ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ৬ - কেন ক্রিয়াযোগকে "বিজ্ঞান" আখ্যা দেওয়া হয়
এখন আমরা প্রবেশ করছি আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে — কেন ক্রিয়াযোগকে "বিজ্ঞান" আখ্যা দেওয়া হয়। পরমহংস যোগানন্দ ও পরমহংস হরিহরানন্দ উভয়েই ক্রিয়াযোগকে বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়েছেন। গণিতশাস্ত্র বা বিজ্ঞানের অন্য শাখায় যেমন নিয়মের ব্যতিক্রমের কোনো সম্ভাবনা নেই, তেমনই ক্রিয়াযোগ-বিজ্ঞান দ্বারা বিভিন্ন অনুভূতির মধ্য দিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ারও কোনো ব্যতিক্রম নেই। পাত্রভেদে কারো কম সময় লাগতে পারে, কারো বেশি — কিন্তু সদ্গুরুর কাছে দীক্ষাপ্রাপ্তির পর অধ্যবসায়ের সঙ্গে গুরুনির্দেশিত পথে সাধনা করলে মোক্ষপ্রাপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া নিশ্চিত।
প্রাণ-অপানের মিলন: ক্রিয়ার মূল প্রক্রিয়াক্রিয়াযোগের প্রাণায়ামে যখন প্রাণকে অপানে এবং অপানকে প্রাণে আহুতি দেওয়া হয়, তখন প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে? এই প্রশ্নের একটি ক্রমবদ্ধ উত্তর গ্রন্থে দেওয়া আছে।
প্রথমত, ঊর্ধ্বগামী প্রাণবায়ু ও অধোগামী অপানবায়ু পরস্পরবিরুদ্ধ দিকে কাজ করে, ফলে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। এই ভারসাম্যে শ্বাসপ্রশ্বাস স্তব্ধ হয়ে যায় বা অত্যন্ত মন্থর হয়, যাকে কুম্ভক বলা হয়। দ্বিতীয়ত, এই ভারসাম্যে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর প্রবাহ সমান হয়ে যায়, ফলে সুষুম্না নাড়ী উন্মুক্ত হয়। তৃতীয়ত, প্রাণশক্তি ইন্দ্রিয় থেকে প্রত্যাহৃত হয়ে মেরুদণ্ডে কেন্দ্রীভূত হয়। চতুর্থত, এই কেন্দ্রীভূত শক্তি চক্রসমূহে আবর্তিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে কুণ্ডলিনী জাগ্রত করে। পঞ্চমত, আয়ুর্বেদিক পরিভাষায় বলতে গেলে, প্রাণশক্তি ও তেজশক্তি একত্রিত হয়ে ওজঃশক্তিকে ঊর্ধ্বগামী করে — শারীরিক শক্তি রূপান্তরিত হয় আধ্যাত্মিক তেজে।
আমাদের মেরুদণ্ডে তিনটি প্রধান নাড়ী আছে — ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না। সুষুম্না মেরুদণ্ডের ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়, এবং এর ভেতরে আরও সূক্ষ্ম নাড়ী — বজ্রা ও চিত্রিণী। ইড়া মেরুদণ্ডের বাম দিক দিয়ে, পিঙ্গলা ডান দিক দিয়ে সর্পিলাকারে ওঠানামা করে। ইড়া চন্দ্রনাড়ী, শীতল, স্ত্রৈণশক্তি, বাম নাসারন্ধ্রের সঙ্গে যুক্ত। পিঙ্গলা সূর্যনাড়ী, উষ্ণ, পুরুষশক্তি, ডান নাসারন্ধ্রের সঙ্গে যুক্ত। স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাসপ্রশ্বাস ইড়া বা পিঙ্গলা দিয়ে চলে — কখনও বাম নাক দিয়ে বেশি, কখনও ডান নাক দিয়ে, প্রতি দেড় থেকে দুই ঘণ্টায় এই পরিবর্তন হয়। কিন্তু সুষুম্না সাধারণত অবরুদ্ধ থাকে। যোগসাধনায়, বিশেষত প্রাণায়ামে, যখন ইড়া ও পিঙ্গলার প্রবাহ সমান হয়, তখন সুষুম্না খুলে যায় এবং প্রাণশক্তি সরাসরি চক্রে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থাতেই মন স্বতঃস্ফূর্তভাবে শান্ত হয়, শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, এবং সাধক গভীর ধ্যান বা সমাধিতে প্রবেশ করেন।
সপ্তচক্র ও কুণ্ডলিনীআমাদের শরীরে সাতটি চক্র আছে — মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা ও সহস্রার। সাধারণত আমাদের মন মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান ও মণিপুর চক্রেই ভ্রমণ করতে থাকে — অর্থাৎ ভয়, কামনা ও ক্ষমতার স্তরে। ক্রিয়াসাধনার মাধ্যমে আমাদের মন ক্রমশ উচ্চতর চক্রে, অর্থাৎ অনাহত (প্রেম), বিশুদ্ধ (সৃজন) ও আজ্ঞাচক্রের (বিবেক) ভূমিতে আরোহণ করে। অবশেষে যখন কুণ্ডলিনীশক্তি মস্তিষ্কস্থ সহস্রদলপদ্মযুক্ত সহস্রার চক্রে আরোহণ করে, তখন সাধক তাঁর সাধনার চরমবিন্দুতে পৌঁছান। কুণ্ডলিনী যখন এই চক্রগুলি ভেদ করে ঊর্ধ্বগামী হয়, তখন সাধক বিভিন্ন অলৌকিক অনুভূতি ও ক্ষমতা লাভ করেন — কিন্তু এগুলি লক্ষ্য নয়, পথের সংকেতমাত্র।


