❛শোনেন শোনেন দেশবাসী, শোনেন দিয়ামন,
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা করিব বর্ণন....❜
কোপাই নদীর তীরে বাঁশবাঁদি গ্রামে প্রায় তিরিশ ঘর কাহারের বাস। এদের আবার দুটো ভাগ আছে - পালকিবাহক কাহার আর আটপৌরে কাহার। দুই গোত্রের মাঝে বিবাদ আছে। তবে সংখ্যায় কাহারেরাই বেশি। তারা পালকিবাহক ছিল। অতীতে সায়েব মেমদের পালকি কাঁধে বইতো প্লো-হিঁ, প্লো-হিঁ শব্দে। তাদের দয়াতেই কাহারেরা বাঁচতো। নিচু জাতের দুঃখ হলেও সব মিলে তারা ভালোই ছিল।
তবে ❛বান❜ এলো ঐযে তাতে সায়েব-মেমদের বাড়ি তো ভাসলোই, ভেসে গেল তারাও। কাহারদের মাথায় মনিবের হাত রইলো না। এভাবে হাঁসুলীর বাঁক চলবে কীভাবে? ঘরে খাবার নাই, দুঃখ- এভাবে হয়না।
তাদের দুঃখের দিনে আশার আলো নিয়ে এলো চৌধুরী মশায়েরা। তারা গাঁয়ের জায়গাটুকু নিলো না, তাদের কাজ দিলো। উঁচু জাতের তাদের সেবা করে, বাসন এঁটো মেজে, তাদের জমিতে ফসল ফলিয়ে তার ভাগ, ধার নিয়ে তাদের আবার সুদিন ফিরলো। জাঙলের সদগোপ মহাশয়, ঘোষেদের ভিটেতে কাহারেরা কাজ শুরু করলো। মনিবেরা তাদের কথা ভাবেন, খাজনা দেন, আবার রোগশোকে তাদের পাশে থাকেন। কাজ মন্দ হলে পিঠে দু চার কিল দিতেও ভুলেন না। তবুও তারা মনিবের কাজ করে। মনিবের ঘরে লক্ষী এলে কি সে ছায়া তাদের পড়বে না? তাই তারা কাজ করে। পালকিবাহক থেকে হয়ে গেল কৃষাণ। সভ্যতার ফেরে পালকির চাহিদা কমেছে। তবুও বিয়েশাদিতে পালকির দরকার হলে কাহারেরা যায়, সানন্দে সে কাজ করে। পিতিপুরুষের কাজ যে! বাদ কেমনে দেয়? মাঝে চু রি-ডাকা তি করলেও পালকিবাহক কাহারেরা নিজেদের বদলে���ে। পারেনি আটপৌরেরা। তারা ফসলি কাজ করে না।
কাহারপাড়ার মাতব্বর এখন কোশকেঁধে বনওয়ারী। যে মাতব্বরির ছড়ি ঘুরায় না তার লোকেদের উপর। ধাম্মিক, পুজোর্চা করে, বাবা কালোরোদ্দুর আর কত্তাবাবার কাছে কাহারদের মঙ্গল কামনা করে। পিতিপুরুষের বিধান সে মেনে চলে। এই জনমে নিচু হয়ে জন্মেছে এটাই নিয়তির নেকা মানে সে। এই জনমে যদি ব্রাহ্মণদের সেবা করে কিংবা দু চার কিল খেয়ে পরের জন্মে উঁচু কুলে জন্ম হয় তাতে দোষ কী? সে চায় পিতিপুরুষের বিধান মেনে চলতে। গোটা কাহারপাড়াই দেবতা, অপদেবতা আর নানা উপকথার সঙ্গী করে তাদের খুশি করে চলতে অভ্যস্ত। কথায় বলে, ❛পিথিমীতে যা আশ্চর্য, কাহারপাড়ায় যা আতঙ্কের কারণ❜। বাঁশ বনের শিস শুনতে পেয়ে তারা ভয় পায়। বিশাল বৃক্ষটিকে তারা দেবতা বাস ভাবে, প্রকৃতির নানা খেলায় তারা দেবতার আদেশ, সাবোধান বাণী খুঁজে পায়। ব্যানোও তাই। সে প্রজন্মকে আঁকড়ে রাখতে চায়। চায়না কেউ মনিবের সেবা ছাড়ুক, ছাড়ুক কৃষাণীর কাজ। সে চায়না কেউ দক্ষিণে যাক। কারণ ধম্মে মানা আছে যে। দক্ষিণেই চন্ননপুর। সেখানে র্যালের কাজ, মিলের কাজ, সাদা বাবুদের কাজ, কাঁচা পয়সা। তাই বলে পয়সার জন্যে কুল জাত বিসর্জন দিতে হবে? না খেয়ে একবেলা রইলেও বনওয়ারী চায়না তার লোকেরা মিলের কাজ করুক। বছর বছর গাজনে বনওয়ারী পাটায় উঠে। কালারোদ্দুরের কাছে ক্ষমা চায়। মাতব্বরি তার কাছে কখনো ব্যাপক কঠিন লাগে। তাইতো নয়নের মায়ের অভিশাপে প্রতিউত্তর করে না। মাথাকে কি রাগ করা সাজে?
সুচাঁদ পিসি চার কুড়ি বয়েস। সে গায় হাঁসুলী বাঁকের উপকথা। সে সবথেকে পুরোনো। গানের ছলে এই বাঁকের ইতিহাস শুনায়।
কাহারেরা তাদের মতো আছে। তাদের জীবনেও অঙ (রঙ, প্রেম) আছে। অঙের খেলা খেলে তারা। আছে নসু। যে শাড়ি, নোয়া পরে বেজায় নাচে, গায়।
বনওয়ারী যেমন ইতিহাস মেনে চলে তেমনি গাঁয়ে আছে স্রোতের বিপরীতে চলা যুবক। নাম তার করালী। যার মা অঙ করে সেই যে কবে হাঁসুলী ছেড়েছে আর ফেরেনি। করালীও শুরুতে কাহারদিকের মতোই কাজ করতো। ঘোষদের সাথে ঝামেলায় সে কাজ ছাড়লে। যোগ দিলো চন্ননপুরে মিলে। এরপর শুরু তার পরিবর্তন। বিধেন মানে না, মানে না নিচু জাতের কথা, জাত আবার কে দেয়?
এইতো সেই বাবার বাহন চন্দ্রবোড়া সাপটিকে পু ড়িয়ে মা রলে। গোটা কাহারপাড়া হেই হেই করে উঠলো। অক্ষে নেই আর। বাবার বাহনকে মা রা? দেব ক্রোধ পড়বেই। আবার বাবার সেই বিশাল বৃক্ষের চূড়ায় উঠে হাকডাক করে। এসব বাবাঠাকুর মানবে? বিধেনে নাই উঁচু বাড়ি করো, ইতিহাস বলে না, ধম্ম বলে না। করালী তাও কোঠাবাড়ি বানানোর জন্য লেগে পড়ে। এত অনাচার ধম্মে সইবে? করালী তাতে থোরাই কেয়ার করে!
সে উল্টো গাঁয়ের লোকেদের ফুসলাচ্ছে চন্ননপুরে র্যালের কাজ করতে, কাঁচা পয়সা, সুবিধা কত কী! কিন্তু লোকেরা বিধেনের বাইরে যেতে চায় না।
এরমধ্যেই দেশে লাগে যু দ্ধু। কোন ইংরেজ আর জার্মানে বেঁধেছে যু দ্ধু তারজন্য এই দ্যাশে নাকি জিনিসের দাম বাড়ে, দব্য পাওয়া যায় না। কত যু দ্ধুই গেল, তাতে হাঁসুলির কী আসে যায়? গান বাঁধে লোকে,
❛সায়েব লোকের লেগেছে ল ড়াই।
ষাঁড়ের ল ড়াইয়ে ম রে উলখাগোড়াই-
ও হয়, ম রব মোরাই উলখগোড়াই।❜
বনওয়ারী যথাসাধ্য চেষ্টা করে যায় পা গলা করালীকে নিয়ন্ত্রণ করতে। তার সাঙাও দেয় পাখীর সাথে। তবুও উ পোলা বাগে আসে না। প্যান্টুল পরে ম্যানদের সাথে ঘুরে।
সময় পেরিয়ে যায়। ঝড়-বাদলা, বানের জলে কাহারের স্বপ্ন ভাসে, ভেসে যায় জমি। মালিকের তোপ বাড়ে, তবুও আশা তারা পেশা ছাড়বে না। কিন্তু অভাব যখন আষ্টেপৃষ্টে ধরে, বিদেশী যু দ্ধের তেজ যখন হাঁসুলীর উপকথাতেও আসে তখন কি বিধেন দিয়ে পেট চলে? শেষ বানে সব ভেসে যায়। হারিয়ে যায় উপকথার পাড়। বনওয়ারীর স্বপ্নের বাঁক কোপাইয়ের তলে বিলীন হয়ে যায়। সায়েব আসে মোটর নিয়ে, রাস্তা বানিয়ে, উজাড় হয়ে বাঁশ বন, বটবৃক্ষ। এইসব দৃশ্য কি বনওয়ারী পারে সহ্য করতে? শিল্পায়নের তোপে, লাভের আশায় শিকড় উপড়ে ফেলা কি সবসময় ভালো? করালীর মতি ফিরবে? সুচাঁদ পিসির উপকথার গল্পে কি আর মাতবে না কাহারপাড়া? কোথায় সেই পালকি বাহকেরা?
❛হাঁসুলী বাঁকের কথা - বলব কারে হায়?
কোপাই নদীর জলে - কথা ভেসে যায়।❜
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝হাঁসুলী বাঁকের উপকথা❞ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ এক সৃষ্টি।
লেখক নোবেল পুরস্কার পাননি বলে আফসোস আছে। উপন্যাসটা পড়লে সেই আফসোসের কারণ বোঝা যায়।
এত মুগ্ধতায় ভরা প্রতিটি লাইন দিয়ে তিনি উপন্যাসটা রচনা করেছেন!
নিচু জাতের কাহার সমাজের জীবন, তাদের অতীত, পেশার বদল, শিল্পায়ন, শিল্প বিপ্লবের সময় তাদের শিকড় ছেড়ে পেটের দায়ে আবার পেশার বদল, আর একবুক আশা নিয়ে পূর্ব পেশায় ফেরার নিঃশব্দ আকুতি প্রকাশ পেয়েছে উপন্যাসের ছয়টি পর্বে।
কোপাইয়ের তীরের হাঁসুলী বাঁকের লোকেদের জীবনকথা কখনো সুচাঁদ পিসির গপ্পে, কখনো গানে কখনো পা গলের সুরে উঠে এসেছে।
তাদের বিধান, ধর্মের পালন, কুসংস্কার, ভয়-ভীতি, অনুষ্ঠান, আচার পালনের বর্ণনা লেখক এত দারুণভাবে দিয়েছেন মনে হচ্ছিল চোখের সামনেই দেখছি সব।
প্রবীণ নবীনের কলহ, তাদের অস্তিত্বের ল ড়াই, শিকড় আকড়ে থাকার বাসনা, অন্যদিকে জাতের নামে অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলা দুই ভিন্ন প্রকৃতির চরিত্রের মধ্যে কাহারপাড়ার বাকিদের জীবনের চিত্র এসেছে।
তারা কাজ করে, ঘরে জোয়ান মর্দ থেকে বউ মেয়েরাও থেমে নেই। বাইরে কাজ করছে, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যেতে মাতব্বরের সাথে মজলিসে বসছে, গান বাঁধছে। কেউ আবার শাপ শাপান্ত করছে। কখনো ঝ গড়া লাগছে, নেচে কুদে ল ড়াই হচ্ছে তো একের বিপদে অন্যে চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে। একই মানুষের পরিস্হিতিভেদে ভিন্ন রূপ, বিপদে কখনো শাপান্তো করে আবার আঁচলবেঁধে সাহায্যে লেগে পড়ার অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য মনে হয় লেখকের বর্ণনাতেই সম্ভব।
উপকথার অতীত ইতিহাসের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন, স্মৃতিচারণ হয়েছে দারুণ। মুগ্ধ করার মতো দৃশ্য ছিল বিয়েতে দুই পাড়ার লোকেদের পালকিবহনের সময়ের ছন্দগান। অভিভূত হয়ে গেছি সেই প্লো-হিঁ শব্দের তালে।
সমাজ ধর্মের তৈরি এই উঁচু নিচু জাতের বেড়া যে কেমন প্রভাব রাখে আর একেই নিত্য স্বাভাবিক বলে মেনে মানিয়ে নেয়ার মধ্যেও সুখের এক বিমূর্ত রেখা টেনেছেন লেখক।
শেষটা কেমন শুন্য শুন্য অনুভূতি দেয়। আবার আশা জাগায়। ইতি বলতে কিছু আছে?
অপূর্ব এক আচ্ছন্নতা ঘিরে ধরবে উপন্যাসের শেষে। খারাপ লাগবে ঝরে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য। কারো শেষ পরিণতি দুঃখ দিবে, কারো উপর বেজায় রাগ হবে। আবার আশার আলো জাগবে। এই তো জীবন।
চরিত্র:
মূল দুই চরিত্র বনওয়ারী আর করালী। একজন প্রবীণ আরেকজন তারুণ্যে ভরা নবীন। দুজনের আদর্শ, মতামত আলাদা। একজন পোড় খাওয়া এখন র ক্ত গরম। তবুও তারা কখনো মিলে থাকে আবার কখনো আদর্শের অমিলে ল ড়ে।
বনওয়ারী চরিত্রটা আমার বেশ লেগেছে। পাড়ার মাথা আসলে যেমন হওয়া উচিত সে তাই। গোঁড়ামি আছে, বিধেনের বাইরে যাওয়া না পসন কিন্তু মনে সে দয়ালু। গোত্রের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তিত। আজীবন তাদের জন্যেই সব করে গেল সে। ভুলচুক কিছু যে নেই, তা নয়। তবে সেটাও গোত্রের জন্যই। আপন কথা ভেবেছে সে কম। তবুও শেষটায় সে ছিল একা। যে সারা পাড়ার জন্য কপাল ঠুকল তার ইতি হলো সর্বশান্ত হয়ে। মানব জীবন কি এমনই?
এদিকেই মন কেড়ে নিবে নসুবালা। দেহটা পুরুষের কিন্তু মনটা নারীর কোমলতায় ভরা। করালীর জন্য সে সব করলেও করালীর শেষের উগ্রতায় সে চুপ থাকেনি। পাশে দাঁড়িয়েছে গাঁয়ের মাতব্বরের দুর্দিনে।
তেমনি পা গলা। গান প্রিয় লোকটির উপস্থিতি ভালো লেগেছে���
সুচাঁদ পিসিকে কখনো এত বিরক্ত লাগবে! আবার কখনো তার ইতিহাসের কথায় মজে যেতে হবে।
করালী - প্রতিবাদের ভাষা, নিয়ম না মানা এক তরুণ। যার দলে গাঁয়ের ছেলে ছোকরা কতক ভিড়েছে। তাকে কি আগাগোড়াই ভালো বলবো? আমার মতে শেষ পরিণতির জন্য সেও কি অনেকটা দায়ী না?
যে নিচু উঁচু জাতের কথা সে বলেছে সেও কি সাদা সায়েবদের পাশে সালাম ঠুকে একই কাজ করেনি? যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা মন্দ নয়। কিন্তু তার ফলাফলে শিকড় উপড়ে ফেলা দোষের নয়? শেষদিকের কাজগুলো আমার কাছে করালীকে একজন নেতিবাচক ব্যক্তি হিসেবেই প্রমাণ করেছে।
শেষে কি তার মতি ফিরেছিল? সেই কি হবে নতুন কাহারপাড়ার পরর্বতী মাতব্বর?
তার জন্য হাঁসুলীর বাঁকে তাকাতে হবে। ঐ দেখা গেল কি একটু নতুন বাঁশের গাছ?
❛যে গড়ে ভাই সেই ভাঙে রে, যে ভাঙে ভাই সেই গড়ে -
ভাঙা গড়ার কারখানাতে, তোরা, দেখে আয় রে উঁকি মে রে।❜