জলেশ্বরীর যাদুকর
[justify]
বৃষ্টি পড়ে ভ্যাপসা ঘামের গরম বাড়িয়েছে আরো, রিকশায় আসতে আসতে হাঁপিয়ে উঠতে হয় ক্লান্তিতে। বাসায় এসে মুখ ধুয়ে শান্তিশান্তি ভাবটা ভেতরে আনতে যেয়েও কেটে যায় খবরটা জেনে। শরীর খারাপ এক সপ্তাহ ধরে, ছোটোখাটো এক দুর্ঘটনার জেরে মাথায় ভোঁতা অনুভূতি থাপড়াচ্ছে ক্রমাগত, গিলতে হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। স্ক্রিনে তাকালে ব্যথাটা কিছু পুষ্টি পায়, বই খুললে শালা এতোই আনন্দিত হয় যে উড়ে যেতে চায় মাথাটা সাথে নিয়ে। তবুও এ খবরে সাময়িক অসার মাথা আর চিরকালীন অসার আঙুল ছটফট করে। ভালো করে কিছুই ভাবা হয় না বলে সুহান বারান্দায় গিয়ে মানুষ, মানুষের মাথা, মোটরকার, রিকশা দেখে।
কিছু মানুষের প্রতি ভক্তি বলো আর মুগ্ধতা বলো, বেশি বাড়লে পরে তাদের সাথে কথা বলার ইচ্ছে মরে যায়। নটরডেমের জওহরলাল যেমন। মতিঝিলের ওদিকে দিয়ে গেলে দেখা তো তার সাথে হবেই। কিন্তু দেখা হলেই কথা হতে হবে এমনটা সুহান ভাবে না। কী দরকার, পাল্টা জিজ্ঞাসায় বুড়ো হয়তো এখনো মন কালা করে দিতে পারে। আরো উদাহরণে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নেওয়া যায়। কলাম লিখুক, বা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে লিখুক, রামপাল নিয়ে লিখুক; একেও ভারি ভালো লাগে। বইমেলার দীর্ঘলাইন, গণিত অলিম্পিয়াডের অনুষ্ঠান, অথবা একুশের হঠাৎ নিরিবিলি সকাল- এই লোকের সাথে দেখা কি আর কম হয়েছে নাকি? কিন্তু ওই যে, মানুষ তো লোকটা! হঠাৎ না পছন্দ কিছু একটা করে বসলে মনে বেঁকে বসার ভয় তাই থেকেই যায়। ভালো লাগা বজায় রাখতেই তার সাথে কথা বলতে মন সায় দেয় না।
সৈয়দ হকের বিষয়টা তা নয়। খেয়াল রাখা দরকার, নিয়মিত তার সাথে দেখা হতো কথা হতো- এমন কেউকেটা সুহান নয় কখনো। তবু সে গুরুর মতোই দেখে লোকটাকে। শব্দের, অক্ষরের, বাক্যের। আকাশ-বাতাস-নিয়ন বিজ্ঞাপণের ঢাকার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এভাবে শিক্ষক হিসেবে মনে মনে সৈয়দ হককে বসিয়ে আবেগে বেশ ভার বোধ হয় সুহানের, কিন্তু এই ল্যাংড়া উপমাকে কীভাবে বলবে ভাবতে ভাবতে তার মাথা আওলায়, ব্যাথাটা বাড়ে এবং বলবার ক্ষমতাটির অভাবে নিজেকে তার ফকির ফকির লাগে।
পরিচয়, যতটুকু মনে পড়ে, উপন্যাস দিয়েই। মহাশুণ্যে পরান মাস্টার, খেলারাম খেলে যা। সেবা অনুবাদ আর থ্রিলারের রোমাঞ্চ জগতের রেসে ওই বুড়োঘোড়া আর কতদূর টানবে। না টানুক, পরিচয়টা তো হলো! এইটুকু মনে করতেই সন্ধ্যা ঝপ করে চলে এলে, হঠাৎ একতাল অন্ধকার ক্যামোফ্লেজে ঢাকা গেরিলার মতোন চারপাশে ক্রল করে এগোতে থাকার ফাঁকে সুহানের মনে পড়ে, এমন কী আজও না শিল্পকলায় লোকটার ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ এর পোস্টার দেখে এলো?
কিন্তু এভাবে সিক্যুয়েল থাকে না, নাটক আপাতত অপেক্ষায় থাকুক। বরং দেখে আসা যাক ছোটগল্প আর মজলিসী লেখাগুলো।
স্রেফ উড়ে যাওয়া যাকে বলে আর কী। কুড়িগ্রামের কোনো এক লোককথক গণি’কে পেছনে ফেলতে যে যাত্রা শুরু, সেটার লাগাম সে কোথায় নিয়ে গেলো দ্যাখো। আবদুল খালেক আর জলেশ্বরী জনপদের কাছে মাথা ঠুকে ঠুকে ঘা বানিয়ে ফেললেও কী আর ওসব পাবো! প্রাচীন বংশের নিঃস্ব কোনো সন্তান কি এখনো পূর্নিমায় তাস বেচাকেনা করছে? কে জানে! গল্পই সে বলেছে, তবে জোছনার বিলাসে সেই গল্প ভেসে যেতে দেয় নি, বলতে গিয়ে বলাটাকে ভাষণও করে তোলেনি লোকটা।
পড়ার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কাজ। পড়া, পড়া এবং পড়া। শোনা কথা, তরুণ লেখকদের তিনি রুঢ়তম আঘাত দিতেন তাদের পর্যাপ্ত পাঠের অভাব দেখে। অথচ এখন লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই নাটক-সেই কবিতা- অমুক গদ্য থেকে ধার করে কয়েকটা কোট করে এখানে ওখানে কোটি খানেক ব্যানার পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছে। এসব অশিক্ষিতের হাতে শিক্ষকের লাঞ্ছনা দেখে সুহানের রাগ হয়, সে রাগ ক্রমশ বাড়ে এবং নিজেরই যখন তার স্মরণ হয় স্বীয় কূপমন্ডুকতার-রাগ উড়ে গিয়ে এলোমেলো ভাবটাই পড়ে থাকে তলায়।
হৃতকলমের টানে ভেসে যেতে হয়। ভেসে যেতে যেতেই জীবনের জন্যে সুহান জেনে যায়, প্রতিটি লেখকেরই সেরা লেখাটি লুকিয়ে থাকে করোটির ভেতরেই- সৈয়দ হকের মতো কোনো কোনো দড়াবাজিকর সেটির সন্ধান করে ফেরেন এবং পেয়েও যান প্রায়শই। আর প্রায় নয়, প্রায় প্রতিবারই মাথা খোলাসা করতে ওস্তাদের মার্জিনে কাটাকুটির অর্থ সন্ধান করতে হয় ফিবছর। লেখাও দিনশেষে অঙ্ক, এই ধ্রুব সত্য আবিষ্কার করেও ভিন্ন মাত্রায় ব্যঞ্জনা আসে ওসব কলকব্জা নেড়েচেড়ে দেখলে। এক্সেল শিট বানিয়ে খেতে হয়, অঙ্ক আর সুহান বুঝবে না? খুব বোঝে, তবু অবাক হয় সে, না হয়ে থাকে না উপায়, যে তেলেনাপোতা বলো আর চিলেকোঠা বলো- কেটে ছিঁড়ে দেখতে হয় ভালোলাগার ভেতরের সবটুকু। ভালোলাগার পাঠ তাই অবশ্যই হতে হবে বারবার।
গুন্টার গ্রাসকে ঢাকার কোনো আড্ডায় দ্বিধাহীন কন্ঠে সৈয়দ হক জানিয়েছিলেন, না, কোনো বই তোমার পড়িনি। জার্মান ব্যাটাও কি আর বাংলার সব্যসাচীর লেখা পড়েছে? পড়েনি। কিন্তু জবাবে যা বললো সে, সৈয়দ হক পেয়ে গেলেন গুন্টারের লেখক মননের পরিচয়। ‘হ্যাঁ, এখন তোমার সাথে মন খুলে কথা যায়। একদমই অচেনা লেখকের সাথে কথা বলেই শান্তি!’
ওনার সাথে সুহান তাই মন খুলে কথা বলতে চেয়েছে অক্ষরদের জলসাতেই, মুখোমুখি কোনো জবুথবু অসম আলোচনায় নয়।
মানুষের মতো জীবনযাপনের স্বার্থপর লোভ এক দিন থেকে অন্য দিনে টেনে নিয়ে গেলে সেখানে কবিতা মারানির জায়গা থাকে না, পদ্য তাই সে পড়ে না। কিন্তু কাব্যনাট্য তো পড়াই যায়। পায়ের আওয়াজের রাজাকারকে মনে পড়ে, মনে পড়ে ঈর্ষা- অদ্ভুত অবিশ্বাস্য সে ঈর্ষা- মানুষ নিজেকেই যা করে! দিনকাল খারাপ, ‘ব্যাটা অমুকপন্থী পত্রিকায় লিখতো- এর জন্যে কান্না কী!’ বা ‘তমুক পার্টির দালালি করতো হালায়, অর মায়েরে বাপ!’ বলে কখন যে কোন নুরুলদীন চলে আসে; এসব আশঙ্কায় জাগো বাহে কোনঠে সবাই বলে ডাকটা গলার কাছে চলে এলেও সেটাকে সুহান ভেতরে ঠেলে দেয়।
সন্ধ্যার হাওয়ায় পৃথিবীর কুৎসিততম নগরীতে একটির পর একটি আলো জ্বলে ওঠে। আর তার খারাপ লাগে। কত কিছুর কথা ভাবা যায়! রক্তগোলাপ? হ্যাঁ, ষাটের দশকের প্রথম ভাগেই, দুনিয়া জোড়া যাদুবাস্তবতার দিকে চোখ পড়বার প্রাক্কালেই ব্যাটা সেটা আমদানি করেছিলো। জনক ও কালোকফি কিংবা দূরত্ব, কত কিছু যে মনে পড়ে যায়। দম ফুরাইলে ঠুঁশ হয়ে যায় মানুষ- এই সত্য আজ নিবিড় করে জেনে গিয়ে তার অন্তিম অ্যাডভেঞ্চারের পূর্বে; সেই কবে পুরোন নতুন ঢাকার পথে হেঁটে বেড়ানো ছেলেটি কতবার নিজেকে নতুন করে জন্ম দিয়েছে জানতে এই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় সুহানের বড় সাধ হয়।
বলতেন, একটি শিরোপা তাদের দেবেই ইতিহাস। বলে যাবে, একটি প্রজন্ম কীভাবে নবগঠিত কৃত্রিম এক রাষ্ট্রের উষর মাটিতে পলি ফেলে ক্ষেত্র তৈরি করেছিলো তাদের কৃষ্টি আর সংস্কৃতির। সত্যিই তো, ওপারের নবকুমার আর পেশোয়ারের মাটিতে না হেঁটে ঢাকার মাটিতে চলেফিরে বেড়ানো আবদুল খালেককে ভুলি কী করে!
বিস্মরণের এই অক্ষমতা সুহানকে পীড়া দেয়। ফলে এমন হয়, দেখা যায় সে কবে যেন বারান্দা ছেড়ে ঘরে এসে গল্পসমগ্র নিয়ে বসেছে আবার। পাটুয়াটুলির সেই সন্ধ্যায়, সওগাত প্রেসের সামনের ডালিম গাছের তলায় সিক্স পেন্সের চাঁদের আলো, নীরবে মন খারাপ করে আছে কেউ। হঠাৎ পিঠে ফজলে লোহানীর হাত, ‘একদিন ওরা কেউ থাকবে না, তুমি থাকবে।’
কখনো কোনো কথা বিনিময় হয়নি যার সাথে, দ্যাখো তেমন কেউই চলে গেলে এক সন্ধ্যায় কেমন লিলুয়া হয়ে পড়ে বাতাস, বিশাল বাংলায় কত উদ্ভ্রান্ত লাগে নুরুলদীনদের। একেই কি ঢং করা বলে? বলতেও পারে।
তবু কারিগর, বলি জেনে রাখুন, একটি মাত্র বাক্যে যদি সুহান কখনো প্রতিফলিত করতে পারে আপনার খেরোখাতার মার্জিনে ঠাঁই নেয়া মন্তব্যের শিক্ষা, জানবেন সে আপনাকেই জেনে ও মেনেছিলো ওস্তাদ হিসেবে।
[/justify]
বৃষ্টি পড়ে ভ্যাপসা ঘামের গরম বাড়িয়েছে আরো, রিকশায় আসতে আসতে হাঁপিয়ে উঠতে হয় ক্লান্তিতে। বাসায় এসে মুখ ধুয়ে শান্তিশান্তি ভাবটা ভেতরে আনতে যেয়েও কেটে যায় খবরটা জেনে। শরীর খারাপ এক সপ্তাহ ধরে, ছোটোখাটো এক দুর্ঘটনার জেরে মাথায় ভোঁতা অনুভূতি থাপড়াচ্ছে ক্রমাগত, গিলতে হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। স্ক্রিনে তাকালে ব্যথাটা কিছু পুষ্টি পায়, বই খুললে শালা এতোই আনন্দিত হয় যে উড়ে যেতে চায় মাথাটা সাথে নিয়ে। তবুও এ খবরে সাময়িক অসার মাথা আর চিরকালীন অসার আঙুল ছটফট করে। ভালো করে কিছুই ভাবা হয় না বলে সুহান বারান্দায় গিয়ে মানুষ, মানুষের মাথা, মোটরকার, রিকশা দেখে।
কিছু মানুষের প্রতি ভক্তি বলো আর মুগ্ধতা বলো, বেশি বাড়লে পরে তাদের সাথে কথা বলার ইচ্ছে মরে যায়। নটরডেমের জওহরলাল যেমন। মতিঝিলের ওদিকে দিয়ে গেলে দেখা তো তার সাথে হবেই। কিন্তু দেখা হলেই কথা হতে হবে এমনটা সুহান ভাবে না। কী দরকার, পাল্টা জিজ্ঞাসায় বুড়ো হয়তো এখনো মন কালা করে দিতে পারে। আরো উদাহরণে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নেওয়া যায়। কলাম লিখুক, বা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে লিখুক, রামপাল নিয়ে লিখুক; একেও ভারি ভালো লাগে। বইমেলার দীর্ঘলাইন, গণিত অলিম্পিয়াডের অনুষ্ঠান, অথবা একুশের হঠাৎ নিরিবিলি সকাল- এই লোকের সাথে দেখা কি আর কম হয়েছে নাকি? কিন্তু ওই যে, মানুষ তো লোকটা! হঠাৎ না পছন্দ কিছু একটা করে বসলে মনে বেঁকে বসার ভয় তাই থেকেই যায়। ভালো লাগা বজায় রাখতেই তার সাথে কথা বলতে মন সায় দেয় না।
সৈয়দ হকের বিষয়টা তা নয়। খেয়াল রাখা দরকার, নিয়মিত তার সাথে দেখা হতো কথা হতো- এমন কেউকেটা সুহান নয় কখনো। তবু সে গুরুর মতোই দেখে লোকটাকে। শব্দের, অক্ষরের, বাক্যের। আকাশ-বাতাস-নিয়ন বিজ্ঞাপণের ঢাকার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এভাবে শিক্ষক হিসেবে মনে মনে সৈয়দ হককে বসিয়ে আবেগে বেশ ভার বোধ হয় সুহানের, কিন্তু এই ল্যাংড়া উপমাকে কীভাবে বলবে ভাবতে ভাবতে তার মাথা আওলায়, ব্যাথাটা বাড়ে এবং বলবার ক্ষমতাটির অভাবে নিজেকে তার ফকির ফকির লাগে।
পরিচয়, যতটুকু মনে পড়ে, উপন্যাস দিয়েই। মহাশুণ্যে পরান মাস্টার, খেলারাম খেলে যা। সেবা অনুবাদ আর থ্রিলারের রোমাঞ্চ জগতের রেসে ওই বুড়োঘোড়া আর কতদূর টানবে। না টানুক, পরিচয়টা তো হলো! এইটুকু মনে করতেই সন্ধ্যা ঝপ করে চলে এলে, হঠাৎ একতাল অন্ধকার ক্যামোফ্লেজে ঢাকা গেরিলার মতোন চারপাশে ক্রল করে এগোতে থাকার ফাঁকে সুহানের মনে পড়ে, এমন কী আজও না শিল্পকলায় লোকটার ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ এর পোস্টার দেখে এলো?
কিন্তু এভাবে সিক্যুয়েল থাকে না, নাটক আপাতত অপেক্ষায় থাকুক। বরং দেখে আসা যাক ছোটগল্প আর মজলিসী লেখাগুলো।
স্রেফ উড়ে যাওয়া যাকে বলে আর কী। কুড়িগ্রামের কোনো এক লোককথক গণি’কে পেছনে ফেলতে যে যাত্রা শুরু, সেটার লাগাম সে কোথায় নিয়ে গেলো দ্যাখো। আবদুল খালেক আর জলেশ্বরী জনপদের কাছে মাথা ঠুকে ঠুকে ঘা বানিয়ে ফেললেও কী আর ওসব পাবো! প্রাচীন বংশের নিঃস্ব কোনো সন্তান কি এখনো পূর্নিমায় তাস বেচাকেনা করছে? কে জানে! গল্পই সে বলেছে, তবে জোছনার বিলাসে সেই গল্প ভেসে যেতে দেয় নি, বলতে গিয়ে বলাটাকে ভাষণও করে তোলেনি লোকটা।
পড়ার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কাজ। পড়া, পড়া এবং পড়া। শোনা কথা, তরুণ লেখকদের তিনি রুঢ়তম আঘাত দিতেন তাদের পর্যাপ্ত পাঠের অভাব দেখে। অথচ এখন লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই নাটক-সেই কবিতা- অমুক গদ্য থেকে ধার করে কয়েকটা কোট করে এখানে ওখানে কোটি খানেক ব্যানার পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছে। এসব অশিক্ষিতের হাতে শিক্ষকের লাঞ্ছনা দেখে সুহানের রাগ হয়, সে রাগ ক্রমশ বাড়ে এবং নিজেরই যখন তার স্মরণ হয় স্বীয় কূপমন্ডুকতার-রাগ উড়ে গিয়ে এলোমেলো ভাবটাই পড়ে থাকে তলায়।
হৃতকলমের টানে ভেসে যেতে হয়। ভেসে যেতে যেতেই জীবনের জন্যে সুহান জেনে যায়, প্রতিটি লেখকেরই সেরা লেখাটি লুকিয়ে থাকে করোটির ভেতরেই- সৈয়দ হকের মতো কোনো কোনো দড়াবাজিকর সেটির সন্ধান করে ফেরেন এবং পেয়েও যান প্রায়শই। আর প্রায় নয়, প্রায় প্রতিবারই মাথা খোলাসা করতে ওস্তাদের মার্জিনে কাটাকুটির অর্থ সন্ধান করতে হয় ফিবছর। লেখাও দিনশেষে অঙ্ক, এই ধ্রুব সত্য আবিষ্কার করেও ভিন্ন মাত্রায় ব্যঞ্জনা আসে ওসব কলকব্জা নেড়েচেড়ে দেখলে। এক্সেল শিট বানিয়ে খেতে হয়, অঙ্ক আর সুহান বুঝবে না? খুব বোঝে, তবু অবাক হয় সে, না হয়ে থাকে না উপায়, যে তেলেনাপোতা বলো আর চিলেকোঠা বলো- কেটে ছিঁড়ে দেখতে হয় ভালোলাগার ভেতরের সবটুকু। ভালোলাগার পাঠ তাই অবশ্যই হতে হবে বারবার।
গুন্টার গ্রাসকে ঢাকার কোনো আড্ডায় দ্বিধাহীন কন্ঠে সৈয়দ হক জানিয়েছিলেন, না, কোনো বই তোমার পড়িনি। জার্মান ব্যাটাও কি আর বাংলার সব্যসাচীর লেখা পড়েছে? পড়েনি। কিন্তু জবাবে যা বললো সে, সৈয়দ হক পেয়ে গেলেন গুন্টারের লেখক মননের পরিচয়। ‘হ্যাঁ, এখন তোমার সাথে মন খুলে কথা যায়। একদমই অচেনা লেখকের সাথে কথা বলেই শান্তি!’
ওনার সাথে সুহান তাই মন খুলে কথা বলতে চেয়েছে অক্ষরদের জলসাতেই, মুখোমুখি কোনো জবুথবু অসম আলোচনায় নয়।
মানুষের মতো জীবনযাপনের স্বার্থপর লোভ এক দিন থেকে অন্য দিনে টেনে নিয়ে গেলে সেখানে কবিতা মারানির জায়গা থাকে না, পদ্য তাই সে পড়ে না। কিন্তু কাব্যনাট্য তো পড়াই যায়। পায়ের আওয়াজের রাজাকারকে মনে পড়ে, মনে পড়ে ঈর্ষা- অদ্ভুত অবিশ্বাস্য সে ঈর্ষা- মানুষ নিজেকেই যা করে! দিনকাল খারাপ, ‘ব্যাটা অমুকপন্থী পত্রিকায় লিখতো- এর জন্যে কান্না কী!’ বা ‘তমুক পার্টির দালালি করতো হালায়, অর মায়েরে বাপ!’ বলে কখন যে কোন নুরুলদীন চলে আসে; এসব আশঙ্কায় জাগো বাহে কোনঠে সবাই বলে ডাকটা গলার কাছে চলে এলেও সেটাকে সুহান ভেতরে ঠেলে দেয়।
সন্ধ্যার হাওয়ায় পৃথিবীর কুৎসিততম নগরীতে একটির পর একটি আলো জ্বলে ওঠে। আর তার খারাপ লাগে। কত কিছুর কথা ভাবা যায়! রক্তগোলাপ? হ্যাঁ, ষাটের দশকের প্রথম ভাগেই, দুনিয়া জোড়া যাদুবাস্তবতার দিকে চোখ পড়বার প্রাক্কালেই ব্যাটা সেটা আমদানি করেছিলো। জনক ও কালোকফি কিংবা দূরত্ব, কত কিছু যে মনে পড়ে যায়। দম ফুরাইলে ঠুঁশ হয়ে যায় মানুষ- এই সত্য আজ নিবিড় করে জেনে গিয়ে তার অন্তিম অ্যাডভেঞ্চারের পূর্বে; সেই কবে পুরোন নতুন ঢাকার পথে হেঁটে বেড়ানো ছেলেটি কতবার নিজেকে নতুন করে জন্ম দিয়েছে জানতে এই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় সুহানের বড় সাধ হয়।
বলতেন, একটি শিরোপা তাদের দেবেই ইতিহাস। বলে যাবে, একটি প্রজন্ম কীভাবে নবগঠিত কৃত্রিম এক রাষ্ট্রের উষর মাটিতে পলি ফেলে ক্ষেত্র তৈরি করেছিলো তাদের কৃষ্টি আর সংস্কৃতির। সত্যিই তো, ওপারের নবকুমার আর পেশোয়ারের মাটিতে না হেঁটে ঢাকার মাটিতে চলেফিরে বেড়ানো আবদুল খালেককে ভুলি কী করে!
বিস্মরণের এই অক্ষমতা সুহানকে পীড়া দেয়। ফলে এমন হয়, দেখা যায় সে কবে যেন বারান্দা ছেড়ে ঘরে এসে গল্পসমগ্র নিয়ে বসেছে আবার। পাটুয়াটুলির সেই সন্ধ্যায়, সওগাত প্রেসের সামনের ডালিম গাছের তলায় সিক্স পেন্সের চাঁদের আলো, নীরবে মন খারাপ করে আছে কেউ। হঠাৎ পিঠে ফজলে লোহানীর হাত, ‘একদিন ওরা কেউ থাকবে না, তুমি থাকবে।’
কখনো কোনো কথা বিনিময় হয়নি যার সাথে, দ্যাখো তেমন কেউই চলে গেলে এক সন্ধ্যায় কেমন লিলুয়া হয়ে পড়ে বাতাস, বিশাল বাংলায় কত উদ্ভ্রান্ত লাগে নুরুলদীনদের। একেই কি ঢং করা বলে? বলতেও পারে।
তবু কারিগর, বলি জেনে রাখুন, একটি মাত্র বাক্যে যদি সুহান কখনো প্রতিফলিত করতে পারে আপনার খেরোখাতার মার্জিনে ঠাঁই নেয়া মন্তব্যের শিক্ষা, জানবেন সে আপনাকেই জেনে ও মেনেছিলো ওস্তাদ হিসেবে।
[/justify]
Published on September 30, 2016 21:29
No comments have been added yet.


