ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ৪ - লুপ্ত ক্রিয়াযোগের হিমালয় থেকে পুনরায় নিম্নভূমিতে মানুষের কাছে ফিরে আসা
ক্রিয়াযোগের পরম্পরার শীর্ষে আছেন মহাবতার বাবাজী মহারাজ — এক কালাতীত, চিরযুবক দিব্য অস্তিত্ব। তিনি কখনও নিরাকার থাকেন, কখনও নিজের ইচ্ছানুসারে যে কোনো রূপে শিষ্যদের সামনে আবির্ভূত হয়ে মানবতাকে সাংসারিক বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। তাঁকে প্রেমভরে মহামুনি, ত্র্যম্বক বাবা, শিব বাবা কিংবা বড়ুয়া বাবা নামেও ডাকা হয়। তাঁর জন্ম, পরিচয় বা জীবনের ঐতিহাসিক তথ্য নির্ণয় করা যায়নি — কালও তাঁর রহস্য উন্মোচনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি হিমালয়ের গভীর অরণ্যে, গুহায়, হিমাচ্ছাদিত শিখরে ধ্যানমগ্ন থাকেন, অথচ পরমতত্ত্বের পথের প্রতিটি নিষ্ঠাবান সাধকের প্রতি তাঁর দৃষ্টি অবিচল থাকে।
মহাবতার বাবাজীর জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা তাঁর করুণা ও দিব্যতার পরিচয় বহন করে। একবার এক আমেরিকান ভক্ত হিমালয়ের দুর্গম শিলাখণ্ডে বাবাজীর সন্ধানে ঘুরছিলেন। বাবাজীর দর্শন পেয়ে তাঁর মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি শিষ্যত্ব প্রার্থনা করলে বাবাজী কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তখন সেই ভক্ত হঠাৎ পাথরের খাদে ঝাঁপ দিলেন। বাবাজী তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দিলেন দেহ সংগ্রহ করতে, এবং নিজের দিব্যস্পর্শে সেই ভক্তকে পুনর্জীবিত করে তাঁকে শিষ্যত্ব দান করলেন। আরেকটি বিখ্যাত ঘটনা — কুম্ভমেলায় বাবাজী লাহিড়ী মহাশয়ের প্রিয় শিষ্য প্রিয়নাথকে (যিনি পরে স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর নামে পরিচিত হবেন) "স্বামীজি" বলে সম্বোধন করেছিলেন — এক ভবিষ্যৎবাণী, যা পরে সত্য হয়েছিল।
মহাবতার বাবাজী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি সমগ্র মানবজাতির মুক্তির জন্য কখনও দেহত্যাগ করবেন না। তাঁরই করুণাবলে পরমহংস যোগানন্দ ও পরমহংস হরিহরানন্দের মাধ্যমে ক্রিয়াযোগের বার্তা পাশ্চাত্য জগতে পৌঁছেছে।
লাহিড়ী মহাশয়ের জীবন ও দীক্ষাএবার আসি এই পরম্পরার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে — যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়। তৎকালীন বঙ্গদেশের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী ঘূর্ণি গ্রামে, আনুমানিক ১৮২৮ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর, এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারে, পিতা গৌরমোহন লাহিড়ী ও মাতা মুক্তকেশীর কনিষ্ঠতম সন্তানরূপে শ্যামাচরণ লাহিড়ীর জন্ম হয়। শিশু শ্যামাচরণ শিবপূজার সময় গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে যেতেন। শৈশবেই তিনি মাতৃহারা হন। এরপর জলঙ্গী নদীর প্রবল বন্যায় লাহিড়ী পরিবারের ভিটে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে, পিতার সঙ্গে তিনি কাশীবাসী হন। কাশীতেই তাঁর ছাত্রজীবন শুরু হয় — উর্দু, হিন্দি, বাংলা, সংস্কৃত, ফরাসি, ইংরেজি এবং বেদের শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন। কাশীমণি দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়, এবং তাঁদের দুই পুত্র ও তিন কন্যা জন্মায়। ১৮৫১ সালে তিনি ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন।
এরপর ঘটে সেই যুগান্তকারী ঘটনা, যা ক্রিয়াযোগের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কয়েক বছর পর শ্যামাচরণের হঠাৎ বদলি হয় হিমালয়ের পাদদেশে, নৈনিতালের কাছে রানিখেতে। সেখানে তাঁবুতে থাকতেন তিনি। অফিসের কাজ করার সময় তিনি স্পষ্ট শুনতেন, কেউ যেন তাঁর নাম ধরে ডাকছে — "শ্যামাচরণ... শ্যামাচরণ, আমি তোমার প্রতীক্ষায় আছি, তুমি আমার কাছে এসো।" প্রথমে তিনি একে মনের ভ্রম ভেবে কাজে মন দিতেন, কিন্তু ডাক ক্রমশ তীব্রতর হতে থাকে। কিছুদিন পর তিনি স্থির করলেন, এই ডাকের উৎস অনুসন্ধান করবেন। সন্ধ্যায় অফিসের কাজ শেষে সেই কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে দ্রোণগিরি পর্বতে আরোহণ করলেন। সূর্যাস্ত হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। হঠাৎ তিনি দেখলেন, পর্বতের একটি গুহা থেকে এক অদ্ভুত আলো চারদিক আলোকিত করে তুলেছে। সেই আলো অনুসরণ করে গুহার কাছে পৌঁছে দেখলেন, এক দিব্যকান্তি যুবা সন্ন্যাসী গুহায় বিরাজমান। শ্যামাচরণ তাঁর দিকে তাকাতেই সন্ন্যাসী বললেন, "শ্যামাচরণ, আমিই তোমাকে ডাকছি, ভেতরে এসো।"
শ্যামাচরণ ভেতরে প্রবেশ করলেও তাঁর মনে সংশয় জাগে — এই সন্ন্যাসী তাঁর নাম জানলেন কীভাবে? অন্তর্যামী সন্ন্যাসী তাঁর মনের অবস্থা বুঝে এগিয়ে এসে তাঁর মেরুদণ্ড স্পর্শ করলেন, আর সেই স্পর্শমাত্রেই শ্যামাচরণ নিজের গুরুকে চিনে ফেললেন। সন্ন্যাসী গুহার ভেতরে একটি আসন ও কমণ্ডলু দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "শ্যামাচরণ, দেখো তো চিনতে পারো কি না?" তখন শ্যামাচরণ সহজেই চিনে ফেললেন — এ তাঁর পূর্বজন্মের সাধনস্থল, তাঁর নিজেরই আসন, এবং তাঁর জীবন্মুক্ত গুরুদেব — স্বয়ং শ্রীবাবাজী মহারাজ। তাঁর মনে পূর্বজন্মের সমস্ত স্মৃতি জেগে উঠল — কীভাবে তিনি এই গুহাতেই সন্ন্যাসী হয়ে গুরুর সান্নিধ্যে সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন, পরে দেহত্যাগ করেছিলেন। তিনি গুরুর চরণ স্পর্শ করে আকুল প্রার্থনা জানালেন যে তিনি পুনরায় সন্ন্যাস গ্রহণ করে এই গুহাতেই থেকে যেতে চান, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কাছে ফিরতে চান না।
গুরুদেব সান্ত্বনার স্বরে বোঝালেন যে তাঁরই যোগবিভূতির বলে শ্যামাচরণ সংসারে আবদ্ধ হয়েছেন এবং রানিখেতে বদলি হয়ে এসেছেন — এবং ক্রিয়াযোগকে নিম্নভূমিতে গৃহস্থ ভক্তদের হিতার্থে প্রচার করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গুরুদেব শ্যামাচরণের শরীর শুদ্ধ করে কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁকে দেবদুর্লভ ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত করলেন। ১৮৬১ সালের এই শুভক্ষণ কেবল শ্যামাচরণের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এক বিশেষ শুভক্ষণ হয়ে চিহ্নিত হয়ে রইল। লুপ্ত ক্রিয়াযোগ হিমালয় থেকে পুনরায় নিম্নভূমিতে ধর্মপিপাসু মানুষের কাছে ফিরে এলো।
ত্রৈলঙ্গ স্বামী, কাশীর 'চলতে-ফিরতে বিশ্বনাথ' নামে পরিচিত মহাযোগী, লাহিড়ী মহাশয়কে 'যোগিরাজ' সম্বোধন করে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেছিলেন — কারণ লাহিড়ী মহাশয় যে যোগমার্গে আরোহণ করেছিলেন, তা তাঁর সমকালীন কোনো যোগীর কাছে বোধগম্য ছিল না। সেই থেকেই তিনি যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় নামে পরিচিত হন — গৃহস্থদের কাছে "গৃহস্থদের ভগবান।" পরমহংস যোগানন্দের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ Autobiography of a Yogi প্রকাশিত হওয়ার পরই সমগ্র বিশ্ব যোগিরাজ লাহিড়ী মহাশয়ের নাম ও তাঁর প্রদর্শিত ক্রিয়াযোগের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হয়।


