সাখুরী পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রাম—যার মধ্য দিয়ে চলনপিড়ি খাল, যার লাগােয়া রূপনারায়ণ, খালটি গ্রামটাকে উত্তর আর দক্ষিণ এই দুই পাড়ায় বিভক্ত করেছে। উত্তরপাড়ার সাত বংশ এখন ‘ভিনাে-ভাগারি’ হয়ে পড়ন্ত হলেও গাঁয়ে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন তিন ভাইয়ের যৌথ পরিবার। গাঁয়ের সকলেরই পেশা চাষ-বাস, পানের বরােজ। এই বংশের ছােট ছেলে রজনী। সরল, সবল, ডাকাবুকো এই রজনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ‘দাঁড়ের ময়না’, মানিক-স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রথম উপন্যাস। গত শতকের পাঁচের দশকের পটভূমিকায় বােনা যেন সাম্প্রতিক কালের চেহারা। রজনী কলে কাজ করতে চাইলে বড় ভাই সুরেন বলে, ‘মাটি হচ্ছে লক্ষ্মী। সেই মাটির সেবায় তাের অরুচি? বাপ পিতেমাের করি। তেজ, গায়ের ঘাম, রক্তের তাগদ মিশে আছে এই মাটিতে। চারুর পােষা ‘দাঁড়ের ময়না’কে মাতাল রজনী উড়িয়ে দিয়েছিল আকাশে। কিন্তু সে আবার ফিরে আসে চারুর দাঁড়ে।
Purnendu Patri (sometimes Anglicised as Purnendu Pattrea) was an Indian poet, writer, editor, artist, illustrator, and film director. He was best known for his poems and stories, particularly for his poetry collection Kathopokathan in Bengali, and for his experimentation with book cover design. He also was a researcher of the history of Kolkata.
"দাঁড়ের ময়না" পূর্ণেন্দু পত্রীর প্রথম উপন্যাস। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আমি লেখার মান নিয়ে নিশ্চিত ছিলাম না, পটভূমি দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে অনন্য বা আলাদা নয় বলেই হয়তো। কিন্তু উপসংহারে এসে স্বীকার করতে হলো, "এই লেখাটা বিশেষ কিছু।"
উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে শুরুতেই লেখক নির্মোহভাবে দেশ ও দেশের মানুষদের অবলোকন করেছেন। প্রোলেতারিয়েতদের নিয়ে করুণায় গদগদ না হয়ে, এদেশে সমাজতন্ত্রের ভুল প্রয়োগের দিকগুলো চিহ্নিত করা সেই সময়ে সহজ ছিলো না, এখনো নেই। তাই রচয়িতাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। নায়ক রজনীর ব্যক্তিপ্রেম থেকে শুরু হয়ে দেশপ্রেম ও আত্মপলোব্ধি দিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রী উপসংহার টানতে পারতেন কিন্তু রয়ে যায় আরো কিছু। আর সেই "আরো কিছু"ই চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্বকে আধুনিক ও চিরকালীন করে তোলে।
কবিতা ও প্রচ্ছদে হাত পাকানো পূর্ণেন্দু পত্রীর ঔপন্যাসিক সত্তার সাথে পরিচিত ছিলাম না। 'দাঁড়ের ময়না' তার প্রথম উপন্যাস, দুই-তৃতীয়াংশ শেষ করার পরেও ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল খাপছাড়া আনাড়ি কোনো লেখা পড়ছি এবং শেষটায় হতাশা অপেক্ষা করছে। তবে শেষভাগে এসে চমৎকৃত হতে হয়। এর আগে কাহিনির বিভিন্ন জায়গায় বিস্তৃত সুতোগুলো সুন্দরভাবে এক জায়গায় টানতে পেরেছেন পত্রী বাবু। মানব মনের জটিল সমীকরণ, নর-নারীর দৈহিক ও মানবিক দিকের বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাত্ত্বিকভাবে অতিআদর্শ(!) ও মহান মনে করা সমাজতত্ত্বের প্রায়োগিক দিকের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাও উঠে এসেছে এ গল্পে।
পূর্ণেন্দু পত্রী বললেই চোখের সামনে আসে কবিতা আর প্রচ্ছদ। কিন্তু সেই সাথে পত্রী সিনেমার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। গদ্যের পত্রী তুলনামূলক কমই পরিচিত। তার মধ্যে এটা আবার উপন্যাস। আগ্রহ হওয়াই স্বাভাবিক। তার থেকেই বেশি, কৌতূহল। সেই কৌতূহল থেকেই পড়তে শুরু করা।
বাখুরী গ্রামের গল্প। সেই গল্পের কেন্দ্রে এসে পড়ে চারু ও রজনী। রজনী পুরুষ। চাষি পরিবারের দরিদ্র পুরুষ, নেশা করে পড়ে থাকলেও সে খানিকটা ভিন্ন। কিংবা পত্রী তাকে এঁকেছেন ভিন্ন করে। সেই ভিন্নতার কারণেই গল্প এগিয়ে যায়। গল্পটা চারু আর রজনীর প্রায় অবৈধ প্রেমের হতে হতে তাই এক সময় পত্রী টেনে নিয়ে যান সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে। অল্প কিছু অ্যাক্টিভিজম আর রাজনীতির চিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি পঞ্চাশের দশকটাকে ফুটিয়ে তোলেন বাখুরী গ্রামের বুকে।
রজনী, চারু, বাখুরী, প্রকৃতি আর মানুষের জৈব-মানবিক জটিলতা এই উপন্যাসকে চালিয়ে নিয়ে যায়। আর কিছু কিছু জায়গায় পাঠককে থেমে ভাবতে বাধ্য করে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে বাধ্য করে।