সংগ্রহ।
"বাবুবৃত্তান্ত" সমর সেনের আত্মজীবনী বা আত্মজীবনীর রূপরেখা। বিশাল, বর্ণাঢ্য জীবন তিনি তুলে ধরেছেন অল্প কথায়। যুক্তিবাদী ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন, লেখায় আবেগের প্রাবল্য নেই একদম। কিন্তু ছোট হওয়ায় পড়ে অতৃপ্তি রয়ে গেলো। প্রাবন্ধিক সমর সেন সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন, ঘটনা বিশ্লেষণে পরিচয় দিয়েছেন দূরদৃষ্টির। সাহিত্য সমালোচক সমর সেনের বিশ্লেষণ ও শব্দচয়ন মুগ্ধ করে কিন্তু তার এ ধরনের লেখা কমই আছে বইতে। বইয়ের ইংরেজি প্রবন্ধ এড়িয়ে গেলাম আপাতত।
বই থেকে পছন্দের কিছু উদ্ধৃতি -
" আনন্দমঠ-এ মুসলমান বধ, ইংরেজ রাজ প্রতিষ্ঠা আমাদের, হিন্দুধর্মের, ঐতিহাসিক কর্তব্য। কিন্তু ইংরেজদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ? সেটা ঐশ্বরিক ব্যাপার হিন্দু মানুষের কাজ নয়। "ঠেঙ্গা লাঠির দ্বারা পরোপকার হয় না। দুষ্টের দমন রাজা না করেন, 'ঈশ্বর করিবেন-তুমি আমি কে?' শিষ্টের পালনের ভার লইও-কিন্তু দুষ্টের দমনের ভার ঈশ্বরের উপরে রাখিও।"
"আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবীদের মানসিক দ্বন্দ্বের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হ'ল কাজের সঙ্গে বিরোধ। অর্থাৎ যে কাজ, যে চাকরি করি তার সঙ্গে আমাদের মূল্যবোধ খাপ খায়না। ফলে বিবেকদংশন দেখা দেয়। অনেকে নানা জোড়াতালি দিয়ে শেষ পর্যন্ত অবস্থাটা সইয়ে নেন। অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সেটা পারেন না। তাঁরা না ঘরের, না বাইরের।"
"রবীন্দ্রনাথের কাব্যে বিদেশি প্রভাবের অভাব নেই। তিনি নিজ বলে পরকে আপন করেছেন, একটি জাতির কবিতা সৃষ্টি করে গিয়েছেন। কিন্তু যে প্রতিভার মুক্ত ধারায় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে, পরবর্তী নিকৃষ্ট লেখকদের হাতে সে ধারা কলের জলের মতো তরলগতিতে চলতে শুরু করল। কবিতা যে বুদ্ধিবৃত্তির উপর যথেষ্ট নির্ভর করে, হৃদয়ের চেয়ে মস্তিষ্কের দাম যে কোনো অংশে কবিতায় কম নয়, একথাটা পরবর্তীরা বেমালুম ভুলে যেতে শুরু করেন। তাঁর জীবনদর্শন কালক্রমে অধিকাংশ লেখককে মানসিক পরিশ্রমের দুরূহ ভার থেকে মুক্ত করে। রবীন্দ্রনাথ নিজে লেখায় বরাবর মোড় নিয়েছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, নিত্য নতুন বিস্ময় জাগিয়েছেন, কিন্তু সাধারণ লেখকেরা তাঁর ভাব ও ভাষার টুকরো ভাঙিয়ে জীবনযাপন করতে লাগলেন।"
"বিশ্বাস যখন আবেগে পরিণত হয় তখন তার কাব্যশক্তি কমে আসে, শেষ পর্যন্ত লেখক একটি বিষণ্ণ গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেন, যেখানে মহৎ সত্যের সাক্ষাৎ মেলে না।"
"দুটি পৃথিবীর মধ্যে তিনি দণ্ডায়মান, তার একটি মৃত, আর একটি জন্মাবার ক্ষমতাহীন।"
"আধুনিক অনর্থের মূল হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের আতিশয্য, ব্যক্তিস্বরূপই সাহিত্যের সত্যকার আশ্রয়।"