রাতের বেলায় কে আসে? কে আবার, ভুত বা চোর হবে কেউ!
তখন ক্লাশ এইট বা নাইনে পড়তাম। ঘুম আসছিল না। দু’বছর পরেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা। কিন্তু তখনই গল্প-উপন্যাস পড়ার নেশা হয়েছে। তেমনি একটির কিছুটা পড়েছি। বইটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভুতুরে ব্যপার তো! ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি? চোর এসেছিল? বেশ ভয় ঢুকলো মনে। বইটি ছিলই চোরদের নিয়ে। ‘নিশি-কুটুম্ব’। লেখক, খুলনার লোক। বইয়ের কথাগুলো সত্য হলে আমি জেগে থাকলেও বইটি চুরি হয়ে যেতে পারে!
ভদ্রঘরের মেয়ে ভাগ্যের ফেরে গণিকা হয়ে গিয়েছিল। কাদায় পরিত্যাক্ত নবজাতক এক শিশুকে মাতৃস্নেহে লালন করে। ধবধবে ফর্সা রঙের জন্য নাম দেয় সাহেব। সেই মায়ের অন্নকষ্ট মেটাতে শিশু বয়সেই সাহেব দোকানের সামনে পড়ে থাকা চাউল কুড়ায় একটি একটি করে। এভাবে চুরিবিদ্যায় হাতেখড়ি হয়। এরপর একে একে পিতৃতুল্য নফরকেস্ট, এক সময়ের জাঁদরেল দারোগা থেকে চোরের মহাজন বনে যাওয়া বলাধিকারী, এবং সবশেষে চোর সাম্রাজ্যের বিস্ময় পচা বাইটার কাছে শিক্ষা পেয়ে ওর পরিচিতি হয় ‘সাহেব চোর’ হিসেবে। থানার দারোগা সম্মান করে ওকে বড়-কারিগর বলে সম্বোধন করে। হাতে পেয়েও গারদে ঢোকায় না।
কি সূক্ষ্ণ চোর রে বাবা! নিঝুম রাতে শুধু নিঃশ্বাস এবং এপাশ-ওপাশ করার মনোজ বসু শব্দ শুনে বলে দিতে পারে ঘরের ভেতরে কতজন ঘুমাচ্ছে। পুরুষ না মহিলা? বয়স কত? শিশু, কুমারী, সধবা, না বিধবা? তবেই স্থির করে চুরির পদ্ধতি। সাধারণ চোরেরা কচি-শিশু, রোগি, বৃদ্ধ, লুচ্চাপুরুষ আর নষ্টমেয়ের ঘর এড়িয়ে চলে। কারণ ওরা যে কোন সময় জেগে উঠতে পারে। কিন্তু সাহেব চোরের কথা আলাদ। নিয়ম না মেনেও বড় বড় চুরির কাজ শেষ করে ফেলে নিমেষে, কেউ টের পায় না। সিঁধের কারুকার্য মুগ্ধচোখে দেখে দেখে গৃহস্থ তার সর্বস্ব হারানোর কথা ভুলে যায়। তা না হলে আর চুরির মর্যাদা কোথায়? এ লাইনে দিকপাল হতে হলে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হয়। সবাই ছাত্র হতে পারে না। হতে পারলেও পরীক্ষায় পাশ করা আরো কঠিন। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা থেকে ঢের কঠিন!
সাহেবের প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে যায়। মনটি বড় দয়ালু তার। চুরি করা বাড়ির লোকজন যেন অভুক্ত না থাকে সেদিকে কড়া নজর! ধনীর সর্বস্ব চুরি করে দরিদ্রের উপকার করা ওর নেশা। রাতে গৃহস্থের সর্বস্ব চুরি করে সকালে সাধুবেশে আবার সেখানেই হাজির হয়। গৃহস্থ সেই সাধুর কাছেই মন উজার করে দেয়। বইটিতে ছিল বিচিত্র সব চুরির ঘটনা, কত চোরের কাহিনী, আধুনিক ও অতীতের, শহুরে ও গ্রামের।
আমার নিশ্চিত ধারণা জন্মেছিল যে মনোজ বসু নিজে একজন চোর ছিলেন। তা না হলে চোরদের অতি নিজস্ব, গুপ্ত ��ংকেত, গোপনীয় কিন্তু বিস্তারিত কলাকৌশল জানা বা বর্ণনা করা কারো পক্ষে সম্ভব হওয়ার কথা নয়। কী সর্বনাস! এক সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখককে আমি চোর ভাবছি! না, তাতে আমার কোন দোষ নেই। কারণ যে চোরের জীবনী নিয়ে এ বইটি, সেও তো ভাল লোক ছিল। মা-কালীর কাছে কতোবার প্রার্থনা করেছে ওকে মন্দ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু দেবী তার কথা শোনেনি।
রাতের বেলায় কে আসে? কে আবার, অভিসারী বা প্রণয়িণী হবে কেউ!
তখন কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম-দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বেড়ার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি। একলা ঘরে বিবাহিতা যুবতী আশালতা ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুদর্শন সাহেব চোর লুকিয়ে তার পেছনে পেছনে হাঁটছে। বিছানায় শোয়ার অনেক্ষণ পর চোরও পাশে শুয়ে পড়লো টুপ করে। আরো কিছুক্ষণ পর সাহেবের ‘দুটো হাতই ব্যস্ত হয়ে পড়লো’। ওর ‘হাতের এমনি ধারা মিহি কাজ’ যে একহাতে আশালতাকে আদর করতে করতে আরেক হাতে ক্ষিপ্র গতিতে একটার পর একটা অলংকার হাতিয়ে নিচ্ছিল। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম! গা খালি হয়ে যায়, যুবতী কিছুই টের পায় না, শুধু আবেশে চোখ বুঁজে আসে। পরদিন বাড়ির সবাই অলঙ্কার হারানোর দুঃখে আহাজারি করছে। কিন্তু আশালতার ‘জীবনে সকলের বড় যে গয়না, অচেনা পুরুষ এসে তার খানিকটা তচনচ করে দিয়ে গেল’! এ কথা মুখফুটে সে কী করে বলে? শেষটা জানার লোভ দেখিয়ে লেখক কী নিপুণতায় আমাকে দিয়ে বিশাল বইটি পড়িয়ে ছেড়েছিলেন!
তাতে আরো ছিল পচা বাইটা-র সুন্দরী পুত্রবধু সুভদ্রা। ‘কাঁখের কলসির মত দেহের কাণায় কাণায় ভরা যৌবন’ নিয়ে স্বামী সোহাগ বঞ্চিতা সেই রমণী জ্যোৎস্না রাতে একাকী সাহেবের হাত ধরে টানাটানি করে। লুকিয়ে আমিও হাঁটি ওদের পিছু পিছু। শুধু সুন্দরীই নয়, সুভদ্রা কাগজ, নকশি কাঁথা এবং দেহের অংগেও নক্সা আঁকিয়ে এক জাত-পটুয়া শিল্পী। নিজের বুকের মাঝখানে স্বামীর হাতে আঁকা ভালবাসার উল্কিটিও সাহেবকে দেখানোর লোভ হয়। কারণ একমাত্র সে-ই শিল্পের মর্যাদা বুঝবে। আচ্ছা, আমিও তো শিল্পের মর্যাদা বুঝতে চাই। আমিও দেখতে চাই। এভাবে রাতশেষে গল্পের ক্লাইমেক্সের অপেক্ষা করে করে শুনতে পেলাম সে এক ‘সাধু স্বামীর সতীসাধ্বী বউ’! তখন আমার তপ্তদেহ এক উষ্ণ-কোমল শ্রদ্ধার আঁধারে নিবারিত হয়। কিন্তু তখনো রাতভর সে হেসে হেসে নিজের দুঃখের কথা শুনিয়ে যায়। সে সব শুনে সাহেবের চোখে জল এসে যায়। জল আসে আমার, পাঠকের চোখেও। আহা, কী ভীষণ মমতা! কী দরদ সেই বর্ণনায়।
রাতের বেলায় কে আসে? কে আবার? পুরনো দিনের স্মৃতি হবে কিছু!
এখন বৃদ্ধ না হলেও আমার বয়স হয়েছে! চোরের গুরুরা সাবধান করে দিয়েছেন বৃদ্ধের ঘর যেন এড়িয়ে চলা হয়। দয়াপরবশে নয়, বৃদ্ধদের ঘুম খুব পাতলা হয় তাই। এখন পুরনো দিনের কথাই বেশি মনে পড়ে, শুয়ে শুয়ে বই পড়ি। ছয় বছর আগে ভারতীয় এক বন্ধুর হাত দিয়ে সেই নিশিকুটুম্ব বইটি কিনিয়ে এনেছিলাম কলকাতা থেকে। কী কাব্যিক একটি নাম! রাতের অতিথিও হতে পারতো, কিন্তু ততো জুৎসই হতো না কিছুতেই। প্রথম প্রকাশ ১৯৬৩। দুই খণ্ডের, ৭ বা ৮ ফন্ট সাইজের ৪৮০ পৃষ্ঠার বইটির প্রকাশক বেঙ্গল পাবলিশার্স। আজকাল আমরা ১২ বা ১৪ ফন্টের অক্ষরে যেসব বই লিখি সেরকম হলে পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮০০র কাছাকাছি হয়ে যেতো!
প্রাচীন শাস্ত্রমতে মহাদেব-পুত্র স্কন্দ বা কার্তিকেয় চৌর্য পদ্ধতির প্রবর্তক ছিলেন। চোরদের শায়েস্তা করতে দারোগা থাকা অবস্থায়ই বলাধিকারী মশাই ‘চৌর্যচর্যা’, ‘ষম্মুখকল্প’, ইত্যাদি প্রাচীন চৌর্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। এখন চোরের মহাজন হয়ে সেসব বিদ্যা কাজে লাগছে। তিনি সাহেবকে সেকালের চুরি ও চোরদের নীতিবাক্য শোনান ‘চোর চক্রবর্তী’র পুঁথিপাঠ করে করে। কীর্তিমান চোর সার্বিলক ছিলেন ‘চলনে বিড়াল, ধাবনে মৃগ, ছিনিয়ে নেয়ার ব্যপারে বাজপাখি’। দুই হাজার বছর আগেই প্রচলিত হয়েছিল ‘পদ্মব্যাকোষ (পদ্মফুল), ভাষ্কর (সূর্য), বালচন্দ্র (কাস্তের আকারের চাঁদ), বাপী (পুকুর), বিস্তীর্ণ, স্বস্তিক, এবং পূর্ণকুম্ভ’ আকৃতির সিঁধের। চোরদের মহাগুরু পচা হাতেকলমে চুরির অসামান্য কৌশল ও শিক্ষা নিয়ে বাইটা উপাধি পেয়েছিলেন। সেই প্রশিক্ষণ ও উপাধি আধুনিক বিএ এমএ বা পিএইচডি থেকে কোন অংশে বেশি বই কম নয়! সাহেব তাঁর চেয়েও এক কাঠি ওপরে।
চুরির অভিনব কৌশল ওকে কিংবদন্তীর খ্যাতি এনে দেয় বাংলার ভাটি অঞ্চলে, গৃহস্থের ঘরে ঘরে। কিন্তু দিনের বেলায় ওকে সবাই বিশ্বাস করে, ভালবাসে। ওর দ্বারা কোন খারাপ কাজ হতে পারে না। বৃদ্ধা-যুবতী-কিশোরী-শিশুর স্নেহ-ভালবাসা-ভক্তি পায় অযাচিত ভাবে। সাহেব চোরের গল্প শুনিয়ে মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়ায়।
কিন্তু সাহেব চোর আর ভাল হতে চায় না। বৃদ্ধ হয়েছে। দুবেলার আহার জোগাড় এবং প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টায় জেল-এও ঠাই হয় না। আবার প্রার্থনা করে ‘হে মা-কালী আমায় মন্দ করে দাও’।
শেষ পর্যন্ত উপন্যাসের প্রথম দিককার চরিত্রগুলো আবার ফিরে আসে। যে আশালতার দেহ থেকে একটি একটি করে গহনা খুলে নিয়েছিল, তার মাতৃহীন কন্যার দেখা পায়। নিস্পাপ সেই কিশোরীর নীতিবান অভিভাবক অভাবের তাড়নায় চুরি করে বসে এবং ধরাও পড়ে। এই সুজোগকে সাহেব আর অবহেলা করে না। নিজে চোর সেজে আসল চোরের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে, আশালতার কন্যার প্রতি অসীম স্নেহ-ভালবাসায়। চোর জেনেও বাড়ির মহিলা ওকে অভুক্ত অবস্থায় জেলে যেতে দেয় না। নতুন দারোগাকে অনুনয় করে একটু অপেক্ষা করতে।
আর ঠিক তক্ষুনি সাহেব উপলব্ধি করে ‘অমৃতের বেটা-বেটি সব ভাল না হয়ে উপায় আছে? মানুষ যতকাল আছে জাতের স্বধর্ম বয়ে বেড়াতে হবে’। এই ভালবাসার উপলব্ধি দিয়েই মোড়ানো বইটির অসংখ্য চরিত্র। ওরা এবং ঘটনাগুলো ‘ধরিত্রির শিরা উপশিরার মত গাঙ-খাল’ হয়ে একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। খুলনা ভাটি অঞ্চলের সামাজিক, কলকাতা কালীঘাটের ‘অসামাজিক’, এবং নস্টালজিক ভৌগলিক চিত্র পাঠকের চোখে হাজির হয়েছে এক স্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে। সার্থক লেখকের কলমের ডগায়। জ্ঞানী বলাধিকারী মহাশয়ের ভাষায় ‘একটা চোরের কথা কেউ যদি ভাল করে লেখে, সমাজের সকল মানুষের জীবনী লেখা হয়ে যায়’। ‘সেকালে যা পাপ ছিল আজ তা পুণ্য’, ‘সাধু মানেই ভণ্ড’! দারোগারা ‘চোরের অনটন পড়লে ভাল গৃহস্থকে চোর বানিয়ে দেয়’! লিখেছেন প্রায়ই সূক্ষ্ণ বিদ্রুপাত্মক, কখনো রম্য রচনার এক মোহনীয় ধাঁচে।
ভোর রাতে চোখে ঘুম আসার আগে আমার পূর্ব সিদ্ধান্ত সংশোধন করলাম। মনোজ বসু নিজে চোর ছিলেন না। বিস্তর পড়াশোনা করেছিলেন ও ভেবেছিলেন চোরদের নিয়ে। হয়তো তেমন কোন চোরের লম্বা সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। ফলে অসামান্য এই উপন্যাসটি লিখতে পেরেছিলেন। তাই প্রকাশিত হবার তিন বছরের মাঝেই ‘সাহিত্য একাডেমি’র পুরস্কার পেয়েছিলেন, যা বছরে শুধু একটি উপন্যাসকেই দেয়া হয়। তাঁর ছোটগল্প ‘একশত বছরের সেরা ছোটগল্প’ বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।